যৌবন ও জীবনের মূল্যায়ন : একটি হাদিস ও কিছু কথা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০১৯ | ১২ বৈশাখ ১৪২৬

যৌবন ও জীবনের মূল্যায়ন : একটি হাদিস ও কিছু কথা

মাওলানা শরীফ মুহাম্মাদ ৭:৫৯ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৮, ২০১৮

যৌবন ও জীবনের মূল্যায়ন : একটি হাদিস ও কিছু কথা

[বিগত ১৫ জুমাদাল আখিরাহ ১৪৩৯ হিজরী/৪মার্চ ২০১৮ ঈসায়ী তারিখে মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা-এর মিরপুরের ভবনে একটি দ্বীনী শিক্ষা মজলিসে তরুণদের উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেন মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ। তাঁর মূল্যবান বয়ান পাঠকবৃন্দের জন্য তিন পর্ব করে আজ ১ম পর্ব পেশ করা হবে ইনশাআল্লাহ।]

হামদ ও ছানার পর

আজকের এই মজলিস একেবারে সমাপ্তির দিকে চলে এসেছে। আমি সকলকে মোবারকবাদ জানাই। আপনারা এখানে এসেছেন। আসাটাই একটা বড় ব্যাপার। মোবারকবাদের একটি কারণ। এলেই কিছু পাওয়া যায়। এধরনের মাজলিস থেকে সাধারণত মানুষ শূন্য পাত্র নিয়ে ঘরে ফিরে না- ইনশাআল্লাহ।

আমি মারকাযের একজন ছাত্রতুল্য মানুষ। আমি উস্তাদদের নির্দেশনা নিয়ে কিছু কিছু কাজ করি। যুবকদের সাথে -শরীয়তের দৃষ্টিতে এখানে সবাই যুবক- আমার কাজ করতে ভালো লাগে। যদিও আমি এখন প্রৌঢ়ত্বে পা দিয়েছি; মনটা যুবকের কাতারে রাখলে ভালো লাগে। মনে হয়, এখনো যুবক আছি। তো যুবকদের সঙ্গে কিছু গল্প করা, কিছু মতবিনিময় করা, যুবকদের সঙ্কট-সম্ভাবনা, ভাবনা-চিন্তা এগুলো আদান-প্রদান করা- এটার জন্যই কিছু কথা আমি পেশ করার চেষ্টা করব।

এখন যৌবন যার

এখানে অধিকাংশই এমন, যারা এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। কেউ কেউ আছে, যারা আরেকটু বড়- ইন্টারের ছাত্র, অনার্সের ছাত্র ও মাস্টার্সের ছাত্র।

মানুষ যখন এসএসসি পরীক্ষা দেয়, মাদরাসায় আমরা বলি, কাফিয়া পরীক্ষা দেয়, তখন একটা অনুভূতি ঘটে থাকে। সেটা হল প্রাপ্তবয়স্কতার অনুভূতি। আমি বড় হয়ে গেছি। আসলেও সে বড় হয়ে গেছে। এই অনুভূতিটা তখন তাকে স্পর্শ করে। একটা গাছ লাগানোর পর যখন চারা গজায় তখনো গাছটাকে বড় মনে হয় না। আমরা গাছটাকে বাচ্চা গাছ বলতে পারি। গাছটা যখন মাথার উপর চলে যায় এবং একটু শক্ত হয়ে যায়, ডালপালা বিস্তৃত হয় তখন আমরা গাছটার আর প্রোটেকশন দরকার মনে করি না। এখন গরু, ছাগল যাই আসুক সে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে। এসএসসি পর্যন্ত যখন একটা ছেলে চলে যায়, বয়সের দিক থেকে, বোধের দিক থেকে, চিন্তার দিক থেকে, বিচরণের দিক থেকে, লেখা পড়ার দিক থেকে- একটা পরিপক্বতার সূচনার জায়গায় সে চলে আসে। নিজস্ব যিম্মাদারির জায়গায় সে চলে আসে।

