কোন মানদণ্ডে আপনি জীবনের সফলতা মাপছেন?

ঢাকা, সোমবার, ২১ জানুয়ারি ২০১৯ | ৮ মাঘ ১৪২৫

কোন মানদণ্ডে আপনি জীবনের সফলতা মাপছেন?

ইদ্রিস তৌফিক ৫:২৯ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৯, ২০১৮

কোন মানদণ্ডে আপনি জীবনের সফলতা মাপছেন?

ঐ লোকটা সফল। এ কথা আমরা কখন বলি? যখন দেখি যে ঐ লোকটার অনেক অর্থকড়ি , বাড়ি-গাড়ি আছে। কিন্তু যে ছেলেটা রাস্তার ধারে জুতা সাফ করছে তাকে সফল বলছিনা, তাইনা? লন্ডনের এক ছোট পরিসরের ফ্লাটে যার বাস তার ব্যাপারে আমরা কখনোই বলিনা যে সে তার জীবনে সফল।আমরা সফলতা পরিমাপ করি কয়টা পরীক্ষা পাস করেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ে কিরকম ডিগ্রি নিলাম আর পরবর্তীতে কেমন চাকরি পেলাম। এ মানদন্ড অনুযায়ী সফলতা হল আমরা কোন কাপড় পরি আর কোন গাড়ি চালাই। অনেক জিনিস থাকলেই আমাদের সফল বলা হয় অথচ এ মান মনে রেখে আসলে আমরা দ্বিতীয় সেরা হই। মুসলিম হিসেবে আমাদেরকে ভাল থাকার চাইতে অনেক কিছু দখলে নেয়ার অন্তহীন সাধনার প্রবণতা থেকে বিরত থাকতে হবে। কিভাবে আমরা আমাদের সফলতা পরিমাপ করব? চাকরি দিয়ে নাকি ট্রেইনার জুতা দিয়ে? লেটেস্ট মডেলের মোবাইল হাতে নিলেই সফল নাকি সবচেয়ে ফ্যাশনেবল জিন্স পড়লেই আমি সফল?

পশ্চিমা দেশের রীতি হল শেষকৃত্য কালে একজন দাঁড়িয়ে মৃত ব্যক্তিকে নিয়ে কিছু কথা বলে । সবার সামনে মৃত ব্যক্তির কফিন রেখেই প্রায় এরকম কিছু কথা বলা হয়। এরকম কথায় বলা হয় না লোকটা কত জোড়া জুতা পরিধান করেছেন। কেউ বলে না তিনি বছরের কয়দিন ছুটিতে কাটিয়েছেন। কেউ তার চাকরি, গাড়ি-বাড়ি কিংবা ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি যা যা পেয়েছেন সেগুলোর কথা তুলে না। বলা হয় তিনি ছিলেন একজন ভাল স্বামী, ভাল পিতা আর বন্ধুদের কাছে তিনি বিশ্বস্ত ছিলেন। তার কাজে তিনি সৎ ছিলেন। আসলে মৃত্যুর পরই আমরা জানতে পারি কোনটা গুরুত্বপূর্ণ আর এটা অবশ্যই কোন নতুন জুতাজোড়া নয়।  

আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি

মুসলিম হিসেবে গোটা সমাজ আমাদের জন্য যে এজেন্ডা ঠিক করে দিয়েছে তা থেকে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। যখন আমাদের চারপাশের সবাই খাপ খাইয়ে নিতে বলে ঠিক সে সময় এ ঠিক করে দেয়া এজেন্ডা এড়িয়ে চলা অনেক কঠিন, তবুও আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাই। মুসলিম হিসেবে আমাদের অগ্রাধিকার হল আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা। অন্য সব কিছুর পূর্বে আমাদেরকে কিছু অর্পিত ফরজিয়াত পালন করতে হবে। পাঁচ ওয়াক্ত নামায নিয়মিত পড়তে হবে, রমযান মাসে রোযা রাখতে হবে এবং সক্ষম হলে গরিবদের হক হিসেবে যাকাত দিতে হবে। সম্পদ আর সক্ষমতা থাকলে জীবনে একবার মক্কায় হজ করতে যেতে হবে। একাজগুলোই আমাদের আলাদা করে। নিজেদের লাভের জন্য নয় কেবলই আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য এগুলো করি। আর আমাদের জীবনে এসব মৌলিক বিষয়ের অস্তিত্ত্ব ছাড়া নিজেদের মুসলিমই বলতে পারি না।

