সংকটে যশোরের যশ খেঁজুরের রস (ভিডিও)

ঢাকা, রবিবার, ৮ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সংকটে যশোরের যশ খেঁজুরের রস (ভিডিও)

যশোর ব্যুরো ৪:০০ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৬, ২০১৯

যশোরের যশ খেঁজুরের রস। খেঁজুর রস গুড়ের সঙ্গে ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে আবহমান কাল ধরে। কালের বিবর্তনে কমছে খেঁজুর গাছ। সেই সাথে নতুন প্রজন্ম আগ্রহী না হওয়ায় গাছির সংখ্যাও কমছে। শ্রম ও বিনিয়োগের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় এই সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। সংকটের মধ্যেও যেসব গাছি টিকে আছেন, তারা খেঁজুর গাছ পরিচর্যা ও রস গুড় সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, যশোর জেলার আট উপজেলায় সাত লক্ষ ৯১ হাজার ৫১৪টি খেঁজুর গাছ আছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি যশোর সদর, মণিরামপুর, শার্শা, চৌগাছা ও বাঘারপাড়া উপজেলায়। গত বছর জেলায় চার হাজার ৬৪০ মেট্রিক টন গুড়-পাটালি ও প্রায় ৪০ মেট্রিক টন রস উৎপাদন হয়েছে।

স্থানীয় বাজারে এই সব গুড় পাটালি বিক্রি হয়। রস গুড়-পাটালি উৎপাদনের জন্য যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলা খাজুরা। এখানকার গাছি আব্দুর জলিল বলেন, আগের মত খেঁজুর গাছ এখন আর দেখা যায় না। দিন দিন গাছ কমছে। প্রতিবছর গাছ কাটি (রস সংগ্রহ) করি। এবার ৩০টির মতো খেজুর গাছ পরিচর্যা করছি। আগাম রস আনতে পারলে রস ও নলেন গুড়-পাটলির ভালো দাম পাবো।

একই এলাকার চাষি নজরুল বলেন, ঝুঁকি নিয়ে গাছ কাটতে হয়। ভোরে গাছ রস নামানো খুব কঠিন কাজ। এর পর জ্বালিয়ে গুড় পাটালি তৈরি করে বিক্রি করতে হয়। এতো কষ্ট করার পরও ভাল দাম পাওয়া যায় না। কষ্টের তুলনায় লাভ হয় না। এজন্য আগের মত যেমন গাছ নেই, তেমনি গাছিও কমছে।

বাঘারপাড়ার পারকুল গ্রামের গাছি মিজানুর রহমান জানান, ২০ বছর ধরে খেঁজুর গাছ কেটে রস সংগ্রহ করেন। এবছর ৮০টি গাছের রস সংগ্রহের জন্য প্রস্তুত করেছেন। প্রতিবছর শীতের মৌসুমে রস, গুড় বিক্রির টাকায় সংসার চলে। মৌসুম শেষে দিনমজুরের কাজ করেন।

হাবুল্লা গ্রামের গাছি সাইফুল ইসলাম বলেন, বাপ দাদাদের কাছ থেকে গাছ কাটা শিখেছি। আমাদের ছেলেরা এই কাজে আর আসতে চায় না। খুব কষ্ট, সেই তুলনায় আয় কম। তাছাড়া ছেলেরা লেখাপড়া শিখে আর এই কাজ করতে চায় না।

শুধু বাঘারপাড়া উপজেলা নয়, গোটা জেলায় আগের মত খেঁজুর গাছ নেই। অনেকাংশে কমেছে গাছ। একই সাথে গাছির সংখ্যাও। অভিজ্ঞ গাছি ছাড়া রস সংগ্রহ করা যায়। গাছিদের পরবর্তী প্রজন্ম খুব বেশি এই পেশায় আগ্রহী হচ্ছে না। এজন্য সংকটে পড়েছে রস গুড়ের অস্তিত্ব। সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গুড় পাটালির ন্যায্য দাম না পাওয়া। বাজার সম্প্রসারণ না হওয়া গাছিরা রস, গুড়ের ন্যায্য দাম বঞ্চিত হয়।

অনলাইনে গুড় পাটালি বিক্রি

গত বছর থেকে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অনলাইনে গুড় পাটালি বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে। এতে বাজার সম্প্রসারণ হচ্ছে। তবে সেটিও সীমিত। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান কেনারহাটের উদ্যোক্তা নাহিদুল ইসলাম বলেন, গত বছর বাঘারপাড়ার ৬০ জন গাছির সঙ্গে চুক্তি করেছিলাম। তাদের তৈরি সাত টন গুড় পাটালি দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করেছি। স্থানীয় বাজারের তুলনায় দাম বেশি দিয়েছি। নির্ভেজাল পণ্যের চাহিদা বেশি হওয়ায় দাম বেশি ছিল। ক্রেতাদের ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। এবার বাঘারপাড়ার পাশাপাশি কেশবপুর ও মণিরামপুরের ক্রেতাদেরও যুক্ত করছি। গত বছরের তুলনায় এবার দ্বিগুণ টার্গেট করছি। গুড় পাটালি বাজার সম্প্রসারণ করতে পারলে গাছিরা দাম বেশি পাবে।  দাম না পেলে গাছ ও গাছি টিকিয়ে রাখা যাবে না।

তিনি আরও বলেন, গাছ ও গাছি কমে যাওয়ার মূল কারণ রস, গুড়, পাটালির ন্যায্য দাম না পাওয়া। গাছিরা যে পরিমাণ শ্রম, বিনিযোগ করে থাকে, সেই তুলনায় দাম পান না। এজন্য  গাছ কেটে অন্য গাছ রোপণ করেন। গাছিদের পরবর্তী প্রজন্মও আগ্রহী হয় না।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের উপ-পরিচালক ইমদাদ হোসেন শেখ জানান, যশোরের ঐতিহ্য খেঁজুর গাছ অনেক কমে গেছে। সরকারিভাবে খেজুর গাছ রোপণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমান প্রজন্মের লোকেরা এই খেঁজুর গাছের গুড় সংগ্রহের প্রতি বেশি উৎসাহী নয়। এজন্য  কিছুটা গাছ কমেছে।

যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শফিউল আরিফ বলেন, খেঁজুরের গুড় উৎপাদনে যশোর বিখ্যাত। এই জেলার গুড়ের সুনাম ও চাহিদা আছে। খেঁজুর গুড়কে ব্র্যান্ডিং করছি। কেনারহাট ডটকম নামে একটি প্রতিষ্ঠান অনলাইনে খেঁজুর গুড় পাটালি বিক্রি করছে। তারা গাছিদের উন্নয়নে কাজ করছে।

তিনি আরও বলেন, ভেজালমুক্ত গুড় পাটালি যাতে তৈরি হয়, সেই ব্যাপারে আমাদের প্রচেষ্টা থাকবে। যারা গুড় পাটালি তৈরি করে, তাদের সহায়তায় কাজ করছি। ভেজালমুক্ত পণ্য উৎপাদনে তাদেরকে উৎসাহিত করছি।

এসবি

 

ফিচার : আরও পড়ুন

আরও