নবীজির স্বপ্নে উম্মতের প্রতি সতর্কবার্তা

ঢাকা, ২৩ জুন, ২০১৯ | 2 0 1

নবীজির স্বপ্নে উম্মতের প্রতি সতর্কবার্তা

আরিফুল ইসলাম দিপু  ৩:৪৪ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০১৯

নবীজির স্বপ্নে উম্মতের প্রতি সতর্কবার্তা

স্বপ্ন বলতেই সব সময়ে তা অবাস্তব, এ কথা কিন্তু ঠিক নয়। আর যদি স্বপ্নটি হয় আল্লাহর প্রেরিত শ্রেষ্ঠ মানুষ – আমাদের প্রিয় নবী (সা.) এর, তবে তা সত্য ছাড়া কিছুই নয়। হাদিসে বর্ণিত এমনই একটি স্বপ্ন ও ফেরেশতাদের দেওয়া এর ব্যাখ্যা নিয়ে এই লিখা।

সামুরাহ ইবনে জুনদুব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সা.) প্রায়ই তাঁর সাহাবীদেরকে বলতেন, “তোমাদের কেউ কোনো স্বপ্ন দেখেছে কি?” বর্ণনাকারী বলেন, আল্লাহ যার ব্যাপারে ইচ্ছা করতেন সে তাঁর কাছে স্বপ্ন বর্ণনা করতো।

একদিন সকালে তিনি নিজেই বললেন, “গতরাতে আমার কাছে দুজন আগন্তুক এলো। তারা আমাকে উঠালো, আর বললো, ‘চলুন।’ আমি তাদের সাথে চলতে লাগলাম। অতঃপর আমরা কাত হয়ে শোয়া এক ব্যক্তির নিকট পৌঁছলাম। দেখলাম, অপর এক ব্যক্তি তার নিকট পাথর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে তার মাথায় পাথর নিক্ষেপ করছে। ফলে তার মাথা ফাটিয়ে ফেলছে। আর পাথর গড়িয়ে সরে পড়ছে। তারপর আবার সে পাথরটির অনুসরণ করে তা পুনরায় নিয়ে আসছে। ফিরে আসতে না আসতেই লোকটির মাথা আগের মতো পুনরায় ভালো হয়ে যাচ্ছে। ফিরে এসে আবার একই আচরণ করছে, যা প্রথমবার করেছিলো। (তিনি বলেন,) আমি সাথীদ্বয়কে বললাম, ‘সুবহানাল্লাহ! এটা কী?’ তারা আমাকে বললো, ‘চলুন, চলুন।’ সুতরাং আমরা চলতে লাগলাম, তারপর চিৎ হয়ে শোয়া এক ব্যক্তির কাছে পৌঁছলাম। এখানেও দেখলাম, তার নিকট এক ব্যক্তি লোহার আঁকড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর সে তার চেহারার একদিকে এসে এর দ্বারা তার কশ থেকে মাথার পিছনের দিক পর্যন্ত এবং একইভাবে নাকের ছিদ্র থেকে মাথার পিছনের দিক পর্যন্ত এবং অনুরূপভাবে চোখ থেকে মাথার পিছন দিক পর্যন্ত চিরে ফেলছে। তারপর ঐ লোকটি শোয়া ব্যক্তির অপরদিকে যাচ্ছে এবং প্রথম দিকের সাথে যেরূপ আচরণ করেছে, অনুরূপ আচরণই অপর দিকের সাথেও করছে। ঐ দিক হতে অবসর হতে না হতেই প্রথম দিকটি আগের মতো ভালো হয়ে যাচ্ছে। তারপর আবার প্রথম বারের মতো আচরণ করছে। (তিনি বলেন,) আমি বললাম, ‘সুবহানাল্লাহ! এরা কারা?’ তারা আমাকে বললো, ‘চলুন, চলুন।’

“সুতরাং আমরা চলতে লাগলাম এবং (তন্দুর) চুলার মতো একটি গর্তের কাছে পৌঁছলাম। (বর্ণনাকারী বলেন, আমার মনে হয়, যেন তিনি বললেন,) আর সেখানে শোরগোল ও নানা শব্দ ছিলো। আমরা তাতে উঁকি মেরে দেখলাম, তাতে বেশ কিছু উলঙ্গ নারী-পুরুষ রয়েছে। আর নিচ থেকে নির্গত আগুনের লেলিহান শিখা তাদেরকে স্পর্শ করছে। যখনই লেলিহান শিখা তাদেরকে স্পর্শ করছে, তখনই তারা উচ্চরবে চিৎকার করে উঠছে। আমি বললাম, ‘এরা কারা?’ তারা আমাকে বললো, ‘চলুন, চলুন।’

