জায়োনিস্ট ইউথ মুভমেন্ট সদস্যের ইসলামের পথে যাত্রা

ঢাকা, রবিবার, ২০ জানুয়ারি ২০১৯ | ৭ মাঘ ১৪২৫

জায়োনিস্ট ইউথ মুভমেন্ট সদস্যের ইসলামের পথে যাত্রা

মরিয়ম জামিলা ৭:৫৫ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৪, ২০১৮

জায়োনিস্ট ইউথ মুভমেন্ট সদস্যের ইসলামের পথে যাত্রা

মার্গারেট পেজি মার্কাস নামে আমার জন্ম। শৈশব থেকেই আমি ছিলাম সঙ্গীতের উপর আসক্ত। বিশেষ করে ক্লাসিক অপেরাহ ও সিম্ফোনি ছিল আমার বিশেষ পছন্দের, পাশ্চাত্য জগতে উচ্চস্তরের সংস্কৃতি হিসেবে যার কদর করা হত।

স্কুলে সঙ্গীত ছিল আমার প্রিয় বিষয়, যাতে সবসময় আমার ফলাফল ছিল উচ্চ। এর মধ্যে কাকতালীয়ভাবে রেডিওর মাধ্যমে আমি আরবী গানের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেলাম, যা আমাকে প্রচন্ডভাবে মুগ্ধ করেছিল। আমি তা আরও শোনার জন্য স্থির করলাম।

আব্বা-আম্মাকে আমি ততক্ষন পর্যন্ত জ্বালাতন করা বন্ধ করলাম না, যতক্ষননা তারা আমাকে নিউইয়র্কের সিরীয় সেকশনে না নিয়ে গেলেন। সেখান থেকে আমি এক গাদা আরবী গানের রেকর্ড সংগ্রহ করলাম। আব্বা-আম্মা, আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীদের ধারনা ছিল আরবী সংগীত খুবই ভয়াবহ এবং সেকারনে আমি যখনই আমার রেকোর্ডারে আরবী গান ছাড়তাম, তখনই তারা বিরক্ত হত। তারা আমার কাছে দাবি করতেন, আমি যেন ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে গান শুনি, যাতে করে তারা উদ্বিগ্ন না হন!

ইসলাম গ্রহনের পর আমি এখন নিউ ইয়র্কের মসজিদের আজান শুনে শিহরিত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করি, বিখ্যাত মিসরীয় ক্বারী আবদুল বাসিতের কন্ঠে কুরআন তেলওয়াত শুনি। কিন্তু জুমার নামাজে ইমাম কোন টেপ চালান না। সেদিন আমাদের একজন বিশেষ অতিথি থাকে। খাটো করে হালকা পাতলা এক কৃষ্ণাঙ্গ যুবক যে   নিজেকে পরিচয় দেয় জাঞ্জিবার থেকে আসা ছাত্র হিসেবে, সূরা আর-রহমান তেলওয়াত করে শোনায়।

ইসলাম সম্পর্কে আমি প্রথম আকৃষ্ট হই দশ বছর বয়সে। রবিবারের ইহুদি ধর্মীয় বিদ্যালয়ে যাওয়ার পর ইহুদি ও আরবদের ঐতিহাসিক সম্পর্ক আবিষ্কার করে আমি বিমুগ্ধ হই।

আমার ইহুদি ধর্মীয় পাঠ্যপুস্তক থেকে আমি জানতে পারি, আব্রাহাম (ইবরাহীম আ.) ইহুদিদের মতই আরবদেরও পূর্বপুরুষ। একইসাথে জানলাম, শত শত শতাব্দী পরে মধ্যযুগীয় ইউরোপের খ্রিস্টানরা যখন তাদের জীবনকে অসহনীয় করে তুলেছিল, মুসলিম স্পেনে তখন ইহুদিদেরকে বসবাসের জন্য স্বাগত জানানো হয়েছিল। এটি ছিল সেই আরব ইসলামী সভ্যতার মহত্ত্ব, যারা হিব্রু সংস্কৃতিকে তার উন্নতির শিখরে পৌছতে সাহায্য করেছিল।

