পিরোজপুরে চরাঞ্চলের নারীরা জন্মনিয়ন্ত্রণে উদাসীন, পুষ্টিহীনতায় শিশুরা

ঢাকা, সোমবার, ২৩ জুলাই ২০১৮ | ৮ শ্রাবণ ১৪২৫

পিরোজপুরে চরাঞ্চলের নারীরা জন্মনিয়ন্ত্রণে উদাসীন, পুষ্টিহীনতায় শিশুরা

পিরোজপুর প্রতিনিধি ৪:৫৬ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১২, ২০১৮

print
পিরোজপুরে চরাঞ্চলের নারীরা জন্মনিয়ন্ত্রণে উদাসীন, পুষ্টিহীনতায় শিশুরা

উপকূলীয় এলাকা পিরোজপুরের ইন্দুরকানীতে জন্মনিয়ন্ত্রণে উদাসীন চরাঞ্চল ও জেলে পরিবারের লোকজন। ফলে অধিক সন্তানসহ নানামুখী সমস্যায় ভুগছে তাঁরা। স্বাস্থ্য ঝুঁকি, অশিক্ষা, পুষ্টিহিনতা, অর্থ সংকট তাদের ঘিরে ধরেছে। কোনভাবেই তাঁরা এর থেকে বের হতে পারছে না।

উপজেলার সাউথখালী চরে প্রায় দেড় শতাধিক পরিবারের বসবাস। যারা সবাই দিন মজুর ও জেলে। দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করছে এখানকার প্রতিটি পরিবার। এখানকার এক বাসিন্দা ফরিদা বেগম। বয়স তার ৩৮ বছর। ৭ সন্তানের জননী তিনি। আব্দুল হক ফরাজীর দ্বিতীয় স্ত্রী তিনি। আব্দুল হক পেশায় একজন দিনমজুর। তার প্রথম স্ত্রীর ঘরেও রয়েছে ৬ সন্তান। ১৬ জন সদস্যের এই পরিবারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন হক। ফরিদা বেগম ৭ সন্তানের ৫ জন নিয়ে আলাদা বসবাস করেন। সাউথখালী চরের আবাসনের একটি কক্ষে থাকেন।

ফরিদার বড় মেয়ে তানিয়া। বয়স ১৩ বছর। ঢাকায় একটি বাসায় ঝিয়ের কাজ করে। তার পরের মেয়েটি ১১ বছরের মানসুরা। সেও বড়বোনের অনুসারী। তাদের উপার্জন যোগ হয় ফরিদার সংসারে। ফরিদার সবার ছোট ছেলে সন্তানের বয়স মাত্র ৮ মাস। স্বামী আব্দুল হক ফরিদার তেমন কোন খোঁজ খবর রাখেন না। তারপরেও জীবিকার দায়ে শিশু সন্তানদের নিয়ে বলেশ্বর নদে জাল দিয়ে মাছ ধরে বিক্রি করেন ফরিদা। এভাবেই কোন মতে তাঁর সংসার চলে যাচ্ছে।

ফরিদার মত করে সাউথখালী চরের অধিকাংশ পরিবারে রয়েছে বহু সন্তান। নিম্নআয়ের এই মানুষগুলো জন্ম নিয়ন্ত্রণে অনাগ্রহী। এখানে যেমন বহু বিবাহের প্রচলন রয়েছে। তেমনি রয়েছে তালাকের প্রবনতাও। আর এ সকল পরিবার প্রধানেরা জন্মনিয়ন্ত্রণে অনাগ্রহী হওয়ায় তাদের পরিবারে শিশু সদস্যের সংখ্যাও বেশি। ফলে দারিদ্রতা ও অপুষ্টি যেন তাদেরকে আরো প্রবল আকারে পেয়ে বসেছে। অধিক সন্তানকে আয়ের উৎস বলে মনে করেন তারা। শিশু বয়সেই সবাই বাবাকে মাছ ধরাসহ বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করেন এখানে। যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ হওয়ায় মূল শহরাঞ্চলের তাদের যাতায়াতও কম। সব মিলিয়ে সচেতনতার অভাবেই তারা জন্মনিয়ন্ত্রণে আগ্রহ হারাচ্ছেন।

সরেজমিনে সাউথখালী চরে গিয়ে নারীদের সাথে জন্মনিয়ন্ত্রণের বিষয়ে কথা বলতে গেলে তারা মুখ ফিরিয়ে নেন। এ বিষয়ে কথা বলতেই নারাজ তারা। তারপরেও কয়েকজনের সাথে আলাপকালে তারা জানান, জন্মনিয়ন্ত্রণের যে পদ্ধতি ব্যবহারের জন্য বলা হয় তা সব সময় সঠিকভাবে করা হয় না। এক্ষেত্রে তারা নিজেদের স্বল্প শিক্ষাকে অনেকটা দায়ী করেছেন। সন্তান কম থাকলে বৃদ্ধ বয়সে তাদের দেখার কেউ থাকবে না বলে অনেকেই মনে করেন। তাই জন্মনিয়ন্ত্রণের বিষয়ে অনেকেই উদাসীন।

উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিস সূত্রে জানা যায়, সাউথখালী চরে জনসংখ্যা ৭০০ জন। ২০১৮ সালে এর কিছুটা ব্যবধান হতে পারে বলেও জানান ভারপ্রাপ্ত উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা।

তবে সাউথাখালী গ্রামের বাসিন্দা ইন্দুরকানী উপজেলা চেয়ারম্যান মাসুদ সাঈদী জানান, সাউথখালী চরে প্রায় ১২’শ মানুষের বসবাস। সেখানের মানুষেরা রয়েছে নানামুখী সমস্যায়। ইন্দুরকানী উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার পদটি শূন্য। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দিয়ে চলছে এই পদের কার্যক্রম। এছাড়া উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শকের তিনটি পদই শূন্য। আবার ১৭ টি ইউনিটের ৪ ইউনিটে কোন কর্মী নেই। তাই জনবল সংকটে ভুগছে এই গুরুত্বপূর্ণ বিভাগটি।

পরিবার কল্যাণ সহকারী মারুফা জানান, আমি প্রতি দুই মাস অন্তর এই চরে যাই। জন্ম নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে তাদের অনেকভাবে বোঝান হয়। কিন্তু কিছু পরিবার এ ব্যপারে উদাসীন। তাদের কোনভাবেই বোঝাতে পারি না।

এবিষয়ে ভারপ্রাপ্ত উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. সোহাগ হোসেন জানান, উপজেলার জেলে প্রধান এলাকার মানুষেরা জন্ম নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে একটু অনাগ্রহী। তাদেরকে নানানভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণের উপকারিতা জানান হয়। কিন্তু কোন কাজ হয় না। আমারা আবাসন ও চরাঞ্চলকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি। আমরা নিয়মিত ওই সব এলাকা পরিদর্শন করে থাকি।
    
জেআইএল/আরজি

 
.



আলোচিত সংবাদ