হাসপাতালে কেমন আছেন সঙ্গীতজ্ঞ আলাউদ্দিন আলী?

ঢাকা, সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯ | ২৯ আশ্বিন ১৪২৬

হাসপাতালে কেমন আছেন সঙ্গীতজ্ঞ আলাউদ্দিন আলী?

সীমান্ত বাধন চৌধুরী ১০:২০ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ০৯, ২০১৯

হাসপাতালে কেমন আছেন সঙ্গীতজ্ঞ আলাউদ্দিন আলী?

‘একবার যদি কেউ ভালোবাসতো,’ ‘যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়,’ ‘ভালোবাসা যতো বড়ো জীবন তত বড় নয়,’ দুঃখ ভালোবেসে প্রেমের খেলা খেলতে হয়,’ ‘সূর্যোদয়ে তুমি, সূর্যাস্তেও তুমি ও আমার বাংলাদেশ,’ ‘যেটুকু সময় তুমি থাকো কাছে,’ এরকম অসংখ্য কালজয়ী বাংলা গানের স্রষ্টা, সুরের আকাশের শুকতারা, দেশবরেণ্য গীতিকার, সুরকার আলাউদ্দিন আলী।

গত ২২ জানুয়ারি থেকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় রাজধানীর মহাখালীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অবস্থা বেশি গুরুতর হলে তাকে রাখা হয় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে।

এরপর অবস্থা আশঙ্কাজনক হলে ২৮ দিন লাইফ সাপোর্টে রাখা হয় তাকে। শারীরিক অবস্থা কিছুটা উন্নত হলে কেবিনে স্থানান্তর করা হয়। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কেবিনেই চলছে তাঁর চিকিৎসা।

কিংবদন্তি এই গীতিকার ও সুরকার বর্তমানে কেমন আছেন এ বিষয়ে পরিবর্তন ডটকমের সঙ্গে কথা বলেছেন তার স্ত্রী ফারজানা মিমি। 

এখন কেমন আছেন দেশবরেণ্য গুণী এই গানের মানুষ? জানতে চাইলে আলাউদ্দিন আলীর স্ত্রী ফারজানা মিমি জানান,  দীর্ঘদিন ধরে রক্তচাপ ও ফুসফুসের সংক্রমণসহ নানা রোগে ভুগছেন আলাউদ্দিন আলী। সর্বশেষ ২২ জানুয়ারি রাতে তাঁকে মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। অবস্থার অবনতি হওয়ায় টানা ২৮ দিন তাঁকে রাখা হয় হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে। অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে ১৭ ফেব্রুয়ারি তাঁকে নিয়ে আসা হয় কেবিনে। সেই থেকে এখন পর্যন্ত এখানেই চিকিৎসা চলছে ।

মিমি বলেন, যেদিন তাকে অসুস্থ অবস্থায় ভর্তি করালাম, সেদিন সকাল ৭টার দিকে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের মৃত্যুর খবরটা পাই। খবরটা শোনার পরই আলাউদ্দিন আলী মানসিকভাবে প্রচণ্ড ভেঙে পড়েন। তিনি এই মৃত্যুটা মেনে নিতে পারেননি। এরপর সারাদিন জ্বর ছিল, হাত-পা ছেড়ে দিলেন। আমি হসপিটালের চেনা একজন ডাক্তারকে ফোন দিলাম। তিনি বললেন, আরেকটু দেখেন কি অবস্থা হয়। বাসায় সারাদিন তাকে পরিচর্যা দেয়ার পর বিকেল পর্যন্ত জ্বরটা কমে এলো। কিন্তু সন্ধ্যা ৭টার দিকে হঠাৎ তার বমি হয় এবং এরপরই তার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে যায়। এমন আগে কখনো হয় নি ওনার, দেখি নি। এসব দেখেই হসপিটালে নিয়ে আসি এবং সাথে সাথে আইসিইউতে রাখা হয় ওনাকে। ২২ জানুয়ারি ভর্তি করালাম ওনাকে। সেদিন লাইফ সাপোর্টে দেয় নি। সেদিন  অবজারভেশনে রেখেছিল।

