মুসলিম রাষ্ট্রে অমুসলিমদের অধিকার!

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৯ | ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

মুসলিম রাষ্ট্রে অমুসলিমদের অধিকার!

মুফতী শাহেদ রাহমানী ৮:১০ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ০১, ২০১৮

মুসলিম রাষ্ট্রে অমুসলিমদের অধিকার!

ইসলাম এমন জীবনব্যবস্থা, একমাত্র যার বিশ্ব সমাজ গড়ে তোলার মতো ঔদার্য আছে। এ ধর্ম মতে, একই রাষ্ট্রে বসবাসকারী বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের মাঝে সামাজিকতার ক্ষেত্রে কোনো বৈষম্য নেই।

গোশত ছাড়া অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে আহলে কিতাব ও অন্যান্য কাফেরের মাঝে কোনো তারতম্য নেই। সবাই একে অন্যের খাবার বৈধ পন্থায় গ্রহণ করতে পারবে। আর গোশতের ক্ষেত্রেও আহলে কিতাব ও মুসলমানদের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই।

আহলে কিতাবের জবাইকৃত হালাল প্রাণী মুসলমানদের জন্য বৈধ। ইসলাম শুধু অমুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতাই দেয়নি,তাদের সঙ্গে সামাজিক অংশীদারি, সৌজন্যবোধ ও মেলামেশার সুযোগ দিয়েছে।

এমনকি আহলে কিতাবের রমণীদের বিবাহ করা বৈধ বলে ঘোষণা করা হয়েছে।

কিন্তু ইসলাম যেহেতু পৃথক একটি ধর্ম। তাই আত্মীয়তার ঘনিষ্ঠতার স্তর ও সহযোগিতার ধরনের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা রাখা হয়েছে।

ইসলাম অমুসলিমদের সব ক্ষেত্রে মর্যাদা ও অধিকার দিয়েছে। তাদের যথাযথ সম্মান দিয়েছে।

যার বিবরণ নিম্নরূপঃ

অমুসলিমদের সঙ্গে উঠাবসা

অমুসলিমদের সঙ্গে উঠাবসা করতে ইসলাম নিষেধ করে না। তাদের সঙ্গে কথাবার্তা ও উঠাবসা করা বৈধ। তবে তাদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব স্থাপন করা যাবে না। এমনকি তাদের মসজিদে বসারও অনুমতি আছে।

হযরত হাসান বলেন, যখন সাকিফ গোত্রের প্রতিনিধি রাসূল (সা.)-এর দরবারে হাজির হয়, তখন তারা মসজিদের শেষ প্রান্তে অবস্থিত গম্বুজের কাছে অবস্থান করে। যখন নামাযের সময় হলো, দলের একজন লোক বলল, হে আল্লাহর রাসূল! নামাযের সময় হয়েছে অথচ এরা একদল অমুসলিম মসজিদে আছে। তখন রাসূল (সা.) বললেন, ‘অমুসলিমদের কারণে জমিন নাপাক হয় না।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদীস : ৮৫৭৬,৮৭৭৪]

অমুসলিমদের প্রতি জুলুম করা নিষিদ্ধ

নবী করীম (সা.) কারো ওপর জুলুম করতে নিষেধ করেছেন,যদিও সে অমুসলিম হয় :

হযরত আনাস বিন মালেক রাঃ বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা মজলুমের বদ দু’আ থেকে বেঁচে থেকো, যদিও সে কাফের হয়। তার মাঝখানে আর আল্লাহর মাঝখানে কোনো পর্দা নেই (অর্থাৎ তার বদ দু’আ দ্রুত কবুল হয়ে যায়)।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ১২৫৭৭, ১২৫৪৯)

অমুসলিমদের সঙ্গে ভালো কথাবার্তা

তাদের সঙ্গে শালীন কথাবার্তা বলতে হবে। আচার-আচরণে ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে।

আল বিদায়া ওয়ান নিহায়াতে এসেছে :

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালমা (রা.) বলেন, যখন আল্লাহ তা’আলা যায়েদ ইবনে সাই’য়াকে ইসলাম গ্রহণের তাওফিক দিলেন, যায়েদ বললেন, নবুওয়তের সব নিদর্শন আমি মহানবী (সা.)-এর চেহারায় অবলোকন করেছি; কিন্তু দুটি নিদর্শন এখনো আমি অনুভব করতে পারিনি।

