গীবত : কারণ ও প্রতিকার

ঢাকা, ২৪ জুন, ২০১৯ | 2 0 1

গীবত : কারণ ও প্রতিকার

ইবনে কুদামা আল মাকদিসি ২:০৯ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৭, ২০১৯

গীবত : কারণ ও প্রতিকার

গীবত মানে হল কারো পশ্চাতে তার নিন্দা করা। একজন মুসলমান অপর কোন মুসলমান ভাই সম্পর্কে এমন কথা বলা যা সে অপছন্দ করে। তার শরীরের কোন খুঁত নিয়ে যেমন, তার বেঁটে হওয়া কিংবা তার টেরা চোখ নিয়ে কিছু বলা কিংবা তার বংশ পরিচয় ধরে যেমন তার বাবার ব্যাপারে বলা যে সে ছিল অসৎ কিংবা অসভ্য কিংবা তার নৈতিকতা বিষয়ে বলা যে সে জঘন্য চরিত্রের ব্যক্তি।

মুসলিম শরীফে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, “নবীজিকে একবার গীবত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল তখন তিনি বললেন এটা হল তোমার ভাই সম্পর্কে এমন আলোচনা যা সে অপছন্দ করে। আবার জিজ্ঞাসা করা হল, যদি সত্যিই আমার ভাইয়ের মাঝে ঐ দোষটা বিদ্যমান থাকে। নবীজি বলেন, যদি সত্যিই তোমার ভাইয়ের মাঝে ঐ দোষ বিদ্যমান থাকে তাহলে আসলে তুমি তার গীবত করলে আর যদি তার মাঝে তা না থাকে তাহলে তুমি তার বিরুদ্ধে অপবাদ দিলে” –মুসলিম।

কুরআনে গীবতকে হারাম করা হয়েছে এবং যে গীবত করে তার তুলনা করা হয়েছে এমন ব্যক্তির সাথে যে নিজ মৃত ভাইয়ের গোশত খায়। ইরশাদ হয়েছে,

“মুমিনগণ, তোমরা অনেক ধারণা থেকে বেঁচে থাক। নিশ্চয় কতক ধারণা গোনাহ। এবং গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না। তোমাদের কেউ যেন কারও পশ্চাতে নিন্দা (গীবত) না করে। তোমাদের কেউ কি তারা মৃত ভ্রাতার মাংস ভক্ষণ করা পছন্দ করবে? বস্তুতঃ তোমরা তো একে ঘৃণাই কর। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।” –সূরা হুজুরাত: ১২

হাদিসেও গীবতকে নিন্দা করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, “নিশ্চয়ই তোমাদের রক্ত তথা জীবন, তোমাদের সম্পদ, তোমাদের সম্মান তোমাদের পরস্পরের জন্য হারাম।” -মুসলিম

আবু বারজা আসলামির রেওয়াতে এসেছে, নবীজি (সা.) বলেছেন, “ওহে! যারা কেবল মুখেই ঈমান এনেছে কিন্তু তাদের কলবে ইমানে দাখেল হয় নাই। তোমরা কোন মুসলিমের গীবত করোনা, তাদের দোষ খুঁজে বেড়িয়ো না। কারণ, যে তার ভাইয়ের দোষ-ত্রুটি খুঁজে বেড়ায় আল্লাহ ও তার দোষ-ত্রুটি প্রকাশ করে দিবেন এমনকি তাকে তার নিজ ঘরেও তাকে অপমানিত করবেন। -আবু দাউদ

গীবতের কারণ

বিভিন্ন কারণেই গীবত সংঘটিত হয়। যথাঃ

১। রাগ প্রশমনের জন্য অথবা অন্যের উপর রাগ ঝাড়ার জন্য। যে কেউ অন্যের উপর রাগের বশে গীবত করতে পারে।

২। কারো বন্ধু কিংবা মেহমানের সঙ্গে সুর মেলানো। কেউ তার বন্ধু বা মেহমানের সাথে মিলে অন্যের গীবত  করতে পারে এই ভেবে যে এটা সামাজিক সম্পর্কের জন্য জরুরী।

৩। অন্যকে নিচে নামিয়ে নিজেকে উপরে তোলার জন্য। যেমন কেউ বলতে পারে অমুক একটা আকাট মূর্খ আর সঙ্কীর্ণমনা অন্যদের এটা বুঝাতে যে সে অনেক জ্ঞানী আর দরাজদিল লোক। মানে, সে অন্যদের চাইতে ভাল।  

