ভাইয়ের প্রতি নবীজি (সা.) এর ৬ নসীহত

ঢাকা, ২৪ জুন, ২০১৯ | 2 0 1

ভাইয়ের প্রতি নবীজি (সা.) এর ৬ নসীহত

পরিবর্তন ডেস্ক ৩:২৩ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২১, ২০১৯

ভাইয়ের প্রতি নবীজি (সা.) এর ৬ নসীহত

হযরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন আমি বাহনে চড়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সাথে কোথাও যাচ্ছিলাম, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে বললেন, “হে যুবক! আমি তোমাকে কয়েকটি বাক্য শিক্ষা দিচ্ছি-

১. আল্লাহর প্রতি রুজু হও, তিনিই তোমার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবেন।

২. তাঁকে স্মরণ কর, সকল কাজেই তাঁকে পাশে পাবে।

৩. যদি কিছু চাওয়ার থাকে আল্লাহর কাছেই চাও।

৪. যদি সাহায্যের প্রয়োজন হয় তবে আল্লাহর কাছেই প্রার্থনা কর।

৫. জেনে রাখো! যদি আল্লাহ তোমাকে সাহায্য না করেন তবে পৃথিবীর সকলে মিলে তোমাকে সাহায্য করতে পারবে না।

৬. আর যদি আল্লাহ তোমার মঙ্গল চান তবে পৃথিবী মিলেও তোমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। তোমার তকদির সুনির্দিষ্টভাবে লিখিত আছে।” (তিরমিযী) 

সুন্দর এ হাদিসটির মাধ্যমে আমরা জানতে পারলাম রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর আপন চাচাতো ভাই ইবনে আব্বাস (রা.) এর সাথে কোথাও যাচ্ছিলেন। এসময় যুবক ভাইকে তিনি কিছু উপদেশ দেন। যা কেবল উপদেশই ছিল না বরং বাস্তব জীবনের এমন কিছু দিকনির্দেশনা প্রদান করলেন যার মাধ্যমে জীবনের সমস্ত চড়াই উৎরাই পেরিয়ে একটি সুন্দর জীবন গঠন সম্ভব।  

প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন ইবনুল জাওজিয়া এই হাদিসটি সমন্ধে বলেন, হাদিসটি নিয়ে ভাবতে গিয়ে সত্যিই আমি অবাক হয়েছি এবং তা আমার চিন্তার দুয়ার খুলে দিয়েছে। যদি আপনি হাদিসটিতে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর ভাষ্য বুঝতে পারেন তবে আপনিও একই উপলব্ধি করতে পারবেন। 

এইযে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইবনে আব্বাস রা. এর সাথে পথ চলতে নিয়েও জীবনের উত্তম দিক-নির্দেশনা সম্বলিত কথাগুলো বলছিলেন, এটিও আমাদের জন্য এক মহান শিক্ষা যে, সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই একে কোনভাবেই নষ্ট করা উচিৎ নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) যে কোনভাবেই হোক প্রতিটি মূহুর্তকে সর্বোচ্চ ব্যবহারের চেষ্টা করতেন এমনকি এখানেও মাত্র কিছু সময় চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে চলা অবস্থায় তাঁকে জীবনের দিক নির্দেশনা দিয়ে দিলেন। 

এই হাদিসটিতে মূলত তিনটি প্রধান বিষয় আলোচনা করা হয়েছে। এর উপর প্রতিটি মুমিনের আমল করা কর্তব্য।  

প্রথমতঃ আল্লাহকে রক্ষা কর তিনিও তোমাকে রক্ষা করবেন।

আল্লাহ নিজেই যেখানে সকল কিছুর রক্ষাকারী সেখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহকে রক্ষা করার কথা বলে আসলে কি বুঝিয়েছেন? 

আসলে তিনি বুঝিয়েছেন আল্লাহ দ্বীনের ব্যাপারে আমাদের যে সীমারেখা নির্ধারিত করে দিয়েছেন আমরা যেন তা মেনে চলি। আল্লাহ আমাদের যা করতে বলেছেন তা করতে হবে এবং যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে দূরে থাকতে হবে। এ সীমা রক্ষার পুরস্কার হবে আল্লাহ আপনাকে রক্ষা করবেন অর্থাৎ যখন আপনি তাঁর আহবানে সাড়া দিয়েছেন তিনিও আপনার ডাকে সাড়া দিবেন। এ সমন্ধে কুরআনে কয়েক জায়গায় বলা হয়েছেঃ 

“আমাকে দেয়া ওয়াদা পূর্ণ কর আমিও কৃত ওয়াদা পূর্ণ করবো।” (সূরা বাকারা: ৪০) 

“আমাকে স্মরণ কর আমিও তোমাদের স্মরণ করবো।” (সূরা বাকারা: ১৫২)

“হে ওই সকল লোকেরা যারা ইমান এনেছ, যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর তবে তিনিও তোমাদের সাহায্য করবেন।” (সূরা মুহাম্মাদ: ৭) 

তাই সহীহ নিয়তে যখনি কোন ভাল কাজ করবেন, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের চেষ্টা করবেন আল্লাহও তদ্রুপ আপনার  ডাকে সাড়া দিবেন। আপনি যেমন দিবেন তেমন লাভ করবেন; এভাবেই আল্লাহ তাঁর বান্দাদের সাথে ওয়াদা রক্ষা করে চলেন, তবে মনে রাখতে হবে আমরা যা দেই আল্লাহ তা বহুগুণে বাড়িয়ে উত্তম কিছুই ফেরত দেন। 