বাংলাদেশে যুবক শব্দটা আরো পরে যুক্ত হয়। আঠারোর পরে, এডাল্ট বলে। প্রাপ্তবয়স্ক বলা হয়। তের থেকে উনিশ এটাকে বলা হয় টিন এজ। আঠারোর পর থেকে টিনের বয়সটা শেষ হয়ে যায়। কিন্তু আসলে তেরোর পর থেকেই একটা ছেলে যুবক হয়ে যায়। মনের দিক থেকে, চিন্তার দিক থেকে, তার বিচরণের দিক থেকে। তার ভেতরে ভাবনাগুলো শুরু হতে থাকে- আমি কী হব, আমি কী করব। এজন্য যারা যুবক তাদেরকে বলছি, যদি আমরা ইসলামের ইতিহাসের দিকে দেখি, আমরা এটা খুব গুরুত্বপূর্ণভাবে পাই যে, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবসময় যুবকদেরকে খুব গুরুত্ব দিয়েছেন। আদর করেছেন। এগিয়ে দিয়েছেন। তাদের ব্যাপারে প্রত্যাশা অনেক বেশি ছিল। বড় বড় দায়িত্ব তাদেরকে দিয়েছেন। আবার যুবকরা সেই দায়িত্ব পালনও করেছেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখনও তৎকালীন ইয়াসরিব, এখন যেটাকে বলি মদীনাতুন নাবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, এর উদ্দেশ্যে হিজরত করেননি। হজে¦র মৌসুমে বাইআতে আকাবায়ে উলায়, বাইআতে আকাবায়ে ছানিয়ায় বিভিন্ন মানুষ এসে রাসূলের কাছে ইসলাম গ্রহণ করেন। শপথ গ্রহণ করে চলে যান। তখন রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের মাঝে মক্কার একজন যুবক সাহাবী পাঠালেন। রাসূল নিজে হিজরতে যাওয়ার আগেই একজন যুবককে পাঠিয়েছেন। কেন? সে কুরআন শেখাবে, দ্বীনের তালীম দেবে। সেই যুবক বিপুল ভূমিকা রাখলেন। কারণ তিনি যুবক। কোনো প্রবীণ সাহাবীকে রাসূল পাঠাননি। এর মানে এই নয়- প্রবীণ সাহাবীগণকে রাসূল মহব্বত করেননি। তাঁদের দ্বারাও অনেক কাজ নিয়েছেন। যুবকদের থেকে রাসূল কাজ নিয়েছেনও বেশি, তারা কাজ করেছেনও বেশি। নিজেকে উজাড় করে করে কাজ করেছেন। ইসলামের ইতিহাসে, ইলমের ইতিহাসে, জিহাদের ইতিহাসে, দাওয়াতের ইতিহাসে, সংগ্রামের ইতিহাসে। সংকটের সময়, সংকটকে সামনে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার ইতিহাসে এবং সেবার ইতিহাসে যুবকদের ভূমিকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা বাংলা সাহিত্যেও যদি দেখি, যৌবনের কথা অনেক বেশি। কবি হেলাল হাফিজের কবিতা অনেক জায়গায় দেয়ালে লেখা থাকে- “এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।” হেলাল হাফিজ এখনও বেঁচে আছেন। আমি তার কবিতাটা উদ্ধৃত করলাম। এটা এই সময়ের উচ্চারিত কবিতা। এটা একাত্তরের আগে উনসত্তরে লেখা। যখন বাংলাদেশে খুব মুখর সময়। তখন তিনি এই কবিতাটা লিখেছেন। কবিতাটার নাম ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’?। তো এখন যৌবন যার, দ্বীনের কাজ করার তার শ্রেষ্ঠ সময়। হাদীসের ভাষায়- এখন যৌবন যার, ইবাদাত করার তার শ্রেষ্ঠ সময়। এখন যৌবন যার, জীবনটাকে গড়ে তোলার তার শ্রেষ্ঠ সময়।