জীবনে সফলতার কথা বললেই স্কুল-কলেজে কোন কোর্স নিব এরকম পরামর্শ আমাদের কাছে খুব আকর্ষণীয়। আকর্ষণীয় লাগবে যদি ইন্টার্ভিউর জন্য কিভাবে নিজেকে প্রস্তুত করব যাতে চাকরিদাতাদের অভিভূত করা যায় এ বিষয়ে কোন পরামর্শ পাওয়া যায়। এর থেকে আকর্ষণীয় হবে যদি বিজনেস ডিল হাতড়ে নেয়ার কিংবা প্রমোশন বাগিয়ে নেয়ার পরামর্শ পাওয়া যায়। এরকম পরামর্শ দেয়ার নীতি যদিও আমাদের মাঝে প্রচলিত তবে এটা হল কমদামে নিজেকে বিক্রি করা।

অবশ্যই মুসলিম মানে হল আমরা সব জায়গায় সেরা হবার চেষ্টা করব তাই ইন্টার্ভিউর জন্য ভাল প্রস্তুতি নেয়া, ভাল পোষাক পরিধান এবং সর্বদা ভদ্রভাবে আত্মবিশ্বাস নিয়ে কথা বলাও আমাদের প্রাত্যহিক আচরণের সহজাত অংশ হবে আর এটাই স্বাভাবিক। অন্য লোকের প্রতি ভাল আচরণ এবং ভদ্র উপায়ে মানুষের সাথে আচরণ করার ক্ষেত্রে মুসলিমদের উৎকর্ষ অর্জন করতে হবে । ফুটবল টিমে সেরা হওয়া, মাঠের সেরা দৌড়বিদ হওয়া কিংবা ক্লাসের ফার্স্টবয় হবার ও লক্ষ্য নিতে পারি কিন্তু মনে রাখতে হবে এসব লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হলে কিন্তু কেয়ামত ঘটে যায়নি। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অত গুরুত্বপূর্ণ না। আসলে অনেক বিষয় যা এ দুনিয়ায় সফলতার কারণ যেমন নিজের আগ্রহের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হওয়া কিংবা একশ ভাগ সময়ই একটা কাজে নিয়োজিত থাকা সবই ইসলামের পয়গামেরই অংশ। মুসলিমরা জানে তারা আল্লাহর সৃষ্টি আর তাদের সব কাজই আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতেরই প্রতিফলন। একইভাবে মুসলিমরা যা করে তা হল অন্যদের কাছে ইসলামের স্বরূপ তুলে ধরার একটা উপায়। আমাদের কথা-বার্তা, আচরণ অন্যদের ইসলাম সম্বন্ধে বার্তা দেয়। অথচ আমাদের ঈমান ও ইসলাম সম্পর্কিত কথা-বার্তাও হয়ত এরকম প্রভাব ফেলে না।

আমাদের কাছে প্রত্যাশা

মুসলিমদের কাছে সত্যিকার সফলতা কেবল একটা চাকরি পাওয়া কিংবা অর্থোপার্জন না, যদিও এগুলোও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। মুসলিমদের জীবনে সবচেয়ে বড় সফলতা হল আল্লাহ তার কাছে যা প্রত্যাশা করেন সে অনুযায়ী আমল করা যদিও এটা সমাজের চাহিদার সাথে বেমানান প্রতীয়মান হয়।  আমাদের মুসলিম বলা হয় কেননা যেকোন পরিস্থিতিতে আমাদের সৎ মানুষ হতে হবে, যেকোন মূল্যে ইনসাফের প্রসার ঘটাতে হবে এবং এ পদক্ষেপ আমাদের বিপদে ফেলে দিবে এরকম না ভেবেই অগ্রসর হতে হবে। অন্য সব পরিচয়ের চাইতে আমাদের মুসলিম পরিচয়ের কারণ হল আমরা নামায পড়ি আর নামাযের মাধ্যমেই জীবনের সত্যিকার সফলতা অর্জন করা যায়। নামাযের উসিলায় আমরা প্রতিটি বিষয়ের বাস্তবকে অনুধাবন করি, অন্যদের দেখিয়ে দেয়া বাস্তবতা নয় নিজেদের উপলব্ধ বাস্তবতা।