দ্বিতীয়তঃ যা চাওয়ার আল্লাহর কাছেই চাও

হাদীসের দ্বিতীয় শিক্ষা হচ্ছে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেনঃ

“কোন কিছু চাইতে হলে আল্লাহর কাছেই চাইবে, সাহায্যের  প্রয়োজন হলে আল্লাহর মুখাপেক্ষী হবে।” 

এর মাধ্যমে আমাদের বিশ্বাসের বাস্তব চিত্র ফুটে উঠতে দেখি। আমরা সাক্ষ্য দেই যে আল্লাহ এক তাঁর কোন শরিক নেই এবং আরও সাক্ষ্য দেই যে সকল প্রয়োজন একমাত্র তিনিই মিটাতে পারেন।  

হাদিসের মাধ্যমে আমরা আরও একটি শিক্ষা লাভ করি যেঃ আল্লাহ সর্বদাই আমাদের ডাকে সাড়া দেন। তিনি সর্বদাই আমাদের ডাকের অপেক্ষা করেন তাই আমাদের এ সুযোগ গ্রহণ করা উচিৎ। যখনি আপনি এ কাজ করবেন দেখবেন আল্লাহ আপনার ডাকে সাড়া দিচ্ছেন। এ বিষয়ের প্রতি ইসলামে অত্যধিক জোড় দিয়েছে। সালমান ফারসি র. কর্তৃক বর্ণীত অপর এক হাদিসে এসেছে রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের বলেছেন, যখন বান্দা আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করে আল্লাহ কখনো তাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দেন না।  

তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) এর শিক্ষা হচ্ছে যে কোন কিছুর জন্যেই আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করুন। হতে পারে তা কোন কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কিংবা আজ রাতে আপনার ডিনারটা টেবিলে রাখার মত কোন ব্যাপার। তারপরও আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করুন যেন তিনি আপনার কাজ সহজ করে দেন।  

এবার আসুন তৃতীয় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা যাক

“জেনে রাখো, যদি সমগ্র পৃথিবী মিলে তোমাকে সাহায্য করতে চায় কিন্তু আল্লাহ না চান তবে কেউ সাহায্য করতে   পারবে না, তকদিরে যা লিখা আছে তাই হবে। এবং যদি সমগ্র পৃথিবী তোমার ক্ষতি করতে চায় তাহলেও আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া তারা কিছুই করতে পারবেনা কারণ আল্লাহ তোমার জন্য যে কল্যাণ নির্ধারণ করেছেন তাই হবে।” 

মূল কথা হচ্ছে আল্লাহ যা পরিকল্পনা নির্ধারণ করে রেখেছেন তাই হবে। এ সমন্ধে একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন। আমাদের কাজ হচ্ছে সর্বোত্তম বিষয়টি খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করা। সেই সাথে আমাদের উচিৎ আল্লাহর তত্ত্বাবধানে থাকার চেষ্টা করা ও তাঁর একনিষ্ঠ বান্দা হতে সর্বোচ্চ সাধনা করা। আল্লাহর পরিকল্পনার বাইরে সমগ্র পৃথিবী মিলেও আপনার পক্ষে কিংবা বিপক্ষে কিছুই করতে পারবে না। 

তাই তকদির নিয়ে কখনো বাড়াবাড়ি করবেন না। আপনি হয়ত দেখছেন এমন কিছু হচ্ছে যা আপনি চাচ্ছেন না কিংবা আপনি যা চাচ্ছেন তা হচ্ছে না। এ নিয়ে ভেঙ্গে পড়ার কিছু নেই। যা হয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয়েছে। 

বরং আল্লাহ যা কিছুই আপনার জন্য নির্ধারণ করেছেন তা নিয়েই সন্তুষ্টচিত্তে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করুন। নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখুন এবং সেই সাথে আল্লাহর সাহায্য চাইতে কখনো ভুলবেন না। মনে রাখবেন আল্লাহ আপনার জন্য যা নির্ধারণ করেছেন দিন শেষে আপনি তাই পাবেন।  

সবশেষে হাদীসের আলোকে মুমিন জীবনের যে তিনটি নির্দেশনা পেলাম তা হচ্ছে -

১. আল্লাহ যা করতে বলেছেন তা করার চেষ্টা করুন এবং সর্বদাই ভালো কাজ করুন।

২. যখন আপনি কিছু চাইবেন তা আল্লাহর কাছেই চাইবেন, যে কোন কাজ করার ক্ষেত্রেই আল্লাহর সাহায্য কামনা করুন যেন তিনি সফলতা দান করেন; যে কোন কিছু করার আগে ও পরে আল্লাহর কাছে রহমত ও বরকতের জন্য প্রার্থনা করুন। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করুন যা করতে যাচ্ছেন তা যেন আল্লাহ পূর্ণ করার তৌফিক দেন এবং সফলতা দান করেন।

৩. আল্লাহর কাছে সবিনয়ে চাওয়ার ও চেষ্টার পর আল্লাহ আপনাকে যা দেন তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকুন।
 
এমএফ/

আরও পড়ুন...
ইমাম গাযালীর মূল্যবান আটটি জীবনোপদেশ
আন্দালুসিয়া বিজয় ও মহান সেনানায়ক তারিক বিন যিয়াদ
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ: জীবন ও দর্শন
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ; অবিচল ঈমানেরদৃষ্টান্ত যিনি
ইমাম শামিল: ককেশাসে রুশ আগ্রাসন প্রতিরোধের মহান নেতা

 

হাদিসের জ্যোতি: আরও পড়ুন

আরও