দার্জিলিংয়ের কমলায় বাজিমাৎ মহেশপুরের রফিকুলের

ঢাকা, রবিবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২০ | ৬ মাঘ ১৪২৬

দার্জিলিংয়ের কমলায় বাজিমাৎ মহেশপুরের রফিকুলের

শাহরিয়ার আলম সোহাগ, ঝিনাইদহ ৫:০৭ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৯, ২০১৯

বাগানে ঢুকতেই অনেক মানুষের ভীড় দেখা গেল। কেউ ঘুরছেন, কেউ আবার সেলফি তুলছেন। যেন দার্জিলিংয়ের কোনো কমলার বাগানে ঘুরতে এসেছেন। গাছে গাছে ঝুলে আছে থোকা থোকা কমলা ফল।

বলছিলাম ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী গ্রাম চাপাতলা এলাকার কমলা চাষী রফিকুল ইসলামের কমলা ফলের বাগানের কথা। রফিকুল মহেশপুর উপজেলার চাপাতলা গ্রামের আইনুদ্দীন মন্ডলের ছেলে। ভারতের সীমান্ত থেকে মাত্র ৪০০ গজ দূরে চাপাতলা গ্রামে অবস্থিত বাগানটি। রফিকুল ইসলাম পেশায় একজন নার্সারী ব্যবসায়ী। তিনি মেন্ডারিন ও দার্জিলিং দুই জাতের কমলা চাষ করেছেন।

বাগানে ঘুরতে ঘুরতে কথা হয় রফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানান, নিজের এক বিঘা চাষের জমি আছে। আর ছোট নার্সারীর ব্যবসা। ২ মেয়ে ও এক ছেলে। খুব কষ্টে দিন কাটতো তার। সংসারের অভাব ঘোচাতে ধার দেনা করে ৩ বছর আগে ভারতের দার্জিলিং গিয়েছিলেন কমলা বাগান দেখতে। মূলত নার্সারী ব্যবসা থাকায় সেখানে বিভিন্ন ফলের বাগানে তিনি ঘুরেছেন। এর মধ্যে কমলা বাগান দেখে বেশি ভালো লেগেছিল তার। দার্জিলিং থেকে ফেরার সময় ২০০ টাকা করে কমলা ও ১৪০ টাকা দরে মাল্টা লেবুর চারা কিনে আনেন। সেখান ফিরে এসে ২০১৬ সালের প্রথম দিকেই চাপাতলা গ্রামে অন্যের কাছ থেকে ৪ বিঘা জমি লীজ নেন। ওই জমিতে তিনি পেয়ারা, কমলা ও মাল্টার চাষ শুরু করেন।

রফিকুল ইসলাম আরো বলেন, প্রায় তিন লক্ষ টাকা খরচ হয়েছিল তার। এই জমি থেকে ১০ লক্ষ টাকার পেয়ারা ও ৯ লক্ষ টাকার কমলা বিক্রি করেছেন। দার্জিলিংয়ের কমলা কেজি প্রতি ১২০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। এরপর বাগান থেকে পেয়ারা গাছ উঠিয়ে শুধুই কমলার বাগান তৈরি করেছেন। এখনো প্রায় ২ লক্ষাধিক টাকার কমলা বাগানে আছে।

চাষ সম্পর্কে তিনি বলেন, ৫ বছর পর একটি গাছ ফল ধরার জন্য পরিপূর্ণতা লাভ করে। প্রতিটি গাছ থেকে ১২ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত ভালোভাবে ফল পাওয়া যাবে।

তিনি বলেন, দার্জিলিং থেকে তার বাগানের কমলা অনেক স্বাদের। তিনি মনে করেন, এ দেশেও কমলা চাষ ভালো হবে। তিনি এখন নিজেই এই কমলা গাছের চারা বিক্রি করছেন। তার বাগানের এই কমলার চাহিদা অনেক। একমাত্র ছেলে রোকনুজ্জামানকে সাথে নিয়ে কমলা চাষ করছেন তিনি।

ঘুরতে আসা তানভীর তুহিন নামের এক তরুণ বলেন, দূর থেকে কমলা বাগান দেখতে অনেক ভালো লাগছে। আমরা আগে ভারতের দার্জিলিংসহ বিভিন্ন দেশের কমলা বাগানের কথা শুনেছি, কিন্তু দেখি নি। এখন আমাদের দেশেই কমলা চাষ হচ্ছে। এটা খুব ভালো উদ্যোগ।

বাগান থেকে কমলা নিতে আসেন ঢাকার ফল ব্যবসায়ী আলমগীর হোসেন। তিনি বলেন, এই কমলার সাইজ, স্বাদ, রং সবকিছু দার্জিলিং বা অন্য দেশের কমলার মতো। এখান থেকে নিয়ে গেলে আমাদের লাভ বেশি হয়। ফল ভালো রাখতে কোনো প্রকার রাসায়নিক ব্যবহার করতে হয়না। এই ফল টাটকা থাকে।

মহেশপুর উপজেলার কুসুমপুর বাজারের ফল ব্যবসায়ী ফারুক হোসেন ও সালাম হোসেন। তারাও এসেছিলেন এই বাগান থেকে কমলা নিতে। তারা জানান, রফিকুল ইসলামের বাগানের এই কমলা অন্য দেশের কমলার থেকে ভালো। এখান থেকে কমলা নিয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামে পাঠান তারা।

মহেশপুর উপজেলা কৃষি অফিসার মোঃ হাসান আলী বলেন, আমি এবং বিভিন্ন ভিজিটর নিয়ে রফিকুল ইসলামের কমলার বাগান পরিদর্শন করেছি। সবাই বলেছে, দার্জিলিং থেকে এই কমলা অনেক ভালো। আমরা জানতাম পাহাড়ি অঞ্চলে কমলা ভালো হয়। কিন্তু মহেশপুর উপজেলার এই বেলে-দোঁ-আশ মাটিতেও অনেক ভালো কমলা হয়েছে। কমলাতে মাছি পোকা এড়াতে তাকে বেশ পরামর্শ দিয়েছি। গ্রাফটিং বা কলমের মাধ্যমে তাকে চারা বানানোর জন্য বলা হয়েছে। তাহলে চারাটি সুন্দর হবে।

তিনি জানান, ইতিমধ্যে বাগানটি পরিদর্শনে আসেন বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ উইংয়ের পরিচালক ড. আলহাজ উদ্দীন আহাম্মেদ। পরিদর্শনকালে তিনি জানিয়েছিলেন, সমতল ভূমিতে বাণিজ্যিকভাবে দার্জিলিং জাতের কমলার চাষ এবারই প্রথম। রফিকুলের বাগানে উৎপাদিত কমলা খেতে বেশ সুস্বাদু ও পুষ্টিকর।

এএসটি/

 

ভিডিও: আরও পড়ুন

আরও