হাসপাতাল থেকে প্রসূতি-নবজাতক গায়েব, ২ নার্স বরখাস্ত

ঢাকা, রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৮ আশ্বিন ১৪২৫

হাসপাতাল থেকে প্রসূতি-নবজাতক গায়েব, ২ নার্স বরখাস্ত

যশোর ব্যুরো ৬:৫৪ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৫, ২০১৮

হাসপাতাল থেকে প্রসূতি-নবজাতক গায়েব, ২ নার্স বরখাস্ত

যশোরের মনিরামপুর হাসপাতালে কর্তব্যরত নার্স ও আয়া লেবার রুমে (ডেলিভারি রুম) এক প্রসূতি মায়ের ডেলিভারি করে নবজাতককে বালতির মধ্যে ফেলে রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে। নার্স-আয়ার যোগসাজশে মা পালিয়ে গেলেও নবজাতকের গায়েবসহ সবকিছু বেমালুম চেপে যাচ্ছিলেন তারা। কিন্তু হাসপাতালের ওয়ার্ডে থাকা রোগী ও সিসি ক্যামেরায় ধারণকৃত ভিডিও ফুটেজে তাদের সব কর্মকাণ্ড ধরা পড়ায় বেকায়দায় পড়েছেন অভিযুক্তরা।

মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে হাসপাতালে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ঘটনার পরদিন বুধবার ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত দুই নার্সকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত নবজাতক উদ্ধারসহ প্রসূতি মায়ের পরিচয় উদঘাটন হয়নি।

মহিলা ওয়ার্ডের একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে নার্স হ্যাপী রায় হাতে পলিথিন ভরে (গ্লাভস্ পরে) এক মহিলাকে নিয়ে ডেলিভারি রুমে নিয়ে যান। একটানা প্রায় সাড়ে ৩টা পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন। দীর্ঘক্ষণ ভিতরে কি হচ্ছে তা দেখার জন্য কয়েকবার চেষ্টা করেন তারা। প্রতিবারই তাদের তাড়িয়ে দেন নার্স হ্যাপী রায়।

এরই এক ফাঁকে তারা দেখতে পান নবজাতককে অক্সিজেন দিয়ে টেবিলের উপর ফেলে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে দুধ নিয়ে ছোটাছুটি করেন ওই নার্স-আয়া। বেলা সাড়ে ৩টার পর নার্সসহ ওই মহিলা বেরিয়ে যান। দীর্ঘক্ষণ প্রসূতি ও নবজাতকসহ নার্সদের খোঁজ না থাকায় তাদের সন্দেহ হয়।

রাত ৭টার দিকে লেবার রুমে গিয়ে তারা নবজাতকের খোঁজ করতে থাকেন। বালতির ভিতর উপুড় করা অবস্থায় নবজাতককে উদ্ধার করেন তারা। পরে নবজাতককে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার কথা বলে আয়া কাকলী, নার্স ঝর্ণা ও  হ্যাপী রায় উদ্ধারকারী রোগীদের সাথে বাগ্বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে দুই নার্স ও আয়া নবজাতককে কেড়ে নিয়ে গায়েব করে দেন। পরে আর ওই নবজাতকের হদিস মেলেনি।

ওয়ার্ডের  রোগীসহ অনেকের ধারণা- কোনো অবিবাহিত মাকে ডেলিভারি করিয়েছেন নার্স ও আয়া। যে কারণে নবজাতকের মা আর ফিরে আসেননি। নার্স হ্যাপী রায়, ঝর্ণা ও আয়া কাকলীকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে নবজাতকের মায়ের পরিচয়সহ পুরো রহস্য উন্মোচিত হবে বলে তারা দাবি করেন।

জানতে চাইলে নার্স ঝর্ণা জানান, নবজাতককে বাঁচাতে তিনি কয়েকবার দুধ পান করিয়েছেন। তার এক নিঃসন্তান আত্মীয় বাচ্চা চেয়েছিল। আয়া কাকলী ফোন করে বাচ্চা নেয়ার জন্য ডাকলে সেখানে তিনি যান।

জানতে চাইলে আয়া কাকলী সব কিছু অস্বীকার করে বলেন, নবজাতককে হাসপাতালে পেয়ে নার্স ঝর্ণাকে খবর দেয়া হয়।

নার্স হ্যাপী ক্ষেপে গিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, না জেনে-শুনে কোনো কথা বলবেন না। নবজাতককে হাসপাতালের লেবার রুমে পাওয়া যায়। একপর্যায়ে তিনি সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করে দেন।

জরুরি বিভাগের চিকিৎসক রাজীব কুমার পাল বলেন, মঙ্গলবার রাত ৮.২০ মিনিটে তখনকার দায়িত্বরত নার্স নাজমা বিষয়টি আমাকে অবহিত করেন। লেবার রুমে গিয়ে সাত মাস বয়সী নবজাতকের চিকিৎসা করি। নার্স হ্যাপী রায়, ঝর্ণা ও আয়া কাকলী নবজাতককে নিয়ে যায়। এরপর নবজাতকের আর কোনো হদিস পাইনি।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে মনিরামপুর হাসপাতালের প্রধান ডা. আব্দুল গফ্ফার বলেন, এ ধরনের অপরাধ মেনে নেয়া যায় না। এ ঘটনায় অভিযুক্ত নার্স হ্যাপী রায় ও ঝর্ণা রানীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে  ডা. রাজীব কুমার পালকে প্রধান করে সিনিয়র নার্স নাজমা ও প্রধান অফিস সহকারী গণেশ মণ্ডলকে সদস্য করে ৩ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী ৭ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এরপর দোষীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হবে।

যশোর সিভিল সার্জন ডা. দিলীপ কুমার রায় বলেন, ইতোমধ্যে বিভাগীয় প্রধান নার্স নাছিমা খাতুনকে তলব করা হয়েছে। তাকে দিয়ে তদন্তের পাশাপাশি হাসপাতালের প্রধান ডা. আব্দুল গফ্ফারকে আগামী শনিবারের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

আইআর/এএল/