মুসলমানদের সহনশীলতার পাঁচ দৃষ্টান্ত

ঢাকা, শনিবার, ৯ নভেম্বর ২০১৯ | ২৪ কার্তিক ১৪২৬

মুসলমানদের সহনশীলতার পাঁচ দৃষ্টান্ত

মুহাম্মদ ওয়াজেদ আখতার ৬:০৬ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৮, ২০১৯

মুসলমানদের সহনশীলতার পাঁচ দৃষ্টান্ত

আজকাল বিভিন্ন বিক্ষোভ থেকে মুসলিম দেশগুলোতে অন্যান্য দেশের পতাকা পোড়ানো এবং অনেক সময় দূতাবাসে হামলার মত ঘটনায় অধিকাংশ অমুসলিম (এবং কিছু মুসলিম) ধারণা করছে, ধর্মপরায়ণ মুসলমানরা পরধর্মের প্রতি সহিষ্ণুতা প্রদর্শন ও সহনশীল আচরণ করতে অক্ষম!

আসলে অন্যের অবস্থান ও পারিপার্শ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা না করে নিজের অবস্থান থেকে অন্যকে বিচার করা পুরোপুরি ভ্রান্ত এক কৌশল এবং প্রতারণাপূর্ণ আচরণ।

সাধারণভাবে বললে, ব্লাসফেমি তথা ধর্ম ও ধর্মীয় মহাপুরুষদের নিন্দা পাশ্চাত্যে সহ্য করা হলেও এর অর্থ নিশ্চিতভাবে এই নয়, যারা এধরনের অপরাধ সহ্য করে না, তারা সহনশীল নন।

মূলত ইসলামবিদ্বেষমূলক এমন অবস্থান থেকে এধরনের অপরাধ করা হয়, যাতে মুসলমানদের অপমান করা হয় ফলে এর প্রতিক্রিয়ায় তারা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে।

কিন্তু পরধর্মসহিষ্ণুতার কথা যদি বলতে হয়, তাহলে পৃথিবীতে মুসলমানদের চেয়ে উত্তম  দৃষ্টান্ত অন্য কোন ধর্মের মানুষ আজও দেখাতে পারেনি। এটি মূলত ইসলামেরই প্রকৃতি, যার কারণে মুসলমানরা তাদের অমুসলিম প্রতিবেশীর সঙ্গে সহনশীল হয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী অতিবাহিত করেছে।

মুসলমানদের সহনশীলতার অসংখ্য দৃষ্টান্ত থেকে এখানে সংক্ষেপে পাঁচটি দৃষ্টান্ত আলোচনা করা হল।

১. মুসলিম রাষ্ট্রে অমুসলিম নাগরিকদের সাফল্য স্বাধীন জীবন-যাপন

অমুসলিম শাসিত ভূখন্ডের অধিবাসী মুসলমানদের অবস্থা যদি আমরা লক্ষ্য করি, তবে কী দেখি?

সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ায় তাদেরকে জবরদস্তি করে পাঠানো হয়েছে সাইবেরিয়ায় নির্বাসনে। পূর্ব ইউরোপের মুসলমানরা বিভিন্ন সময় গণহত্যার শিকার হয়েছে। ফিলিস্তিনে আজ একাত্তর বছর তারা দখলদারিত্ব, নির্যাতন, অপমান ও কারাবাসের শিকার হয়ে আসছে। স্পেনে খ্রিস্টানদের বিজয়ের পর মুসলমানদেরকে সেখান থেকে এমনভাবে নিশ্চিহ্ন করা হয়, আযান দেওয়ার মত একজন লোকও সেখানে ছিল না।

এখন দেখা যাক, মুসলিম শাসিত ভূখন্ডে অমুসলিমদের অবস্থা।

মুঘল ভারতে, ভারতের স্থানীয় হিন্দু অধিবাসীরা একইসাথে মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপনের পাশাপাশি তারা মুঘল সেনাবাহিনী ও প্রশাসনে তাদের যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্মরত ছিল।

স্পেনে মুসলিম শাসনামলে স্পেনের সকল অধিবাসীই আজকের পাশ্চাত্যের আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর মতই পাশাপাশি সহনশীলতার সাথে একত্রে বসবাস করত।

ওসমানী সাম্রাজ্যের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। উপরন্তু, ইউরোপের বিভিন্ন স্থান থেকে বিতাড়িত ই্হুদিরা ওসমানী সাম্রাজ্যে এসে আশ্রয় গ্রহণ করে এবং এখানে তারা তাদের নতুন যুগের সূচনা করে।

ইরাক, সিরিয়া ও মিসরের স্থানীয় খ্রিস্টান অধিবাসীরা এসকল স্থানে মুসলমানদের ১৪০০ বছরের শাসন স্বত্ত্বেও স্বাধীন ও দৃষ্টিগ্রাহ্য অবস্থান বজায় রেখে বসবাস করে আসছে।

