চকবাজারে ধ্বংসলীলার মধ্যে অক্ষত চুড়িহাট্টা মসজিদ (ভিডিও)

ঢাকা, বুধবার, ২২ মে ২০১৯ | ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

চকবাজারে ধ্বংসলীলার মধ্যে অক্ষত চুড়িহাট্টা মসজিদ (ভিডিও)

শাহাদৎ স্বপন ৮:০৩ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৯

ধ্বংসযজ্ঞ। চোখে বিশ্বাস করা কঠিন! শুধু ছাই আর ছাই। ভেসে আসছে পোড়া গন্ধ। অথচ বুধবার রাত ১০টা পর্যন্তও এখানে ছিল ইমারতের পর ইমারত। কর্মব্যস্ত সবাই।

বলছিলাম পুরনো ঢাকার ব্যস্ততম চকবাজারের কথা। এখানেই বিস্ফোরণ থেকে ছোট্ট আগুন। মুহূর্তেই তার লেলিহান শিখার দংশন। তাতেই ধ্বংসস্তূপ চকবাজার। বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত আগুনে জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মারা যাওয়া ৭৮ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।

বিশ্বও জেনে গেছে এই খবর। ভয়াবহ আগুনের এই ধ্বংসলীলার মধ্যেও ঘোর কাটছে না নজরুল ইসলাম ও রিয়াজ উদ্দিনের। মধ্যবয়স্ক এই দু’জন চকবাজারের চুড়িহাট্টা শাহী মসজিদের খাদেম।

এই মসজিদের প্রধান ফটকের সামনেই একটি গাড়িতে থাকা সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়, রাত তখন ঠিক ১০টা ১০ মিনিট। সেটি গিয়ে লাগে বৈদ্যুতিক ট্রান্সমিটারে। এরপরই তার পাশের জামাল কমিউনিটি সেন্টারে আগুন ধরে যায়। মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে পাশের চারতলা ওয়াহিদ ম্যানশনে, যে ভবনের প্রথম দুইতলায় প্রসাধন সামগ্রী, প্লাস্টিকের দানা ও রাসায়নিক দাহ্য পদার্থের গুদাম।

এখানে থাকা গোডাউনের কেমিক্যালেই আগুন নতুন প্রাণ পায়। এরপর আশপাশের আরও পাঁচটি ভবনে ছড়িয়ে পড়ে। আগুনে ওই এলাকার কয়েকটি খাবারের হোটেলের গ্যাস সিলিন্ডারও বিস্ফোরণ হয়। পুড়ে যায় সড়কে থাকা একটি প্রাইভেট কারসহ কয়েকটি যানবাহন।

দীর্ঘ ১১ ঘণ্টার প্রচেষ্টায় বৃহস্পতিবার সকালে থেমেছে। ততক্ষণে ঝরে গেছে ৭৮ প্রাণ, ভেঙে গেছে অজস্র স্বপ্ন। আগুনে মোটামুটি চুড়িহাট্টা শাহী মসজিদের ৫ ফিট দূরে থাকা বেশিরভাগ ভবনই পুড়ে গেছে। বিস্ময়করভাবে মসজিদটি অক্ষত রয়েছে।

কিভাবে মসজিদ রক্ষা পেয়েছে, তা পরিবর্তন ডটকমকে বলছিলেন খাদেম নজরুল ইসলাম ও রিয়াজ উদ্দিন। তারা জানান, মুসল্লিরা নামাজ শেষ করে বেশ আগেই চলে গেছেন। দু’একজন আসছেন, নামাজ পড়ে চলে যাচ্ছেন। মুয়াজ্জিন মো. শাহ আলম এবং তারাও সবকিছু গুছিয়ে ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

নজরুল ইসলামের ভাষায়, হঠাৎই বিস্ফোরণে থমকে গেলাম। প্রথমে ভেবেছিলাম বৈদ্যুতিক ট্রান্সমিটার বিস্ফোরণ হয়েছে। কারণ, বিকট শব্দের পরই বিদ্যুৎ চলে যায়। এরপরই ঝলমল করে জ্বলে ওঠে আলো।

আলোর সঙ্গে বাড়তে থাকে আর্তনাদ। নজরুল ও রিয়াজের ভুল ভাঙে। ততক্ষণে তাদের চারপাশে আগুন আর আগুন। মসজিদ থেকে বের হবার সুযোগ নেই। মুয়াজ্জিনকে নিয়ে মসজিদে বসেই তারা আল্লাহকে ডাকতে থাকেন। পরিবারের সদস্যদের কাছে দোয়ার সঙ্গে মাফ চেয়ে নেন। পরিচিতজন থেকেও একইভাবে বিদায় নেন তারা তিনজন।

এভাবেই ভোর হতে থাকে। পাশের একটি ভবনে আগুন লাগেনি, সেখান দিয়েই তারা চেষ্টা করতে থাকেন বের হবার। হঠাৎ শব্দ আসে কানে— মসজিদেই থাকেন। কোনো সমস্যা নেই। শুরুতে ভেবেছিলেন স্বয়ং আল্লাহ, তাদের এই গায়েবি আওয়াজ শোনাচ্ছেন। পরে দেখতে পান দমকলকর্মীরা পানি ছিটাচ্ছেন আর মাইকে মসজিদের ভেতরেই থাকতে বলছেন।

