অনন্য ফযীলতের রমাদান মাস

ঢাকা, বুধবার, ২২ মে ২০১৯ | ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

বিষয় :

রমাদান মাসের ফযীলত

রমাদান সম্পর্কে আয়াত ও হাদীস

অনন্য ফযীলতের রমাদান মাস

আফসানা হোসাইন ৩:৩৭ অপরাহ্ণ, মে ০৭, ২০১৯

অনন্য ফযীলতের রমাদান মাস

আবার একটি বছর পর ফিরে এলো রমাযান। বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের আত্মশুদ্ধির মাধ্যম। অন্তরের সমস্ত কলুষতা দূর করে পবিত্র হওয়ার উত্তম সময়। আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধনে রোযা একটি অপরিহার্য ইবাদত। হাদীসে বর্ণিত আছে,

ﻗَﺎﻝَ ﻋُﺜْﻤَﺎﻥُ ﺳَﻤِﻌْﺖُ ﺭَﺳُﻮﻝَ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﻳَﻘُﻮﻝُ ﺍﻟﺼِّﻴَﺎﻡُ ﺟُﻨَّﺔٌ ﻣِﻦْ ﺍﻟﻨَّﺎﺭِ ﻛَﺠُﻨَّﺔِ ﺃَﺣَﺪِﻛُﻢْ ﻣِﻦْ ﺍﻟْﻘِﺘَﺎﻝ

উসমান (রা.) বলেন, আমি রাসূল (সা.) কে বলতে শুনেছি, “রোযা ঢাল স্বরূপ। তোমাদের যুদ্ধে ব্যবহৃত ঢালের ন্যায়।” (ইবন মাজাহঃ ১৬৩৯)

আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একদিন রোযা রাখলে ঐ রোযাদার ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে সরিয়ে রাখা হবে। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেন,

مَنْ صام يومًا في سبيل الله باعد الله وجهه عن النار سبعين خريفًا

“যে বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় একদিন রোযা রাখে, আল্লাহ তাআলা তার মাঝে এবং জাহান্নামের মাঝে ৭০ বছরের দূরত্ব তৈরি করেন।” (বুখারী- ২৮৪০)

এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) আরো বলেছেন,

من صام رمضان ايمانا واحتسابا غفر له ما تقدم من ذنبه

“যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সাওয়াবের আশায় রোযা রাখবে তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।” (বুখারী- ১৮৭৫)

রোযা প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরয। রোযা হলো এমন ইবাদত, যার মাধ্যমে বান্দা প্রভুর নৈকট্যলাভ করতে সক্ষম হয়। মহাল আল্লাহ তাআলা বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ

“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরয করা হয়েছে, যেরূপ ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পারো। (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত : ১৮৩)

রমাদান হলো ইবাদতের মাস। এ মাসে ঈমান বৃদ্ধি হয়। এ সময় মানুষ অধিক নামায আদায় করে। কুরআন তেলওয়াত করে। তওবা, ইস্তিগফার করে। রাসূল (সা.) বলেন,

من قرأ حرفا من كتاب الله فله به حسنة والحسنة بعشر أمثالها

“যে ব্যক্তি কুরআনের একটি অক্ষর পাঠ করে তার প্রতিদানে সে একটি সাওয়াব পাবে। আর প্রতিটি সাওয়াব দশগুণ বাড়িয়ে দেয়া হয়।” (তিরমিযী- ২৯১০)

রোযা মন ও প্রবৃত্তিকে দমন ও নিয়ন্ত্রন করে, সংযমী হতে উদ্বুদ্ধ করে। ফলে রোযাদার তার মন ও প্রবৃত্তিকে সেই কাজে ব্যবহার করতে পারে, যাতে ইহকালীন ও পরকালীন কল্যান নিহিত রয়েছে। রাসূল (সা.) বলেন,

كل عمل ابن ادم يضاعف الحسنة عشر أمثالها إلي سبعمائة ضعف قال الله عزوجل إلا الصوم فإنه لي وأنا أجزي به يدع شهوته وطعامه من أجلي

“আদম সন্তানের নেক আমল দশ থেকে সাতশোগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। মহান আল্লাহ বলেন, তবে রোযা ব্যতিত। কেননা তা আমার জন্য, আর আমি নিজ হাতেই তার প্রতিদান দিব। সে তো তার প্রবৃত্তি ও পানাহার আমার জন্যই বর্জন করেছে।” (মুসলিম- ২৭৬৩)

রোযার মাধ্যমে প্রত্যেক ব্যক্তি পাপ কাজ থেকে মুক্ত থাকে, তাকওয়াবান হয়। যাবতীয় নিষিদ্ধ কর্ম থেকে বিরত থাকে। রাসূল (সা.) বলেন,

مَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ الزُّورِ وَالْعَمَلَ بِهِ وَالْجَهْل فَلَيْسَ لِلَّهِ حَاجَةٌ فِي أَنْ يَدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ

“যে ব্যক্তি রোযা রেখে মিথ্যা কথা ও তার উপর আমল ত্যাগ করতে পারল না, সে ব্যাক্তির পানাহার ত্যাগ করার মাঝে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।” (বুখারী- ৬০৫৭)

