ফিলিস্তিন, সিরিয়া ও ইয়েমেনে ঈদুল ফিতর

ঢাকা, ১০ জুলাই, ২০১৯ | 2 0 1

ফিলিস্তিন, সিরিয়া ও ইয়েমেনে ঈদুল ফিতর

পরিবর্তন ডেস্ক ৯:০০ অপরাহ্ণ, জুন ০৬, ২০১৯

ফিলিস্তিন, সিরিয়া ও ইয়েমেনে ঈদুল ফিতর

পবিত্র ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করতে ঈদগাহে উপস্থিত হন ইসরাইলি হামলায় আহত এই ফিলিস্তিনি। জুন, ২০১৭। ছবি: আলামি ডটকম

ইয়েমেন, সিরিয়া, ফিলিস্তিনে বোমা আর গুলির শব্দে, নতুন কারো মৃত্যুর বেদনার সাথে আসে ঈদ। বরাবরের মতো এবারও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। সিরিয়ায় ২০১১ সালের মার্চ থেকে ৯ বছর, ইয়েমেনে ২০১৫ সালের মার্চ থেকে ৪ বছর আর ফিলিস্তিনে ১৯১৮ সাল থেকে প্রায় এক শতাব্দী যাবত এভাবে বিপর্যয়-বেদনার মধ্য দিয়ে তাদের প্রতিটি দিনের মতো ঈদ কাটছে।

ফিলিস্তিনবাসীর ঈদ

ইসলামের প্রারম্ভিক যুগ থেকেই ফিলিস্তিনের মুসলমানরা ঈদ উদযাপন করে আসছেন। ফিলিস্তিনের গাজা ও পশ্চিম তীরের মানুষের ঈদ উৎসব ছিল বেশ জাঁকজমকপূর্ণ। জায়নবাদী ইসরাইল প্রতিষ্ঠার আগে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল যথেষ্ট সচ্ছল। ঈদে গাজা ও পশ্চিমতীরের শিশুরা রাস্তাঘাট ও অলিগলিতে গেয়ে বেড়াত আনন্দ-সংগীত। নতুন জামাকাপড় পরে বেড়াতো পাড়া-মহল্লায়। ঈদের খুশি প্রকাশ করতে রাস্তায় রাস্তায় আনন্দ শোভাযাত্রাও বের করতো। ‘মামুল’ নামক পিঠা তৈরি করা হতো ঘরে ঘরে। কুকি ও মিষ্টান্নের বাহারি আয়োজন হতো সবার ঘরে।

পরিবারের নারী-শিশুরা ঈদ উপলক্ষে প্রস্তুত করছে ‘মামুল’ পিঠা।

কিন্তু পরাধীনতা আর জীবনের অনিশ্চয়তার মধ্যে সেই পরম্পরা ও ধর্মীয় উৎসবের রেওয়াজ অনুযায়ী এখন ফিলিস্তিনে ঈদ কতটা সম্ভব? কারণ গেল কয়েক বছর তাদের ঈদের খুশি পরিণত হয়েছে মহাদুর্যোগে।

পশ্চিম তীরে ঈদের দিন নাগরদোলায় উঠে শিশুরা আনন্দ করছে।

বিগত বছরগুলোতে দেখা গেছে, ফিলিস্তিনিদের ওপর ঈদের দিনেও হামলা করেছে জালেম নেতানিয়াহুর সেনাবাহিনী। ঈদের দিনেও তারা আক্রমণ করেছে নিরীহ-নিরস্ত্র ফিলিস্তিনি মুসলমানদের ওপর। ঈদের আনন্দের জায়গায় ফিলিস্তিনিরা উপহার পেয়েছে লাশের স্তূপ। পশু জবাইয়ের বদলায় সন্তানের কর্তিত-বিচূর্ণ শরীরকে কবরস্থ করতে হয়েছে হতভাগা মা-বাবার।

ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে নিহত ফিলিস্তিনি কিশোর হিতাম আল-জামালের জামা-জুতা আগলেই ঈদ কেটেছে মায়ের। ছবি: রয়টার্স

মূলত ১৯৪৮ সালের ১৫ মে জায়নবাদী ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পর থেকে তাদের অভিধান থেকে হাসিখুশি ও ঈদ-আনন্দের মতো শব্দগুলো বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সেখানে এখন বিনোদনের সব অনুষঙ্গ বিদায় নিয়ে আগমন করেছে আন-নাকবা। ‘নাকবা’ মানে মহাদুর্যোগ। ফিলিস্তিনের ভাগ্যকাশে এখন যে সূর্য উদিত হয়, তার গায়েই যেন খচিত থাকে ‘আন-নাকবা’ নিশান। ফিলিস্তিনিদের প্রতিটি প্রহরই নাকবার প্রহর। তাদের উৎসব মানেই নাকবার আগমন। তাদের আকাশে এখন একটিই সূর্য; ‘আন-নাকবা’র সূর্য।  

সিরিয়াবাসীর ঈদ

সিরিয়া অঞ্চল ইসলামী সভ্যতার প্রাচীন ভূমি। ইসলামের ইতিহাসে পৃথিবীর বেশিরভাগ নবী-রাসূল এ অঞ্চলেই আগমন করেছেন। মানব সভ্যতার সূচনা হয় এখান থেকেই। কিন্তু সেই সিরিয়াতেই আজ মানবতা মুখ থুবড়ে পড়েছে, ভূমধ্যসাগরেই মানবতার ভরাডুবি ঘটেছে।

