আমি আর লিখতে পারছি না: কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন

ঢাকা, বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯ | ২৯ কার্তিক ১৪২৬

আমি আর লিখতে পারছি না: কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন

সীমান্ত বাঁধন চৌধুরী  ৬:২৫ অপরাহ্ণ, মে ০১, ২০১৯

আমি আর লিখতে পারছি না: কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন

প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন। পঞ্চাশের দশকে মুসলিম নারীদের জীবন যখন অনেক বিধি- নিষেধের বেড়াজালে বন্দি, সেই সময় তিনি আত্মপ্রকাশ করেন একজন লেখক হিসেবে। স্বাধীনতার আগে একজন নারী যেখানে ঘরের বাইরে যাবার কথাই ভাবতে পারতেন না, সেই সময় রক্ষণশীল সমাজে জন্মেও নারীর অবরুদ্ধতার অবসান ঘটিয়ে মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিলেন রাবেয়া খাতুন। সমাজ সংস্কারের লক্ষ্যে অল্প বয়সেই লেখনীর সূচনা ঘটান, সাহিত্য-অঙ্গনে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন নিজের অবস্থান। কর্মজীবনে তিনি লেখালেখির পাশাপাশি সিনেমা, ‘খাওয়াতীন’ ও ‘অঙ্গনা’ পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেছেন। এসব নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন অনলাইন নিউজ পোর্টাল পরিবর্তন ডটকম এর সঙ্গে। সাক্ষাতকার নিয়েছেন সীমান্ত বাঁধন চৌধুরী 

(রাবেয়া খাতুনের জন্ম ১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর তকালীন ঢাকা জেলার বিক্রমপুরে মামার বাড়ি পাউসার গ্রামে। তার পৈতৃক বাড়ি শ্রীনগর থানার ষোলঘর গ্রামে। বাবা মৌলভী মোহাম্মদ মুল্লুক চাঁদ ও মা হামিদা খাতুন। ১৯৫২ সালের ২৩ জুলাই সম্পাদক ও চিত্র পরিচালক এটিএম ফজলুল হকের সাথে রাবেয়া খাতুনের বিয়ে হয়। ফরিদুর রেজা সাগর, কেকা ফেরদৌসী, ফরহাদুর রেজা প্রবাল ও ফারহানা কাকলী এ চার সন্তানের জননী রাবেয়া খাতুন।)

লেখালেখি শুরু করেছিলেন কবে থেকে, কেমন ছিল শুরুটা?

ছোটবেলা। বয়স তখন ১২/১৩ হবে। স্কুলে পড়তাম। ছোট গল্প কি, কাকে ছোট গল্প বলে তখনও আমার জানা নেই। আমার ধারণা ছিল লেখা ছোট হলেই সেটা ছোটগল্প। প্রথমদিকে পড়ে পড়ে ছোট গল্পের কিছুটা আন্দাজ করতে পেরে গল্প লিখে বিভিন্ন পত্রিকায় ডাকযোগে পাঠাতাম। আর আমার ছোট বোন সুফিয়া সে-ই আমার পাঠক। সে আবার ছবি আঁকতো। সে-ই আমার সবকিছু। আজকে যেখানে এসেছি, এর প্রথম ভিতটা সে না হলে হতো না। কেন না বাবা, মা, ভাই, বোন সবার হাতের লেখা খুব সুন্দর ছিল। শুধু আমার হাতের লেখা খুব বাজে ছিল। তখনো যা ছিল এখনো তা-ই আছে। তো আমি লিখতাম ঠিকই, তবে আমি বুঝতাম এই লেখা কেউ পড়তে পারবে না। সুফিয়ার হাতের লেখা ছিল খুবই চমৎকার। কাজেই আমি গল্প লিখতাম সুফিয়া সেগুলো কপি করে দিতো। আর সুফিয়ার পরে আমার একটা ছোটভাই ছিল, সে ‘মাহেনও’, ‘দিলরুবা’সহ অন্যান্য পত্রিকায় লেখা নিয়ে যেত। সরকারি পত্রিকা মাহেনও’র  অফিস তখন শান্তিনগরে। গোলাম মোস্তফা সাহেব তখন একটা পত্রিকা বের করতেন। ততদিনে দেশ স্বাধীন হয় এবং আমরা পুরান ঢাকার বাসা ছেড়ে শান্তিনগরে চলে আসি। আমার গল্পের বই পড়া নেশা ছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, পাড়ায় কোনো মুসলমান ঘরে বই নাই। একমাত্র গোলাম মোস্তফা সাহেবের বাড়ি ছাড়া।  আলাপ হয় গোলাম মোস্তফা সাহেবের পরিবারের সাথে। আসলে শুরু এখান থেকেই। তখন পত্রিকায় লেখার নিয়ম ছিল যে, আপনার লেখা যদি তিন মাসের মধ্যে ছাপা না হয়, ধরে নেবেন আর ছাপা হবে না। লেখা ছাপা না হওয়ার এ অভিজ্ঞতা আমার বেশি হয় নাই।   

