হাদিসের আলোকে ভালো মৃত্যুর কিছু নিদর্শন

ঢাকা, ১৯ জুন, ২০১৯ | 2 0 1

হাদিসের আলোকে ভালো মৃত্যুর কিছু নিদর্শন

মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ ফাহাদ ৪:২৫ অপরাহ্ণ, জুন ২৫, ২০১৮

হাদিসের আলোকে ভালো মৃত্যুর কিছু নিদর্শন

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু শুভ নিদর্শনের কথা বলেছেন, যার কোনো একটির সাথে বান্দার মৃত্যু হলে তা শুভ মৃত্যুর দিকে অঙুলি নির্দেশ করে।

১. মৃত্যুর সময় তাওহীদের কালিমা পাঠ।

হযরত মুয়ায ইবনে জাবাল রা. বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- من كان آخر كلامه لا إله إلا الله دخل الجنة “যার শেষ কথা হবে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৩১১৬; মুসতাদরাকে হাকিম ১/৩৫১

২. পৃথিবীতে আল্লাহ কালিমাকে সমুচ্চ রাখার জন্য শাহাদত বরণ করা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, (তরজমা) এবং (হে নবী!) যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদেরকে কখনো মৃত মনে করো না; বরং তারা জীবিত। তাদেরকে তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে রিযিক দেওয়া হয়।

আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে যা কিছু দিয়েছেন তারা তাতে প্রফুল্ল। আর তাদের পরে এখনও যারা (শাহাদতে) তাদের সঙ্গে মিলিত হয়নি তাদের ব্যাপারে এ কারণে তারা আনন্দ বোধ করে যে, (তারা যখন তাদের সঙ্গে এসে মিলিত হবে তখন) তাদের কোনো ভয় থাকবে না এবং তারা দুঃখিতও হবে না।

তারা আল্লাহর নেয়ামত ও অনুগ্রহের কারণেও আনন্দ লাভ করে এবং এ কারণেও যে, আল্লাহ মুমিনদের কর্মফল নষ্ট করেন না।-সূরা আলে ইমরান : ১৬৯-১৭১

৩. জিহাদের সফরে বা হজ্বের ইহরাম বাধা অবস্থায় মৃত্যু বরণ করা। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে সে শহীদ। যে আল্লাহর পথে মৃত্যু বরণ করেছে সে শহীদ।-সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১২০৬

অন্য হাদীসে আছে, ইহরামের হালতে উটের পিঠ থেকে পড়ে একজন ব্যক্তির মৃত্যু হলে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সম্পর্কে বললেন, তাকে বড়ই পাতাযুক্ত পানি দ্বারা গোসল দাও এবং তার (পরিহিত) দুটো কাপড়েই তাকে কাফন দাও। তবে তার মাথা আবৃত করো না। কেননা, কিয়ামতের দিন সে তালবিয়া পাঠ করতে করতে উত্থিত হবে।-সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১২০৬

৪. শেষ কাজ ইবাদত-বন্দেগী হওয়া

হুযায়ফা রা. বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে এবং এটাই হবে তার শেষ আমল, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। যে আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় একদিন রোযা রাখবে এবং এটাই হবে তার শেষ আমল, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। যে আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় সদকা করবে এবং এটাই হবে তার শেষ আমল, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

-মুসনাদে আহমদ ৫/৩৯১

৫. শরীয়ত কর্তৃক সংরক্ষিত পাঁচটি বিষয়ের কোনো একটি রক্ষা করতে যেয়ে মৃত্যুবরণ করা। পাঁচটি বিষয় হল : ধর্ম, জীবন, সম্পদ, সম্মান ও বুদ্ধি।

সায়ীদ ইবনে যায়েদ রা. থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে তার সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয় সে শহীদ, যে তার পরিবার-পরিজনদের রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয় সে শহীদ, যে দ্বীন রক্ষায় নিহত হয় সে শহীদ এবং যে তার জীবন রক্ষায় নিহত হয় সে শহীদ।-সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৪৭৭২; তিরমিযী, হাদীস : ১৪১৮

