ব্যাংকিং খাতে ভাইরাস ঢুকেছে, দরকার এন্টিভাইরাস (ভিডিও)

ঢাকা, রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৮ আশ্বিন ১৪২৫

ব্যাংকিং খাতে ভাইরাস ঢুকেছে, দরকার এন্টিভাইরাস (ভিডিও)

হিমাদ্রী রাহা,চট্টগ্রাম ৩:৩৩ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ০৫, ২০১৮

প্রফেসর ডক্টর সৈয়দ আহসানুল আলম পারভেজ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের চেয়ারম্যান। টানা ত্রিশ বছরের শিক্ষকতা জীবনে তিনি বিভিন্ন ব্যাংক বীমা খাতের গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব পালন করেছেন। সর্বশেষ বেসরকারি ইসলামী ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। বর্তমানে ন্যাশনাল ব্যুরো অফ ইকোনমিক রিসার্চের চেয়ারম্যান।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং খাতের গবেষক প্রফেসর পারভেজ বর্তমান ব্যাংকিং খাত নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। তার সাথে একান্ত আলাপচারিতায় উঠে এসেছে দেশের ব্যাংকিং খাতের নানা দিক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন পরিবর্তন ডটকমের চট্টগ্রাম অফিসের প্রতিবেদক হিমাদ্রী রাহা।

পরিবর্তন ডটকম : বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতা চলছে। এ অবস্থায় ব্যাংকগুলো কোন অবস্থায় আছে বলে আপনি মনে করেন?

প্রফেসর পারভেজ : ব্যাংক খাতের কথা যদি বলতে হয় তবে বলবো, মিস গভর্নেন্স, অব্যবস্থাপনা ও দুর্বৃত্তায়নের কারণে ব্যাংকগুলো ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। ইতোমধ্যে ১৩-১৪টি ব্যাংক ঝুঁকিপূর্ণ বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক (কেন্দ্রীয় ব্যাংক)। ওইসব ব্যাংকগুলো প্রায় তাদের পুঁজি খেয়ে ফেলেছে। এর মধ্যে ফারমার্স ব্যাংক, এনআরবি, সোনালী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক তো ক্যাপিটালই হারিয়ে ফেলেছে।

ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশ্য হিসাবে এক লক্ষ ২৫ হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়ে গেছে। এর মধ্যে আবার যারা বাবার সম্পত্তি মনে করে জনগণের টাকা লোপাট করেছে সেই হিসাবসহ করলে প্রায় দুই লক্ষ কোটি টাকা লোপাট হয়েছে।

পরিবর্তন ডটকম : ব্যাংকিং খাতের এই দুরবস্থার জন্য দায়ী করা?

প্রফেসর পারভেজ : দেখুন ব্যাংকগুলোর এ অবস্থার জন্য কাউকে দোষারোপ করে লাভ নেই। বিষয়টা এখন দোষারোপের ঊর্ধ্বে চলে গেছে। দোষ তখনই দেয়া যায়, মৃদু মৃদু দোষ মৃদু মৃদু সমালোচনা করে যখন তা সংশোধনের পর্যায়ে থাকে। কিন্তু সমস্যাটি এখন এমন পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে যে, এটার সার্জারি দরকার।

একটা ব্যাংকের পুঁজি যখন চলে যাচ্ছে তখন তার জন্য ব্যাংকটির এমডি বা সিইও দায়ী। ব্যাংকের এমডি বা সিইও হয়ে আমি জানবো না ব্যাংকের টাকা কোথায়, কে আত্মসাৎ করলো তা তো হতে পারে না। সমস্যা হচ্ছে ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিরা দুর্নীতি ও রাজনীতি; এই দুই নীতির কাছে পরাজিত।

পরিবর্তন ডটকম : ব্যাংক খাতের এ দুরবস্থার জন্য অনেকে রাজনীতিবিদরা দায়ী করেন- আপনি কি মনে করেন?