ফারজানা মিমি জানালেন, দুদিন যাবত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানা গেল ওনার Pneumonia, septicemia হয়েছে। মানে ইনফেকশন ব্লাডে ছড়িয়ে পড়েছে। এসবের চিকিৎসা চলছিলো এরই মধ্যে তার কার্ডিয়াক এরেস্ট হয় এবং ২৫ জানুয়ারি তাকে লাইফ সাপোর্টে দেয়া হয়। এরপর ডাক্তার আমাদের জানান, তার হৃদযন্ত্রের কার্যক্রম প্রায় ১৫ মিনিট বন্ধ থাকে। ওর মধ্য থেকে আল্লাহ তাকে ফিরিয়ে দেন। তখন ১৪ দিন একনাগাড়ে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। ডাক্তার বললেন, এ অবস্থায় মুখে ইনফেকশন হতে পারে তাই কণ্ঠনালী ছিদ্র করে আরো ১৪ দিন লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। মোট ২৮ দিন লাইফ সাপোর্টে ছিলেন তিনি। বোর্ড মিটিং করে কেবিনে আনার সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। সেই থেকে এ যাবত হসপিটালেই আছি।

তিনি আরো বলেন, আগে তো সেন্স ছিল না। এখন হাত-পা নাড়াচাড়া করেন। আগের চেয়ে কনশাস লেভেলও বেড়েছে। প্রফেসর আহমেদুল কবির (মেডিসিন) আরো কিছু ডাক্তারের তত্ত্বাবধানেও আছেন। যেমন- ইউরোলজিসট, নিউরো, চেস্ট স্পেশালিস্ট এমন মোট সাতজন ডাক্তার দেখছেন ওনাকে।

আলাউদ্দিন আলীর সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে মিমি বলেন, ‘নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে তিনি যে অবস্থায় ছিলেন সেখান থেকে এখন অনেকটাই ভালো। হাত-পা নাড়াচ্ছেন। কিছু  কথাও বলতে পারেন, তবে অস্পষ্ট। কাশিটা এখনো আছে। কাশি হলেই শ্বাসকষ্টও হয়। তবে আগের চেয়ে ভালো আলহামদুলিল্লাহ।’

ডাক্তার বলেছেন, ওনাকে বেশ সাবধানে খাওয়াতে হবে, যাতে খাবার শ্বাসনালীতে চলে না যায়।

মিমি বলেন, তরল খাবার এনজি টিউবের মাধ্যমে দেয়া হচ্ছে লাইফ সাপোর্টের পর থেকে এখন পর্যন্ত। আর পরবর্তী পদক্ষেপ হচ্ছে তাকে ফিজিওথেরাপি দিতে হবে, এজন্য আমরা সহসাই সিআরপিতে নিয়ে যাবো তাকে। দু-এক  দিনের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নেবো আমরা কবে নিয়ে যাবো।

তিনি আরো জানান, অনেক বড় ধকল গিয়েছে তাই শরীরটা দুর্বল। আলাউদ্দিন আলীর চিকিৎসার জন্য ২৫ লাখ টাকার পারিবারিক সঞ্চয়পত্র করে দিয়েছেন আমাদের মমতাময়ী প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেছেন- তার চিকিৎসার দায়িত্ব আমার। আমি আর আমার মেয়ে রাজকন্যা পরিবর্তন ডটকমের মাধ্যমে আলাউদ্দিন আলীর সুস্থতার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া প্রার্থনা করছি।

১৯৫২ সালের ২৪ ডিসেম্বর মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলার বাঁশবাড়ি গ্রামের এক সাংস্কৃতিক পরিবারে এ গুণী সঙ্গীতজ্ঞ জন্মগ্রহণ করেন।

আলাউদ্দীন আলী একাধারে গীতিকার, সুরকার এবং সঙ্গীত পরিচালক। সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে সাতবার এবং গীতিকার হিসেবে তিনি একবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন।

বাবা ওস্তাদ জাবেদ আলী ও ছোট চাচা সাদেক আলীর কাছেই শৈশবে আলাউদ্দীন আলীর সঙ্গীতে হাতেখড়ি হয়। ১৯৬৮ সালে তিনি যন্ত্রশিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্র জগতে আসেন এবং প্রখ্যাত সুরকার আলতাফ মাহমুদের সহযোগী হিসেবে যোগ দেন। এরপর তিনি সুরকার আনোয়ার পারভেজসহ বিভিন্ন সুরকারের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন।

গোলাপী এখন ট্রেনে (১৯৭৯), সুন্দরী (১৯৮০), কসাই এবং যোগাযোগ চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন আলাউদ্দিন আলী। এছাড়া ১৯৮৫ সালে তিনি শ্রেষ্ঠ গীতিকার হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। খ্যাতিমান পরিচালক গৌতম ঘোষ পরিচালিত ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ ছবির সঙ্গীত পরিচালনাও করেছেন আলাউদ্দিন আলী।

এইচআর

 

সাক্ষাৎকার: আরও পড়ুন

আরও