৬. মহামারি জাতীয় কোনো রোগে আক্রান্ত হয়ে ধৈর্য্য ধারণ করা এবং ছওয়াবের আশা নিয়ে মৃত্যু বরণ করা। হাদীস শরীফে এমন কয়েকটি রোগের কথা উল্লেখিত হয়েছে।

ক) প্লেগ (Plague)।

আনাস ইবনে মালিক রা. বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘তাউন’ হচ্ছে সকল মুসলিমের জন্য শাহাদত।-সহীহ বুখারী ১০/১৬৫-১৫৭; মুসনাদে আহমদ ৩/১৫০, ২২০

খ) যক্ষ্মা (Tuberculosis)।

রাশেদ ইবনে হুবাইশ বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, মুসলিমকে হত্যা করা হলে তা শাহাদত, তাউন শাহাদত, সন্তান প্রসবের সময় নারীর মৃত্যুবরণ শাহাদত এবং যক্ষা হল শাহাদত।-মুসনাদে আহমদ ৩/২৮৯

গ) পেটের পীড়া।

আবু হুরায়রা রা. বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হয়ে কেউ মৃত্যু বরণ করলে সে শহীদ।-সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১৯১৫

ঘ) যাতুল জাম্ব (ফুসফুসের একটি বিশেষ ব্যাধি (Pleurisy)।

জাবির ইবনে ওতাইক রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘যাতুল জাম্ব’ রোগে মৃত্যুবরণকারী শহীদ।

৭. সন্তান প্রসবের সময় ও নেফাস অবস্থায় নারীর মৃত্যু।

উবাদা ইবনে সামিত রা. থেকে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-সন্তান প্রসব করতে গিয়ে নারীর মৃত্যু হলে তা শাহাদত। তার সন্তান তাকে জান্নাতের দিকে টেনে নিয়ে যাবে। ... -মুসনাদে আহমদ ৪/২০১, ৫/৩২৩

৮. পানিতে ডুবে, আগুনে পুড়ে কিংবা ভূমি ধ্বসে মৃত্যু।

আবু হুরায়রা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, শহীদ পাঁচ শ্রেণীর : প্লেগ রোগে মৃত্যুবরণকারী, পেটের পীড়ায় মৃত্যুবরণকারী, পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণকারী, ভূমি ধ্বসে মৃত্যুবরণকারী এবং আল্লাহর পথের শহীদ।-জামে তিরমিযী, হাদীস : ১০৬৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১৯১৫

হযরত জাবির ইবনে ওতাইক বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তাআলার পথে নিহত হওয়া ছাড়াও আরো সাত শ্রেণীর শহীদ আছেন। যথা-

প্লেগ রোগে মৃত্যুবরণকারী শহীদ, পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণকারী শহীদ, যাতুল জাম্বে (ফুসফুসের একটি বিশেষ ব্যাধি) মৃত্যুবরণকারী শহীদ, পেটের পীড়ায় মৃত্যুবরণকারী শহীদ, আগুনে পুড়ে মৃত্যুবরণকারী শহীদ, ধ্বসের নীচে চাপা পড়ে মৃত্যুবরণকারী শহীদ। সন্তান প্রসব করতে গিয়ে মৃত্যুবরণকারী নারী শহীদ।-মুসনাদে আহমদ ৫/৪৪৬; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৩১১১; সুনানে নাসায়ী ৪/১৩-১৪

৯. জুমআর দিন বা রাতে মৃত্যুবরণ করা।

আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, কোনো মুসলিম শুক্রবার দিনের বেলা কিংবা রাতে মৃত্যুবরণ করলে আল্লাহ তাআলা তাকে কবরের ফেতনা থেকে মুক্তি দান করেন।-মুসনাদে আহমদ ২/১৬৭; জামে তিরমিযী, হাদীস : ১০৮০