এক. তাঁর ধৈর্য তাঁর অজ্ঞতার ওপর প্রাধান্য লাভ করবে।

দুই. অজ্ঞতা তাঁর ধৈর্যকে আরো বাড়িয়ে দেবে।

সাহাবী বলেন, তখন আমি তাঁর সঙ্গে মিশতে চেষ্টা করি, যাতে তাঁর ধৈর্যের পরীক্ষা নিতে পারি। একবার আমি মহানবী (সা.)-এর কাছে এলাম। আমি তাঁর জামা ও চাদর ধরলাম। তিনি সঙ্গীদের সঙ্গে এক জানাযায় ছিলেন। আমি তাঁর দিকে রুক্ষ চেহারায় তাকালাম এবং বললাম, হে মুহাম্মদ! তুমি কি আমার ঋণ আদায় করবে না? আল্লাহর কসম! তোমরা বনি মুত্তালিব টালবাহানার লোক।

এ সময় ওমর (রা.) আমার দিকে তাকালেন। তাঁর চেহারায় চক্ষু ঘোরাফেরা করছে ঘুরন্ত নক্ষত্রের মতো, অর্থাৎ রাগে তিনি অগ্নিশর্মা হয়ে আছেন।

ওমর (রা.) আমাকে বললেন, ‘হে আল্লাহর দুশমন! তুমি কি রাসূলকে এমন কথা বলছ, যা আমি শুনছি? তুমি কি এমন কিছু করছ, যা আমি দেখছি? আল্লাহর কসম! মহানবী (সা.) আমাকে বকা না দিলে আমি তোমার গর্দান উড়িয়ে দিতাম।’

রাসূল (সা.) তখন ওমরের দিকে শান্ত, ভদ্র ও মুচকি হেসে তাকালেন। তারপর বললেন, ‘হে ওমর! আমি ও সে তার চেয়ে উত্তম আচরণের মুখাপেক্ষী। তুমি আমাকে সুন্দরভাবে ঋণ আদায় করতে বলতে পারতে। আর তাঁকে সুন্দরভাবে ঋণ উসুল করার জন্য বলতে পারতে। হে ওমর! তুমি যাও ও তাঁর হক্ব আদায় করো এবং তাকে আরো অতিরিক্ত ২০ ‘সা’ ফল দাও।’

এটি দেখে যায়েদ ইবনে সা’ইয়া ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেন এবং রাসূলের সঙ্গে পরবর্তী সব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তাবুক যুদ্ধের বছর তিনি ইন্তেকাল করেন।’ (ইবনে কাসীর, খ–২, পৃষ্ঠা-৩৮০)

অমুসলিম রোগীকে দেখতে যাওয়া

অমুসলিম রোগীকে দেখতে যাওয়াও সুন্নাত। নবী করীম (সা.) অমুসলিম রোগীদের দেখতে যেতেন এবং তাদের ঈমানের দাওয়াত দিতেন। তাদের সেবা করতেন।

হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ইহুদি বালক নবী করীম (সা.)-এর খেদমত করত। যখন সে অসুস্থ হলো, তখন মহানবী (সা.) তাকে দেখতে গেলেন, তার মাথার দিকে বসলেন আর তাকে বললেন, তুমি ইসলাম গ্রহণ করো! তখন সে তার পিতার দিকে দেখল। পিতা বললেন, তুমি আবুল কাসেমের অনুসরণ করো, ফলে সে ইসলাম গ্রহণ করল। তখন নবী (সা.) এই বলে বের হলেন, আল্লাহর শোকর, যিনি তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিলেন।’ (বুখারী শরীফ, হাদীস : ১৩৫৬)

সহীহ বুখারীর অন্য বর্ণনায় এসেছে,

হজরত ইবনুল মুসায়্যিব তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, যখন আবু তালিবের মৃত্যু ঘনিয়ে এল নবী (সা.) তাঁর দরবারে গেলেন। তাঁর কাছে আবু জাহল বসা ছিল। তখন তিনি বললেন, হে চাচা! কালেমা পড়ো, আমি তা দ্বারা আল্লাহর দরবারে আবেদন করব।

তখন আবু জাহল ও আবদুল্লাহ ইবনে আবু উমাইয়া বলল, হে আবু তালিব! তুমি কি আবদুল মুত্তালিবের ধর্ম থেকে বিমুখ হচ্ছ? তারা তাঁকে বারবার তা স্মরণ করিয়ে দিল। তাই আবু তালিব শেষ কথা বলল, আমি আবদুল মুত্তালিবের ধর্মে ইন্তেকাল করছি।

