‘বেঁচে থাকব ভাবিনি’

ঢাকা, শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯ | ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

‘বেঁচে থাকব ভাবিনি’

সালাহ উদ্দিন জসিম ৫:০১ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২০, ২০১৯

‘বেঁচে থাকব ভাবিনি’

কাউয়া, হাইব্রিড বা অনুপ্রবেশের সঙ্গে তখনও পরিচিত হয়নি আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনগুলো। সেটা ছিল ২০০১ পরবর্তী সময়ের কথা। তখন আওয়ামী লীগ করা ছিল ‘পাপ’। ক্ষমতার স্বাদ বা ক্রিম তখন বিএনপি-জামায়াত চার দলীয় জোটে।

উচ্ছিষ্ট ভোগীরাও তখন সেদিকেই। ছাত্রদেরও মোহ ছিল ছাত্রদল-শিবিরে। ছাত্রলীগের নাম নিলেই ঘোর অমানিশা নেমে আসতো ক্যাম্পাস জীবনে।

নিজের জীবন ও ক্যারিয়ারকে বাজি রেখে খুব কম লোকই ছাত্রলীগ করতো। যারা করতো তারা আবার চারদলীয় জোট সরকার ও তাদের দলীয় ক্যাডার অথবা দোসরদের নির্যাতনের পরাকাষ্টা সহ্য করে নানা পরীক্ষা দিয়ে খাঁটি সোনা হিসেবে নিজেকে পরিচিত করিয়েছেন, এই খাঁটি সোনা আবার সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ক্যাম্পাসে নিপীড়নেও পরীক্ষিত। যার কারণে সেসময়কার ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ধরা হয় আদর্শিক কর্মী হিসেবে।

তাদেরই একজন ইকবাল মাহমুদ বাবলু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ছাত্র ছিলেন তিনি। ২০০১ সালের পহেলা অক্টোবরের নির্বাচনের সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জহুরুল হক হল ছাত্রলীগের দপ্তর সম্পাদক। ২০০২ সালে সংকটের সময় একই হলের সাধারণ সম্পাদক হন। নানা নির্যাতন সয়েও হাল ছাড়েন নি, আদর্শিক পতাকা হাতে এগিয়ে গেছেন। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকও হয়েছেন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে শেখ হাসিনা মুক্তি আন্দোলনের এই অগ্রসেনানী বর্তমানে আওয়ামী যুবলীগের প্রচার সম্পাদক। উপ-গ্রন্থণা ও প্রকাশনা সম্পদকের দায়িত্বও পালন করেছেন। বৈরি পরিবেশে নিভৃতচারী সেই নেতার রাজনীতির গল্প শুনবো-

‘আল্লাহর অশেষ রহমতে এখনো বেঁচে আছি। কখনো ভাবিনি বেঁচে থাকব, আজও আমাদের প্রাণপ্রিয় নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একজন বিশ্বস্ত সৈনিক হিসেবে কাজ করতে পারছি। এখনো সেই রাতের দুর্বিষহ ঘটনা মনে পড়লে চোখ ভিজে আসে। রাতে ঘুমাতে পারি না, মাঝে মাঝে স্বপ্ন দেখে আঁতকে উঠি। চোখে ভেসে ওঠে সেই রাতের ভয়াবহ চিত্র।’ আলোচনার শুরুর কথাগুলো ছিল এরকমই।

কী এমন ভয়াবহ ঘটনা? কেমন সেই বিভীষিকা? আজকের নতুন রাজনীতে আসাদের প্রশ্ন হতেই পারে। জবাবে বললেন, ‘সেটি ২০০২ সালের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা। হলে ছাত্রদল হামলা চালায়। আমি তখন হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। মারতে মারতে দোতলা থেকে ফেলে দেয়। ওরা ভেবেছে মরে গেছি। আমিও বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। পরে আল্লাহর রহমতে বেঁচে গেছি। কেউ ভাবেনি, বাবলু বাঁচবে!’

