র‌্যাব পরিচয়ে অপহরণ-নির্যাতন করতো তারা

ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮ | ২৯ কার্তিক ১৪২৫

র‌্যাব পরিচয়ে অপহরণ-নির্যাতন করতো তারা

পরিবর্তন প্রতিবেদক ১১:৫২ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ০৫, ২০১৮

র‌্যাব পরিচয়ে অপহরণ-নির্যাতন করতো তারা

ব্যাংক থেকে টাকা ওঠাতে আসা ও বিদেশ ফেরত ব্যক্তিদের র‌্যাবের পরিচয় দিয়ে মাইক্রোবাসে তুলে নিত একটি চক্র। ভুক্তভোগীদের গাড়িতে তোলার পর তারা বলতো, আপনার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

 

পরে ভুক্তভোগীদের চোখ বেধে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে সবকিছু ছিনতাই করে নির্জন স্থানে ফেলে রেখে যেত। রাজধানীর কাউলা থেকে র‌্যাব পরিচয়ে অপহরণকারী ওই চক্রের সাতজনকে আটক করেছে র‌্যাব-১। চক্রটি অপহরণ করে লোকজনকে ক্রসফায়ারেরও ভয় দেখাতো।

সোমবার দুপুরে কারওয়ানবাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান।

গ্রেফতারকৃতরা হলেন, কাসেম ওরফে জীবন (৫৮), ইব্রাহিম খলিল (৪০), জাকির হোসেন সুমন (২৭), বিল্লাল হোসেন ওরফে আসলাম (৩২), আব্দুল মান্নান (৫০), সোহাগ (২৭) ও আরিফ (২৮)।

ব্রিফিংয়ে মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক বলেন, এই চক্রের মূলহোতা কাশেম ওরফে জীবন। দলের স্থায়ী সদস্য ১০/১১ জন। চক্রটি বিভিন্ন মহাসড়কে ডাকাতি, ছিনতাই ও চাঁদাবাজিসহ নানাবিধ অপরাধ সংগঠিত করে থাকে। চক্রটি সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ব্যাংক গ্রাহককে টার্গেট করে অপহরণ করে তাদের কাছে থাকা নগদ টাকা ছিনিয়ে নেয়। এরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাংকের গ্রাহকদের অপহরণ ও অর্থ ছিনিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে নানা ধরনের কৌশল অবলম্বন করে থাকে।

প্রথমে তারা ১/২ জন গ্রাহক সেজে ব্যাংকে প্রবেশ করে অপর একটি দল তাদের তথ্যানুযায়ী সুবিধাজনক স্থানে র‌্যাবের স্টিকারযুক্ত মাইক্রোবাস নিয়ে অবস্থান করে। যেকোনো একজন গ্রাহককে টার্গেট করে যিনি ব্যাংক থেকে মোটা অংকের টাকা উত্তোলন করেছেন। তিনি যখন টকা নিয়ে ব্যাংক হয়ে বের হন, তখন ব্যাংকের ভেতরে থাকা গ্রুপটি বাইরে থাকা অপহরণ গ্রুপটিকে তাকে দেখিয়ে দেয়। ব্যাংকের গ্রাহক টাকা নিয়ে যে গাড়িতে ওঠে সেটা অপহরণকারী চক্রের মাইক্রোবাস অনুসরণ করে।

তাদের সুবিধাজনক স্থানে গিয়ে গাড়ির গতিরোধ করে। এরপর টার্গেট ব্যক্তিকে গাড়ি থেকে নামিয়ে চোখ বেঁধে অপহরণকারীরা তাদের গাড়িতে তুলে। মারধর করে তার কাছে থাকা টাকা হাতিয়ে নেয়। এরপর চেতনানাশক দিয়ে অথবা নির্জন কোনও জায়গায় তাকে নামিয়ে দেওয়া হয়।