   

কথা সাহিত্যে আসার নির্দিষ্ট কোনো কারণ ছিল কি? 

হ্যাঁ। বাবার কাছে, বড় আপার কাছে এবং আমার এক ভাইয়ের কাছে অনেক গল্প শুনতাম। সব বাচ্চাই গল্প ভালবাসে। কিন্তু আমার গল্প শোনা ছিল নেশার মত। গল্প শুনতে খুব ভালবাসতাম। আমার বড় বোন আশ্চর্য রকম মেধাবি ছিলেন বলতে হয়। যিনি খুব ভাল গল্প বলতে পারতেন। বড় বোনের কাছে শুনতাম, আর আমার চাচাতো ভাই আব্দুল মজিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম হলে থেকে এমএ পড়তেন তখন। আর আমার বাবার যে ছোট ভাই, সেও তখন ডাক্তারি পড়তেন। পরিবারের মেয়েরা ছাড়া সবাই স্কুল কলেজে পড়তেন। মেয়েরা পড়াশোনা করবে, তখন তেমন কোন চল ছিল না। কিন্তু আমার ছোট ফুপি তার ভাইদের কাছ থেকে দেখে দেখে বাংলা শিখে ফেলল। বাংলা পড়তে পারতেন। আর আমার বড় বোন এর কাছ থেকে ওর কাছ থেকে শুনে শুনে বই পড়া শিখে ফেললেন। বড় বোন চিঠি লিখতেন, কি যে সুন্দর ভাষা! তিনিও প্রচুর গল্পের বই পড়তেন। প্রতি শনিবার আমাদের বাসায় আসতেন। রোববারে হলে ফিরে যেতেন। আর রাতের বেলা গল্পের আসর বসতো। ওই আব্দুল মজিদ ভাই বাসায় এলেই মা, খালা, চাচী, আপা এরা সব বসে যেতেন তার মুখে গল্প শোনার জন্য। আগে থেকেই বলা হতো বাচ্চারা যেন ওখানে না যায়। খাওয়া দাওয়া হলে প্রত্যেককে বিছানায় পাঠিয়ে দেয়া হতো। কিন্তু আমি উঠে আসতাম। অনাহুত  অতিথির মত এসে দরজার বাইরে চুপ করে বসে থাকতাম। সবাই আমাকে সরিয়ে দেয়ার জন্য তাড়া দিতো, কিন্তু আমাকে নড়াতে পারতো না। মজিদ ভাইয়ের গল্পের মধ্যে নৌকাডুবি ছিল, ছিল সেক্সপিয়ার, কখনও রবিঠাকুর, শরৎচন্দ্রের গল্প শোনাতেন আমাদের মজিদ ভাই। আমাদের বোঝার মত করেই তিনি বলতেন, আর মন্ত্রমুগ্ধের মতো এই গল্পগুলো শুনতাম তখন। এভাবেই মজিদ ভাইয়ের মুখে দেশ বিদেশের নানান গল্প শুনে শুনে বড় হতে শুরু করলাম। একসময় দেখলাম আমি স্কুলের বই ছাড়াও বাইরের বই অনেক পড়ে ফেলেছি। তখনি নৌকাডুবি, রামের সুমতি পড়তে ভাল লাগতো। পরবর্তীতে বড় হয়ে অধিকাংশ বই হাতে নিয়েই দেখতাম, আরে! এই গল্প তো আমার জানা। তখন মজিদ ভাইয়ের কথা মনে পড়তো।

