মানুষ কীভাবে গ্রহণ করে সেটিই বড়

ঢাকা, ৯ ফেব্রুয়ারি , ২০১৯ | 2 0 1

মানুষ কীভাবে গ্রহণ করে সেটিই বড়

মাহমুদুল হাসান ১২:৫০ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৩০, ২০১৯

মানুষ কীভাবে গ্রহণ করে সেটিই বড়

মজিবুর রহমান মঞ্জু। ছাত্ররাজনীতির পরিচিত মুখ। নতুন তকমা পেয়েছেন একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী জামায়াতে ইসলামীর সংস্কারপন্থী নেতা।

সদ্য ‘জনআকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ’ নামক নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে আলোচনায় এসেছেন। ছিলেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি। চট্টগ্রাম কলেজ এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতিরও দায়িত্ব পালন করেছেন মঞ্জু।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্য পদ থেকে বহিষ্কৃত নেতা মজিবুর রহমান মঞ্জু দল ভেঙে দল করা, সরকারি আনুকূল্য, একাত্তরে জামায়াতের অবস্থান ছাড়াও তার সংগঠনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে রোববার রাতে ধানমন্ডির নিজ বাসায় পরিবর্তন ডটকমের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মাহমুদুল হাসান।

নানা জল্পনা-কল্পনা শেষে অবশেষে এলেন নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘জনআকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ’ দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ঠিক কেন এলেন, কি করবেন আপনারা?

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যাশা ও আকাঙ্খা ছিল- সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক সুবিচার। আমরা এর সঙ্গে লিংক করে বলেছি- নাগরিক সুবিধা, কল্যাণমুখী সমাজ ও রাষ্ট্র, জনগণের মৌলিক অধিকার। আর এগুলোর জন্যই ‘জনআকাঙ্খার বাংলাদেশ’ কাজ করবে। তবে একটি কথা বলে রাখি, আমাদের তৎপরতা একটি রাজনৈতিক দলে রূপ নেবে। সুতরাং এই নাম চূড়ান্ত নয়। প্রাথমিকভাবে সবার পরামর্শের ভিত্তিতে নামটি রাখা হয়েছে।

আওয়ামী লীগ বলেই দিয়েছে, আপনারা আসলে জামায়াতের খোলস পাল্টে এসেছেন রাজনীতি করতে দেয়া হবে না ক্ষমতাসীনদের বিরোধিতায় কিভাবে জনআকাঙ্ক্ষার রাজনীতি এগিয়ে যাবে?

আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফের এমন একটি বক্তব্য আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। তার বক্তব্য জামায়াত সংশ্লিষ্ট। দলটি খোলস পাল্টে আসছে। কিন্তু, আমরা যে উদ্যাগ নিয়েছি, তার সঙ্গে জামায়াতের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা স্পষ্ট করে বলেছি, এটি কোনো ইসলামিক দল হবে না। আমরা মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাপত্র বাস্তবায়ন করতে চাই। অধিকারভিত্তিক রাজনীতিই হচ্ছে আমাদের মূল শর্ত। তা ছাড়া হানিফ ভাইয়েরা তো জামায়াতের সঙ্গে রাজনীতি করেছেন। এক সঙ্গে সংসদে গেছেন, আন্দোলন করেছেন। উনার বক্তব্য রাজনীতিক, গণতান্ত্রিক কোনো কথা নয়।

আত্মপ্রকাশের আগেই সোশ্যাল মিডিয়ায় আপনাদের নিয়ে তুমুল সমালোচনা তাদের অভিযোগ, আরেকটি কিংস পার্টি হবে শুরুতেই এমন তকমা নিয়ে চলা কতটা সহজ হবে?

আমাদের বিরুদ্ধে দেয়া এই অভিযোগ মোটেও সঠিক নয়, মিথ্যা অপবাদ এবং অপপ্রচার। আত্মপ্রকাশের দিনেইতো পুলিশ আমাদের বাধা দিয়েছে। পরে আলোচনা করলে, পুলিশ তাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে আমাদের অনুষ্ঠান করা সুযোগ দেয়। তবে ভবিষ্যতে অনুমতি নিয়ে অনুষ্ঠান করার কথা বলেছে।

আমি মনে করি, বর্তমানে যে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা, অগণতান্ত্রিক পরিবেশ, সবকিছু মোকাবেলা করেই আমাদের কাজ করতে হবে। কারও কাঁধে ভর করে, কারও দালালি করে, আনুকূল্য নিয়ে রাজনীতি এদেশে বহু আগেই প্রত্যাখ্যাত। সুতরাং আমরা এই ধরনের রাজনীতি কখনও করতে চাই না।

আপনার নিজেরই আলাদা পরিচয় আছে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সামলেছেন সাংবাদিকতাও করেছেন এসব দায়িত্বে ব্যর্থ না হলেও খুব একটা সফল বলা যাবে না আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ, জামায়াত ভাঙার ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছেন?