ইকবাল মাহমুদ বাবলু বলেন, ‘আমাদের ছাত্র রাজনীতি আর এখনকার রাজনীতি আকাশ-পাতাল পার্থক্য।’

হাসতে হাসতে বললেন, ‘দল ক্ষমতায়- এখনকার রাজনীতি তো গ্রামের ডাঙ্গুলি খেলার মতো সহজ। ’

নিজের রাজনীতির গল্প বলতে গিয়ে এই যুবনেতা বলেন, ‘২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন। পহেলা অক্টোবরের সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হয়। ক্ষমতায় আসে বিএনপি সরকার। নির্বাচনের দিনগত রাতে যখন বিএনপি আওয়ামী লীগের চেয়ে অনেক ভোটে এগিয়ে ঠিক তখনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪টি হলের ছাত্রলীগের বেশিরভাগ নেতাকর্মী ভয়ে পালিয়ে যায়। বিএনপি ক্ষমতায় আসে। শুরু হয় এক বিভীষিকাময় মুহূর্ত। সেই মুহূর্তে ছাত্রদল নেতাকর্মীদের অত্যাচারের ভয়ে ছাত্রলীগের কেউ আর প্রতিবাদ করেনি। আর যারা করেছে, তাদের মধ্যে অনেক কর্মী জীবন বাঁচাতে জহুরুল হক হলে আশ্রয় নেয়। কারণ তখন জহরুল হক হলে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের একটা শক্ত অবস্থান ছিলো।’

‘১৩ নভেম্বর, তখন আমি জহরুল হক হলের দপ্তর সম্পাদক ছিলাম। হঠাৎ করে জোরপূর্বক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. একে আজাদ চৌধুরীকে অপসারণ করে রাতারাতি আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরীকে ভিসি হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়। তারপর থেকেই শুরু হয় হল দখলের রাজনীতি। একে একে হলগুলো দখল করা শুরু করে ছাত্রদল নেতাকর্মীরা।’ জানান ইকবাল মাহমুদ বাবলু।

তিনি বলেন, ‘হল দখলের প্রথম প্রস্তুতি হিসেবে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা জগন্নাথ হলে আক্রমণ করে। সেদিন ওই হলে বৃষ্টির মতো গুলি করে ছাত্রদলের ক্যাডাররা। অনেক ছাত্রলীগ নেতাকর্মী সেদিন আহত হয়। তারপর জহুরুল হক হল দখল করার জন্য হামলা চালায়। সেই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মুস্তাফিজুল ইসলাম মামুন ও নাসির উদ্দিন পিন্টুর নেতৃত্বে ছাত্রদলের ক্যাডার বাহিনী আমাদের হল দখলের জন্য আক্রমণ করে।’

‘সারাটা দিন এক ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে ছাত্রদলের ক্যাডার বাহিনী। কিন্তু হল ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি মইনুদ্দিন বাবু ভাইয়ের নেতৃত্বে আমাদের ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের একটা শক্ত অবস্থান থাকায় সারাদিন হামলা করেও হল দখল করতে পারে নি। সেদিন সন্ধ্যায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ঘেরাও করে আমাদের হল। পরবর্তীতে আমরা হল ছাড়তে বাধ্য হই।’

ছাত্র রাজনীতির এ গল্পের পরিক্রমায় তিনি জানান, ‘২০০২ সালে জহুরুল হক হল ছাত্রলীগের সম্মেলন হয়। সেই সম্মেলনে আমি হলের সাধারণ সম্পাদক হই। তারপর আমরা আবার ছাত্রলীগকে সংঘঠিত করি। আগে ছাত্রলীগের যে অবস্থান ছিল সেই অবস্থানে আবার ফিরে আসি। যখন আমাদের একটা শক্ত অবস্থান তৈরি হয়, তখনই ছাত্রদল এবং শিবিরের নেতাকর্মীরা আমাদের প্রতি রুষ্ট হয়। সেখান থেকেই বিভিন্ন প্রোগ্রাম নিয়ে ছাত্রদল নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। তখন ছাত্রদলের সভাপতি ছিল তানজিল।’