আমাদের পরিবারে আরো একজন আমাকে গল্প শোনাত। তিনি আমার বড় বোন নূরজাহান বেগম। তিনি হাত পা নেড়ে নেড়ে সুন্দর করে রূপকথার গল্প শোনাতেন। তিনি শুধু গল্প নয়, চমৎকার কাপড়ের পুতুল বানাতে পারতেন। আমি সেই পুতুলগুলো দিয়ে ছোট ছোট গল্প বানাতাম। আপা আরো একটি কাজ করতেন। সুইসুতা দিয়ে চমৎকার দৃশ্য তৈরি করতেন। সেকালে এসব দেয়ালে শোভা পেতো। প্রকৃতির এই ছবিগুলো, এই হস্তশিল্পের ছবিগুলো আমাকে গল্প লেখায় সাহায্য করতো। মনে মনে ভাবতাম বড় হয়ে আমি মজিদ ভাই ও নূরজাহানের মতো অন্য মানুষকে লিখে গল্প শোনাব। এভাবেই বাংলা সাহিত্যের প্রতি একটা অনুরাগ জন্মে। কিন্তু কি হবে এই অনুরাগ দিয়ে আমরা কেউ জানতাম না।

এই যে বললেন জানতেন না লেখালেখি করে কি হবে, তারপর লেখক হলেন কি করে?

ওটাই বলছি। মাও মাঝে মাঝে প্রশ্ন করতেন, কি হবে লেখালেখি করে? তো এই কি হবে তা মাও জানেন না আমিও জানি না। এ থেকে বই ছাপা হবে, বই বিক্রি হবে এসব কিছুই জানতাম না। লিখি আর লিখি। শুধু আমার ছোট বোন সুফিয়া বলতো এগুলো লিখে পত্রিকায় পাঠান। এরকম দুটা চারটা করে গল্প লিখে পাঠাতে লাগলাম। একদিন দেখি আশ্চর্যের বিষয়! পিয়ন ডাকছে। টাকা এসেছে আমার নামে। বাড়িতে সবাই অবাক। আমার নামে কে টাকা পাঠাবে! আর লিখে যে টাকা পাওয়া যায় আমরা জানতাম না। পিয়ন ডাকছে, আমি এলাম। পিয়ন আমাকে দশ টাকার একটি নোট দিলো। এটা করাচী থেকে এসেছে। পত্রিকার নাম ছিল মাহেনও। ওরা নতুন লেখককে টাকা দিতো। এ খবর জানতাম না। তো প্রথম টাকা পেলাম ওই।

শুরুর লেখালেখিগুলো কেমন ছিল?

কাঁচা হাতের লেখা ছিল। গল্প মনে আসতো, কিন্তু কিভাবে সাজিয়ে লিখতে হয় তা বুঝতাম না। আন্দাজ করে করে লিখতাম। এজন্য তখনকার কয়েকটা উপন্যাস যেমন, নিরাশ্রয়া, বিদায় ও অশোকা রেবা অপ্রকাশিতই রয়ে গেছে।  

প্রথম উপন্যাসের নাম মধুমতি। মধুমতি নামকরণ কেন হলো?  আর প্ল্যাটফর্মটা কেন বেছে নিয়েছিলেন?