“সুতরাং আমরা চলতে লাগলাম এবং একটি নদীর কাছে গিয়ে পৌঁছলাম। (বর্ণনাকারী বলেন, আমার যতদূর মনে পড়ে, তিনি বললেন,) নদীটি ছিলো রক্তের মতো লাল। আর দেখলাম, সেই নদীতে এক ব্যক্তি সাঁতার কাটছে। আর নদীর তীরে অপর এক ব্যক্তি রয়েছে এবং সে তার কাছে অনেকগুলো পাথর একত্রিত করে রেখেছে। আর ঐ সাঁতার-রত ব্যক্তি বেশ কিছুক্ষণ সাঁতার কাটার পর সেই ব্যক্তির কাছে ফিরে আসছে, যে তার নিকট পাথর একত্রিত করে রেখেছে। সেখানে এসে সে তার সামনে মুখ খুলে দিচ্ছে এবং ঐ ব্যক্তি তার মুখে একটি পাথর ঢুকিয়ে দিচ্ছে। তারপর সে চলে গিয়ে আবার সাঁতার কাটছে এবং আবার তার কাছে ফিরে আসছে। আর যখনই ফিরে আসছে তখনই ঐ ব্যক্তি তার মুখে পাথর ঢুকিয়ে দিচ্ছে। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এরা কারা?’ তারা বললো, ‘চলুন, চলুন।’

“সুতরাং আমরা চলতে লাগলাম এবং এমন একজন কুৎসিত ব্যক্তির কাছে এসে পৌঁছলাম, যা তোমার দৃষ্টিতে সর্বাধিক কুৎসিত বলে মনে হয়। আর দেখলাম, তার নিকট রয়েছে আগুন, যা সে জ্বালাচ্ছে ও তার চারিদিকে ছুটে বেড়াচ্ছে। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ঐ লোকটি কে?’ তারা বললো, ‘চলুন, চলুন।’

“সুতরাং আমরা চলতে লাগলাম এবং একটা সবুজ-শ্যামল বাগানে এসে উপস্থিত হলাম। সেখানে বসন্তের সব রকমের ফুল রয়েছে আর বাগানের মাঝে এত বেশি দীর্ঘকায় একজন পুরুষ রয়েছে, আকাশে যার মাথা যেন আমি দেখতেই পাচ্ছিলাম না। আবার দেখলাম, তার চারদিকে এত বেশি পরিমাণ বালক-বালিকা রয়েছে, যত বেশি পরিমাণ আর কখনোও আমি দেখিনি। আমি তাদেরকে বললাম, ‘উনি কে? এরা কারা?’ তারা আমাকে বললো, ‘চলুন, চলুন।’

“সুতরাং আমরা চলতে লাগলাম এবং একটা বিশাল (বাগান বা) গাছের নিকট গিয়ে উপস্থিত হলাম। এমন বড় এবং সুন্দর (বাগান বা) গাছ আমি আর কখনো দেখিনি। তারা আমাকে বললো, ‘এর উপরে চড়ুন।’ আমরা উপরে চড়লাম। শেষ পর্যন্ত সোনা-রূপার ইটের তৈরি একটি শহরে গিয়ে আমরা উপস্থিত হলাম। আমরা শহরের দরজায় পৌঁছলাম এবং দরজা খুলতে বললাম। আমাদের জন্য দরজা খুলে দেওয়া হলো। আমরা তাতে প্রবেশ করলাম। তখন সেখানে কতক লোক আমাদের সাথে সাক্ষাৎ করলো, যাদের অর্ধেক শরীর এত সুন্দর ছিলো, যত সুন্দর তুমি দেখেছো, তার থেকেও অধিক। আর অর্ধেক শরীর এত কুৎসিত ছিলো, যত কুৎসিত তুমি দেখেছো, তার থেকেও অধিক। সাথীদ্বয় ওদেরকে বললো, ‘যাও, ঐ নদীতে গিয়ে নেমে পড়ো।’ আর সেটা ছিলো সুপ্রশস্ত প্রবহমান নদী। তার পানি যেন ধবধবে সাদা। ওরা তাতে গিয়ে নেমে পড়লো। অতঃপর ওরা আমাদের কাছে ফিরে এলো। দেখা গেলো, তাদের ঐ কুশ্রী রূপ দূর হয়ে গেছে এবং তারা খুবই সুন্দর আকৃতির হয়ে গেছে। (তিনি বলেন,) তারা আমাকে বললো, ‘এটা জান্নাতে আদ্ন এবং ওটা আপনার বাসস্থান।’ (তিনি বলেন,) উপরের দিকে আমার দৃষ্টি গেলে দেখলাম, ধবধবে সাদা মেঘের মতো একটি প্রাসাদ রয়েছে। তারা আমাকে বললো, ‘ঐটা আপনার বাসগৃহ।’ (তিনি বললেন,) আমি তাদেরকে বললাম, ‘আল্লাহ তোমাদের মাঝে বরকত দিন, আমাকে ছেড়ে দাও; আমি এতে প্রবেশ করি।’ তারা বললো, ‘আপনি অবশ্যই এতে প্রবেশ করবেন। তবে এখন নয়।’