যায়নবাদের প্রকৃতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ ধারণা না থাকায় আমি চিন্তা করতাম, ফিলিস্তিনে ইহুদিদের ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা মূলত তাদের সেমিটিয় ভাইদের সাথে একত্রে বসবাস এবং এই অঞ্চলের সাথে তাদের সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা মাত্র। আমি বিশ্বাস করতাম, ইহুদি এবং আরবরা একত্রে আবার মধ্যপ্রাচ্যে সভ্যতার এক নতুন যুগের সূচনা করবে।

আঠারো বছর বয়সে আমি স্থানীয় যায়নবাদী যুব সংগঠন মিযরাখি হাতজেইরের সদস্য হয়েছিলাম। কিন্তু শীঘ্রই আমি আবিষ্কার করলাম যায়নবাদের আসল প্রকৃতি, যা ইহুদি এবং আরবদের মধ্যে নিরন্তর শত্রুতার প্রাচীর নির্মাণ করেছিল। বিরক্ত হয়ে কয়েক মাস পরেই আমি সংগঠনটি ত্যাগ করি।

বিশ বছর বয়সে আমি যখন নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, তখন আমার অধ্যয়নের বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে একটি নৈর্বাচনিক বিষয় ছিল ইসলামে ইহুদি মতবাদ। আমার শিক্ষক, রাব্বী আবরাহাম আইজ্যাক কাতেশ যিনি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের হিব্রু স্টাডিজ বিভাগের প্রধান, তার ছাত্রদের একথা বোঝাতে কোন প্রচেষ্টাই বাদ রাখতেন না যে, ইসলাম ধর্মের উৎপত্তি ইহুদি ধর্মের গর্ভ থেকে। অবশ্য তার ছাত্ররা সকলেই ছিল ইহুদি এবং এদের মধ্যে অনেকেই আকাঙ্খী ছিল রাব্বী তথা ইহুদি ধর্মযাজক হওয়ার জন্য।

আমাদের পাঠ্যপুস্তক, যা তারই রচিত ছিল, পরিপূর্ণ ছিল কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের বর্ণনা এবং তাদের তথাকথিত ইহুদি উৎস সম্পর্কে প্রমাণের উপস্থাপনায়।

অবশ্য তার আসল লক্ষ্য ছিল তার ছাত্রদের মাঝে ইসলামের উপরে ইহুদি ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার, কিন্তু তার এই প্রচেষ্টা নাটকীয়ভাবে আমার উপর বিপরীত ক্রিয়া করেছে।

আমি শীঘ্রই আবিষ্কার করলাম যায়নবাদ মূলত ইহুদি ধর্মের বর্ণবাদী ও গোষ্ঠীগত বাখ্যার সমন্বয় মাত্র। আধুনিক সেকুল্যার যায়নাবাদী মতবাদকে আমি আরও অপছন্দ করা শুরু করলাম যখন দেখলাম যায়নবাদী নেতাদের মধ্যে খুব কমই ধর্মপরায়ন ইহুদি। ঐতিহ্যগতভাবে ইহুদিধর্ম পালনকে এখানে তীব্র ঘৃণার চোখে দেখা হয়।

আমেরিকার যায়নবাদী নেতাদের মধ্যে ফিলিস্তিনি আরবদের প্রতি ভয়াবহ অবিচার চালানোর জন্য যখন আমি সামান্যতম অনুশোচনার প্রকাশ দেখলাম না, তখন থেকে আমি নিজেকে আর মনে প্রাণে ইহুদি হিসেবে কল্পনা করতে পারিনি।

এক সকালে প্রফেসর কাতেশ তার লেকচারে মোজেসের (মুসা আ.) উপর অবতীর্ণ ঈশ্বরের একত্ববাদের শিক্ষা ও আসমানী বিধানের পক্ষে অকাট্য যুক্তি প্রদান করছিলেন। তার মতে, এটি ছিল অপরিহার্য যা সকল প্রকার উচ্চ মূল্যবোধের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।

তার মতে, মূল্যবোধ যদি সম্পূর্ণভাবে মানুষের নির্ধারন করতে হত, যা বিভিন্ন অজ্ঞেয়বাদী ও নিরীশ্বরবাদী দর্শনগুলো শিক্ষা প্রদান করে, তবে তারা তাদের বিচারবুদ্ধি, পরিবেশ ও ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে সময়ে সময়ে তার পরিবর্তন করতে থাকবে।

