ফিলিস্তিন : যেখানে দলিত মানবতা

ঢাকা, রবিবার, ১৯ আগস্ট ২০১৮ | ৩ ভাদ্র ১৪২৫

ফিলিস্তিন : যেখানে দলিত মানবতা

মুহাম্মাদ ফয়জুল্লাহ ৫:১৯ অপরাহ্ণ, মে ২৪, ২০১৮

print
ফিলিস্তিন : যেখানে দলিত মানবতা

১৯৪৮ সনের ১৫ মে। ফিলিস্তিনিদের নাকাবা দিবস। ফিলিস্তিনের ইতিহাসে নৃশংসতম ধ্বংসের দিন। অবিস্মরণীয় বেদনার সেই অন্ধকারতম দিন, যাকে এভূমির অতীত-বর্তমানের কেউ কোনদিন ভুলবে না। এ দিন একদিকে যেমন তাদের মাতৃভূমির উপর ইহুদিরা অবৈধ দখলরাজ কায়েম করেছে, অপরদিকে একই দিনে আট লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে নিজেদের বাস্তুভিটা থেকেও উচ্ছেদ করে উদ্বাস্তুতে পরিণত করেছে। ফিলিস্তিনের সত্তুর বছরের ইতিহাস যদি দেখা হয় তাহলে এসময়কালের এক একটি দিন ফিলিস্তিনিদের জন্য নাকাবা দিবস থেকে কম ছিল না কখনো।

২০১৮ সালেও ফিলিস্তিনি জনতা নাকাবা দিবসে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করেছে এবং বিশ্ব বিবেকে ঝাঁকুনি দিতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এইবার একটু ভিন্নভাবেই ফিলিস্তিনিদের রক্ত যেন অন্ধকার রাতেই ঝরে গেলো। কেউ দেখেনি শুনেনি যেন কিছুই। কারণ পৃথিবীতে মানবাধিকারের ঠিকাদার সুপার পাওয়ার আমেরিকা এ কথা প্রকাশ্যে প্রমাণ করে দিয়েছে যে বিগত সত্তুর বছর যাবত ফিলিস্তিনে ঘটে যাওয়া মানবাধিকারের পদদলনে আমেরিকাই ইসরাইলের পৃষ্ঠপোষকতা করে এসেছে।

এবছর ফিলিস্তিনি আম জনতা গত সাত সপ্তাহ যাবত তাদের অধিকার পুনরুদ্ধারের দাবী করে আসছে। গাজা ও পশ্চিম তীরের মাঝে দখলদার ইসরাইলের পক্ষ থেকে জোড়পূর্বকভাবে প্রতিষ্ঠা করা লাইন অফ কন্ট্রোলে তারা একত্রিত হয়। এখানে তাদের আত্মমর্যাদার শ্লোগান ছিল ‘ফিলিস্তিনের দিকে প্রত্যাবর্তন’, ‘কুদসের দিকে প্রত্যাবর্তন’। কিন্তু প্রতিউত্তরে প্রথমে ৩০ মার্চ ইহুদিবাদি অবৈধ দখলদারেরা নিপীড়িত নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের উপর ভয়ানক সহিংসতা চালায়। ফলে গত সাত সপ্তাহে সত্তুরেরও অধিক ফিলিস্তিনি শহীদ হন এবং আহত হন আরও সাত হাজারেরও অধিক।

তবে ১৪ মে আমেরিকার পৃষ্ঠপোষকতায় ইহুদিবাদি দখলদারেরা পশুসুলভ সহিংসতার আরও নিকৃষ্ট নমুনা পেশ করে যখন ফিলিস্তিনের জনতা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করে দাবী জানাচ্ছিল আমেরিকার দূতাবাস যেন পবিত্র বাইতুল মুকাদ্দাস শহরে স্থানান্তর বন্ধ করা হয়। যা মূলত মানবাধিকারের পদদলন তো বটেই; আন্তর্জাতিক আইনেরও লঙ্ঘন। কিন্তু জবাবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ষাটেরও অধিক নিরস্ত্র নিরপরাধ ফিলিস্তিনিকে নির্মম সহিংসতার নিশানা বানিয়ে মৃত্যুর চির নিদ্রায় শুইয়ে দেওয়া হয়। আর পৃথিবীর মানবাধিকারের ঠিকাদার আমেরিকা এ সকল ফিলিস্তিনি মা’সুম নারী-শিশু ও নিরস্ত্র নিরপরাধ ফিলিস্তিনি জনতার লাশের উপর দিয়ে নিজের দূতাবাস কুদস শহরে খুলে বসেই তবে ক্ষ্যান্ত হয়। সাথে সাথে পৃথিবীকেও এই বার্তা দিয়ে দেয় যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের সামনে মানবাধিকার ও মানুষ্যপ্রাণের কোন মুল্য নেই।