ধলেশ্বরী নদী অনেক পরে হয়েছে। মধুমতি নদীর গা ঘেঁষে আমাদের বাড়ি। মধুমতি নদীর নাম থেকেই মূলত প্রথম উপন্যাসের নাম রেখেছিলাম মধুমতি। তাঁতি সম্প্রদায়ের জীবন সংকট এবং মধ্যবিত্তের জীবন-অস্তিত্ব ছিল এই উপন্যাসের মূল বিষয়। আমার দাদা ছিলেন কবিরাজ। গ্রামে লোকজনের অসুখবিসুখ হলে মুসলমানরা তাকেই ডাকতো। বিশেষ করে মেয়েদের অসুখবিসুখ। মুসলমান চিকিৎসক তিনিই প্রথম। ষোলঘর কাজিবাড়ি নামকরা। তারা তখন হিন্দিও বলতো আবার বাংলাও বলতো। কাজিবাড়ির নামডাক থাকলেও প্রথম পড়াশোনাটা ঐ গ্রামে আসে আমাদের বাড়ি থেকে।  হিন্দুরা কিন্তু তখনই পড়াশোনা করতো। তো একটা স্কুল ছিল পুণ্ডুরীর স্কুল। এক হিন্দু মহিলার নাম পুণ্ডুরী। শুনে অবাক হই, শিক্ষার প্রতি কি ভালবাসা। বিধবা মহিলা নিজ বাড়ির উঠানে পাড়ার ছেলেমেয়েদের বসিয়ে পড়াতো। বাবা তাকে ডাকতো পুণ্ডুরী মা। দাদা ওখান থেকেই পড়াশোনা শিখেছেন। তারপর তার হিন্দু বন্ধুরা ছিল তাদের কাছ থেকেও শিখেছেন। দাদা ইংরেজি জানতেন না কিন্তু ভাল বাংলা জানতেন। এক ভদ্রলোক তার বাড়ির উঠানে এমনি এমনি পড়াতেন পাড়ার ছেলেপেলে। সেখান থেকেই বাবা কাকাদের অ আ ক খ শুরু। ভাবতে অবাক লাগে, তখনকার ষোলঘর সেতো একটা এঁদো পাড়াগ্রাম। তখন ষোলঘর হাই স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন একজন খাস ইংরেজ। এমনিই বিদ্যা দান করতেন। বাবা কাকারা ওখান থেকে ম্যাট্রিক পাস করে তখন গ্রামের প্রথম শিক্ষিত ব্যক্তি। গ্রামের লোকেরা দেখতে আসতো তাদের। এরপর বাবা আর কাকা জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হলেন। দাদার তেমন ইনকাম সোর্স ছিল না কিন্তু প্রচুর জমিজমা ছিল। তা বিক্রি করে করে দুই ছেলেকে আইএ পাস করানোর পরে দাদা সাফ  জানিয়ে দিলেন, আমার পক্ষে আর কুলাতে পারছি না এবার তোমরা তোমাদের ব্যবস্থা করে নাও।  তখন কাকা পুলিশের চাকরি নিল।

