দাওয়াত হেদায়েতের সিঁড়ি

ঢাকা, শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৭ আশ্বিন ১৪২৫

দাওয়াত হেদায়েতের সিঁড়ি

হাফেজ মাওলানা জুবায়ের ২:২৪ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২১, ২০১৮

দাওয়াত হেদায়েতের সিঁড়ি

মানবজাতির হেদায়েতের জন্য আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। প্রত্যেক নবীই দাঈ ছিলেন। দাওয়াত নবীদের গুরুত্বপূর্ণ জিম্মাদারি। দাওয়াত দ্বারা জাহেলিয়াত (অজ্ঞতা) দূর হয়। আল্লাহর সঙ্গে বান্দার পরিচয় লাভ হয়। নবীদের আগমনের পূর্বসময়কে জাহেলিযুগ বলে।

জাহেলিযুগ মানে অজ্ঞতার যুগ। অর্থাৎ তখন মানুষ আল্লাহর ব্যাপারে অজ্ঞ ছিল।

আমাদের প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আর্বিভাবের সময় লেখা-পড়া ও সাহিত্যচর্চা ছিল। তবুও সেই যুগকে ইতিহাসে জাহেলিযুগ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কারণ, তখন মানুষ এক আল্লাহকে ভুলে গিয়ে শত-সহস্র মূর্তিপূজায় নিমজ্জিত হয়ে পড়েছিল।

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাদেরকে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এর দাওয়াত দেন, তারা আশ্চর্যবোধ করল।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা তাদের সে আশ্চর্যের কথা এভাবে বর্ণনা করেছেন, ‘সে কি বহু উপাস্যের পরিবর্তে এক উপাস্যের উপাসনা সাব্যস্ত করে দিয়েছে! নিশ্চয় এটা এক বিস্ময়কর ব্যাপার।’ (সূরা সাদ, আয়াত : ৫)

দাওয়াতের কারণে প্রিয়তম নবীকে শারীরিক, মানসিক সব ধরনের কষ্ট দেয়া হয়েছে। নির্যাতনের চূড়ায়ও তিনি দাওয়াত থেকে দমে যান নি। বরং তাঁর বারবার দাওয়াতের ফলেই মক্কার মুশরিকদের হৃদয়ে হেদায়েতের বীজ রোপিত হয়েছে।

উমরের মতো দৃঢ়চেতা বীরপুরুষ তরবারি হাতে প্রিয়নবীর শিরোচ্ছেদে অগ্রসর হয়েও অবনত মস্তকে পাঠ করে নিয়েছেন, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।’ উমরের জন্য নবীজির দাওয়াত এবং দোয়া দুটোই ছিল। আল্লাহ তা কবুল করেছেন।

হেদায়েত আল্লাহর হাতে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা হেদায়েতের জন্য নবীদেরকে দাওয়াতের জিম্মাদারি দিয়ে প্রেরণ করেছেন। চাষের বদৌলতে যেমন ফসল উৎপন্ন হয় তেমনি দাওয়াতের উছিলায় হেদায়েতের চারা উৎপন্ন হয়।

আমাদের নবীজির পর আর কোনো নবীর আগমন ঘটবে না বিধায় দাওয়াতের জিম্মাদারি প্রত্যেক উম্মতের ওপর আবর্তিত। কুরআনে পাকে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যাণের জন্যই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের আদেশ করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত : ১১০)

অন্য আয়াতে বলেছেন, ‘ওই ব্যক্তির কথার চেয়ে উত্তম কথা কার হতে পারে? যে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়, সৎকর্ম করে এবং বলে আমি একজন মুসলমান।’ (সূরা হা-মিম সেজদা, আয়াত : ৩৪)

দাওয়াত হলো মানুষকে আল্লাহর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। অর্থাৎ মানুষকে সৃষ্টির গোলামি থেকে স্রষ্টার গোলামিতে লাগিয়ে দেওয়া। এই পৃথিবীতে অসংখ্য মানুষ সূর্যের ইবাদত করে। অসংখ্য মানুষ আগুনের পূজা করে। অসংখ্য মানুষ গাছের পূজা করে। অথচ সূর্য, আগুন, গাছ সবই আল্লাহর সৃষ্টি। স্রষ্টাকে বাদ দিয়ে সৃষ্টির গোলামি করা অজ্ঞতা, নির্বুদ্ধিতা। এই জন্যই নবীদের আগমনের পূর্বযুগকে জাহেলি বা অজ্ঞতার যুগ বলা হয়।