“আমি বললাম, ‘আমি রাতে অনেক বিস্ময়কর ব্যাপার দেখতে পেলাম, এগুলোর তাৎপর্য কী?’ তারা আমাকে বললো, ‘আচ্ছা আমরা আপনাকে বলে দিচ্ছি। ঐ যে প্রথম ব্যক্তিকে যার কাছে আপনি পৌঁছলেন, যার মাথা পাথর দিয়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হচ্ছিলো, সে হলো ঐ ব্যক্তি, যে কুরআন গ্রহণ করে তা বর্জন করে। আর ফরয সালাত ছেড়ে ঘুমিয়ে থাকে।

“আর ঐ ব্যক্তি যার কাছে গিয়ে দেখলেন যে, তার কশ থেকে মাথার পিছনের দিক পর্যন্ত এবং একইভাবে নাকের ছিদ্র থেকে মাথার পিছনের দিক পর্যন্ত এবং অনুরূপভাবে চোখ থেকে মাথার পিছন দিক পর্যন্ত চিরে ফেলা হচ্ছিলো। সে হলো ঐ ব্যক্তি যে সকালে আপন ঘর থেকে বের হয়ে এমন মিথ্যা বলে, যা চতুর্দিক ছড়িয়ে পড়ে।

“আর যে সকল উলঙ্গ নারী-পুরুষ যারা (তন্দুর) চুলা সদৃশ গর্তের অভ্যন্তরে রয়েছে, তারা হলো ব্যভিচারী-ব্যভিচারিণীর দল।

“আর ঐ ব্যক্তি যার কাছে পৌঁছে দেখলেন যে, সে নদীতে সাঁতার কাটছে ও তার মুখে পাথর ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে, সে হলো সুদখোর।

“আর ঐ কুৎসিত ব্যক্তি যে আগুনের কাছে ছিলো এবং আগুন জ্বালাচ্ছিলো আর তার চারপাশে ছুটে বেড়াচ্ছিলো, সে হলো মালেক (ফেরেশতা); জাহান্নামের দারোগা।

“আর ঐ দীর্ঘকায় ব্যক্তি যিনি বাগানে ছিলেন। তিনি হলেন ইব্রাহীম (‘আলাইহিস সালাম)। আর তাঁর চারপাশে যে বালক-বালিকারা ছিলো, ওরা হলো তারা, যারা (ইসলামী) প্রকৃতি নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে।”

বারক্বানীর বর্ণনায় আছে, “ওরা তারা, যারা (ইসলামী) প্রকৃতি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে (মৃত্যুবরণ করেছে)।” তখন কিছু সংখ্যক মুসলিম জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! মুশরিকদের শিশু-সন্তানরাও কি (সেখানে আছে)?’ রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, “মুশরিকদের শিশু-সন্তানরাও (সেখানে আছে)।

“আর ঐ সব লোক যাদের অর্ধেকাংশ অতি সুন্দর ও অর্ধেকাংশ অতি কুৎসিত ছিলো, তারা হলো ঐ সম্প্রদায় যারা সৎ-অসৎ উভয় প্রকারের কাজ মিশ্রিতভাবে করেছে। আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।” (বুখারি, বায়হাকি)

উল্লেখিত ঘটনাসমূহ অবশ্যই আমাদের জন্য সতর্কবার্তা বহন করে এবং একটি পরকালমুখী জীবন গড়তে তাগিদ দেয়। আল্লাহ্ আমাদের জন্য সহজ করুন। আমীন।

এমএফ/

আরও পড়ুন...

নবীজির স্বপ্নে দেখা কবরের আযাব
খারাপ স্বপ্ন দেখলে যে পাঁচটি কাজ করবেন
পাঁচ অবস্থার আগে পাঁচ অবস্থার মূল্যায়ন করুন

 

হাদিসের জ্যোতি: আরও পড়ুন

আরও