যে কথা বলছিলাম, মধুমতি উপন্যাসে এই প্লাটফর্মটা এসেছিল যেভাবে তা হচ্ছে, আমি ছোটবেলা থেকেই বাইরে বের হতে পছন্দ করি। মুসলমান পরিবারের বিশেষ করে মহিলাদের চিকিৎসার জন্য দাদাকে যেতে হতো। কারণ অন্য কবিরাজরা হিন্দু। আর রোগী মশারির ভেতর থাকতো, দাদা বাইরে থেকে চিকিৎসা দিতেন। তো আমার দাদা যখন বিভিন্ন বাড়িতে রোগী দেখতে যেতেন, প্রত্যেকদিন আমি পিছে পিছে দৌড়াতাম। তো ওসব বাড়িতে ঘুরে ঘুরে দেখতাম,  বাড়ির ছেলেমেয়ে ছোটবড় সবাই কাজ করছে, দেখে খুব ভাল লাগতো। এসব আমাকে খুব টানতো। এরপর রঙিন সুতা, তাঁত ঘুরছে দেখে ভাল লাগতো। এখান থেকে ভাল লাগা শুরু। এসব দেখতে দেখতে যখন একটু বড় হলাম, তখন কেন মনে হলো যে প্রেমের গল্প এগুলো না লিখে সমাজকে নিয়ে লেখা দরকার। তখন সাগর হয়েছে। সাগরকে নিয়ে আর আমার ছোট ভাইকে নিয়ে গ্রামে যেতাম। তখন গ্রামের লোক খুব হাসাহাসি করতো। বলতো, তারা তো সাংবাদিক বুঝছ! কি যেন একটা গণ্ডগোলে আইয়ুব খাঁন তাঁতি সম্প্রদায়ের এই সুতাটা বন্ধ করে দেয়। ওটা নিয়ে খুব লেখালেখি হয়। আমি খবরগুলো কাঁচি দিয়ে কেটে কেটে রেখে দিতাম। তখন মনে হলো, এটার মধ্যে গল্পের মত কিছু আছে। এভাবেই প্ল্যাটফর্মটা সিলেক্ট করি। প্রথমেই মধুমতি মানুষের এবং বিশেষ করে সাংবাদিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এই কারণে যে, বইটা আর দশটা বইয়ের মত প্রেমের গল্প না।       

তখনকার সমাজ ব্যবস্থায় শিক্ষাগ্রহণের ক্ষেত্রে কতোটা বাধার সম্মুখীন হতেন?  

সে অনেক কথা। তখন তো মেয়েদের তেমন পড়াশোনারই প্রচলন ছিল না। শহরে আমার বাবা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন। ঢাকায় এসেছি একবছর বয়সে। পুরনো ঢাকার মালিটোলা গার্লস হাইস্কুলে বেবী ক্লাসে ভর্তি হলাম। ওটা ছিল পিকচার হাউজ মানে পুরান ছবি ঘর। ওখানে পড়তাম। তবে লেখাপড়ায় আমার হাতে খড়ি মায়ের কাছ থেকে।

দিন ভালোই যাচ্ছিল। আমি যখন পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী, হঠাৎ একদিন পাড়ার সর্দারের কাছ থেকে আমার স্কুলে যাওয়া নিয়ে আপত্তি তোলা হলো।

বলাবাহুল্য ঢাকার বিভিন্ন এলাকা তখন সর্দারদের আইনে চলত। ঝগড়া বিবাদ মিটাতে সবাই এলাকার সর্দারের শরণাপন্ন হতো। মেয়েদের ক্ষেত্রে পর্দা প্রথা ছিল বেশ কড়াকড়ি। মহল্লার মসজিদেই আমার বাবাকে ডাকা হলো। তাকে জোরাল ভাষায় বলা হলো, আপনার মেয়ে বড় হয়েছে। স্কুলে যায়। সদর রাস্তা দিয়ে চলে। পর্দা মানে না। মহল্লায় থাকতে হলে এসব চলবে না।

বাবা বাসায় এসে মাকে বললেন, কাল থেকে মেয়েকে আর স্কুলে পাঠাবে না।

মায়ের মন খারাপ। আমাকে ডেকে নিয়ে মা বললেন, কাল থেকে তোমাকে আর স্কুলে যেতে হবে না। এমন নানা বাধা- বিপত্তি সামনে এসে দাঁড়াতো। এমনি করে করে ম্যাট্রিক পাস পর্যন্ত করতে পেরেছিলাম। 

রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে জন্মে নারী লেখক হিসেবে আপনি ছিলেন প্রতিকূলের যাত্রী। এই প্রতিকূলতাকে ঠেলে কি করে সাহিত্যঙ্গনে নিজেকে টিকিয়ে রেখেছিলেন?