রিয়াজ উদ্দিন যেমনটি বলছিলেন, রাতভর প্রাণের আর্তনাদ শুনতে শুনতে কখন যেন ভুলে গেছি আমরাও জীবিত আছি। আল্লাহ সবই পারেন। না হলে এখানে এভাবে মসজিদ অক্ষত থাকার কথা নয়। আমরাও বেঁছে থাকতাম না।

মসজিদের মুয়াজ্জিন মো. শাহ আলম পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘চারদিকে ব্যাপক আগুন, হাত পাঁচেক দূরেই। আমরাও দেখতে পাচ্ছি। পুরো মসজিদ দুলছে। মনে হচ্ছে, ভূমিকম্পে এখনই ভেঙে পড়বে। আমরাও ধরে নিয়েছি, আর রক্ষা নেই। কিন্তু, আগুন যখন মসজিদের ভেতরে আসছে না, তখনই মনে সাহস পেলাম। আল্লাহর ঘর তিনিই রক্ষা করবেন।’

তিনি বলেন, ‘আগুন নেভানোর শেষদিকে কিছুটা শিখা মসজিদের দিকে এসেছে। এতে দেয়ালের বাইরের অংশে ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু, মসজিদের ভেতরে কিছু হয়নি। আসলে আল্লাহই হেফাজত করেছেন।’

এমন আগুনের পর বৃহস্পতিবার ভোরেই চুড়িহাট্টা মসজিদে এলাকার মুসল্লিরা ফজরের নামাজ আদায় করেছেন। এই মো. শাহ আলমই আযানে ‘হাইয়্যা আলাছ ছালাহ, হাইয়্যা আলাল ফালাহ’ বলে সবাইকে আহ্বান জানিয়েছেন। পৌঁছে দিয়েছেন, আল্লাহর বাণী, ‘ঘুম থেকে নামাজ উত্তম’।

জোহর, আসরের পর মাগরিবেও আহ্বান জানিয়েছেন মুয়াজ্জিন। এই আহ্বানের মধ্যেই সেখান থেকে একবার পর একটা লাশ উদ্ধার হয়েছে, স্বজনেরা কান্নায় বাতাস ভারী করেছেন।

সরেজমিনে চুড়িহাট্টা শাহী মসজিদের আশপাশের অন্তত ৭টি ভবনকে আগুনে ক্ষতিগ্রস্তের সাক্ষী হিসেবে পাওয়া গেছে। মসজিদের দক্ষিণ পাশের দেয়ালের টাইলস, বৈদ্যুতিক তার ও লোহার গেটের কাঁচ খসে পড়েছে। এর বাইরে কোনো ক্ষতি হয়নি।

স্থানীয় এক মুসল্লি জানান, নামাজে এসে আমরাও অবাক হচ্ছি। চারপাশে সব পুড়ে ছাই হলেও মসজিদের ভেতরে বা বাইরে কোনো ক্ষতি হয়নি। দেয়ালের সামান্য কিছু জায়গা তাপে কালো হয়ে গেছে।

ঐতিহাসিকদের মতে, চুড়িহাট্টা মসজিদ ৩৭০ বছরের পুরনো। বর্তমানে ৩০ ফুট দৈর্ঘ্য এবং ১৩ ফুট প্রস্থ মসজিদে প্রাচীন স্থাপত্যের কিছুই নেই। আগে এর অবস্থান উমেশ চন্দ্র দত্ত লেন ও হায়দার বকশ লেনের তেমাথায় ছিল। পরে ২০০৮ সালে আধুনিক স্থাপত্যের সময় এটি চকবাজারের সামান্য পশ্চিমে ২৬-২৭ শেখ হায়দার বকশ লেনে করা হয়।

ইতিহাসবিদ বিশারদ ড. দানীর মতে, চুড়িহাট্টা মসজিদ আয়তাকৃতি। চার কোণে চারটা টাওয়ার সদৃশ মিনার এবং পূর্বদিকে ৩টি ফটক রয়েছে।

মসজিদের একটি শিলালিপিতে আল কোরআনের সুরা তওবার ১৭ ও ১৮ নম্বর আয়াত লেখা, যার বাংলা অর্থ, ‘আল্লাহতা’আলা বলেন, একমাত্র তারাই আল্লাহর মসজিদসমূহের রক্ষণাবেক্ষণ করবেন, যারা আল্লাহ ও পরকালের উপর বিশ্বাস রাখে। নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করে না’।

মুঘল আমলের এই শিলালিপিতে মসজিদটির নির্মাতা হিসেবে সুবেদার শাহ সুজার (১৬৪৯ খ্রিস্টাব্দ) আমলের মোহাম্মদী বেগ নামে এক ব্যক্তির নাম রয়েছে। এটি মসজিদের দোতলার মিহরাবে লাগানো।

মুঘল আমল থেকেই মুসলমান কারিগরেরা কাঁচের চুড়ি তৈরি করে পুরনো ঢাকার চকবাজারে বিক্রি করতেন। তারাই নিজেদের নামাজের জন্য মসজিদটি নির্মাণ করেন। পরে স্থানীয়ভাবে পুরো এলাকার নামই চুড়িহাট্টা হয়ে যায়।

অবশ্য ‘কিংবদন্তির ঢাকা’ গ্রন্থে নাজির হোসেন উল্লেখ করেছেন, সুবেদার শাহ সুজা জনৈক হিন্দু কর্মকর্তাকে একটি মসজিদ নির্মাণ করতে বললে তিনি মন্দির নির্মাণ করেন। পরে জানতে পেরে শাহ সুজা মন্দির থেকে বিগ্রহ সরিয়ে সেটি মসজিদে রূপ দেন।

এসএস/আইএম