যার ফলাফল হবে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা যা ব্যক্তি ও সমাজকে ধ্বংস করে ছাড়বে।

পরকালের প্রতি বিশ্বাস সম্পর্কে প্রফেসর কাতেশ তার মত প্রকাশ করে বলেন, এটি শুধু সামান্য কল্যান চিন্তাই নয়, বরং তা নৈতিক প্রয়োজনীয়তা।

তিনি বলেন, যারা বিশ্বাস করে আমাদের কাজের জন্য জন্য শেষ বিচারের দিন ঈশ্বরের কাছে আমাদের জবাবদিহি করতে হবে এবং কাজের ভিত্তিতে পুরস্কার বা শাস্তি নির্ধারিত হবে, তারা নিজেদের জীবনে ক্ষণস্থায়ী আনন্দের পরিবর্তে বাস্তবজীবনে শৃঙ্খলাকে প্রাধান্য দেবে এবং সাময়িক দুঃখ-কষ্টকে বরনের মাধ্যমে অনন্ত সুখের অধিকারী হবে।

প্রফেসর কাতেশের ক্লাসেই আমি পরিচিত জিনিতার সাথে, আমার জীবনে দেখা সবচেয়ে ব্যতিক্রম ও আকর্ষনীয় মেয়ে। প্রথম যখন আমি প্রফেসর কাতেশের ক্লাসে প্রবেশ করি, বসার জন্য খালি জায়গা খুজতে গিয়ে দুইটি ডেস্ক আমার নজরে আসে। এর একটিতে সুন্দর করে বাঁধাই করা ইউসুফ আলীর রচিত কুরআনের ইংরেজি অনুবাদ ও ব্যাখার তিনটি বিশাল খন্ড পড়েছিল।

আমি ঠিক সেখানেই গিয়ে বসলাম। নিজের মধ্যে আমি কৌতুহলে ফেটে পড়ছিলাম, বিশাল এই তিনটি বই কার। রাব্বী কাতেশের লেকচার শুরুর পূর্বে লম্বা করে হালকা-পাতলা গড়নের ফ্যাকাশে বর্ণের মাথা ভর্তি লাল চুলের একটি মেয়ে এসে আমার পাশে বসল। তার চেহারা এতই পৃথক ছিল যে, আমি চিন্তা করেছিলাম সে তুরস্ক, সিরিয়া বা নিকটপ্রাচ্যের কোন দেশ থেকে আগত বিদেশী শিক্ষার্থী।

ক্লাসের অধিকাংশ ছাত্রই ছিল তরুন যারা ইহুদি ধর্মীয় কালো টুপি পরা ছিল, যাদের লক্ষ্য ছিল রাব্বী হওয়া। আমরা দুইজনই ছিলাম শুধু ক্লাসের নারী শিক্ষার্থী।

বিকালে যখন আমরা লাইব্রেরী থেকে বেরিয়ে আসছিলাম, তখন তার সাথে আমার পরিচয় হল। কথায় কথায় তার কাছ থেকে জানলাম, ধর্মপরায়ন এক ইহুদি পরিবারে তার জন্ম এবং ১৯১৭ সালে রাশিয়ার কমিউনিস্ট বিপ্লবের অল্প কয়েক বছর আগে তার বাবা-মা পরিবারের সকলকে নিয়ে রাশিয়া থেকে আমেরিকায় চলে এসেছে।

আমি লক্ষ্য করলাম, আমার নতুন বন্ধু অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ইংরেজি উচ্চারন করছে, যেভাবে একজন বিদেশি উচ্চারন করে। আমার অনুমানকে সমর্থন করে সে জানায়, নিজেদের পারিবারিক গন্ডি ও বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে তারা ইড্ডিশ ভাষায় কথা বলতো বলে পাবলিক স্কুলে ভর্তি হওয়ার পূর্বে তার ইংরেজি শেখা হয়ে উঠেনি।