লেখালেখির কথা বলতে গেলে সে আরেক বিপদ। প্রথম দিকে ধারণা করে করে গল্প লিখে ডাকযোগে বিভিন্ন পত্রিকায় পাঠাতাম। কিন্তু আমার শ্রম প্রতিবারেই ব্যর্থ হতো।

এই সময় একটা ঘটনা ঘটল। তখনকার ম্যাট্রিকের পরীক্ষার্থীদের জন্য প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা থাকতো এবং এ নিয়ে বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞাপন ছাপা হতো। নারায়ণগঞ্জ থেকে এমন একটি বিজ্ঞাপন বের হলো প্রবন্ধ প্রতিযোগিতার। মেধাবী ছেলে-মেয়েদের মধ্যে একজনকে পুরস্কার দেয়া হবে। আমার বাড়ির লোকেরা এসব পছন্দ করে না। তবুও লেখা পাঠালাম আমার ছোট ভাইয়ের নামে। ওই প্রতিযোগিতায় আমার পাঠানো লেখা বাংলাদেশে প্রথম হলো। নাম ঠিকানা ছাপা হলো আমাদের বাড়ির। লেখকের নামের জায়গায় আমার ছোট ভাইয়ের নাম ছাপা হয়। উদ্যোক্তারা প্রাইজ নিতে আহ্বান জানায়। বিপদে পরতে হলো তখন। পুরস্কার কে আনবে?  ভাইটি ছোট। আমার পক্ষে তো যাওয়া সম্ভব নয়। বুদ্ধি করে একটা চিঠি দিলাম উদ্যোক্তাদের। ছোট ভাইয়ের নামেই চিঠি লিখলাম, ‘আমি গাছ থেকে পড়ে আহত হয়েছি। নির্ধারিত তারিখে আমার পক্ষে পুরস্কার নিতে আসা সম্ভব নয়। পুরস্কারটি ডাকযোগে পাঠিয়ে দিন’। কিন্তু এই চিঠির আর কোনো জবাব পেলাম না। জীবনের প্রথম পুরস্কার এভাবেই জলাঞ্জলি দিতে হলো।

একবার রেডিওতে আমি গল্প পাঠ করলাম একটি। চেক পেলাম ২০ টাকার। চেক ভাঙিয়ে প্রথমেই ৯ টাকা দিয়ে একটি কলম আর ১ টাকা দিয়ে কালি কিনেছিলাম।

কলম কিনে বাবার কাছে মৃদু বকুনিও খেলাম এবং সেদিন প্রচুর কেঁদেছিলাম। কলম কেনার আনন্দ কিছুটা ম্লান হয়ে গেল।

তখন আমার বিয়ে হয় নাই। নতুন বিপদ এল আপার শ্বশুর বাড়ি থেকে। সেই সময়টা আমার জন্য কি যে দুঃখের ছিল! বাবার কাছে চিঠি এলো একটা পোস্টকার্ড। তাতে লেখা ‘এই পরিবার থেকে একটি মেয়ে বাইরে হাতের লেখা পাঠায়, উভয় পরিবারের জন্য ইহা অতিব লজ্জার বিষয় যে মেয়ের হাতের লেখা পরপুরুষে দেখিতেছে’ এই চিঠি পাবার পর বাবা আমার লেখা বন্ধ করে দিলো।

আপনি শিক্ষকতা এবং সাংবাদিকতা পেশায় আসলেন কিভাবে?