রোযা হলো বেহেস্তীগামী পথ। আবু উমামাহ (রা.), রাসূল (সা.) কাছে জানতে চাইলেন জান্নাতের প্রবেশ করাবে এমন আমল কি? রাসূল (সা.) বলেন, “তুমি রোযা রাখ। কারণ রোযার মত অন্য কোনো আমল নেই।” (নাসাঈ- ২২২১)

এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) আরো বলেন,

ان في الجنة بابا يقال له الريان يدخل منه الصائمون يوم القيامة لايدخل منه أحد غيرهم

“জান্নাতের এমন একটি দরজা আছে যার নাম হলো রাইয়ান। কিয়ামতের দিন এ দরজা দিয়ে কেবল রোযাদার ব্যক্তিগণ প্রবেশ করতে পারবে, অন্যরা প্রবেশ করতে পারবে না।” (বুখারী- ১৭৬৩)

রোযাদার ব্যক্তির মর্যাদা মহান আল্লাহ তাআলা সুমহান করেছেন। রোযাদার ব্যক্তির সকল আকুতি তিনি কবুল করে থাকেন। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেন,

ثلاثة لا تُرَدُّ دَعْوَتُهُمْ الإِمَامُ الْعَادِلُ وَالصَّائِمُ حِينَ يُفْطِرُ وَدَعْوَةُ الْمَظْلُومِ يَرْفَعُهَا فَوْقَ الْغَمَامِ وَتُفَتَّحُ لَهَا أَبْوَابُ السَّمَاءِ وَيَقُولُ الرَّبُّ عَزَّ وَجَلَّ وَعِزَّتِي لأَنْصُرَنَّكِ وَلَوْ بَعْدَ حِينٍ

“তিন ব্যক্তি এমন রয়েছে, যাদের দুআ ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। ১. ন্যায়পরায়ন শাসক, ২. রোযাদার, যখন সে ইফতার করে, ৩. মযলুম ব্যক্তির দুআ। তাদের দুআ মেঘের উপর তুলে নেওয়া হয় এবং এর জন্য আসমানের দরোজা সমূহ খুলে দেওয়া হয়। প্রতিপালক বলেন, আমার মর্যাদার শপথ! আমি তোমাকে সাহায্য করবো যদিও কিছু সময় পরেও হয়। (তিরমিযী- ২৫২৫)

রোযা কিয়ামত দিবসে রোযাদারের জন্য মহান আল্লাহর নিকটু সুপারিশ করবে । বলবে হে আমার রব! আমি তাকে দিনের বেলায় পানাহার ও যৌনক্রিয়া থেকে বিরত রেখেছিলাম। সুতরাং তার ব্যাপারে তুমি আমার সুপারিশ গ্রহণ করো। অতঃপর মহান আল্লাহ তাআলা রোযার সুপারিশ গ্রহণ করবেন। (মুসনাদে আহমদ- ১৭৪)

রোযা রোযাদারের জন্য খুশি ও সুখের সেতু। রাসূল (সা.) বলেন,

للصائم فرحتان يفرحهما إذا أفطر فرح وإذا لقي ربه فرح بصومه

“রোযাদারের জন্য দুইটি আনন্দের সময় রয়েছে। ১. ইফতারের সময় ২. প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাতের সময়।” (বুখারী- ১৭৭১)

রমাযানে সাহরী খাওয়া বরকতময়। রাসূল (সা.) বলেন,

تسحروا فان في السحور بركة

“তোমরা সাহারী খাও, কেননা সাহারীর মধ্যে বরকত রয়েছে।” (বুখারী- ১৭৮৯)

রোযা মানুষের হৃদয়কে নরম করে, আল্লাহ-প্রেমী করে। শিশুর মনে আমানতদারীতার বীজ রোপণ করে। একজন শিশুকে রোযা রাখতে অভ্যস্ত করার সময় যখন তাকে পানাহার করতে নিষেধ করা হয় এবং খাবার কাছে থাকা সত্ত্বেত সে এ বিশ্বাসে খেতে পারে না যে, এটা আল্লাহ নিষেধ করেছেন এবং তিনি দেখছেন। যার ফলে শৈশব থেকেই শিশু মহান আল্লাহর আনুগত্য করতে থাকে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ

“তারা তো আল্লাহর আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে একনিষ্ঠভাবে তার ইবাদত করতে আদিষ্ট হয়েছিল।” (সূরা আল-বায়্যিনাহ, আয়াত : ৫)

রমাদান হলো রহমতের মাস। এ মাসে শয়তানকে বন্ধি করে রাখা হয়। জান্নাতের দরজা সমূহ খোলে দেওয়া হয়। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেন,

إذا جاء رمضان فتحت أبواب الجنة وغلقت أبواب النار وصفدت الشياطين

“রমাদান মাস আসলে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয় আর শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়।” (মুসলিম- ২৫৪৭)

লেখক: শিক্ষার্থী, অনার্স তৃতীয় বর্ষ, ইসলামিক স্টাডিজ, টঙ্গি সরকারি কলেজ

এমএফ/ 

আরও পড়ুন...
রমযান যাদের আল্লাহর সাথে মিলিয়ে দেয়
রোযা ও রমযান : ফাযায়েল ও জরুরি মাসায়েল
হাদিস থেকে রমযানুল মোবারকের বিশটি স্পেশাল আমল
ইতিকাফ সৌভাগ্যের সোপান
রমযানের রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের হাদিসটি শুদ্ধ নয়