আবারও হর্ন বাজছে মোংলা বন্দরে

ঢাকা, বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৪ আশ্বিন ১৪২৫

আবারও হর্ন বাজছে মোংলা বন্দরে

এমএম ফিরোজ, মোংলা ৮:৫০ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১২, ২০১৮

আবারও হর্ন বাজছে মোংলা বন্দরে

মোংলা বন্দর সৃষ্টির পর থেকে দেশি-বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজের হর্নের শব্দে ঘুম ভাঙতো মোংলাবাসীর। কিন্তু নব্বই দশকের পর লোকসানে পরিণত হয় এ বন্দর। জাহাজ আগমন শূন্যে নেমে আসে। তবে এখন মোংলার পশুর নদীর বুক চিরে হর্ন বাজিয়ে বড় বড় জাহাজের আগমন জানান দিচ্ছে সুদিনে ফিরেছে মোংলা বন্দর। লোকসান কাটিয়ে প্রতি বছরই বাড়ছে বন্দরের রাজস্ব। গত ৫ অর্থ বছরের পরিসংখ্যানই তার প্রমাণ দিচ্ছে।

সূত্র জানায়, ১৯৫০ সালের ১ ডিসেম্বর মোংলা বন্দর প্রতিষ্ঠার পর নব্বই দশকের শেষে এসে মৃতপ্রায় ও লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় বন্দরটি। ধারাবাহিকভাবে লোকসান গুণতে গুণতে ক্রমেই বন্ধের উপক্রম হয়ে কর্মহীন ও অচল হয়ে পড়ে বন্দর।

 তবে দিন বদলে গেছে। মৃতপ্রায় বন্দরটিতে কর্মচাঞ্চল্য ফিরেছে।

সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, আগামী এক দশকের মধ্যে মোংলা বন্দরের কারণে গোটা খুলনাঞ্চল ঈর্ষণীয় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করবে যা জিডিপির (গ্রস ডমেস্টিক প্রোডাক্টশন) প্রবৃদ্ধিতে ২ শতাংশেরও বেশি অবদান রাখবে।

বন্দরের পরিসংখ্যানে জানা গেছে, গত ৫ বছরে মোংলা বন্দর দিয়ে জাহাজ আগমন, পণ্য আমাদানি বেড়েছে কয়েকগুন। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে মোংলা বন্দরে জাহাজ আগমন ছিলো ৩৪৫টি। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪১৬টি। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৪৮২টি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৬২৩টি এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৭৮৪টি।

এদিকে, মোংলা বন্দরের রাজস্ব আয়ের একটি বড় অংশ আসে রিকন্ডিশন গাড়ি দিয়ে।

বন্দরের পরিসংখ্যান বলছে, এ খাতেও গত ৫ বছরে বড় সাফল্য এসেছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে মোংলা বন্দর দিয়ে রিকন্ডিশন গাড়ি আমদানি হয়েছে ৮৪৩৮টি। ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে ১১২১৮টি। ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে ১৪৯৬৯টি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১৫৯০৭টি এবং সবশেষ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭২৯৫টি।

সমান তালে বেড়েছে বন্দর দিয়ে অন্যান্য পণ্য আমদানিও। এসব পণ্যের মধ্যে সিমেন্টে কাঁচামাল, গাছের লগ, মেশিনারি, কয়লা, পাথর উল্লেখযোগ্য। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে মোংলা বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি হয় ৩৫,৪৩,৯৪৯ মেট্রিক টন। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৫,৩০,২৭৯ মেট্রিক টন। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৫৭,৯৭,৫২১ মেট্রিক টন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৭৫,১২,০০০ মেট্রিক টন, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৭,১৬,০৫০ মেট্রিক টন।

অন্যদিকে বন্দরে জাহাজ আগমন, রিকন্ডিশন গাড়ি ও পণ্য আমদানি বেড়ে যাওয়ায় পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বন্দরের রাজস্ব আয়ও। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে মোংলা বন্দরের আয় হয়েছে ১৫৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭০ কোটি ১৭ লাখ টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে ১৯৬ কোটি ৬২ লাখ টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ২২৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। সবশেষ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৬৬ কোটি ৪২লাখ টাকা।

বন্দর সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও সকলের আন্তরিকতায় স্বরূপে ফিরেছে মোংলা বন্দর।

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান কমোডর এ কে এম ফারুক হাসান বলেন, উন্নয়নের সুবাতাস বইছে মোংলা বন্দরের উপর দিয়ে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে মোংলা বন্দর দ্রুত আধুনিকায়নের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এর ফলে বন্দর ব্যবহাকারীসহ সবার নজর এখন এ বন্দরের দিকে পড়ছে।

তার ভাষ্যমতে, ২০০১ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ক্রমাগত লোকসানের পর বর্তমান সরকার মোংলা বন্দর উন্নয়ন ও ব্যবহার বাড়াতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে নানামুখী পদক্ষেপ নেয়। বন্দরের সার্বিক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বেশ কিছু প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। সরকারের নানামুখী ইতিবাচক পদক্ষেপে বন্দরের ব্যবহার বাড়তে থাকে। ২০০৯ সাল থেকে এটি একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

রাজস্ব খাতে আয় বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে মোংলা বন্দর জাতীয় মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিতে অবদান রেখে চলেছে। আমদানি করা খাদ্যশস্যের ৪০ শতাংশের বেশি এ বন্দর দিয়ে খালাস হয়। বছরে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা মূল্যের পণ্য আমদানি-রপ্তানি হয় এ বন্দরের মাধ্যমে। কর্মসংস্থান হয় ১০ হাজার লোকের। তবে পদ্মা ব্রিজ, খুলনা-মোংলা রেললাইন, রামপাল পাওয়ার প্ল্যান্ট, বিমান বন্দর, ইপিজেড, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, প্রতিবেশী দেশগুলোর ট্রানজিট সুবিধা চালুর পর বন্দরের ব্যবহার আরও ৩ থেকে ৪ গুণ বেড়ে যাবে। দেশি-বিদেশি বাণিজ্য পণ্য আমাদানি-রপ্তানির সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়ে এখন থেকেই তৈরি হতে হবে।

এসবি