সে আমাকে জানায় তার নাম জিনিতা লিবারমেন কিন্তু বর্তমানে নিজেদেরকে মার্কিনী হিসেবে তৈরির জন্য তার পিতা-মাতা তাদের নাম ‘লিবারমেন’ থেকে পরিবর্তন করে ‘লেন’ রেখেছে।

পিতার নিকট থেকে ধর্মীয় শিক্ষা ও হিব্রু শেখার পর সে স্কুলে ভর্তি হয়। সে জানায়, বর্তমানে সে চেষ্টা করছে আরবী ভাষা শেখার জন্য।

কিন্তু, কোন প্রকার আগাম সংবাদ ছাড়াই জিনিতা ক্লাস করা ছেড়ে দেয়। যদিও কোর্স সমাপ্ত করার জন্য আমি ক্লাস করতে থাকি। জিনিতা ক্লাসে আর ফিরেনি।

মাসের পর মাস পার হয়ে গেল এবং আমিও জিনিতার কথা প্রায় ভুলে গেলাম। হঠাৎ একদিন সে আমাকে সংবাদ দিল এবং আমাকে মেট্রোপলিটন মিউজিয়ামে গিয়ে তার সাথে দেখা করতে অনুরোধ করলো। একইসাথে সে তখন সেখানে চলমান কুরআনের প্রাচীন বিভিন্ন পান্ডুলিপি এবং আকর্ষণীয় আরবী ক্যালিওগ্রাফীর একটি প্রদর্শনী তার সাথে ঘুরে দেখার জন্য আবেদন করলো।

মিউজিয়ামে আমাদের এই ভ্রমণের সময় জিনিতা আমাকে জানালো, সে তার দুইজন ফিলিস্তিনি বন্ধুকে সাক্ষী রেখে ইসলাম গ্রহণ করেছে।

আমি অবাক হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “কেন তুমি ইসলাম গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিলে?” সে জানালো, কিডনির জটিলতার কারনে সে ভয়াবহভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। ফলে সে প্রফেসর কাতেশের ক্লাসে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। তার অবস্থা এতই খারাপ হয়ে পড়েছিল যে, তার পিতা-মাতাও তার জীবনের আশা ছেড়ে দেয়।

সে জানায়, “প্রচন্ড জ্বরে একদিন বিকালে আমি আমার বিছানার পাশের টেবিল থেকে কুরআন উঠিয়ে পড়তে থাকি। যখন আমি আয়াতগুলো পাঠ করছিলাম, এটি আমার হৃদয়ে এমনভাবে স্পর্শ করে যে আমি কাঁদতে শুরু করি এবং তারপর আমার মনে হল, আমি আবার সুস্থ হয়ে উঠবো।

যখনই আমি বিছানা ছেড়ে দাঁড়ানোর মত শক্তি অর্জন করলাম, আমি আমার দুইজন ‍মুসলিম বন্ধুকে ডাকলাম এবং তাদের সামনে কালেমা শাহাদাত উচ্চারন করলাম।”

প্রফেসর কাতেশ যখন আমাদের ইহুদিধর্ম ও ইসলামের মধকার তুলনা সম্পর্কে শিক্ষা দিচ্ছিলেন, আমি তখন নিজে থেকে আমার ওল্ড টেস্টামেন্ট ও তালামুদ পাঠের জ্ঞান এবং ক্লাসে উপস্থাপিত কুরআন-হাদীসের শিক্ষার মধ্যে তুলনা করছিলাম। পরবর্তীতে এই পথ ধরেই আমি ইসলাম গ্রহণ করি।

সূত্র: এবাউট ইসলাম ডটনেট

এমএফ/

আরও পড়ুন...

ইসলাম গ্রহণ করলেন বিখ্যাত আইরিশ গায়িকা সিনাদ ও’কনর
প্রথম মোঙ্গলীয় মুসলিম শাসক বারকে খানের ইসলাম গ্রহণ
অমুসলিমদের সঙ্গে লেনদেনে হোক উত্তম আচরণ
অমুসলিমদের প্রতি ইহসান প্রদর্শনে ইসলামের নির্দেশ
অমুসলিম প্রতিবেশী অসুস্থ হলে দেখতে যাওয়ার বিধান কী?