তখন মহানবী (সা.) বললেন, আমি আপনার জন্য পাপ ক্ষমা চাইব নিষেধাজ্ঞা আসা পর্যন্ত। এর পরিপ্রেক্ষিতে আয়াত নাজিল হলো “নবী ও ঈমানদারের উচিত নয়, মুশরিকদের জন্য ক্ষমা চাওয়া, যদিও তারা আত্মীয়স্বজন হয়।’ (বুখারী, হাদীস : ৩৮৮৪)

এভাবে তিনি মৃত্যুর সময় তাঁদের দেখতে গিয়ে ঈমানের দাওয়াত দিতেন এবং জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতেন।

অমুসলিম মৃতদের সম্মান করা

অমুসলিম জীবিতের যেমন হক্ব রয়েছে, তেমনি মৃতেরও হক্ব রয়েছে। তাদের দাফনে সহযোগিতা করতে হবে এবং তাদের জানাযাকেও সম্মান দিতে হবে। কেননা তারা মানবজাতির অন্তর্ভুক্ত।

হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবি লায়লা থেকে বর্ণিত, সাহল ইবনে হুনাইফ ও কায়েস ইবনে সাদ কাদেসিয়াতে বসা ছিলেন।

তখন তাঁদের পাশ দিয়ে একটি জানাযা নিয়ে কিছু লোক অতিক্রম করল। তাঁরা দুজন দাঁড়িয়ে গেলেন। তাঁদের বলা হলো, ইনি হলো কাফের।

তাঁরা বললেন, মহানবী (সা.)-এর পাশ দিয়ে একসময় এক জানাযা নেওয়া হয়েছিল। তখন তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন।

তাঁকে বলা হলো, এটা তো এক ইয়াহুদির জানাযা। তখন তিনি বললেন, এটা কি প্রাণী নয় (মানব নয়)?’ (সহীহ বুখারী, হাদীস : ১৩১২)

অমুসলিমদের অন্যায়ভাবে হত্যা করা নিষিদ্ধ

যেসব অমুসলিম মুসলিম দেশে জিম্মি হিসেবে (মুসলিম রাষ্ট্রের আইন মেনে) বসবাস করে, তাদের হত্যা করা যাবে না।

তেমনি যারা ভিসা নিয়ে আমাদের দেশে আসে, তাদের হত্যা করা যাবে না। তাদের জানমালের নিরাপত্তা মুসলমানদের মতোই অপরিহার্য।

ইমাম বায়হাকি (রহ.) সুনানে কুবরা নামক গ্রন্থে বর্ণনা করেন,

হযরত আবু জানুব আসাদি (রহ.) থেকে বর্ণিত, আলী (রা.)-এর দরবারে এক মুসলিমকে হাজির করা হয়, যে একজন অমুসলিম নাগরিককে হত্যা করেছে। এ হত্যার প্রমাণও পাওয়া গেছে। তখন তিনি তাকে কেসাস হিসেবে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছেন। এ সময় মৃত ব্যক্তির ভাই এল এবং বলল, আমি তাকে ক্ষমা করছি।

তখন আলী রা. বললেন, হয়তো তার পরিবার তোমাকে ধমক দিয়েছে, ভীতি প্রদর্শন করেছে, হুমকি দিয়েছে। সে বলল, না। কিন্তু তাকে হত্যা করলে আমার ভাই ফিরে আসবে না। আর তারা আমাকে ‘দিয়াত’ (রক্তপণ) দিয়েছে। তাই আমি রাজি হয়েছি।

আলী (রা.) বললেন, ‘তুমি ভালো করেই জানো, যেসব অমুসলিম আমাদের রাষ্ট্রে নাগরিক হিসেবে থাকবে, তাদের জীবন আমাদের মতো, তাদের রক্তপণ আমাদের রক্তপণের মতো।’ (বায়হাকী, হাদীস : ১৫৯৩৪)

অন্য হাদীস শরীফে এসেছে,

অর্থাৎ যে ব্যক্তি কোনো অমুসলিম নাগরিককে হত্যা করল, সে জান্নাতের সুগন্ধিও পাবে না, অথচ জান্নাতের সুগন্ধি ৪০ বছরের রাস্তার দূরত্ব থেকেও পাওয়া যায়।’ (বুখারী, হাদীস : ৩১৬৬)

হযরত আবু বাকারা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কোনো অমুসলিম নাগরিককে হত্যা করবে, আল্লাহ তার ওপর জান্নাত হারাম করে দেবেন।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ২০৬৪৮,২০৩৭৭)