প্রফেসর পারভেজ : ইংরেজীতে দুটি কথা আছে-system corrupts system এবং In every system there is an built in self destructive system. এই দুর্নীতি এবং আত্মঘাতী নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া থেকে ব্যাংকগুলোতে বের হতে হবে।

দেখুন অনেকেই রাজনীতিবিদদের দিকে আঙুল তোলেন। বিশ্বাস করুন, আমি যখন রূপালী ব্যাংকে ছিলাম কোনো রাজনীতিবিদ আমাকে ফোন করেনি। আমি যখন ইসলামী ব্যাংকে ছিলাম কোনো রাজনীতিবিদ আমাকে ফোন করেনি। ব্যাংকের কিছু অসাধু কর্মকর্তারাই নিজের পকেট ভারী করার জন্য রাজনীতিবিদদের নাম জড়িয়ে দেয়।

লোনের ক্ষেত্রে ৩% সিস্টেম একটা প্রথা হয়ে গেছে। আপনি ১০০ কোটি টাকা লোন নেবেন? তো তিন কোটি টাকা কর্মকর্তাদের দিন। আপনার লোন পাস হয়ে যাবে। কোনো কোনো জায়গায় ২৫% পর্যন্ত নিয়ে এমডি ও চেয়ারম্যানদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে থাকে। এই ধরনের সীমাহীন লোনের সিস্টেম এখন আর দায়বদ্ধতার জায়গায় নেই। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, এই ধরনের সমস্যাগুলো এখন আর একটি দুইটি ব্যাংকের নয়। দেশের ৫৭টি ব্যাংকেরই একই অবস্থা। এখনই সিদ্ধান্ত না নিলে অবস্থা আরো খারাপ হতে পারে। বলা যায় দেশের ব্যাংকিং সিস্টেমে ভাইরাস ঢুকেছে। দরকার এন্টিভাইরাস। এই ভাইরাস নির্মূলে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

পরিবর্তন ডটকম : ঋণখেলাপী বাড়ার কারণ কি?

প্রফেসর পারভেজ : ওই যে বললাম ভাইরাস! ভাইরাস ঢুকেছে ব্যাংকিং সিস্টেমে। ২%, ৩% লেফট-রাইট হিসাব করেই তো কুঋণ দেয়া হচ্ছে। তার ফলাফল তো এখন দৃশ্যমান।

দেখুন টাকা এমন একটা জিনিস যা চরিত্রকেও নষ্ট করে। স্বাধীনতার পর থেকেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বেগবান ছিলো। কিন্ত এখন সেই চেতনার প্রতিফলন কতটুকু?

আবার ব্যাংকের টাকা যারা ফেরত দিচ্ছে না তাদের মধ্যে সবাই অপরাধী নয়। পদ্মার পাড়ে আপনি ফ্যাক্টরি করলেন, কক্সবাজারে আপনি লবন চাষ করলেন, বন্যায় সব ধ্বংস হয়ে গেল। তখন সেখানের টাকা তো আর ফেরত আসবে না। এগুলোকে আমরা ডিসট্রেস কেইস বলি। এক্ষেত্রে ব্যাংকের উচিত এসব ব্যবসায়ীদের আবার তুলে দেওয়া। এরপর লোনের টাকা তুলে আনা। এমনও ঘটেছে ব্যাংকের লোনের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে মারা গেছেন আমার ছোটবেলার এক বন্ধুর বাবা।

কথায় আছে আপনি সবকিছু লোপাট করলেও ব্যাংকের টাকা কখনো লোপাট করতে পারবেন না। কিন্তু সে সংজ্ঞা এখন পাল্টে গেছে। ব্যাংকের টাকাই লোপাট হচ্ছে সহজে। ব্যাংকের টাকা নিলে দিতে হয় না। এক ধরনের একটি কালচার দাঁড়িয়ে গেছে। এ যেন ‘সরকার কা মাল দরিয়ামে ঢাল’।

যদি বলি রোগ সংক্রামক নাকি গুণ সংক্রামক? উত্তর হবে রোগ। আমার চর্মরোগ আছে। আমি যদি আপনাকে স্পর্শ করি আপনার শরীরে চর্মরোগের জীবাণু প্রবেশ করবে। কিন্তু আমার ভালো গুণসমূহ প্রবেশ করবে না।

পরিবর্তন ডটকম : দায়ী ব্যক্তিদের কি শাস্তি হওয়া উচিত?

প্রফেসর পারভেজ : ভিয়েতনামে যেমন পুঁজি হারানোর দায়ে ব্যাংকের সর্বোচ্চ কর্মকর্তাদের ফাঁসি দেয়া হয়েছিলো তেমনি এদেশেও সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান করা উচিত।

পরিবর্তন ডটকম : অনেকগুলো নতুন ব্যাংক তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে। আরো ব্যাংক আসবে। এর প্রভাব কেমন হবে?

