এখনও দুবলায় শুঁটকি উৎপাদনে ব্যস্ত জেলেরা

ঢাকা, শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৬ আশ্বিন ১৪২৫

এখনও দুবলায় শুঁটকি উৎপাদনে ব্যস্ত জেলেরা

এমএম ফিরোজ, মংলা ১২:৫১ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৩, ২০১৮

এখনও দুবলায় শুঁটকি উৎপাদনে ব্যস্ত জেলেরা

সুন্দরবনের দুবলার চরে সাধারণত অক্টোবরের শেষ থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শুঁটকি উৎপাদনের মৌসুম। সে হিসেবে শুঁটকি তৈরির মৌসুম শেষ। কিন্তু এখনও দুবলার চরে শুঁটকি শুকাতে ব্যস্ত জেলেরা। তারা বলছেন, বন বিভাগের অনুমতি নিয়েই শুঁটকি শুকাচ্ছেন তারা।

প্রশ্ন রাখা হয় বনকর্তাদের কাছে। তাদের জবাব, এ বছর প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে নির্ধারিত সময়ে পর্যাপ্ত পরিমাণ শুঁটকি উৎপাদন করা সম্ভব হয়নি। গত বছরের চেয়েও উৎপাদন অর্ধেকেরও কম হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন জেলে ও ব্যবসায়ীরা। ফলে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ও রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যেই এ বছর জেলে-মহাজনদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আরো এক মাস সময় বাড়িয়েছেন তারা।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, মংলা থেকে দুবলার চরে জেলে পল্লীর দূরত্ব প্রায় ৯০ নটিক্যাল মাইল। প্রতি বছর শুঁটকি মৌসুমে এখানকার মেহের আলীর চর, আলোর কোল, অফিস কিল্লা, মাঝের কিল্লা, শেলার চর, নারকেলবাড়িয়া, ছোট আমবাড়িয়া, বড় আমবাড়িয়া, মানিকখালী, কবরখালী, ছাপড়াখালীর চর, কোকিলমনি ও হলদেখালী চরে মংলা, রামপাল, খুলনা, সাতক্ষীরাসহ দক্ষিণ উপকূলের প্রায় ২০ হাজার জেলে জড়ো হন। এরপর তারা চার মাস এখানে অস্থায়ী বসতি স্থাপন করে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ শিকারের পাশাপাশি শুঁটকি তৈরি করেন। কিন্তু এবার দুবলার চরে বিভিন্ন কারণে শুঁটকি মৌসুমে উৎপাদনে বিপর্যয় দেখা দেয়। ফলে জেলেদের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত এক মাস শুঁটকি প্রক্রিয়াকরণের অনুমতি চেয়ে আবেদন করা হয়।

এ ব্যাপারে পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মাহমুদুল হাসান পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে ক্ষতির কথা উল্লেখ করে শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতের জন্য মার্চ জুড়ে সময় চেয়ে লিখিত আবেদন করেন জেলেরা। রাজস্ব বৃদ্ধির কথা চিন্তা করে তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা তা মঞ্জুর করেছি।’

এদিকে দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপের ম্যানেজার মো. ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘এ বছরই এখানে শুঁটকি খাতে সবচেয়ে বেশি বিপর্যয় ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে। কারণ দু-তিন দফা প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও প্রতিনিয়ত বাংলাদেশের জলসীমায় ভারতীয় জেলেদের অনুপ্রবেশের কারণে আমাদের জেলেরা সাগরে মাছ শিকার করতে পারেননি।’

মাঝেরকিল্লার শুঁটকি পল্লীর সুকুমার বহদ্দার, মুজাহার বহদ্দার, সুধীর বহদ্দার ও আলোরকোল শুঁটকি পল্লীর শিব বিশ্বাস বলেন, এবার শুঁটকি মৌসুমে ভারতীয় জেলেরা অবৈধভাবে বাংলাদেশের সীমানায় ঢুকে মাছ শিকার করেছে। এছাড়া তাদের হামলা ও লুটের কারণে আমাদের জেলেরা ঠিকমতো মাছ ধরতে পারেননি। এ অবস্থায় আমাদের ব্যবসায়ীরা লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেও ক্ষতির শিকার হয়েছেন। এ ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সবার সম্মিলিত সিদ্ধান্তে বন বিভাগের কাছে সময় বাড়ানোর আবেদন করি।

ভারতীয় জেলেদের অনুপ্রবেশ রোধ ও দেশের জেলেদের নিরাপত্তার বিষয়ে জানতে চাইলে দুবলার জেলে পল্লীর টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ফরেস্ট রেঞ্জার) মো. মোকাম্মেল কবির বলেন, ‘গভীর সমুদ্রে জলসীমা ও জেলেদের সব নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনী। এ ক্ষেত্রে আমাদের কিছু করার নেই। কোস্টগার্ডকে এরই মধ্যে বিষয়টি জানানো হয়েছে।’

তিনি জানান, গত বছর শুঁটকি পল্লী থেকে রাজস্ব আয় হয়েছিল ৩ কোটি ২ লাখ ২৭ হাজার ৮২৭ টাকা। তবে এবার নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা আয় হয়েছে।

কোস্টগার্ড মংলা পশ্চিম জোনের জোনাল কমান্ডার ক্যাপ্টেন এম মিনারুল হক পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘আমরা স্থলে যেভাবে অভিযান চালাতে পারি, সমুদ্রে সেভাবে অভিযান পরিচালনা করা একটু কঠিন। কারণ সমুদ্রের জলসীমা বেশ বড়। তাছাড়া এত বড় এলাকায় টহলের জন্য আমাদের লোকবল ও জলযানের অভাব রয়েছে। এ বিশাল এলাকায় এখন চার থেকে পাঁচটি জলযান দিয়ে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। তাছাড়া ভিনদেশী জেলেদের চিহ্নিত করাও সহজ নয়। বিশেষ করে ভারতীয় ও বাংলাদেশী ট্রলার দেখতে একই রকম।’

উল্লেখ্য, ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে দুবলার চরে শুঁটকি উৎপাদন হয়ে আসছে। সামুদ্রিক লইট্যা, ছুরি, রূপচাঁদা, পারসে, চিংড়িসহ এখানে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের শুঁটকি উৎপাদন করা হয়। সুস্বাদু ও মান ভালো হওয়ায় দেশে-বিদেশে এখানকার শুঁটকির বেশ সুনাম ও চাহিদা রয়েছে।

এমএমএফ/এসএফ