অমুসলিম বন্দিদের সঙ্গে সদাচার

কোনো কারণে যদি তাদের কোনো লোক বন্দি হিসেবে মুসলমানদের অধীনে আসে তখন তাদের বন্দিদের সঙ্গে সদাচার করত হবে। তাদের আহার করাতেও সদকার পুণ্য রয়েছে। বরং যেকোনো প্রাণীকে আহার করাতে সদকা রয়েছে।

কারণ প্রত্যেক প্রাণীর প্রাণ মর্যাদাবান। তাই তাদের অনর্থক নষ্ট করা নিষেধ।

কাতাদাহ (রহ.) থেকে বর্ণিত,

‘তারা আহার করায় আল্লাহর মুহাব্বাতে মিসকিন ইয়াতিম ও বন্দিদের। তিনি বলেন, আল্লাহ তা’আলা এখানে বন্দিদের সঙ্গে ভালো আচরণ করার জন্য বলেছেন। আর তখনকার বন্দিরা মুশরিকই ছিল।’ (তাফসীরে তাবারী : ২৪/৯৭,২৩/৫৪৪)

বন্দিদের সঙ্গে ভালো আচরণের একটি দৃষ্টান্ত বুখারী শরীফে এভাবে এসেছে,

হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সা.) নজদের দিকে অশ্বারোহী একটি দল পাঠালেন, তখন বনী হানীফার ছুমামা ইবনে উছাল নামক ব্যক্তিকে তাঁরা আটক করলেন। তাঁরা তাকে মসজিদের একটি স্তম্ভের সঙ্গে বেঁধে রাখলেন।

নবী (সা.) তার কাছে গেলেন এবং বললেন, তোমার কী ধারণা, হে ছুমামা? তখন সে বলল, হে মুহাম্মদ! আমার ভালো ধারণা রয়েছে। যদি আপনি হত্যা করেন, তাহলে একজন হত্যার উপযুক্তকে হত্যা করবেন। আর যদি ইহসান করেন, তাহলে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তিকে মুক্তি দেবেন। যদি আপনি মাল চান, তাহলে যা ইচ্ছা চান।

এভাবে দ্বিতীয় দিন অতিক্রম হলো।

মহানবী (সা.) তাকে বললেন, তোমার কী ধারণা ছুমামা! তখন সে বলল, কথা তো আমি আগেই বলেছি, যদি মুক্তি দেন, তাহলে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তিকে মুক্তি দেবেন। মহানবী (সা.) তাকে রেখে গেলেন। পরবর্তী দিন তিনি তাকে বললেন, ছুমামা তোমার কী ধারণা? তখন সে বলল, আগেই তো বলেছি।

তখন তিনি বললেন, তাকে মুক্তি দাও। মুক্তি পাওয়ার পর সে মসজিদের একটি নিকটবর্তী খেজুর বাগানে গিয়ে গোসল করল, তারপর আবার মসজিদে প্রবেশ করল। আর সাক্ষ্য দিল আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই ও মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসুল।

অতঃপর বলল, হে মুহাম্মদ! আল্লাহর কসম আমার কাছে পৃথিবীর বুকে আপনার চেহারার চেয়ে ঘৃণিত চেহারা দ্বিতীয়টি ছিল না। এখন আমার কাছে আপনার চেহারা সবচেয়ে প্রিয় হয়ে গেল। আমার কাছে পৃথিবীতে আপনার ধর্মের চেয়ে ঘৃণিত ধর্ম ছিল না। এখন আপনার ধর্ম আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় ধর্মে পরিণত হলো। আল্লাহর কসম! আপনার শহরের চেয়ে ঘৃণিত শহর ছিল না। এখন আপনার শহরের চেয়ে প্রিয় শহর নেই। নিশ্চয়ই আপনার অশ্বারোহী দলের হাতে আমি পাকড়াও হয়েছি এখন আমি ওমরা করার উদ্দেশ্যে বের হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করছি। আপনি কী বলেন? তখন নবী (সা.) তাকে সুসংবাদ দিলেন এবং তাকে ওমরার অনুমতি দিলেন।

যখন সে মক্কায় এল, একজন তাকে বলল, তুমি তো পথভ্রষ্ট হয়েছ। তখন সে বলল, না, বরং আমি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছি মুহাম্মদের হাতে, আল্লাহর কসম! ইয়ামামা থেকে একটি গমের দানাও রাসূল (সা.)-এর অনুমতি ছাড়া তোমরা পাবে না।’ (বুখারী, হাদীস : ৪৩৭২)