আমি যখন যে রাজনীতি করেছি, সেখানে নিজের বিবেকের আলোকে পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও সংশোধনের চেষ্টা করেছি। যেহেতু জামায়াত আমাকে বের করে দিয়েছে, আমি এখন স্বাধীন মানুষ। স্বাধীনভাবেই আমার রাজনৈতিক মতপ্রকাশের সূচনা করছি এবং এটা এগিয়ে নিয়ে যাব। কতটুকু সফল হব, তা সময়ই বলবে। আর কি কি করব, তা আমাদের ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করেছি। এখন দেখার বিষয়, মানুষ আমাদের কিভাবে গ্রহণ করেন।

আর ষড়যন্ত্র, সেটিতো মানুষ করে পেছনে, গোপনে। আমরাতো প্রকাশ্যে রাজনীতির ঘোষণা দিয়েছি। যে প্ল্যাটফর্ম হলো, সেখান থেকে ক্রমান্বয়ে আমরা রাজনৈতিক দল গঠন করব। সুতরাং কেউ যদি আমাদের তৎপরতায় ষড়যন্ত্র খোঁজেন, সেটি তাদের অজ্ঞানতা। ষড়যন্ত্র করে কেউ কোনো দিন সফল হয়নি। ষড়যন্ত্র সব সময় ব্যর্থ হয়ে যায়, এটাই বাস্তবতা।

আত্মপ্রকাশের পর লক্ষ্য করছি, বেশ বড় সংখ্যক ডানপন্থী, বিশেষ করে সাবেক সংগঠনের মানুষ আপনাকে আস্থায় নিতে পারছেন না তারা প্রকাশ্যে আপনার উদ্যোগের বিরোধিতা করছেন সরকারের চাপে পড়ে দল ভাঙার প্রক্রিয়ায় যুক্তও করছেন তাদের জন্য আপনার কাছে সত্যিই কি কোনো জবাব আছে?

ডান-বাম বলে কোনো কথা নেই। বাংলাদেশের চলমান তত্ত্ব ও মতবাদ ব্যক্তিকেন্দ্রীক। সেখান থেকে একটি মৌলিক পরিবর্তনের কথা আমরা বলেছি। আমরা কোনো ধর্মীয় দল করব না এবং সকল মানুষকে একীভূত করে ইনক্লুসিভ প্ল্যার্টফর্ম গড়ে তুলব। এটাই আমাদের টার্গেট। সরকারের চাপের বিষয় নয়। সরকারই অনেক বিষয় নিয়ে চাপে আছে। বাংলাদেশ একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। গুম, খুনের অনিরাপদ রাষ্ট্র। সরকার নিজেদের বৈধতার সঙ্কট নিয়েও চাপে রয়েছে। আমি মনে করি, সব বাধা-বিপত্তি পেরিয়েই আমরা এগিয়ে যেতে পারব। নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্যদিয়ে আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করব।

বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও কিন্তু মুসলিম লীগ করতেন। তিনি সেই দল থেকে বেরিয়ে এসে আওয়ামী লীগ গঠন করেন। তিনি এবং তার দল কি গ্রহণযোগ্যতা পায়নি? সুতরাং আগে আমি কি করেছি, তা গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় নয়। এখন আমি কি করছি, কি বলছি এটাই গুরুত্বপূর্ণ। এর উপরই আমার রাজনীতি এগিয়ে যাবে।

আপনার তৎপরতার সঙ্গে মার্কিন ও ভারতপন্থী এদেশীয় অনেক বুদ্ধিজীবীর নাম যুক্ত করা হচ্ছে কিন্তু, আপনিতো আজীবন লালন ও রাজনীতি করে এসেছেন আধিপত্যবাদের বিরোধিতা করে এখন তাদের দাসে পরিণত হওয়ার এমন উল্টোযাত্রা কেন?

এমন ধারণা কল্পিত ও বানোয়াট। আমার সঙ্গে অনেকের আলোচনা আছে, সম্পর্ক আছে। আমি যেহেতু মিডিয়াতে কাজ করেছি। সবার সঙ্গে আমার সম্পর্ক আছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত। তাদের সঙ্গে  আমাদের সম্পর্কের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি। আমরা সুনির্দিষ্টভাবে ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করেছি- আমরা কাঁটাতারের বেড়া, সীমান্ত হত্যা বন্ধের দাবি করেছি। নিজস্ব সক্ষমতা ছাড়া আসলে এসব মোকাবেলা করা যায় না। সাম্রাজ্যবাদী যেসব রাষ্ট্র আছে, তাদের ব্যাপারে আমাদের একই কথা- আমরা কারও সঙ্গে চূড়ান্তভাবে বৈরিতা করব না। কারও সঙ্গে আমাদের অন্ধ বন্ধুত্বও হবে না। দুটির সমন্বয় হতে পারে।

জামায়াতের একাত্তরের অবস্থান নিয়ে আপনার মধ্যে কোনটি এখনো বেশি কাজ করে? তাদের রাজনৈতিক অবস্থান সঠিকই ছিল; নাকি পরিণতির জন্য অনুশোচনা হয়?