আপনি যদি বলেন, এগুলো তো আপনি কবিতার মতো বলছেন? আমি বলব, না, আমি কবিতার মতো বলছি না। আমার বয়স এখন সাতচল্লিশ। আমি খুব আস্থার সঙ্গে আপনাদেরকে বলি, আপনারা বিশ্বাস করুন, যৌবনে আমি যা শিখিনি এখন তা চাইলেই শিখতে পারি না। আমি যে অভ্যাস যৌবনে করিনি, তা চাইলেই পারি না। এখন যদি আমি মনে করি, একশটা দুআ ইয়াদ করব, পারব না। মেমোরি জ্যাম হয়ে গেছে। মাথায় অনেক চিন্তা, অনেক কাজ, অনেক পেরেশানি, অনেক উদাসীনতা। কিন্তু আপনাদের এখন সময়। এখন যদি কেউ মনে করেন, আমি বিশটা সূরা শিখব, মাসায়েল শিখব, আমি চমৎকার করে আগামী এক বছরে একশটা দুআ শিখে ফেলব। আপনি পারবেন। আপনার অন্তরের শ্লেটটা কাঁচা। এখন দাগ দেবেন দাগ বসবে। বয়স পার হয়ে যাবে, আফসোস করবেন, পারবেন না। কেউ পারে না তা না। আমি একটা সাধারণ কথা বলছি। সাধারণ কথাটা এমন যে, যৌবন পার হওয়ার পর অর্জন কঠিন হয়ে যায়। তখন মানুষ ফলাফল খোঁজে, যা অর্জন করেছে তার। যার অর্জন যতটুকু তার ফলাফল ততটুকু। ভালোর মধ্যে যৌবন যে কাটিয়েছে, সে যদি প্রৗঢ়ত্বে স্বাভাবিক অবস্থার মধ্যে থাকে তাহলে ভালো কাজগুলো তার এমনি হয়ে যাবে। মন্দের মধ্যে যার যৌবন কাটে সে যদি প্রৌঢ়ত্বের মধ্যে তার গা-টাকে ছেড়ে রাখে তাহলে মন্দের মধ্যেই তার সময় কাটবে। তার চোখের ভুল ব্যবহার যদি যৌবনে বেশি হয়ে থাকে প্রৌঢ়ত্বে তার চোখের ভুল ব্যবহারই বেশি হবে। তার সময় অপচয়ের অভ্যাস যদি যৌবনে তৈরি হয় প্রৗঢ়ত্বে তার সময় অপচয়ের অভ্যাসটা থাকবে। মানুষের সাথে রুক্ষ আচরণের অভ্যাস যদি যৌবনে হয় তাহলে প্রৌঢ়ত্বে সে এখান থেকে খুব দ্রুত নিজেকে সরিয়ে আনতে পারবে না। যৌবনের সময়টা হচ্ছে কাঁচা সময়। অর্জনের সময়।

প্রাসঙ্গিক কথা- তারপরও বলি, আমি আমার বন্ধুদের সাথে একবার বলছিলাম, আমি একদিন দেখি নামাযের আগে হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক ছাহেব, যার আলোচনা আপনারা আসরের নামাযের আগে শুনেছেন, আপনারা তাঁকে কীভাবে চেনেন, আমি জানি না, তাঁর বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। একান্ন বায়ান্ন-এর মধ্যে। বাংলাদেশে যদি তিন জন আলেমকে বলা হয়, ইলমের সমুদ্র, ইসলামী প্রজ্ঞার ভা-ার তাহলে এর মধ্যে তিনি একজন। আমি এর চেয়েও নির্ধারিত করে বলতে পারতাম, কিন্তু আদবের কারণে বললাম না। আমি যদি বলতাম ইনি একজন, বলতে পারতাম, আমার কথাটা ভুল হত না। আমি এজন্য তিন জন, চার জন, পাঁচ জন এভাবে বললাম। সাত-আট বছর আগে তিনি একদিন একা একা ঝিলপাড় মসজিদের দিকে যাচ্ছেন। পায়ে স্যান্ডেল। তিনি সবসময় সাদামাটা স্যান্ডেল ব্যবহার করেন। হেঁটে হেঁটে যাচ্ছেন, কাত হয়ে হয়ে। আমি আমার এক প্রিয়জনকে বললাম, আগামী দিনের ইতিহাস হেঁটে হেঁটে যাচ্ছেন। আজকে মানুষ তাঁকে ওইভাবে চেনে না। কিন্তু বিশ বছর পর -আল্লাহ তাঁর হায়াত বাড়িয়ে দিন- মানুষ তাঁকে খুঁজবে। খুঁজুক এটা আমরা চাই, একথা বলছি না। এটা খুব স্বাভাবিক ঘটনা হবে- মানুষ খুঁজবে। প্রজ্ঞাবান মানুষের পেছনে ছোটাছুটি দুনিয়ায় এটা খুব ন্যাচারাল, খুব স্বাভাবিক। সে যেভাবেই হোক। মানুষ তাঁকে খুঁজবে। তিনি এখন হেঁটে হেঁটে যাচ্ছেন। আগামী দিনের ইতিহাস।