এ রকম অসংখ্য উদারতা ও সদাচারের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ আছে।

ইসলামের উদারতায় প্রতিপক্ষ যোদ্ধাদের ইসলাম গ্রহণ

হুনাইন যুদ্ধে হাওয়াজিন ও সাকিফ গোত্রের কয়েকজন সরদার মারা যায়। কেউ কেউ পালিয়ে যায়। তাদের পরিবার-পরিজন বন্দিরূপে এবং মালামাল গনিমত হিসেবে মুসলমানদের আয়ত্তে আসে। এর মধ্যে ছিল ছয় হাজার বন্দি, ২৪ হাজার উট, ৪০ হাজারেরও বেশি বকরি এবং প্রায় চার মণ রুপা।

রাসূলুল্লাহ (সা.) আবু সুফিয়ান বিন হারবকে গনিমতের এসব মালামালের ওপর তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করেন। তার পরও হাওয়াজিন ও সাকিফ গোত্রদ্বয় মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্থানে জড়ো হয়; কিন্তু সব জায়গায় তারা পরাজিত হয়।

শেষ পর্যন্ত তায়েফের এক মজবুত দুর্গে তারা আশ্রয় গ্রহণ করে। রাসূলুল্লাহ (সা.) ১০ থেকে ২০ দিন এই দুর্গ অবরোধ করে রাখেন। ওরা দুর্গ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে বাণ নিক্ষেপ করতে থাকে। কিন্তু সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার সাহস তাদের ছিল না।

সাহাবায়ে কেরাম বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! এদের বদদু’আ দিন। রাসূলুল্লাহ (সা.) এদের হেদায়েতের জন্য দু’আ করেন। তারপর তিনি সেখান থেকে প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন।

প্রথমে তিনি মক্কা গিয়ে ওমরা পালন, তারপর মদিনা প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। আল্লাহ তা’আলা মহানবী (সা.)-এর দু’আ কবুল করে তাদের হেদায়েত দান করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন জি’রানা নামক স্থানে পৌঁছেন তখন বহু অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করে।

ঐতিহাসিক হুনাইনের যুদ্ধের পর নজিরবিহীন এ ঘটনা সংঘটিত হয়। যুদ্ধের পরই হাওয়াজিন গোত্রের অবশিষ্ট লোকেরা সদলবলে ইসলামের পতাকাতলে শামিল হয়। সত্য, ন্যায় ও হেদায়েতের এই মিছিলে দলনেতা মালিক বিন আউফও যোগ দেন। যুদ্ধের প্রায় ২০ দিন পর এই ঘটনা ঘটে।

ইতিমধ্যেই তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত অর্থ-সম্পদ গনিমত হিসেবে মুসলমানদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হয়। এখানে নতুন সংকট দেখা দেয়, মুসলমান হয়ে যাওয়ার পর তারা তাদের সম্পদের দাবি জানায়।

রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের দুটি বিষয়ের মধ্যে যেকোনো একটি পথ বেছে নিতে বলেন। হয়তো তারা তাদের ওই সম্পদ ফিরিয়ে নিয়ে যাবে অথবা সম্পদের পরিবর্তে তাদের ছয় হাজার যুদ্ধবন্দিকে ফেরত নিয়ে যাবে। তারা তাদের বন্দিদের ফিরিয়ে নিয়ে যেতে সম্মত হয়।

মুজাহিদদের ছাড়াও এই বিপুল সম্পদ থেকে সেসব নওমুসলিমদেরও একটা বিশেষ অংশ দেওয়া হয়, মক্কা বিজয়ের পর যারা মুসলমান হয়েছিল। তাদের অনেককে রাসূলুল্লাহ (সা.) ১০০ করে উট দান করেছেন।

হাওয়াজিন গোত্রের নেতা মালিক বিন আউফকেও ১০০ উট দেওয়া হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁকে নিজ গোত্রের সরদারও বানিয়ে দেন। আগেও তিনি সেই গোত্রের সরদার ছিলেন, তবে সেটা ছিল অমুসলিম হিসেবে। এবার তিনি একই গোত্রের সরদার হয়েছেন মুসলমানদের নেতা হিসেবে (ইবনে কাছীর, তাফসীরে মুনীর)।

অমুসলিমদের দান-সদকা করার বিধান

সদকা শব্দটি সাধারণত দান-অনুদান বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। সেই অর্থে যেকোনো অমুসলিমকে দান করা সমস্ত আলেমের ঐকমত্যে বৈধ।