প্রাচীন রোমে সড়ক ব্যবস্থা অনেক উন্নত ছিল। রাস্তাগুলো ছিল সোজা আর ভালভাবে নির্মিত । এ পথ ধরে সৈনিক এবং বার্তাবাহকরা সাম্রাজ্যের যে কোন প্রান্তেই পৌছে যেতে পারত। প্রতিটি সড়কের গন্তব্য ছিল সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দু রোম। পূর্বাপর অনেক সাম্রাজ্যের মতই রোমান সাম্রাজ্য অনেক দিন হল গত হয়েছে। তৎকালীন অনেক প্রতাপশালী লোক যারা অন্যদের উপর ছড়ি ঘুরাতেন তাদের কাউকে আর মানুষ স্মরণ করছে না। সকল দুনিয়াবি ক্ষমতাধরদের মতই তাদের বিজয় আর সাফল্যের কথা লোকে অনেক আগেই ভুলে গেছে।

ক্ষণিকের জন্যই একজন ক্ষমতাধর ব্যক্তি বা একটা ক্ষমতাধর রাষ্ট্র অন্যদের উপর ছড়ি ঘুরায় কিন্তু সময় ফুরালেই তারা গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে এবং অন্যরা ক্ষমতাধর হয়। রোমানরা তাদের সে বিখ্যাত প্রবাদ রেখে গেছে, ‘সব পথ মিলেছে আজ রোমে’ কিন্তু আজকের দিনে সব পথ রোমে গিয়ে মিলে না । আল্লাহকে হাযির-নাযির জানা এবং তার সন্তোষ কামনাকারী মুসলিমদের কাছে এ প্রবাদের ভিন্নার্থ দাঁড়িয়েছে। মুসলিমদের কাছে সব পথ গিয়ে মিলেছে আল্লাহর দরবারে। এখন আমরা ভালো যা করি আর যা বলি সবই আমাদের আল্লাহর কাছে নিয়ে যায় আর এটাই সফলতা। 

জীবনের শেষ প্রান্তে গিয়ে যখন আমরা পিছন ফিরে দেখব আমরা সফল ছিলাম কিনা তখন কিন্তু আমাদের অধিকারে থাকা জিনিস দিয়ে নিজেদের সফলতা বিবেচনা করবো না। হাশরের দিন যখন সর্বসমক্ষে আমাদের আমলনামা উন্মুক্ত করা হবে সেদিন আমাদের পছন্দের পরিধেয় কাপড়ের কোন মূল্য থাকবে না। ঐদিনের সফলতার মানদন্ড হবে আযান শোনার সাথে সাথে আমরা মসজিদে গিয়েছি কিনা, পৃথিবীর মানুষের জন্য আমাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব আমরা ঠিকমত পালন করেছি কিনা। ঐদিনের সফলতা বিবেচনা করা হবে আমরা কেমন লোক ছিলাম তার উপর ভিত্তি করে, আমরা কোন কোন বস্তুর মালিক ছিলাম তার ভিত্তিতে নয়। সবার মনের গহীনে দোলা দেয় আসলে এটাই বাস্তবতা।

দুনিয়ার সব টাকা দিয়েও সুখ কেনা যয় না। একজন প্রেমিক স্বামী বা স্ত্রী কিংবা আদরের সন্তান কিনতে পাওয়া যায় না। জনগণ সততা আর নিষ্ঠাকে ভালবাসে, জ্ঞানী লোকদের সম্মান করে এবং রহমদিল মানুষের মত হতে চায়। সফলতার পালক ছোঁয়া জীবনব্যাপী কর্মতৎপরতার বিষয়। এটার মানে হল জীবনের প্রতিদিন আরো ভালো করার জন্য এবং ঈমানী চেতনায় বলীয়ান হবার অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। দুনিয়ার সফল মানুষেরা সবকিছু পেয়েছেন যখন তারা একটা বিষয় ঠিক রেখেছেন তথা ‘ভাল মুসলিম হিসেবে বাঁচা’। আমরা ও যেন একই পথে সফল হতে পারি সে আশা রাখি। আল্লাহ সহজ করুন, তাওফিক দান করুন। আমীন।

এমএফ/

আরও পড়ুন...

সফল হবার চার কুরআনী পরামর্শ
সফল জীবন প্রত্যাশীদের জন্য ২৭ টি নির্দেশনা
স্বচ্ছলতা লাভের ৬ কুরআনি পরামর্শ