৪। হাসি-তামাশা। কেউ কেবল লোক হাসাতে অন্যের গীবত গাইতে পারে এমনকি এটা কারো কারো জীবিকা উপার্জনের উপায় ও বটে।

প্রতিকারের উপায়

গীবত হতে পারে কথায়, লেখায় কিংবা শারীরিক অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে। গীবত শ্রবণকারীও গিবতকারীর গুনাহের ভাগীদার হবে যদি না সে ঐ গীবতকে অগ্রাহ্য বা প্রত্যাখান করে তার কথা দিয়ে কিংবা হৃদয় দিয়ে অন্তত তা অপনোদনের চিন্তা না করে। কেউ চাইলে গীবতের স্থান ত্যাগ করতে পারে কিংবা আলোচনার মোড় অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে পারে। মানে, যে কোন অবস্থায় তাকে গীবতকে বাধা দিতে হবে। এটা মুসলিম হিসেবে আরেক মুসলিমের প্রতি দায়িত্ব।

গীবতকারীর জানা উচিত তার গীবতের মাধ্যমে সে নিজেকে আল্লাহর রাগ আর শাস্তির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তার নেক আমল যার গীবত করা হচ্ছে তার আমলনামায় যুক্ত হবে। আর যদি তার কোন নেক আমলই না থাকে তাহলে গীবতের শিকার ব্যক্তিদের পাপের বোঝা তার উপরই চাপানো হবে। কোন গীবতকারীর জন্য এ কথাগুলো স্মরণ আর এ অবস্থা নিয়ে ভাবার চাইতে ভালো কোন প্রতিকার নেই। এরপরেও যদি কেউ গীবত করতে চায় তবে সে তার নিজের দোষ-ত্রুটি আর এগুলো সারানোর উপায় নিয়ে ভাববে তখন হয়ত সে নিজের দোষ-ত্রুটির ব্যাপারে লজ্জিত আর সচেতন হবে। যখন বুঝতে পারবে তার নিজেরই তো কত দোষ আর ভুল! তখন সে লজ্জায় মরে যাবে এ ভয়ে যে যদি কেউ দেখে ফেলে। 

যদি কোন গীবতকারীর মনে হয় যে তার নিজের কোন দোষ-ত্রুটি নেই তবুও আল্লাহর প্রদত্ত নেয়ামতের শুকরিয়া জানিয়ে নিজেকে নিকৃষ্ট পাপ গীবতের কলুষতা থেকে মুক্ত রাখতে পারে। এর চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ হল গীবতের কারণগুলো সমূলে উৎপাটন করতে হবে। যদি সে জানে কারো উপর রাগ করলে সে তার গীবত করবে তাহলে তার রাগ প্রশমন করা উচিত। অন্য আলোচনায় যাবার পূর্বে বলে রাখা দরকার কলবের ও গীবত আছে। মানে অন্যের ব্যপারে খারাপ ধারণা রাখা। একজন মুসলিম অন্য মুসলিমের ব্যপারে খারাপ ধারণা রাখতে পারে না। অবশ্য সে যদি বিশ্বস্ত সূত্রে ঐ ব্যক্তির খারাপ দিক সম্পর্কে কোন মুসলিমের পক্ষ থেকে খবর পায়, যার সত্যতা সম্পর্কে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই তাহলে ভিন্ন কথা। তবুও একজন মুসলিমের অন্য মুসলিমের ব্যাপারে খারাপ ধারণা থেকে বিরত থাকা উচিত। শয়তান যখনই অন্য মুসলিম ভাইয়ের ব্যাপারে খারাপ ধারণা করতে কুমন্ত্রণা দেবে তখনই সে তার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করবে ফলে শয়তান ক্ষুদ্ধ হয়ে তাকে আর এ ব্যাপারে কুমন্ত্রণা দিবে না ইনশাআল্লাহ।

রাব্বুল আলামিন আমাদেরকে ধ্বংসাত্মক গীবত থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলার তাওফিক দান করুন। আমীন।

এমএফ/

আরও পড়ুন...
গীবত কী? চলুন জেনে নেই
গীবতের কারণ ও বেঁচে থাকার উপায়
অন্যের দোষ চর্চাকারী একজন ক্ষতিকর মানুষ
মানব সমাজ ও বিপর্যয় সৃষ্টিকারী গীবত
ধ্বংসাত্মক ৮ জিনিস থেকে জিহ্বাকে বাঁচান

 

হাদিসের জ্যোতি: আরও পড়ুন

আরও