অবিবাহিতাদের প্রতি সামাজিক প্রতিবন্ধকতা রোধে পরামর্শ

ঢাকা, রবিবার, ১৬ জুন ২০১৯ | ২ আষাঢ় ১৪২৬

অবিবাহিতাদের প্রতি সামাজিক প্রতিবন্ধকতা রোধে পরামর্শ

মারিয়াম ইউসুফ ৪:২০ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ০২, ২০১৯

অবিবাহিতাদের প্রতি সামাজিক প্রতিবন্ধকতা রোধে পরামর্শ

“আরে বোন, কি খবর তোমার? কেমন চলছে সব কিছু?”
“আলহামদুলিল্লাহ, আমি ভালো আছি, আমি চাকরিতে নতুন পদোন্নতি পেয়েছি, কুরআনের কিছু অংশ মুখস্তও করেছি আর আমার ভাই মেয়ে শিশুর বাবা হয়েছেন।”

“মাশাআল্লাহ, অত্যন্ত খুশির খবর, তা তোমার বিয়ের কি খবর? এখন তোমার বয়স কত হল?”

সবার ক্ষেত্রে না হলেও বর্তমানের অধিকাংশ মেয়েকেই বিয়ে নিয়ে এরকম অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়, মনে হয় জীবনে বিয়ে ছাড়া আর কোন কিছুতেই পূর্ণতা আসে না। এ ধরণের প্রশ্নের কারণে সঠিক জীবন সঙ্গী খুঁজে না পাওয়ার চিন্তা ব্যক্তির শারীরিক, মানসিক ও ব্যক্তিত্বের বিকাশকে স্তব্ধ করে দেয়। এটি মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা। 

বিয়ে নিয়ে অধিক চাপাচাপির ফলে অনেক সময় ব্যক্তি নিজেকে মূল্যহীন মনে করেন। একদিকে যেমন চাইলেই স্বামী বা স্ত্রী পাওয়া যায়না ফলে খোঁজাখুঁজি নিয়ে চলে কষ্টকর কালক্ষেপণ, অন্যদিকে যেখানেই যাবেন কেউ না কেউ প্রশ্ন করবেই, আপনি বিয়ে করেছেন কিনা? যদি না করে থাকেন তবে প্রশ্ন করবে কেন করলেন না, সমস্যা কি?

একসময় আমি ভাবতাম :

আচ্ছা আমি যদি সারা জীবন অবিবাহিতা থাকি তবে কি সমস্যা? কিন্তু আমি বুঝতে পারলাম যখন আপনি নিজের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলতে থাকেন তখন সমস্যাগুলো আরও মারাত্মক হয়ে জেঁকে বসবে। তাই আপনার উচিত এ সমস্যা মোকাবেলায় পারিপার্শ্বিক অবস্থার আলোকে নিজেকে প্রস্তুত করা। 

আমরা চারপাশের মানুষগুলোকে কখনো পরিবর্তন করতে পারবো না, কিন্তু নিজেদের অবশ্যই পরিবর্তন করতে পারবো যেন চারপাশের সমস্যা মোকাবেলায় এগিয়ে যেতে পারি। এখানে আমি কিছু পরামর্শ দিচ্ছি যেগুলো আমার জীবনে কাজে লেগেছে আশা করি আপনাদের ক্ষেত্রেও কাজে লাগবে।

যৌবনকে উপলব্ধি করুন

নেতিবাচক কথা কিংবা প্রশ্নে আপনি নিজের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলবেন বা কখনো প্রশ্রয় দিবেন না। আল্লাহ বলেছেন,

وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُم مِّنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَى كَثِيرٍ مِّمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلاً

নিশ্চয় আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি, আমি তাদেরকে স্থলে ও জলে চলাচলের বাহন দান করেছি; তাদেরকে উত্তম জীবনোপকরণ প্রদান করেছি এবং তাদেরকে অনেক সৃষ্ট বস্তুর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।” –সূরা বনী ইসরাইল:৭০

আল্লাহ আদম সন্তানকে সম্মানিত করেছেন এবং বহু সৃষ্টির উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। তিনি কখনো আপনি বিবাহিতা কি না তা দেখে সম্মান মর্যাদা দেন না। তিনি মর্যাদা দান করেছেন আপনার তাক্বওয়ার উপর।

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,

يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ

“হে মানব, আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিতি হও। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত যে সর্বাধিক পরহেযগার। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছুর খবর রাখেন।” -সুরা হুজুরাত: ১৩

আপনার জীবন সঙ্গী কখন আপনার কাছে আসবে তা আল্লাহ নির্ধারণ করবেন, আপনি না! যে বিষয়ে আপনার ক্ষমতা নেই তা লাভ করার চেষ্টা করা আর নিজের মানসিক ও আধ্যাত্মিক জীবনে পতন ডেকে আনার সমান।