ব্যক্তি আমি যতটা পেরেছি জামায়াতের মতাদর্শের সংস্কারের কথা বলেছি। যেসব জায়গায় প্রয়োজন, সেখানে করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের বিরোধিতা নিয়ে যে ধোঁয়াশা, সেটি স্পষ্ট করতে বলেছি। দলের অনিয়মের কথা বলেছি। জামায়াত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাস্তবায়ন করবে বলেছে। কিন্তু, আমাদের অবস্থান ছিল, যেহেতু জামায়াত আগে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে, সেটি নিয়ে নিজেদের অবস্থান আগে পষ্ট করতে হবে। ভুল করে থাকলে সেটি স্বীকার করতে হবে, আমরা ভুল করেছি।

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াত নেতাদের ফাঁসি নিয়ে আপনার এখনকার মূল্যায়ন, বিশেষ করে মীর কাসেম আলীকে নিয়ে কারণ, আপনি তার খুব ঘনিষ্ঠ এবং বলা হয়ে থাকে, তাকে নিয়েই জামায়াতের ভেতর একটি আলাদা বলয় করতে তৎপর ছিলেন আপনি—

আমরা সব সময় আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে স্বচ্ছ বিচারের দাবি করেছি। মানবতাবিরোধী অপরাধী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলেই আছেন। দলমত নির্বিশেষে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ন্যায়বিচারের কথা বলতে হবে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রই কিন্তু জন্ম হয়েছে ন্যায়বিচারের দাবিতে। কাউকে জোর করে বিচারের সন্মুখীন করতে আমরা পারি না। একটি ন্যায়পরায়ণতার মধ্যদিয়ে বিচারের সম্মুখীন করতে হবে। বিচার গ্রহণযোগ্য স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হতে হবে।

মীর কাসেম আলীর সঙ্গে কাজ করেছি। উনি আমার সিনিয়র ছিলেন। উনার অধীনে একটা মিডিয়াতে কাজ করেছি। উনার ব্যক্তিত্ব, মেধা আমি এখনও অনুভব করি। আমি মনে করি, উনার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এসেছে, যদি এগুলো স্বচ্ছভাবে দেখা হতো, তাহলে তিনি ন্যায়বিচার পেতেন।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মতো বড় দটি দলের বাইরে কেন জনগণ আপনাদের গ্রহণ করবে?

আওয়ামী লীগ এদেশের স্বাধীনতার নেতৃত্ব দিয়েছে। কিন্তু, আজ গণতন্ত্র চর্চায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। তারা জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছে। সব জায়গায় বিভেদ- স্কুল কমিটি, মসজিদ কমিটিতে বিভেদ তৈরি করেছে। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অঙ্গণে দলাদলি। সুতরাং সব দিক থেকে বিচার করলে, আওয়ামী লীগের রাজনীতি ব্যর্থ হতে চলেছে। অন্যদিকে বিরোধী হিসেবে বিএনপির ওপর মানুষের আস্থা ছিল। সেটিকে তারা কাজে লাগাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এমন রাজনীতির শূন্য ময়দানে আমরা মনে করছি, জনগণ বড় রাজনৈতিক দলের বিকল্প হিসেবেই আমাদের গ্রহণ করবে।

ঠিক দল হিসেবে কবে নাগাদ আত্মপ্রকাশ ঘটবে, কোনো ডেটলাইন কি?

ঠিক বলতে পারছি না। কিন্তু, আমরা স্বপ্নটা দেখতে চাই। আমাদের ৫০ বছরের ব্যর্থতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আশা করি, মুক্তিযুদ্ধের তিনটি মূলনীতির উপর ভিত্তি করে করেই আমরা জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে সক্ষম হব। আমাদের প্রস্ততি জোরেশোরে চলছে। অনেকেই নানাভাবে যোগাযোগ করছেন। পারস্পারিক আলোচনার মধ্যদিয়ে একটা দলীয় কাঠামো ও পদ্ধতি, কর্মসূচি, দলের নাম, নেতৃত্ব নির্ধারণ করা হবে। আর এজন্য যতটুকু সময় লাগে, সেটুকু আমাদের দিতে হবে। একটি রাজনৈতিক দলতো আর হঠাৎ করে গড়ে ওঠার বিষয় না। একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে যেতে হবে।

এমএইচ/আইএম

আরও পড়ুন...
জামায়াতের সংস্কারপন্থী নেতাদের নিয়ে মজিবুরের নতুন সংগঠন
ষড়যন্ত্র করে সফলতা আসে না: মঞ্জু

 

সাক্ষাৎকার: আরও পড়ুন

আরও