শিক্ষকতা করেছি পুরান ঢাকার ভাড়াবাড়ি ছেড়ে শান্তিনগরে বাবার কেনা বাড়িতে আসার পর। সিদ্ধেশ্বরী হাইস্কুলটি তখন একেবারে উঠে যাওয়ার মতো অবস্থা। কারণ শিক্ষার্থীরা বেশির ভাগই ছিল হিন্দু। হিন্দুরা থাকতে ক্লাস হতো নিয়মিত। দেশ ভাগের কারণে হিন্দুরা চলে যাওয়ায় স্কুলটি বন্ধ হবার মত অবস্থা। পাড়ার কিছু লোক তখন স্কুলটি আবার চালানোর চেষ্টা করলেন। আইএ, বিএ পড়া ছেলেদের বলা হলো আপনারা সকালবেলা স্কুলে ক্লাসে সময়  দেবেন। তারা ক্লাস নিতেন। আবার বিকেলে মেয়েদের জন্যও ক্লাস চালু হলো। যেসব পরিবারে মেয়েরা কিছু পড়াশোনা জানে, তাদেরও শিক্ষিকা হিসেবে নেয়ার উদ্যোগ নিলেন স্কুল কর্তৃপক্ষ। একদিন তারা আমাদের বাসায় এলেন, বাবার কাছে আমার ব্যাপারে কথা বলার জন্য। আমাকে চাইল শিক্ষয়িত্রী হিসেবে। আমার বাবা বললেন, না মেয়েকে স্কুলে যেতে দেবো না। স্কুলে এতো লোকের মধ্যে রাস্তা দিয়ে যাবে এটা হবে না।

স্কুল আমাদের প্রায় বাসার কাছে। আমি তখন ম্যাট্রিক পাস করেছি। সুতরাং স্কুলে চাকরি হয়ে গেল। আমার মতো আরো কয়েকজনের চাকরি হলো। মাসিক বেতন ৩০ টাকা। তার ওপর মাঝে মাঝে বাড়তি ভাতাও থাকতো। তখন স্কুলের হেড মিসট্রেস হয়ে এলেন জাহানারা ইমাম। তিনি তখনি আমার কয়েকটি লেখা পড়েছিলেন এবং খুব উৎসাহ নিয়ে বললেন আমি যাব। সত্যিই তিনি এলেন। আমার বাবা, কাকা সবাই ছিলেন। জাহানারা ইমামের কথা তো! বেরুনো মুশকিল। যুক্তি দিয়ে কথা বলতে বলতে কি করে আশ্চর্যজনক ভাবে বাবা, চাচাকে রাজি করিয়ে ফেলল। তো সকালে মেয়েদের স্কুল আর বারোটা থেকে ছেলেদের স্কুল। 

আর সাংবাদিকতা বিষয়ে বলি। এরইমধ্যে জাহানারা ইমাম আপা একটি পত্রিকা বের করলেন নাম ‘খাওয়াতিন’। একদিন আপা আমাকে বললেন, তুমি তো লেখালেখির সাথে আছো, তো আমার সাথে থাকবে? আমি বললাম, একটা কাগজের সাথে যুক্ত হওয়া তো আমার স্বপ্ন। কিন্তু বাসা থেকে আমাকে দেবে না। আবার এলেন আমাদের বাসায় জাহানারা ইমাম। 

বাবা কাকাকে রাজি করালেন। পত্রিকা বের হতো ওয়াইজঘাট থেকে। শান্তিনগর থেকে ওয়াইজঘাট। কম দূরের পথ নয়। হেঁটে এসে পুরান পল্টন থেকে বাসে উঠতে হয়।

জাহানারা ইমাম বললেন, আমরা রিকশায় যাব এবং ফেরার পথে রিকশায় ওকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে যাবো। এইভাবে জাহানারা ইমাম আমার সঙ্গে আসতেন এরপর যেতেন তার বাসা আজিমপুর কলোনিতে। পত্রিকার নাম ছিল মাসিক খাওয়াতিন। খাতুন মানে ভদ্রমহিলা। আর খাওয়াতিন মানে ভদ্রমহিলাগণ। সেজন্য পত্রিকার নাম খাওয়াতিন। এই পত্রিকাটি দু’মাস ভালোই চলল। তারপর দেখা দিল বিজ্ঞাপনের সমস্যা। এই পত্রিকাটিও বন্ধ হয়ে গেল।

গল্প উপন্যাস লিখতে পরিবার থেকে কার উৎসাহ বেশি পেয়েছিলেন?