তো আমি যে কথাটা বলতে চাচ্ছি, আপনাদেরও আগামী দিনের ইতিহাস হওয়ার যোগ্যতা আছে। এখন হয়তো মনে হচ্ছে খুব সাধারণ একজন মানুষ আপনি। এক হাজার জনের একজন। এক লাখ জনের একজন। এক কোটি জনের একজন। কিন্তু আপনি যদি মনে করেন আমি ওই এক কোটি জনের একজন- আসলেই একজন হব- ইনশাআল্লাহ- অনন্য একজন। এক কোটির মধ্যে আমাকে আলাদা করা যাবে ইনশাআল্লাহ। আমি ওই চেষ্টা করব। আমি এই মঞ্চে বসে এই কথা বলব না- দুনিয়াবীভাবে আপনি তেমনি একজন হন। আমি বলব- আপনারা লেখাপড়া করছেন পার্থিব জগতের বিষয়গুলো নিয়ে। হযরত মাওলানা আবদুল মালেক ছাহেব বলে দিয়েছেন যে, নিয়ত ঠিক থাকতে হবে। ভালো নিয়ত নিয়ে, ভালো জীবন চর্চা নিয়ে, মুসলমানের কাছে যে জীবন চাওয়া হয়, ওই জীবন নিয়ে এখন থেকেই যদি তৈরি হন তাহলে আগামী দশ বছর, পনের বছর, বিশ বছর পরে আপনি ওই আলো বিতরণকারী মানুষে পরিণত হবেন- ইনশাআল্লাহ।

পাঁচটি বিষয়ের মূল্য দাও

আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি হাদীস আপনাদের সামনে পাঠ করেছি। হাদীসটির তরজমা হল-

রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তোমরা পাঁচটি জিনিসের পূর্বে পাঁচটি জিনিসকে দাম দাও। মূল্যবান মনে কর। পাঁচটি জিনিসের আগে পাঁচটি জিনিস, পাঁচটি বিষয়ের আগে পাঁচটি বিষয়। হাদীসের শব্দ অত্যন্ত সাহিত্যপূর্ণ। পাঁচের আগে পাঁচকে মূল্য দাও। কোন্ পাঁচের আগে কোন্ পাঁচ?

১. প্রৌঢ়ত্বের আগে যৌবনকে গুরুত্ব দাও। যৌবনকে যৌবন হারিয়ে ফেলার আগে গুরুত্ব দাও। হাদীসে এক নাম্বারে এই কথাটা বলা হয়েছে- شَبَابَكَ قَبْلَ هَرَمِكَ।

২. صِحَّتَكَ قَبْلَ سَقَمِكَ অসুস্থতার আগে সুস্থতার মূল্য দাও। অসুস্থতার আগে সুস্থতাকে গুরুত্ব দাও। খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা। মনে হতে পারে, আমি তো অসুস্থ হব না। যেদিন মারা যাব মারা যাব। হতে তো পারে এমন। কিন্তু বাস্তব কথা হল, যার শরীর আছে, দেহ আছে, স্বাস্থ্য আছে তার জীবনে অসুস্থতাও আছে। একটা হল সাধারণ অসুস্থতা যেটাকে আমরা অসুস্থতা বলি। আরেকটা হচ্ছে প্রাকৃতিক জরাগ্রস্ততা। মানুষের বয়স যখন বাড়তে থাকে শরীরের উদ্যম হারিয়ে যেতে থাকে। শরীরে কোনো অসুস্থতা না এলেও। এখন যেমন আপনি একটা দৌঁড় দিতে পারেন মসজিদের দিকে, বয়স যখন ষাট পার হবে সেভাবে তখন দৌড় দিতে পারবেন না। আপনি যদি মনে করেন, আপনি দুই রাকাত নামায আধা ঘণ্টা লাগিয়ে পরবেন, পারবেন না। দাঁড়িয়ে পারবেন না। আপনি যেভাবে সেজদা দিতে পারবেন একজন সত্তর বছর বয়সী মানুষ সেভাবে পারবেন না।