মুফতি মাহমুদ খান বলেন, বিদেশ থেকে আসা ব্যক্তিদেরও অপহরণ করে তারা। কারণ, নগদ টাকা না পেলেও বিদেশ থেকে আনা বড় বড় লাগেজ পাওয়া যায়। এসব ক্ষেত্রে এই প্রতারক চক্রটি রাস্তায় তল্লাশি চৌকি বসিয়ে প্রতারণা করে।

র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, আরেকটি গ্রুপ লক্ষ্য রাখে যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ফলো করছে কি না। পরে অপহৃতের কাছ থেকে টাকা কেড়ে নিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে রাস্তায় ফেলে দেয়া হয়। এছাড়াও তারা রাস্তায় তল্লাশি চৌকি বসিয়েও বিদেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের অপহরণ করে সর্বস্ব কেড়ে নেয়।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক বলেন, গত সেপ্টেম্বরে দু’টি ও অক্টোবরে ১১টি অপহরণ করেছে এই চক্রটি। এরা হবিগঞ্জ, সীতাকুণ্ড, আশুলিয়া, চান্দিনা, কেরানীগঞ্জ, নরসিংদী, মাদারীপুর, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইলেরর মির্জাপুর, সিরাজগঞ্জ, টঙ্গী, চোদ্দগ্রামসহ বিভিন্ন হাইওয়ে এলাকায় তারা অপহরণ করে।

তিনি বলেন, চক্রটি মোটা অংকের টাকা পেয়েই শুধু ক্ষান্ত থাকতো না। তারা অপহরণ করে ডেবিট কার্ড ও ক্রেডিট কার্ডের পাসওয়ার্ডও নিয়ে নিত। পাসওয়ার্ড না দিতে চাইলে অমানুষিকভাবে নির্যাতন চালাতো।

মুফতি মাহমুদ খান আরও বলেন, চক্রটির কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন, ২ রাউন্ড গুলি, একটি ম্যাগাজিন, দু’টি হ্যান্ডকাফ, একটা ওয়াকিটকি সেট, দু’টি র‌্যাবের জ্যাকেট, একটি র‌্যাব বোর্ড, দু’টি সিগন্যাল লাইট, ছয়টি বড়লাঠি, দড়ি, চারটি চোখবাধার কালো কাপড়, ২৮ হাজার টাকা ও একটি কালো গ্লাসের মাইক্রোবাস।

সংবাদ সম্মেলনে ভিকটিম সেনাবাহিনীর সার্জেন্ট (অব.) রফিক তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে যেয়ে তিনি বলেন, কিছুদিন আগে আমি অবসরে যাই। ব্যাংক থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় তারা আমাকে ফলো করে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে টাকা ছিনিয়ে নেয়। সেনাবাহিনীর সার্জেন্ট হিসেবে কর্মরত ছিলাম আমি পরিচয় দিলেও তারা আমার কোনো কথায় না শুনে অমানুষিক অত্যাচার করে। তারা বলে, 'তোর মতো কত সেনাবাহিনীর অফিসারকে রাস্তাঘাটে ক্রসফায়ার দিলাম।' অনুরোধ করলেও তারা আমার সেনাবাহিনীর কার্ডটিও ফেরত দেয়নি। পরে আমাকে মারধোর করে নির্জন স্থানে ফেলে দেয়।

দেলোয়ার হোসেন নামে কেরানীগঞ্জের এক ভিকটিম জানান, তার গরুর খামার আছে। প্রতি বছর তিনি ব্রাক ব্যাংক থেকে ১০ লাখ টাকা তোলেন। এবারও তিনি ওই পরিমাণ টাকা তোলেন। টাকা উত্তোলন করে সোনালী ব্যাংকে জমা দিতে যাওয়ার সময় র‍্যাব পরিচয়ে গত সপ্তাহে তাকে অপহরণ করে। এসময় তার কাছে থাকা সাত লাখ টাকা নিয়ে যায় চক্রটি।

আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনআনুগ ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন বলে জানান র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক।

পিএসএস/এআরই