ছোটবোন সুফিয়া আর সেই মজিদ ভাইয়ের কাছ থেকে। আর মা তো বকতেন। বিয়ের পর স্বামী ফজলুল হকের কাছ থেকে। এই লোকটি আমাকে খুবই উৎসাহ দিয়েছেন। উনি খুব উদার এবং ভাল একজন মানুষ ছিলেন। সবচেয়ে বড় কথা তিনি আমাকে প্রচুর বইপত্র চিনিয়ে দিতেন। সাগরের আব্বা আমাকে সবদিক থেকেই সাহায্য করার চেষ্টা করতেন। ১৮ বছর বয়সে আমার বিয়ে হয় তার সাথে। তিনি বিত্তবান কেউ ছিলেন না। একটি সিনেমা পত্রিকার  মালিক এবং সম্পাদক। সিনেমায় আমরা চারজন কর্মী ছিলাম। ফজলুল হক, কাইয়ুম চৌধুরী, জহির রায়হান এবং আমি। জহির, কাইয়ুম তখন ছাত্র। সিনেমা পত্রিকাও একদিন বন্ধ হয়ে যায়।

হক তখন একটি মেয়েদের পত্রিকা বের করার সংকল্প নেয়। কাগজের নাম অঙ্গনা। মাসিক। আমি জহির রায়হান এবং কাইয়ুম চৌধুরী পত্রিকাটি বের করতাম। কাইয়ুম ও জহির কাগজটি সম্পর্কে যথেষ্ট চিন্তা ভাবনা করতো। সাড়া ফেলেছিল। কিন্তু ঐ পর্যন্তই। দুটি সংখ্যা বের হয়ে অঙ্গনা বন্ধ হয়ে গেল। তখন আবার সিনেমা পত্রিকা বের হতে লাগল। সেই সময় বাজারে চিত্রালী বেরিয়েছে। আরো কয়েকটি সিনে ম্যাগাজিন বের হলো। আয়ু সংক্ষিপ্ত হলেও একের পর বের হতেই লাগল। তখনও পত্রিকার পাঠকগোষ্ঠী গড়ে উঠেনি।

সাম্প্রতিক বাংলা সাহিত্যের ধারা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন...

আমাদের সাথে আর তোমাদের সাথে বেশ খানিকটা তফাৎ হয়ে গেছে। আমরাই ভালভাবে লিখব আসলেই তাই? অগ্রজরা কি লিখে গেছে, কি দিয়ে গেছে, কি অবস্থায় লিখেছে জানতে হবে। কোন সুযোগ সুবিধা কিছুই যেখানে ছিল না। কিছু না জেনেই পুরান লেখকদের সম্পর্কে আমাদের পরবর্তীতে কেউ কেউ বলতো, খালি মাঠে গোল দিয়েছে এরা। আমি এবং সৈয়দ হক বলতাম, মাঠ কোথায় আমরা যে গোল দেবো! তাছাড়া সাহিত্য সমালোচনা বর্তমানে তো উঠেই গেছে বলতে গেলে। কিন্তু আমাদের সময় সাহিত্য সমালোচনা ছিল অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও প্রবল। প্রত্যেকটি সমালোচনা হতো কঠোরভাবে। অতি পরিচিতজনকেও কেউ ছেড়ে কথা বলতেন না।

আপনার প্রায় দুশো প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা। জীবনের এ বেলায় এসে কি মনে হয়, আরো দেবার সামর্থ্য ছিল। ঘাটতি রয়ে গেল কিছু?

ছিল। এ বয়সের অভিজ্ঞতা অনেক। অনেক লেখার ছিল। কিন্তু আমার লেখা হচ্ছে না। আমি আর লিখতে পারছি না। অজস্র কল্পনা এখনো আছে। কিন্তু লেখা আর হয় না। খুব খারাপ দিন যায়। খুব খারাপ লাগে। মাঝে মাঝে বই পড়ার চেষ্টা করি।

এতক্ষণ সময় দেয়ার জন্য পরিবর্তন ডটকমের পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ।

পরিবর্তনের সকলকে শুভেচ্ছা ও স্নেহাশিস।

ছবি: ওসমান গনি

এসবি

 

সাক্ষাৎকার: আরও পড়ুন

আরও