৩. তিন নাম্বার غِنَاكَ قَبْلَ فَقْرِكَ দারিদ্র্যের আগে স্বচ্ছলতাকে গুরুত্ব দাও। পকেটে টাকা আছে, সামর্থ্য আছে, খেয়ালই করা হচ্ছে না, টাকা উড়িয়ে দিচ্ছি আমি। খাদ্যের পেছনে, বিলাস ব্যসনের পেছনে। ফুর্তির পেছনে। টাকাটা ভাল কাজে লাগাচ্ছি না। তাহলে ওই লোকের আক্ষেপের সময় আসছে, যখন তার দরকার হবে তখন সে পাবে না। আখেরাতের ভালো কাজেও লাগাতে পারবে না। তার পার্থিব ভালো কাজেও লাগাতে পারবে না।

৪. চার নাম্বার فَرَاغَكَ قَبْلَ شُغْلِكَ তুমি নিমগ্ন হয়ে যাওয়ার আগে সময়ের যে ফুরসত থাকে তাকে গুরুত্ব দাও। যেমন পরীক্ষার পর এখন আপনাদের আছে। চাকরিতে ঢুকে গেলে রাত দিন সময় দিতে হয়। তখন মনে অনেক কিছুই চাবে কিন্তু পারবেন না। ফারাগ শব্দের বাংলা তরজমা অবসর। অবসর বললে এখানে বুঝে আসবে না। ফারাগ বলতে নিমগ্নতাহীনতা। একটা কিছুর মধ্যে ডুবে যাওয়া, নিমজ্জিত হয়ে যাওয়া, এনগেইজড্ হয়ে যাওয়ার আগের অংশটাকে ফারাগ বলে। আমি ডুবে গেলাম ব্যবসায়, আমি ব্যস্ত হয়ে গেলাম চাকরিতে, আমি অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলাম। এই ব্যস্ত হওয়ার আগের অংশটা, যখন সময় কিছুটা ছড়ানো ছিটানো থাকে। যেমন, রাতভর গল্প করলে কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করে না। পরের দিন জবাবদিহিতা নেই। ওই রাতটা আমি কাজে লাগাই। আসর থেকে এশা পর্যন্ত সময় একভাবে ব্যয় করলে চাকরি চলে যাবে না, পরীক্ষায় ফেল করার ব্যাপার আসবে না। ওই সময়টা হচ্ছে ফারাগ। নিমগ্নতার আগে অবকাশের যে সময়টা, যে সময় খুব স্বাভাবিক আনন্দময়, যে সময়টা গভীর নিমগ্নতাপূর্ণ নয়, সে সময়টাকে তুমি মূল্য দাও। মানে দামী বানাও, কাজে লাগাও।

৫. حَيَاتَكَ قَبْلَ مَوْتِكَ তোমার জীবনটাকে তুমি মৃত্যুর আগে কাজে লাগাও। পাঁচ নম্বরটা হল, আগের চারটার নির্যাস।

এটা রাসূলে কারীমের হাদীস। কত চমৎকার কবিতার মত এই হাদীসটা- যারা আরবী বুঝেন তারা বুঝতে পারেন। রাসূল শুরুতে একবার বলেছেন ‘ইগতানিম’ গুরুত্ব দাও। এরপর শুধু শব্দগুলো বলেছেন। আপনারা আবার শুনুন- ‘ইগতানিম’ এটা গনীমত থেকে। গনীমত শব্দ আমরা সবাই বুঝি। মানে গনীমত মনে কর, দামী মনে কর, মূল্যবান মনে কর। যুবকদের কথা হাদীসের শুরুতেই রাসূল বলেছেন। এজন্য আমরা এ সময়টাকে গুরুত্ব দেই।