সিরিয়ার যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দৌমা শহর ২০১৮ সালের ঈদুল ফিতরে শিশুদের ঈদ আনন্দে যেন নতুন জন্মলাভ করেছিল। ছবি: সিরিয়া হোম নিউজ

৬৩৫ খ্রিস্টাব্দে ইসলামের প্রথম যুগে খলীফা হযরত আবু বকর (রা.) এর শাসনামলেই সিরিয়ায় ইসলাম পৌঁছে যায়। তখন থেকেই সিরিয়ায় ইসলামের যাবতীয় অনুষঙ্গের সাথে ঈদও তার যথাযথ ভাব-মর্যাদা ও আনন্দের সাথে উদযাপিত হয়ে আসছে। স্থানীয় রীতিনীতির সাথে বেশ জাঁকজমকভাবে পালিত হতো মুসলমানদের এ বৃহৎ উৎসব।

ধ্বংসস্তুপের মাঝে সিরিয়ার শিশুদের ঈদ আনন্দ উৎসব। জুন, ২০১৭। ছবি: আনাদলু এজেন্সি

কিন্তু গত প্রায় এক শতাব্দী থেকে পশ্চিমা উপনিবেশবাদী শক্তিগুলো সিরিয়াকে নিজেদের চক্রান্ত ও স্বার্থ হাসিলের খেলার মাঠ বানিয়ে রেখেছে। সময়ে সময়ে বাধিয়ে রেখেছে গৃহযুদ্ধ।

ঈদুল ফিতরে পুতুল উপহার পেয়ে খুশি সিরিয়ার তিন শিশু। ছবি: এএফপি

সর্বশেষ ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা চরম দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে সে বছরের মার্চ মাসে জ্বলে ওঠে গৃহযুদ্ধের আগুন। সেই থেকে আজ অবধি পুড়ছে সিরিয়া, প্রতিদিন মরছে নিরপরাধ মানুষ। কত না হাজার যুবক-শিশু স্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণ করেছে। হাজার হাজার পরিবার সর্বস্ব হারিয়ে ভিনদেশের শরণার্থী শিবিরে মানবেতর জীবনযাপন করছে। এক ধ্বংস আর মৃত্যুর নগরীতে কেটে গেছে সিরিয়াবাসীর ৮ বছরের ঈদ। তাদের ভবিষ্যৎ এখনও অন্ধকারেই রয়ে গেছে।

ইয়েমেনবাসীর ঈদ   

ইয়েমেনবাসীরাও ইসলামের শুরু থেকে ঈদ উদযাপন করে আসছেন। নবীজি (সা.) এর জীবদ্দশাতেই ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে ইয়েমেনে ইসলাম পৌঁছে যায়। নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঢঙে নানা আয়োজনে ইয়েমেনবাসীর ঈদ উদযাপন ছিল বেশ জাঁকজমকপূর্ণ।

ঈদগাহে কোলাকুলিরত দুই ইয়েমেনি।

ঈদের সকালে ইয়েমেনিরা ঈদ উপলক্ষ্যে প্রস্তুতকৃত নানা প্রকার মিষ্টান্ন–যেমন কিসমিস, আখরোট, পেস্তা বাদাম, কাজু বাদামসহ নানা প্রকার বাদাম, পিঠা, কেক খেতো। রুটি, বাদাম ও দুধের সমন্বয়ে বিশেষ পদ্ধতির পায়েস এবং মধুর তৈরি একপ্রকার সুস্বাদু খাদ্যও ছিল ঈদের দিনের বিশেষ খাবার।  

মধু, দুধ, রুটি ও নানা প্রকার বাদামের সমন্বয়ে তৈরি ইয়েমেনিদের ঈদ স্পেশাল খাবার।

কিন্তু ২০১৫ সাল থেকে যুদ্ধ, ক্ষুধা, মহামারী, বাস্তুচ্যুতি ও অর্থনৈতিক মন্দা- এগুলো এমন কিছু শিরোনাম যা ২০১৯ সালেও পিছু ছাড়েনি। বরং আরও চরম আকার ধারণ করে সামনে এসেছে।

সৌদি জোটের বোমা হামলায় ঈদের রাতে নিহত ইয়েমেনের কিশোর-কিশোরীরা। ২০১৬।

গৃহযুদ্ধের পঞ্চম বছরে আরব উপদ্বীপের দরিদ্রতম এ দেশটি ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়েছে। ২০১৫ সালের মার্চে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৬০ হাজারের অধিক ইয়েমেনি নিহত ও আহত হয়েছে এবং ৩০ লক্ষেরও বেশি মানুষ উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছে। আহতদের মধ্যে বহু সংখ্যক তো বাকি জীবনের জন্য স্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণ করে নিয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না এর মধ্য দিয়ে কেমন কাটলো ইয়েমেনবাসীর ঈদুল ফিতর।

এমএফ/আরপি

আরও পড়ুন...
ত্রিমুখী বিপর্যয়ে নতুন বছর শুরু ইয়েমেনবাসীর
ইয়েমেন: রাজধানী সান’আর পুরনো শহরে শরণার্থীরা
সিরিয়া যুদ্ধের অতীত থেকে বর্তমান; একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
আফগান ফিলিস্তিন কাশ্মীর: যেখানে মিশে গেছে রক্ত-মাটি
ফিলিস্তিন : যেখানে দলিত মানবতা

 

ইসলামি সংবাদ: আরও পড়ুন

আরও