অমুসলিম প্রতিবেশী আক্রান্ত হলে, তারা বিপদগ্রস্ত হলে মুসলমানদের উচিত তাদের সাহায্যে এগিয়ে যাওয়া।

আর সদকা শব্দটি কখনো যাকাত অর্থেও ব্যবহৃত হয়। এটি অমুসলিমদের দেওয়া যায় না। ইসলামী রাষ্ট্রের অন্যতম অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি।

কেবল যাকাতের ক্ষেত্রে বিধানের স্বাতন্ত্র্য ধরে রাখা হয়েছে, অন্যথায় যেকোনো দান-সদকা, এমনকি ফিতরাও অমুসলিমদের দেওয়া যায়।

এখানে লক্ষণীয় যে যাকাত দিতে হয় বছরে একবার। মুসলিম ধনীদের মধ্যে কারো প্রয়োজন অতিরিক্ত সম্পদ সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপা কিংবা এর অর্থমূল্য পরিমাণ সম্পদ মজুদ থাকলে এবং এর ওপর পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হলে তার ওপর যাকাত ওয়াজিব হয়। এটি ধনীদের সম্পদ থেকে ২.৫ শতাংশ আদায় করতে হয়।

অন্যদিকে সদকা বছরের যেকোনো সময় অনির্দিষ্ট পরিমাণ মুসলিম-অমুসলিম সবাইকে দেওয়া যায়। তাছাড়া সদকা ধনীরা ছাড়াও যে কেউ আদায় করতে পারে।

অমুসলিম ত্মীয়-স্বজনের অধিকার

সমাজবদ্ধভাবে জীবন যাপন করতে গিয়ে নানা শ্রেণির, নানা পেশার, নানা মত ও পথের মানুষের মুখোমুখি হতে হয় । মুখোমুখি হতে হয় অমুসলিমদেরও। অমুসলিম ব্যক্তি হতে পারে কোনো মুসলমানের প্রতিবেশী।

যদি কারো প্রতিবেশী কিংবা কোনো আত্মীয় অমুসলিম হয়, ইসলামের নির্দেশনা হলো “তার সঙ্গেও প্রতিবেশী বা আত্মীয়তার অধিকার রক্ষা করে চলতে হবে।”

আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখার বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, সে যেন তার আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখে।’ (সহীহ বুখারী : হাদীস ৬১৩৮)

পবিত্র কোরআন ও হাদীসে সুস্পষ্ট ভাষায় অমুসলিম হওয়া সত্ত্বেও সম্পর্ক রক্ষা করতে বলা হয়েছে। এক আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলেন,

‘তোমার পিতামাতা যদি এমন কাউকে (প্রভুত্বে) আমার সমকক্ষ সাব্যস্ত করার জন্য তোমাকে চাপ দেয়, যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান (দলিল ও প্রমাণ) নেই, তাদের কথা মানবে না। তবে দুনিয়ায় তাদের সঙ্গে সদাচরণ করো। আর এমন ব্যক্তির পথ অনুসরণ করো, যে একান্তভাবে আমার অভিমুখী হয়েছে। তারপর তোমাদের সবাইকে আমার কাছে ফিরে আসতে হবে। তখন আমি তোমাদের সে বিষয়ে অবহিত করব, যা তোমরা করতে।’ (সূরা লোকমান : ১৫)

হযরত আসমা বিনতে আবি বকর (রা.) থেকে বর্ণিত,

তিনি বলেন, আমার মা আমার কাছে এলেন রাসূলের যুগে মুশরিক অবস্থায়। তখন আমি রাসূল (সা.) থেকে ফাতওয়া জিজ্ঞাসা করে বললাম, আমার মা এসেছেন, তিনি ইসলাম ধর্মবিমুখ। আমি কি তাঁর আত্মীয়তা রক্ষা করব? তখন তিনি বলেন–হ্যাঁ, তাঁর সঙ্গে আত্মীয়তা বজায় রেখো। (বুখারী, হাদীস : ২৬২০)

ইসলামের প্রধান লক্ষ্য মানবতার কল্যাণ। মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যে বৈরী মনোভাব দূর করার জন্য পারস্পরিক লেনদেন, দান-অনুদান বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। মানবতার বাসযোগ্য একটি সুন্দর পৃথিবী উপহার দিতে সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাজ গঠনের বিকল্প নেই।

এফএস/এএসটি

 

বিবিধ: আরও পড়ুন

আরও