‘হঠাৎ একদিন ছাত্রদল সভাপতির নেতৃত্বে ছাত্রদল ও শিবির নেতাকর্মীদের সমন্বয়ে আমাদের অ্যাটাক করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। কিন্তু আমরা বুঝতে পারিনি আমাদের ওপর অ্যাটাক হবে। ২০০৩ সালের ৩১ জুলাই। রাত তখন ১টা। ঠিক ওই মুহূর্তে অতর্কিত আমাদের জহুরুল হক হলে হামলা চালায় তারা। প্রথমে তৎকালীন ডেইলি স্টারের সাংবাদিক এবং জহুরুল হক হল ছাত্রলীগের ক্রীড়া সম্পাদক হাসান জাহিদ তুষারের ওপর হামলা চালায় (যিনি বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি)। তারপর ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালায়। এতে ছাত্রলীগের মিজান, মিঠু, রাজীব, তুহিন, ফরহাদ, জুয়েল, মফিজসহ অনেক নেতাকর্মী আহত হয়।’

তিনি বলেন, ‘সে রাত্রে আমি দ্বিতীয় তলার মাঝামাঝি আমার বন্ধুর রুমে ফাইনাল পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে আলাপ করছিলাম। যেহেতু আমি অন্যরুমে ছিলাম, তাই তখন আমি একা। কারণ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সবাই একদিকে ছিল আর আমি একদিকে। সেদিন রাতে ছাত্রদল নেতাকর্মীরা আমাকে এমনভাবে মারে যা বলে প্রকাশ করতে পারবো না। মারতে মারতে আমাকে দোতলা থেকে নিচে ফেলে দেয়। তারা মনে করেছে আমি মরে গেছি। আমিও বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম।’

‘পরে শুনেছি, হলের দুজন কর্মচারী আমাকে নিয়ে হলসংলগ্ন জহুরুল হক হলের সবেক সভাপতি মাইনুদ্দিন বাবু ভাইয়ের বাসায় যায়। তারপর অচেতন অবস্থায়ই আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। যখন জ্ঞান ফিরে, তখন আমি এলিফ্যান্ট রোডের জেনারেল হাসপাতালের বেডে। আমাকে এমনভাবে মেরে ফেলে দেয়, কেউ ভাবেনি আমি বেঁচে থাকবো। আল্লাহর অশেষ রহমতে বেঁচে গেছি।’

‘সেদিন সকালে আমাদের প্রাণপ্রিয় নেত্রী তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও দলের সিনিয়র নেতারা আমাকে দেখতে আসেন। তারপর সুস্থ হয়ে আবারো দলের পাশে থেকে রাজনীতি শুরু করি। দলের দুঃসময়ে থেকে শুরু করে শেখ হাসিনার হাতকে আরো শক্তিশালী করার লক্ষ্যে কাজ শুরু করি।’

এখন রাজনীতি নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলেন। অনুপ্রবেশ বা বিতর্কের বিষয় সামনে এসেছে। এনিয়ে আপনার কোনো আক্ষেপ আছে কীনা? জবাবে ইকবাল মাহমুদ বাবলু বলেন, ‘ফুলের সৌরভ সবাই নিতে চায়। ফুলের মৌ, মাছিতো নেবেই। সেরকমভাবে আওয়ামী লীগ এখন ক্ষমতায়, যে কেউ সুবিধা নিতে চাইবে বা চায় অথবা নেয়ও। এটা হওয়াই স্বাভাবিক। এতে আমাদের কষ্ট নেই। কষ্ট লাগে তখন, যখন দেখি সংগঠনের বড় পদেও ওই সুবিধাভোগীরা। আর দুঃসময়ের ত্যাগিরা অভিমানে দূরে।’ 

সামনে যুবলীগের সম্মেলন, আপনি তো সংগঠনটির প্রচার সম্পাদক, এ সম্মেলন ঘিরে আপনার কোনো প্রত্যাশা আছে কীনা? ‘প্রত্যাশা তো থাকেই। বিরোধীদলে, সেনা সমর্থিত সরকারে তারপর এখন। সব সময়ই দলের সঙ্গে ছিলাম।’

‘আমাকে আমার নেত্রী যে পদেই রাখেন না কেনো, এই দলেই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবো। পদের জন্য রাজনীতি করি না, ত্যাগের জন্যই রাজনীতি করি।’ জানালেন এই ত্যাগী নেতা।

এসইউজে/এইচআর

 

পরিবর্তন বিশেষ: আরও পড়ুন

আরও