প্রকৃতপক্ষে বিষয়টি কেবল এমন নয় যে আমেরিকা বাইতুল মুকাদ্দাস শহরে তার দূতাবাস খুলে শুধু ইহুদিবাদি দখলদার রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতারই প্রমাণ দিয়েছে- বরং সে এর মাধ্যমে পুরো বিশ্বে বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাধীনতাকামী মুসলমানদেরও একটি ঝাঁকি দিয়ে দিয়েছে। বাইতুল মুকাদ্দাসে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তরের পর্দার পেছনে তার আরও হীন নাপাক লক্ষ্য লুকায়িত রয়েছে। যার অধীনে সে ফিলিস্তিনের সেই ঐতিহাসিক শহর জেরুসালেমের ইসলামী, আরব্য ও ভৌগলিক পরিচয় পরিবর্তন করে দখলদার ইহুদি রাষ্ট্রের অধিকারে করতে চায়।

আমেরিকা এর মাধ্যমে যেমন একদিকে ফিলিস্তিনিদের অধিকার খুল্লামখুলা পদতলে পিষ্ট করেছে, তেমনি আন্তর্জাতিক আইনও চূড়ান্তভাবে লঙ্ঘন করেছে। এর সাথেই যদি আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো এবং বিশেষভাবে যদি জাতিসংঘের প্রস্তাবের কথা বলা হয় তাহলেও আমেরিকা দখলদার জায়নবাদি অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইলের পক্ষে থেকে ঐ প্রস্তাবকেও আবর্জনার ঝুড়িতে নিক্ষেপ করেছে।

গত বছর জাতিসংঘের জেনারেল এসেম্বলিতে একটি প্রস্তাব পাস হয়েছিল, যাতে ১৯৩ টি দেশের মধ্যে ১২৮ টি দেশই কুদস বিষয়ে আমেরিকার সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখ্যান করে তার বিরোধিতা করেছে। তন্মধ্যে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির মত আমেরিকার মিত্র রাষ্ট্রগুলোও ছিল। আন্তর্জাতিক চাপ ও বিরোধিতা সত্ত্বেও ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্ব আইনকে দেওয়ালে ছুড়ে মারে এবং ১৪ মে, ২০১৮ তে মার্কিন দূতাবাস তেল আবিব থেকে অধিকৃত বাইতুল মুকাদ্দাসে স্থানান্তর করে ইতিহাসের এক নতুন কালো অধ্যায় রচনা করে।

অধিকৃত বাইতুল মুকাদ্দাস দুইটি অংশ নিয়ে গঠিত। যার পশ্চিম অংশে ইসরাইল ১৯৪৮ সালের যুদ্ধের পর যুলুমি আধিপত্য কায়েম করে, আর ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে পূর্ব বাইতুল মুকাদ্দাসের উপর নিজের অবৈধ দখল প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৪৮ সালে ইসরাইল সম্মিলিত কুদসকে এ ইহুদিবাদি জাতিরাষ্ট্রের রাজধানী ঘোষণা করে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যার বিরোধিতা সেই অতীত থেকে আজও করে আসছে। আত্মমর্যাদাশীল ফিলিস্তিনি জাতি কুদসের স্বাধীনতার জন্য বিরামহীন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। আল-কুদস ফিলিস্তিনে উদীয়মান বিপ্লবী আন্দোলন ও ইন্তিফাদার শিরোনাম হয়ে থাকছে।

গত বছর ৬ ডিসেম্বর যখন ইহুদীদের পৃষ্ঠপোষক আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কুদসকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে সমর্থন করে তখন ফিলিস্তিনিরা এক নতুন তাহরীকে ইন্তিফাদা শুরু করে। ইতিমধ্যে এ আন্দোলনে ১৪০ ফিলিস্তিনি জনতা শাহাদাত বরণ করেন, জেলবন্দি ও আহত হন আরও কয়েক হাজার।

গত বছর মার্কিন প্রেসিডেন্টের কুদস বিষয়ক ন্যাক্কারজনক সিদ্ধান্ত সামনে আসার পরেও মুসলিম উম্মাহ বিশেষত মুসলমানদের অধিকার রক্ষার আন্তর্জাতিক সংগঠন ওআইসি এবং ওআইসিভুক্ত প্রভাবশালী মুসলিম রাষ্ট্রগুলোও দু’চারটি প্রদর্শন সর্বস্ব সম্মেলন ও বিবৃতি সর্বস্ব নিন্দা প্রকাশ ছাড়া তেমন কোনই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি- যার ফলাফল শেষ পর্যন্ত এই হয় যে ফিলিস্তিনিদের লাশের উপর দিয়ে আমেরিকা তার দূতাবাস স্থানান্তর করে সীমান্তের ওপাড় অধিকৃত ফিলিস্তিনে আমেরিকা-ইসরাইল ‘ভাই-ভাই’ মিলে নিজেদের নৃশংসতার বিকৃত উৎসব উদযাপন করে!

লেখক : তরুণ আলেম, মিডিয়া কর্মী

এমএফ/
আরও পড়ুন
আফগান ফিলিস্তিন কাশ্মীর: যেখানে মিশে গেছে রক্ত-মাটি

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
 
.


আলোচিত সংবাদ