ইবরাহিম (আ.) কে দাওয়াতের কারণে নমরুদ আগুনে নিক্ষেপ করলো। সে আগুনের ক্ষমতায় বিশ্বাসী ছিল। আগুনে নিক্ষিপ্ত হতে যাওয়া ইবরাহিমকে আসমানের ফেরেশতারা এসে সাহায্য করতে চাইল। কিন্তু তিনি ফেরেশতাদের সাহায্য গ্রহণ করেন নি। কারণ, তার বিশ্বাস ছিল, ফেরেশতারা আল্লাহর সৃষ্টি, আগুনও আল্লাহর সৃষ্টি। এক সৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য আরেক সৃষ্টির সাহায্য নেওয়ার অর্থ নেই। তাঁর এই বিশ্বাসের ফলে আল্লাহ আগুনকে ফুলবাগানে পরিণত করে দিয়েছেন। এভাবে আল্লাহ তায়ালা নবীদের মাধ্যমে তাঁর কুদরতের প্রকাশ ঘটিয়েছেন।

সালেহ (আ.) এর কাছে তার জাতি আল্লাহর ক্ষমতা দেখতে চাইল। তারা একটি ছোট্ট পাথর থেকে উটনী বের করে দেখানোর আবেদন জানাল। তাদের বিশ্বাস, পাথর থেকে উটনী বের হওয়া অসম্ভব।

কিন্তু আল্লাহ তায়ালা ছোট্ট পাথর থেকে বিশাল উটনী বের করে দেখালেন।

মুসা (আ.) আল্লাহর নির্দেশে লাঠি দিয়ে পানিতে আঘাত করলেন, সঙ্গে সঙ্গে ১২টি রাস্তা হয়ে গেল। নীল দরিয়ার পানি খরস্রোতা স্রোত থেমে রাস্তার দু’ধারের পানি পর্বতসম উঁচু হয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইল। মুসা এবং তার জাতি নিরাপদে পার হলেন কিন্তু ফেরাউন ও তার সম্প্রদায়ের সেখানে হলো সলিল সমাধি।

এ ছিল আল্লাহ পাকের কুদরত। তাঁর ক্ষমতার প্রকাশ। ফেরাউন তার ক্ষমতার দাপট দেখাল। এক মুসার জন্য বনি ইসরাইলের হাজার হাজার শিশুকে হত্যা করল। আল্লাহ পাক সেই মুসাকে ফেরাউনের ঘরে আদর-যত্নে বড় করলেন। চল্লিশ বছর বয়সে তাকে নবী বানিয়ে ফেরাউনের কাছে দাওয়াত দিয়ে পাঠালেন। লাঠি এবং হাতের শুভ্রতা ছাড়াও আরো নয়টি মুজিজা আল্লাহ মুসা (আ.) কে দান করেছিলেন। মুজিজা ছিল দাওয়াতের কাজে সহায়ক। আমাদের নবীকে আল্লাহ তায়ালা সবচেয়ে বেশি মুজিজা দান করেছেন।

কুরআনে কারিম নবীজির জীবন্ত মুজিজা। কুরআনে পাকে আল্লাহর দয়া, বড়ত্ব ও কুদরতের বিবরণ রয়েছে। এগুলো দাওয়াতের উপাদান। আল্লাহ বলেন, ‘তারা কি উটের প্রতি লক্ষ্য করে না, কিভাবে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে? আকাশের প্রতি লক্ষ্য করে না, কিভাবে তা উচ্চ করা হয়েছে? পাহাড়ের দিকে তাকায় না, তা কিভাবে স্থাপন করা হয়েছে? পৃথিবীর দিকে তাকায় না, তা কিভাবে সমতল বিছানো হয়েছে? (সূরা গাসিয়া, আয়াতে : ১৮-২০)

কুরআনে মানবসৃষ্টির আলোচনা করে মানুষের প্রতি আল্লাহর অশেষ দয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। যাতে মানুষ আল্লাহকে রব হিসেবে মেনে নেয়। মৃত্যু এবং জান্নাত, জাহান্নামের আলোচনা করে মানুষকে পরকালের জীবনের প্রতি আকৃষ্ট করা হয়েছে। এসবই দাওয়াতের বিষয়। পূর্ববর্তী অবাধ্য জাতিসমূহের ধ্বংসলীলা কুরআনে পাকে বারবার বিবৃত হয়েছে। যাতে করে তাদের থেকে পরবর্তীরা শিক্ষা লাভ করে। মানুষ ক্ষমতার বড়াই করে। অথচ ক্ষমতার মালিক আল্লাহ।

কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘আপনি বলুন, হে আল্লাহ! তুমিই সার্বভৌম শক্তির অধিকারী। তুমি যাকে ইচ্ছা রাজ্য দান কর এবং যার থেকে ইচ্ছা রাজ্য ছিনিয়ে নাও এবং তুমি যাকে ইচ্ছা সম্মান দান কর আর যাকে ইচ্ছা অপমানে পতিত কর। তোমার হাতেই যাবতীয় কল্যাণ। নিশ্চয় তুমি সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাশীল।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত : ২৬)

বিশ্ব ইজতেমা ২০১৮ দ্বিতীয় পর্বের দ্বিতীয় দিন শনিবার বাদ মাগরিব আম বয়ানের অনুলিখন করেছেন মাহবুবুর রহমান নোমানি

এএইচটি/এএসটি