পথের কাঁটা দূরীকরণও সাদকাহ!

ঢাকা, রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৮ আশ্বিন ১৪২৫

পথের কাঁটা দূরীকরণও সাদকাহ!

শাইখ আতিক উল্লাহ ৫:৫৪ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১৮

পথের কাঁটা দূরীকরণও সাদকাহ!

মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। একাকী জীবন যাপন করা অসম্ভব না হলেও, একাকী জীবন যাপন করা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া নয়। সমাজে বাস করতে হলে, অপরকে নিয়েই বাস করতে হয়। সামাজিক জীবন সুন্দর করতে হলে, অপরের সাহায্য নিতেই হয়। বিনিময়ে আমাকেও কিছু দায়িত্ব পালন করতে হয়। কিছু দায়িত্ব ঐচ্ছিক, কিছু দায়িত্ব আবশ্যিক।

আবশ্যিক দায়িত্ব তো পালন না করে উপায় থাকে না। ঐচ্ছিক দায়িত্বগুলো নিয়ে অনেক সময় সমস্যা সৃষ্টি হয়। সমাজে বাস করা সব মানুষের দায়িত্ববোধ সমান নয়। কিছু মানুষ চেষ্টা করে, ফাঁকি দিয়ে দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে। তারা চায়, অন্যদের কাছ থেকে ষোলআনা আদায় করে, নিজের দেবার বেলায় গড়িমসি করতে। ঐচ্ছিক কাজগুলো নিজের দায়িত্ব নয় বলে অনেকে এড়িয়ে বাঁচতে চায়।

একটা সমাজ সুন্দরভাবে গড়ে উঠতে হলে, সমাজের প্রতিটি মানুষের মনোভাব সুন্দর হতে হয়। পারস্পরিক সহযোগিতার মানসিকতা থাকতে হয়। এই মানসিকতাকে উৎসাহিত করার জন্যে নবীজি আজীবন চেষ্টা-মেহনত করে গেছেন। নানাভাবে উপলক্ষে আমাদেরকে তিনি অন্যের তরে বাঁচার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে গেছেন। কখনও বিপুল সওয়াবের কথা বলে, কখনো পরকালের ভয় দেখিয়ে!

নবীজি (সা.) চেয়েছেন, প্রতিটি মুসলমান হবে আত্মত্যাগী। নিজের স্বার্থের চেয়ে অন্যের স্বার্থকে প্রাধান্য দেবে। সবার মানসিকতা হবে, অন্যের অপেক্ষায় না থেকে, নিজেই আগে বেড়ে কাজটা সেরে রাখা। এমন একটা কাজ হল, পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে রাখা। নবীজি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন,

كُلُّ سُلاَمَى مِنَ النَّاسِ عَلَيْهِ صَدَقَةٌ، كُلَّ يَوْمٍ تَطْلُعُ فِيهِ الشَّمْسُ، يَعْدِلُ بَيْنَ الاِثْنَيْنِ صَدَقَةٌ، وَيُعِينُ الرَّجُلَ عَلَى دَابَّتِهِ فَيَحْمِلُ عَلَيْهَا، أَوْ يَرْفَعُ عَلَيْهَا مَتَاعَهُ صَدَقَةٌ، وَالكَلِمَةُ الطَّيِّبَةُ صَدَقَةٌ، وَكُلُّ خُطْوَةٍ يَخْطُوهَا إِلَى الصَّلاَةِ صَدَقَةٌ، وَيُمِيطُ الأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ صَدَقَةٌ

মানুষের উপর প্রতিদিন তার শরীরের প্রতিটি ‘গ্রন্থি’র জন্যে সাদাকা দেয়া আবশ্যক। দু’জন ব্যক্তির মাঝে ইনসাফ কায়েম করে দেয়া একটা সাদাকা। কাউকে বাহনে চড়তে সাহায্য করা বা বাহনে বোঝা তুলতে সাহায্য করা একটি সাদাকা। উত্তম বাক্য উচ্চারণ করা একটি সাদাকা। সালাতের জন্যে মসজিদের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় প্রতিটি পদক্ষেপ একটি সাদাকা। পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেয়া একটি সাদাকা (আবু হুরায়রা রা. বুখারি ২৯৮৯)।

আমার এই শরীর আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ উপহার। আমার উচিত এই উপাহর প্রাপ্তির বিনিময়ে কিছু করা। আল্লাহর নবীও বলেছেন, আমার এই বহুমূল্য রত্নতুল্য শরীরের জন্যে আমার সাদাকা করা আবশ্যক। গুণে গুণে প্রতিটি গ্রন্থির জন্যে একটা করে সাদাকা। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের পক্ষে শরীরের গ্রন্থি-পরিমাণ নিত্যদিন সাদাকা করা অসম্ভব। নবীজি (সা.) বিকল্প বাতলে দিয়েছেন। কিছু আমল দিয়েছেন। সেগুলো করলে, সাদাকা আদায় হয়ে যাবে।

হাদীসে দুই ধরনের আমলের কথা বলা হয়েছে। দুই ব্যক্তির মাঝে ইনসাফ কায়েম করা, অপরকে বাহনের ক্ষেত্রে সাহায্য করা, সালাতের জন্যে মসজিদে গমন করা। পথ থেকে কষ্টকর বস্তু সরিয়ে দেয়া। একটা বিষয় লক্ষ্যণীয়, পথের কষ্টকর বস্তু সরিয়ে দেয়াকে উল্লেখ করা হয়েছে মসজিদে গমনের পাশে। মসজিদে গমন করা হয় আবশ্যিক ইবাদতের জন্যে। দুই ধরনের দু’টি আমলকে পাশাপাশি বলা, দু’টিকে প্রায় সমান স্তরের মর্যাদা দেয়া। নবীজি (সা.)সালাতের জন্যে মসজিদে গমনের মতো পথ থেকে কষ্টকর বস্তু সরিয়ে দেয়ার প্রতিও সমান গুরুত্ব দিয়েছেন।

بَيْنَمَا رَجُلٌ يَمْشِي بِطَرِيقٍ وَجَدَ غُصْنَ شَوْكٍ عَلَى الطَّرِيقِ فَأَخَّرَهُ، فَشَكَرَ اللهُ لَهُ فَغَفَرَ لَهُ

কোনও ব্যক্তি পথ চলার সময়, পথের উপর পড়ে থাকা কাঁটা সরিয়ে দিলে, আল্লাহর তার গুণগ্রাহী হয়ে তাকে ক্ষমা করে দেন (আবু হুরায়রা রা, বুখারি ২৪৭২)

ছোট্ট একটা কাঁটা সরানোর মাধ্যমে আল্লাহর ক্ষমা পেয়ে যাবো। আমার ছোট্ট এই কাজের মাধ্যমে কত মানুষ আর কত জীব কষ্ট পাওয়া থেকে রক্ষা পেল! রাস্তায় পড়ে থাকা নুড়ি-কংকর সরিয়ে দিতে পারি! কলার খোসা সরিয়ে দিতে পারি! গাড়ির চাকা ও পায়ের তলার জন্যে ক্ষতিকর কিছু থাকলে সরিয়ে দিতে পারি। রাস্তায় গর্ত থাকলে ভরাট করে দিতে পারি। কাঁদা থাকলে নিজ উদ্যোগে কিছু বালু ঢেলে দিতে পারি। পানি জমে থাকলে, একটা নালা কেটে পানি নিষ্কাষণের ব্যবস্থা করে দিতে পারি। প্রতিটি কাজের জন্যে আমি সরাসরি আল্লাহর ক্ষমা পেতে থাকব!

এফএস/এএসটি