সহনশীলতার আধুনিক পশ্চিমা ধারণার চেয়ে বহু উত্তম ব্যবস্থার অধীনে মুসলমানরা তাদের শাসনাধীন অঞ্চলের অমুসলিম বাসিন্দাদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ এবং তাদের স্বাধীনভাবে জীবনাযাপন ও অবস্থানের সুযোগ দিয়ে আসছে। অন্য আর আদর্শের মত যদি ইসলাম অসহিষ্ণু হত, তবে মুসলিম বিশ্বের অমুসলিম সম্প্রদায় বহুপূর্বেই স্পেনের মুসলমানদের মত নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত।

২. অন্য জাতির জ্ঞানসম্পদ সংরক্ষণ

এটি প্রায় সাধারণ বিষয়, কোন জাতি যদি অপর কোন জাতির উপর বিজয় লাভ করে, তবে বিজিত জাতির সঞ্চিত জ্ঞান ও সংস্কৃতিকে বিজয়ী জাতি কোন প্রকার মূল্যয়ন করে না এবং অবজ্ঞার সাথে তা ছুঁড়ে ফেলে। বর্তমানের আধুনিক পশ্চিমা প্রাচ্যবিদদের ইসলাম ও মুসলিম সংক্রান্ত ধারণা ও মনোভাব থেকেই আমরা এই বিষয় সম্পর্কে ধারণা করতে পারি।

প্রায়শই বলা হয়, ইসলাম মানব সভ্যতার জন্য কল্যানকর কিছুই সৃষ্টি করেনি এবং বাস্তব ইতিহাসের বিপরীতে মুসলমানদেরকে সবসময়ই পশ্চাৎপদ হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

প্রকৃতপক্ষে মুসলিম শাসনসমূহের ইতিহাস যদি বিচার করা হয়, তবে দেখা যাবে. তাদের মধ্যে জ্ঞানচর্চা ও সংস্কৃতির ঐতিহ্য তো ছিলই, পাশাপাশি অন্যান্য জাতির জ্ঞানচর্চা ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং সেখান থেকে নিজেদের প্রয়োজনীয় বস্তু গ্রহণ করতে পারার মত ঔদার্য মুসলমানদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল।

অন্যান্যদের জ্ঞানের প্রতি সম্মান ও স্বীকৃতি প্রদানের মত সহনশীলতার বলে মুসলমানরা পরিণত হয়েছিল সারাবিশ্বে জ্ঞানচর্চার অভিভাবক হিসেবে, যা থেকে সকল বিজয়ীরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।

বিস্ময়কর হলেও সত্য, বিশ্বের সর্বাধিক প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান মুসলিম ভূখন্ডে। গ্রীকদের দর্শন, ভারতীয় গণনাপদ্ধতি এবং পারসিক কৃষিব্যবস্থা সংক্রান্ত জ্ঞানসহ প্রাচীন বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর অর্জিত জ্ঞান ধ্বংস হওয়ার পরিবর্তে মুসলমানদের হাতে পরবর্তী বংশধরদের জন্য আমানত হিসেবে এই বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে সংরক্ষিত হয়।

৩. জেরুসালেম বিজয়

ইতিহাসের দিকে এবার একটু দৃষ্টি দেওয়া যাক। ১০৯৯ খ্রিস্টাব্দে যখন খ্রিস্টান ক্রুসেডাররা জেরুসালেম দখল করে নেয়, তখনকার বিস্তারিত বিবরণ তাদের ঐতিহাসিকদের লিখিত গ্রন্থেই পাওয়া যায়। বলা হয়ে থাকে, জেরুসালেম দখলের পর জেরুসালেমের বাসিন্দাদের উপর এমন হত্যাকান্ড চালানো হয়, ঘোড়ার খুর রক্তের নিচে ডুবে যায়। তারা তাদের রক্তাক্ত বিজয়ের পর মসজিদুল আকসা ও কুব্বাতুস সাখারাকে আস্তাবল ও প্রাসাদে পরিণত করে।

প্রায় একশত বছর পর সুলতান সালাহউদ্দীন আল-আইয়ুবী ক্রুসেডারদের কাছ থেকে জেরুসালেম পুনরায় জয় করে নেন। হিত্তিনের যুদ্ধে ক্রুসেড বাহিনীর পুরোপুরি পরাজয়ের পর জেরুসালেম রক্ষা করার মত কোন সেনাবাহিনীই ক্রুসেডারদের হাতে ছিল না। সুলতান সালাহউদ্দীন ইচ্ছা করলেই শহরে বসবাসকারী ক্রুসেডের সাথে সাথে আগত ইউরোপীয় বাসিন্দাদের নিশ্চিহ্ন করতে পারতেন এবং সেপালকার গীর্জাকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে পারতেন।

কিন্তু তিনি তা না করে তাদের উপর একটি নির্দিষ্ট পরিমান মুক্তিপণ নির্ধারণ করে তাদের মুক্তির ব্যবস্থা করেন। তিনি যখন দেখেন অনেক গরিব খ্রিস্টানই মুক্তিপণ প্রদান করতে পারছেনা, তখন তিনি নিজের পকেট থেকেই অনেকের মুক্তিপণের ব্যবস্থা করে দেন। তার দৃষ্টান্তে উদ্বুদ্ধ হয়ে তার বাহিনীর অনেক সৈনিক দরিদ্র খ্রিস্টান অধিবাসীদের মুক্তিপণের ব্যবস্থা নিজেদের অর্থ থেকে করে দেয়।