বারবার গুরুত্ব দিতে বলার অর্থ আবার এটা বুঝে নিয়েন না যে, আজকের আলোচনা আমাদেরকে টাইট বানিয়ে দিচ্ছে। নড়াচড়ার ব্যবস্থা নেই। মাত্র পরীক্ষা দিয়ে এসেছি। একটু গল্পসল্প করব। হুজুররা বয়ান করে এমন পেরেক মেরে দিচ্ছে মাথার মধ্যে, মনে হচ্ছে যে, আর দম ফেলার সময় নাই। এটা না। একটা নোসখা বলে দেওয়া হচ্ছে শুধু এখানে। আপনি দম ফেলবেন, হাসবেন, কথা বলবেন। গল্প করবেন। পরিবারকে সময় দেবেন। কোনো অসুবিধা নিই। সিরিয়াস হয়ে যাওয়ার জন্যে, ভারাক্রান্ত হয়ে যাওয়ার জন্য নয় আজকের মজলিস। এখানে সবটুকুই আনন্দ। আপনাদের আনন্দটা বাড়ানোর জন্যই এত কথা। আনন্দ যেন সুন্দর হয়, আত্মঘাতী না হয়। আনন্দটা যেন পরে আপনাকে রাস্তার পাশে ফেলে না দেয়। মটর সাইকেল দুইভাবে চালানো যায়। একটা হচ্ছে, আমি দীর্ঘ সময় চালাব। রাস্তা দেখে দেখে চালাব। আরেকটা হচ্ছে, না, শুরুতেই একশ বিশ। তো শব্দ হবে, আওয়াজ হবে- সে মটর সাইকেল চালাচ্ছে। দশ মিনিট পর আওয়াজটা থেমেও যেতে পারে। ভাঙ্গা রাস্তা, নির্মাণের কাজ চলছে, সংস্কারের কাজ চলছে। তার আর হুঁশ নাই- মোটর সাইকেল এমনভাবে চালিয়েছে... মোটর সাইকেলেরও একেকটার একেক নাম। বাজাজ, হোন্ডা, পালসার। কী বিকট শব্দ! আমরা রাস্তায় মাঝেমধ্যে শুনি। মনে হয় হেলিকপ্টার আসছে। খুব ভয় লাগে। আমার জন্য ভয় লাগে না। আমার ভয় লাগে, এই বাচ্চাটা ‘থেমে’ যায় কি না ।

তো আমরা আপনাদেরকে নিয়ে ওই আলোচনাই করতে চাই যে, আপনারা লম্বা সময় ধরে চালান। আমাদের যেন এই আশংকা না থাকে- দশ মিনিট পর আওয়াজটা থেমে যেতে পারে।

হায়াত আল্লাহ দিয়েছেন। আবার প্রতিটি সতর্কতা রক্ষার কথাও শরীয়তে বলা আছে। এজন্য ডাক্তাররা রসিকতা করে বলেন, অল্প করে অনেক দিন খেতে চান, না বেশি করে অল্প দিন খেতে চান? যদি অল্প দিন বেশি খেতে চান, পয়সা পকেটে থাকে, সকালে একবার যান হোটেলে, বিকেলে একবার যান। নানা ধরনের ফাস্টফুড আছে, এটা ওটা আছে। খেতে থাকুন। দুই বছরের মাথায় ফ্যাট জমে যাবে। আমি ডাক্তারি কথা বলছি। তিন বছরের মাথায় ডাক্তার ব্লাডের টেস্ট দিয়ে বলবে- আপনার এটার মাত্রা এত, এটার মাত্রা এত। তারপর একদিন বলবে- বয়সে যুবক মানুষ, কিন্তু আমার মনে হয়, আপনার এনজিওগ্রাম করা দরকার। বুকে যে চাপ লাগে- আমার ভয় হয়। চল্লিশের পর বলবে, আপনার ওপেন হার্ট সার্জারি লাগবে। নানা ধরনের সমস্যা যুক্ত হয়ে যাবে। পঁয়তাল্লিশে বলবে, আপনি ‘প্রস্তুতি’ নিন। বাবা সুস্থ, দাদা সুস্থ, যুবকের অবস্থা এমন। আমরা ওটা চাচ্ছি না। আমরা চাই, আপনি অল্প অল্প করে বেশি দিন খান। আশি বছর পর্যন্ত আপনার শরীর চাঙ্গা থাকুক। একটা পিজা দেখবেন খাবেন। একটু সবজি খাবেন। এই একটু মুরগী দেখবেন খাবেন। মাছ ফ্রাই দেখবেন খাবেন। আবার এড়িয়েও যাবেন, সংযম অবলম্বন করবেন। যেটা জীবনের সাথে যুক্ত। শরীয়ত এ কথা বলে। হালাল জিনিসগুলোকে আমরা ভোগ করব। খারাপ জিনিসে আমরা যাব না। আমাদের দুনিয়াতেও ফায়দা, আখেরাতেও আমরা নাজাত পাব।

চলবে...

এমএফ/

আরও পড়ুন...
যৌবন ও জীবনের মূল্যায়ন : একটি হাদিস ও কিছু কথা (২য় পর্ব)
জীবন-যৌবনের মূল্যায়ন: একটি হাদীস ও কিছু কথা (শেষপর্ব)