১০. মৃত্যুর সময় কপাল ঘর্মাক্ত হওয়া।

হোসাইব থেকে বোরায়দা বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ঈমানদার মৃত্যু বরণ করে কপাল ঘর্মাক্ত অবস্থায়।-তিরমিযী, হাদীস : ৯৮২; সুনানে নাসায়ী ৪/৬

পরিশেষ
এছাড়াও আরো কয়েকটি উপায় নিম্নে উল্লেখ করা হল, যা শুভ মৃত্যুর উপলক্ষ হয়ে থাকে।

ক. গোপনে ও প্রকাশ্যে আল্লাহকে ভয় করা এবং নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহ অনুসরণ করা। কারণ এটিই মুক্তির পথ।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, (তরজমা) হে মুমিনগণ! অন্তরে আল্লাহকে সেইভাবে ভয় কর যেভাবে তাকে ভয় করা উচিত। সাবধান অন্য কোনো অবস্থায় যেন তোমাদের মৃত্যু না আসে; বরং এই অবস্থায়ই যেন আসে যে, তোমরা মুসলমান।-সূরা আলে ইমরান : ১০২

প্রত্যেকের উচিত গুনাহকে ভয় করা এবং তা থেকে দূরে থাকা। কারণ কবীরা গুনাহ তো মানুষকে ধ্বংস করে দেয় আর সগীরা গুনাহ বার বার করা হলে তা কবীরায় পরিণত হয়। সগীরা গুনাহয় লিপ্ত থাকলে তা অন্তরে কালিমা সৃষ্টি করে।

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে সকল গুনাহকে তুচ্ছ মনে করা হয় তোমরা তা থেকে দূরে থাক। (গুনাহকে তুচ্ছজ্ঞান করার দৃষ্টান্ত হল) একটি কাফেলা কোনো উপাত্যকায় যাত্রা বিরতি করল। এরপর একজন একটি লাকড়ি সংগ্রহ করে আনল, অন্যজন আরেকটি আনল (এভাবে পর্যাপ্ত লাকড়ি একত্র হল) এবং তারা রুটি সেঁকে প্রস্তত করল।

তো (এভাবেই) ছোটছোট গুনাহ যখন ব্যক্তিকে একত্রে পাকড়াও করবে তখন তাকে ধ্বংস করে ছাড়বে।-মুসনাদে আহমদ ৫/৩৩১

খ. সর্বদা আল্লাহর যিকির করা। যে সর্বদা আল্লাহর যিকির করে, যিকিরের মাধ্যমে তার সকল কাজ সমাপ্ত হয় এবং দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়ার সময় তার যবানে উচ্চারিত হয়-লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ সে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুসংবাদ লাভ করবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যার শেষ কথা হবে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।-সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৩১১৬; মুসতাদরাকে হাকেম ১/৩৫১

হাসানের সূত্রে সায়ীদ ইবনে মানসুর বর্ণনা করেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হল, সর্বোত্তম আমল কী? উত্তরে তিনি বললেন, তোমার মৃত্যু দিবসে তোসার জিহবা আল্লাহর যিকিরে সজীব থাকা।-আলমুগনী ২/৪৫০

হে আল্লাহ! আমাদের সর্বশেষ আমল যেন হয় আমাদের সর্বোত্তম আমল এবং আপনার সাথে মোলাকাতের দিন যেন হয় আমাদের শ্রেষ্ঠ দিন। আর আমাদেরকে শামিল করুন ঐসব লোকদের মাঝে যাদের প্রতি আপনার নেয়ামত বর্ষিত হয়েছে, যাদেরকে আপনি স্থান দিয়েছেন জান্নাতে, আপনার নৈকট্যের স্থানে। আমিন।

এমএফ/
আরও পড়ুন...
মৃত্যু যেন হয় জান্নাতের পথে যাত্রা

 

হাদিসের জ্যোতি: আরও পড়ুন

আরও