এবছর বাংলাদেশের নির্বাচনে ভারত কেন গরম ইস্যু নয়

ঢাকা, বুধবার, ১৬ জানুয়ারি ২০১৯ | ৩ মাঘ ১৪২৫

এবছর বাংলাদেশের নির্বাচনে ভারত কেন গরম ইস্যু নয়

পরিবর্তন ডেস্ক ৩:৪২ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৮, ২০১৮

এবছর বাংলাদেশের নির্বাচনে ভারত কেন গরম ইস্যু নয়

রোববার অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের ৪৮ ঘণ্টা আগে শুক্রবার সকালে নির্বাচনী প্রচারণা শেষ। কিন্তু এবারের প্রচারণার বক্তৃতাগুলোতে ভারত ফ্যাক্টরের কথা নেই, যদিও  অন্যান্যবার নির্বাচনের আগের প্রচারণায় এটার উল্লেখ থাকত।

যে কারনে এটা ঘটেছে তা হলো ‘অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন’ আয়োজনের আহ্বান জানানো ছাড়া ভারত আর কোনও বিবৃতি দেয়নি। তবে পশ্চিমা দেশগুলো বিশেষ করে ইউরোপীয় ও আমেরিকানরা নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন বিবৃতি দিয়েছে, তবে ভারত দেয়নি।

‘এটা খুব ইন্টারেস্টিং যে দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রচারণায় এবার ভারতের কোনও উল্লেখ নেই’, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন ঢাকায় নিযুক্ত এক ভারতীয় এক কূটনীতিবিদ।

হিযবুত তাহরীরের মতো একটি ইসলামি দল কিছু ভারতবিরোধী বক্তব্য দিয়েছে, কিন্তু বিএনপি বা আওয়ামী লীগের কোনো নেতাই প্রচারণার সময় ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্টকে নিয়ে মুখে ফেনা তোলেননি।

দুর্নীতির অভিযোগে কারাগারে থাকা খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি) আগের নির্বাচনগুলোতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন আওয়ামি লীগকে ‘ভারতপন্থি’ হওয়ার জন্য দোষারোপ করত। ‘আমার মনে হয় ওরা বুঝতে পেরেছে ভারতকে দূরে ঠেলে দিয়ে বিএনপির কোনও লাভ হচ্ছে না,’ বলেন ওই কূটনীতিবিদ।

সাবেক কূটনীতিবিদ ও খালেদা জিয়ার পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা সাবিহুদ্দিন দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন: ‘ভারত এবারের নির্বাচনে কোনও ফ্যাক্টর নয়। দিল্লীতে বিজেপি ক্ষমতায় এল নাকি কংগ্রেস তা নিয়ে আমাদের মাথাব্যাথার কোনও কারণ নেই। একইভাবে, নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জিতবে নাকি বিএনপি জিতবে সেটা নিয়ে ভারত সরকারেরও বিচলিত হওয়া উচিৎ নয়।’

আগের নির্বাচনগুলোতে ঐতিহ্যগতভাবে বিএনপি ভারতের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ করে এসেছে। কিন্তু ২০১৪ সালে আঙ্গুল পুড়িয়ে এবার তারা তাদের অবস্থানে সূক্ষ্ম পরিবর্তন এনেছে। সেবার বিএনপি নির্বাচন বয়কট করার পর ফের নির্বাচন আয়োজন করার জন্য দিল্লী হাসিনার সরকারকে কোনও চাপ দেয়নি, বরং তারা হাসিনার বিজয়কেই সমর্থন দিয়েছে। এতে অবস্থার বিরাট অবনতি ঘটে, যেটাকে বিএনপির ভিতরের অনেকেই ‘সাঙ্ঘাতিক ভুল’ বলে অভিহিত করেছেন।

ভারতের জন্য যেটা সহায়ক হয়েছে তা হলো গত কয়েক বছর ধরে দেশটি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্ব সহকারে কাজ করেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও শেখ হাসিনার মধ্যে দশটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে, ভিডিও কনফারেন্স হয়েছে ছয়টি, ফোনে কথোপকথন হয়েছে পাঁচ বার। দুই নেতা যৌথভাবে ১৯টি উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধন করেছেন। এবং মহাকাশ, তথ্যপ্রযুক্তি, সাইবার সিকিউরিটি, ইলেকট্রনিক্স, বেসামরিক পরমাণু শক্তির মতো বিভিন্ন বিষয়ে ৯০টি দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন।

চীনের প্রেসিডেন্ট শী জিনপিং যখন দুই হাজার তিনশ’ কোটি ডলার নিয়ে বাংলাদেশকে তোষামোদ করছেন, তখন দিল্লীও তাদের তৎপরতা বাড়িয়ে দিয়েছে। ১৯৭১ সালের পর ভারতের কোনও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর করেছেন।

বাংলাদেশ তাদের ৮০ শতাংশ সামরিক সরঞ্জাম আমদানি করে চীন থেকে।

গত তিন বছরে বাংলাদেশকে দেয়া ভারতের সহায়তার পরিমাণ তিনশ’ কোটি ডলার থেকে বেড়ে আটশ’ কোটি ডলারে এসে পৌঁছেছে। সাতশ’ কোটি ডলার মূল্যমানের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ৩১.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৯৩০ কোটি ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে।

পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউট অফ বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন: ‘আমার মনে হয় শেখ হাসিনা খুব দক্ষতার সঙ্গে ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিচরণ করেছেন। এবং আন্তর্জাতিক স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক উইন-উইন পার্টনারশিপ অর্থাৎ উভয়পক্ষ লাভবান হবে এমন অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে।’

কিন্তু খেলার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশিদের জন্য ভারতীয় ভিসার প্রক্রিয়া সহজ করে দেয়া। গত তিন বছরে এটা তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, ২০১৫ সালে ছিল পাঁচ লাখ ভিসা দেয়া হয় এবং ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৪.৫ লাখ।

‘বাংলাদেশের মানুষ এখন স্বচ্ছল এবং তাদের ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে তারা কেনাকাটা অথবা সাপ্তাহিক ছুটিতে স্রেফ পানশালায় ঘোরার জন্য কলকাতায় যায়,’ বলেন একজন ভারতীয় কূটনীতিবিদ।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহিংসতা ও উত্তেজনার মধ্যে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনকে নতুন দিল্লী বাংলাদেশের ‘আভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে অভিহিত করে শুভ ফলাফলের প্রত্যাশায় নিষ্ক্রিয় ভাবে অপেক্ষা করছে ভারত। তবে, তিন জন পর্যবেক্ষকও পাঠাবে তারা।

[শুভজিৎ রায় দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর সিনিয়র এডিটর। ২৮ ডিসেম্বর প্রকাশিত তার ‘This time in Bangla poll heat, why India not hot-button issue’ শিরোনামের লেখাটি অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ মামুনূর রশিদ।]

এমআর/এএসটি