প্রফেসর পারভেজ : দেখুন দেশে এখন ১২টা ব্যাংক এলেও কোনো সমস্যা নয়। কিন্তু সমস্যা হলো ব্যাংকগুলো যেন গুটিকয়েক ব্যক্তির হয়ে না যায়। তাদের মাথায় রাখতে হবে তাদের আগেও ৫৭টি ব্যাংক রয়েছে। তাদের সাথেই পাল্লা দিতে হবে। ব্যাংকাররা এখন যার টাকা আছে তাদের কাছে যায়। তেলে মাথায় তেল দেয়। মনে রাখতে হবে টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া ১৬ কোটি মানুষের সবার কিন্তু ব্যাংক একাউন্ট নেই।

ধরুন কক্সবাজারের পর্যটন শিল্পকে কেন্দ্র করে তার বিকাশের জন্য পর্যটন উন্নয়নভিত্তিক ব্যাংক স্থাপন করা যেতে পারে। পার্বত্য এলাকার উন্নয়নে পাবর্ত্য উন্নয়ন ব্যাংক করা যেতে পারে। এভাবে দেশের সম্ভাবনাময় স্থানে যদি জনমুখী ব্যাংক করা যায় তবে নতুন এক ডজন ব্যাংক আসলেও কোনো অসুবিধা হবে না। কিন্তু তারা যদি গলায় ফিতা ঝুলিয়ে আবারো আমার আর আপনার কাছেই এফডিআর’র জন্য আসে তবে ব্যাংকগুলোর ভরাডুবি অবশ্যম্ভাবী। আমেরিকাতে এক স্টেটে যে ব্যাংক আছে অন্য স্টেটে সে ব্যাংক নেই। কিন্তু তাদের মধ্যে অনলাইন কানেকটিভিটি আছে। এমনটা এখানেও দরকার।

পরিবর্তন ডটকম : বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান লোন পাচ্ছে, কিন্তু ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা লোন পাচ্ছে না। এধরনের লোন বৈষম্য কেন?

প্রফেসর পারভেজ : দেখুন বিষয়টি হচ্ছে তেলে মাথায় তেল দেওয়া। যা আগেও বলেছি। ব্যাংক ঋণ তিন ধরনের- ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় ঋণ। প্রতিক্ষেত্রেই বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ৩০% করে দেয়া উচিত। বাকি ১০% নারীদের জন্য। কিন্তু ব্যাংকগুলো কি করছে নিয়মবহির্ভূতভাবে শুধু বড় লোন দিচ্ছে। বেসিক ব্যাংকের ৩৫০০ কোটি টাকার ৮০% তো ২২টি পরিবারই শেষ করেছে। এই যেখানে অবস্থা, সেখানে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উঠে আসার সুযোগ কোথায়? তাই যা হওয়ার তাই হচ্ছে।

পরিবর্তন ডটকম : ব্যাংকিং খাতের এই দুরবস্থায় আপনি কতটুক আশাবাদী

প্রফেসর পারভেজ : ব্যাংকিং সেক্টরটাও এখন দুর্নীতি নামক জীবাণুতে ভরা। তবে আশার কথা হলো বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশের হাল ধরেছেন। অনেক বাধা বিপত্তি ঠেলে দেশকে সামনের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। এরই ধারাবাহিকতায় ব্যাংকগুলোও দুর্নীতি কাটিয়ে আবারো উঠে দাঁড়াবে। সেই সুদিন হয়তো সামনে আসবে।

পরিবর্তন ডটকম : আপনার দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে দেশের অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাতের পট পরিবর্তন কেমন দেখছেন?

প্রফেসর পারভেজ : দেশের অর্থনীতি অনেক দূর এগিয়ে গেছে। রেমিটেন্স, পোশাকশিল্প, কৃষিখাত, এসডিজি, সময়ের আগেই এমডিজি অর্জন সবমিলিয়ে আমরা অনেক অগ্রগতি করেছি। কিন্তু এসবের অগ্রগতির মধু নষ্ট করে দিচ্ছে ব্যাংকের পিঁপড়ারা। এসব রুখতে হবে সময় থাকতে। নয়তো আমাদের সকল অর্থনৈতিক অর্জন নষ্ট হবে দ্রুত। সবশেষ একটা কথাই বলবো সুষম ব্যাংকিং প্রথা চালু না হলে বৈষম্যহীন সুষম সমাজ গঠন সম্ভব নয়।

পরিবর্তন ডটকম : এতক্ষণ সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ

প্রফেসর পারভেজ : আপনাকেও ধন্যবাদ

এইচআর/এসবি