৪. স্পেনের ইহুদিদের জীবনরক্ষা

ইউরোপে বসবাসকারী ইহুদিরা সবসময়েই গণ্য হত নিম্নস্তরের মানুষ হিসেবে। ইউরোপীয়দের হাতে তাদের অপমান ও অত্যাচারের কোন সীমা পরিসীমা ছিল না। আইবেরিয় উপদ্বীপে ভিজিগথিক শাসকদের অধীন তাদের জীবন ছিল জঘন্যতর।

স্পেনে ইহুদিদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রথমত তাদের সন্তানদেরকে তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হল। পরবর্তীতে যখন তা যথেষ্ট হল না, তখন ইহুদিদেরকে স্পেন থেকে বের করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু জাতিগত নির্মূলের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হওয়ার পূর্বেই স্পেনে মুসলমানরা এসে হাজির হয় এবং স্পেন মুসলিম শাসনের অধীনে চলে আসে। এরফলে ইহুদিরা শুধু স্বাধীনভাবে বসবাসের অধিকারই লাভ করেনি, বরং তারা মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন এবং যোগ্যতা অনুসারে কাজের অধিকার লাভ করে।

আটশত বছর মুসলমানদের পাশাপাশি ইহুদি এবং খ্রিস্টান উভয়েই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে আইবেরিয় উপদ্বীপে বসবাস করে।

কিন্তু ১৪৯২ সালে গ্রানাডা পতনের পর স্পেন যখন মুসলমানদের থেকে পুরোপুরি হাতছাড়া হয়ে যায়, তখন স্পেনিশ খ্রিস্টান শাসকরা তাদের পুরনো অভ্যাস মত অন্য সকল ধর্মের মানুষকে স্পেন থেকে বিতাড়িত করে। স্পেনিশ মুসলমানরা বিভিন্ন মুসলিম ভূখন্ডে আশ্রয় গ্রহণ করতে সক্ষম হয়। কিন্তু ইহুদিদের নিজস্ব কোন ভূখন্ড না থাকায় তাদের কোথাও যাওয়ার মত জায়গা থাকে না।

উদ্বাস্তু গন্তব্যহীন এই ইহুদি জনগোষ্ঠীকে ওসমানী সাম্রাজ্যে আশ্রয় প্রদান করা হয়। এছাড়া মরক্কোর বিভিন্ন স্থানে তাদের বসবাসের জন্য জমি বরাদ্দ করা হয়। এভাবে দ্বিতীয়বারের মত স্পেনীয় ইহুদিদের মুসলমানরা রক্ষা করে।

৫. নবী মুহাম্মদ (সা.) এর জীবন

নিশ্চিতভাবেই, রাসূলুল্লাহ (সা.) এর থেকে সহনশীলতার উত্তম কোন দৃষ্টান্ত হতে পারে না। রাসূল (সা.) যখন তার অল্প কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে মক্কায় দ্বীন প্রচার করছিলেন, তখন তাকে গালমন্দের জন্য তিনি কাউকে পাল্টা গালমন্দ করেননি। তায়েফে তাকে পাথর নিক্ষেপ করে জর্জরিত করা হল, তথাপি তিনি কাউকে অভিশাপ দেননি। তার চোখের সামনে যখন মক্কাবাসীদের আরোপিত তিন বছরের অবরোধের ফলে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষে তার চাচা ও স্ত্রী ইন্তেকাল করেন, তখনও তিনি অবরোধের জন্য দায়ি কাউকেই আঘাত করেননি।

পরবর্তীতে যখন তিনি বিজয়ী অবস্থায় মক্কায় প্রবেশ করেন, তিনি কারো কাছ থেকেই কোন প্রকার প্রতিশোধ গ্রহণ নেননি এমনকি তার প্রিয়তম চাচার হত্যকারীকেও তিনি ক্ষমা করে দেন। অবশ্যই রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন সকল প্রকার অত্যাচার, আগ্রাসন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে। তার জীবনের একনিষ্ঠ অধ্যয়নের মাধ্যমেই আমরা সহনশীলতা এবং এর সীমা সম্পর্কে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি।

বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্বের ভয়াবহ ইসলামবিদ্বেষ এবং এর প্রেক্ষিতে মুসলিম বিশ্বের প্রতিক্রিয়ায় আমাদের উচিত রাসূল (সা.) এর উদাহরণ স্মরণে রাখা। তার শিক্ষা অনুযায়ী একটি নতুন পৃথিবী গড়তে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে মনোযোগ নিবদ্ধ করে কাজ করতে পারি। তার শিক্ষা সম্পর্কে জানা আমাদের জন্য কঠিন কিছু নয়। তার শিক্ষার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠতে পারে পারস্পারিক সহাবস্থানের একটি সহনশীল নতুন বিশ্ব।

এমএফ/

আরও পড়ুন...
মুসলিম রাষ্ট্রে অমুসলিমদের অধিকার!

 

বিবিধ: আরও পড়ুন

আরও