মনোবিজ্ঞানী নাজওয়াআওয়াদ বলেছেন: “এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক যে সবসময়ই এমন কিছু মানুষ থাকে যারা একজন মহিলা কিভাবে জীবিকা নির্বাহ করে তা নিয়ে অপ্রয়োজনীয় এবং কষ্টদায়ক মন্তব্য করে,  বিশেষ করে যদি সে অবিবাহিতা হয়। একজন মুসলিম মহিলার মনে রাখা প্রয়োজন যে, তার জীবনে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তার সৃষ্টিকর্তার সাথেই থাকবে; যদি সে তার সাথে সুখী হয় তবে আর কোন চিন্তা তার থাকবে না। যদি একটি মুসলিমাহ তার আধ্যাত্মিকতার চারপাশে নিজস্ব- পরিচয়কে ভিত্তি করে এবং সত্যিকারের ভাল ব্যক্তিত্ব হিসেবে বেঁচে থাকে,  তাহলে সে অন্যের কাছ থেকে যতই সমালোচনা শুনতে পাবে, তাতে যেন সে ডুবে না যায়।”

আমরা কখন জন্ম নিব, কখন মৃত্যু হবে এবং কখন বিয়ে করব সব কিছুই আল্লাহ নির্ধারণ করে রেখেছেন। যদি পরিবারের লোকেরা বিয়ে নিয়ে জোর করেন তবে তাদের বলা উচিৎঃ আল্লাহই  সঠিক, তিনি যখন ইচ্ছা করেন সে সময়ই সর্বাপেক্ষা উত্তম, তাই আমার বিয়ে তখনি হবে যখন তিনি চাইবেন।

এই সময়ে অবশ্যই একজন মুসলিমাকে নিজের প্রতি যত্নবান হতে হবে, শিক্ষা লাভের মাধ্যমে নিজের মনকে আরও শাণিত করবে, ভাল কাজের মাধ্যমে আত্মিক উন্নতি লাভ করবে এবং ভাল  খাবার ও শারীরিক ব্যায়ামের মাধ্যমে শরীরের যত্ন নিবে।

চাপ প্রয়োগকারীদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করুন

শুনে অবাক হওয়ার মতই ব্যাপার যে, যখন কেউ বিশেষ করে পরিবারের সদস্য আপনার উপর  ক্রমাগত মানসিক চাপ ফেলছে তাদের সাথেই ভালো আচরণ করার কথা বলা হচ্ছে?

কথাটি শুনে রাগান্বিত বা বিরক্ত হওয়াই স্বাভাবিক। যাইহোক, আগের কথাগুলো আবার স্মরণ করুন দেখবেন আপনার উপর আর কোন চাপ বা নেতিবাচক কথার প্রভাব কেটে গেছে।

অনেক বৈশিষ্ট্যই অন্য পরিবারের দেখাদেখি নিজ পরিবারেও এসে থাকে। আপনার অভিভাবকদের ক্ষেত্রেও এমনটি হওয়াই স্বাভাবিক। তারা হয়ত মানসিকভাবে কিংবা আবেগের জায়গা থেকে পারিপার্শ্বিকতা বিচারে যা দেখে এসেছেন তাই আপনার উপর চাপিয়েছেন।   

এখনো অনেক পরিবারকেই দেখা যায় তারা চা পার্টি, বিবাহ কিংবা যে কোন অনুষ্ঠানে নিজ সন্তানের সফলতার কথা বলে বেড়ান, ছেলেমেয়েরাই সব সময় তাদের আলোচনার প্রধান বিষয়বস্তু হিসেবেই বিবেচিত হয়।

“আপনার ছেলে কি করে?”
“আপনার মেয়ের বিয়ে হয়েছে? হয়নি? কি লজ্জার কথা...”

এবার ভেবে দেখুন যাদের দাদা দাদী বেঁচে আছেন তারাও আপনার পিতামাতার উপর কেমন চাপ দিয়ে যাচ্ছেন।

তাই কঠোর ভাষা ব্যবহার করলেই সমস্যার সমাধান নয় বরং বুঝতে হবে সমস্যা তাদের যারা ধারণা করে বিয়ে ব্যতীত আর কোন সফলতা নেই, এটি মোটেও আপনার সমস্যা নয়।

এমএফ/

আরও পড়ুন...

বিবাহ-বিচ্ছেদের প্রধান ১০ কারণ ও প্রতিকার
বাবা-মায়ের যে ৮ অভ্যাস সন্তানের ভবিষ্যত ধ্বংস করে
কোন মানদণ্ডে আপনি জীবনের সফলতা মাপছেন?
সফল হবার চার কুরআনী পরামর্শ
সফল জীবন প্রত্যাশীদের জন্য ২৭ টি নির্দেশনা