বহু সাধনার পর মিডিয়ায় জায়গা পেয়েছি: ফাতেমা তুজ জোহরা

ঢাকা, বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯ | ২৯ কার্তিক ১৪২৬

বহু সাধনার পর মিডিয়ায় জায়গা পেয়েছি: ফাতেমা তুজ জোহরা

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ৭:০৬ অপরাহ্ণ, মার্চ ০২, ২০১৯

বহু সাধনার পর মিডিয়ায় জায়গা পেয়েছি: ফাতেমা তুজ জোহরা

বাংলাদেশে খ্যাতিমান নজরুল সঙ্গীত শিল্পীদের কথা বলতে গেলে প্রথম সারিতে যে মুখগুলো ভেসে আসে, তাদের মধ্যে অন্যতম ফাতেমা তুজ জোহরা। বলা যায় জীবনের পুরো সময়টাই নজরুলের গানের সাধনায় নিবেদিত করেছেন তিনি।

ফাতেমা তুজ জোহরার শ্রোতা, ভক্তকুলকে বিশেষ করে তার নিজস্ব গায়কী স্টাইল দিয়ে মুগ্ধ করে রেখেছেন যুগ যুগ। মন মাতাল করা আবেশ নিয়ে এ যাবত গেয়েছেন অসংখ্য নজরুল সঙ্গীত। আধুনিকেও তার পদচারণা কম নয়।

পরিবর্তন ডটকমের সাথে তার বর্ণাঢ্যময় সঙ্গীত জীবন সম্পর্কে একান্ত আলোচনাটি তুলে ধরা হলো।  

সাক্ষাৎকার গ্রহণে ছিলেন সীমান্ত বাঁধন চৌধুরী। 

 প্রশ্ন : সঙ্গীতাঙ্গনে আগের মতো দেখা যায় না আপনাকে কেন?

কে বলল? আসলে আগে শুধু বিটিভিই ছিল। সেখানে গানের স্লট অনেক ছিল। এখন এতোগুলো চ্যানেল হয়েছে, কিন্তু গানের স্লটে বিটিভির সাথে পাল্লা দিয়ে পারবে না। সহজ উত্তর। ওখানে সবচেয়ে ইম্পরটেন্ট প্রোগ্রামগুলো হতো। সেখানে ক্লাসিক্যাল হতো এবং অনেক নামের অনেক সুন্দর সুন্দর অনুষ্ঠান হতো আধুনিক গানের। এরপর নজরুল সঙ্গীত যেমন- মালঞ্চ, দোলনচাঁপা এমন সব অনুষ্ঠান হতো। এখনও ভালো ভালো অনুষ্ঠান হচ্ছে। আমার বিশ্বাস যারা সঙ্গীত ভালোবাসে তাদের দেখার জায়গা বিটিভি। আমি নিয়মিত আছি।

বর্তমান ব্যস্ততা কি নিয়ে?

গান ছাড়া আর আমার ব্যস্ততা বলতে কিছু নেই। সংসার করতে হয় তো। ছেলে-মেয়ে, স্বামী, সংসার এসবও দেখতে হয়। মা মারা গেলেন দু’বছর হয়নি। আম্মাকে নিয়ে প্রায় আড়াই বছর হসপিটাল, ক্লিনিকে ব্যস্ত থাকতে হলো। মা মারা যাওয়ার পর থেকে নিত্যনৈমিত্তিক কাজগুলোও নিয়ম করে হয় না। মায়ের বিষয়, কাজেই মানসিক একটা প্রভাব তো থাকেই। কখনো কখনো ভালো লাগে না।

সঙ্গীত জগতে পা রেখেছিলেন কবে?

তিন/চার বছর বয়সে। তখন স্কুলেও যাইনি। আব্বা গান গাইতেন। আব্বা ডাক্তার ছিলেন। আব্বার নাম সৈয়দ ফরিদউদ্দিন। চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি গানের প্রতি আব্বার এবং আমার দাদুরও গানের প্রতি খুব অনুরাগ ছিল। প্রতিদিন সন্ধ্যায় আব্বার রেক্রিয়েশন ছিল গান করা। আব্বা গান করতেন তার কাছের বন্ধু হাবিবুর রহমান সাথীর সঙ্গে। আর হাবিবুর রহমান সাথীই ছিলেন আমার গুরু। তিনি ছিলেন থানা কৃষি কর্মকর্তা এবং খুব ভালো সঙ্গীতজ্ঞ। এটা তার নিয়মিত চর্চার বিষয়। তিনি আমাকে ‘সা’ উচ্চারণ করিয়েই বাবাকে বলেছিলেন, ওর গান হবে। ওর কণ্ঠ ভালো। এভাবেই শুরু।

পরবর্তীতে সঙ্গীতে আপনার গুরু কে কে ছিলেন?

আমার বিয়ের পরও আমার সঙ্গীত গুরু বাবার অই সাথী ভাই বন্ধু মানে আমার কাকু ছিলেন। পরে ঢাকায় চলে এলে কাকু বললেন, তুমি যদি ভালো গুরু পাও শিখতে পারো ঢাকায়। কারণ তুমি তো দূরে চলে গেছো, আর আমি তো চাকরি করি। কাজেই ঢাকা যেতে পারি না। কাকু অনুমতি দেয়ার পর আমি শিখেছি ওস্তাদ মিথুন দে’র কাছে। এই আমার দুজন গুরু। আমার ভাগ্যটা বেশ ভালো, দুজন গুরুর শেখানোর স্টাইল একই ছিল। আমাকে কোনো দ্বিধায় পড়তে হয়নি।

আপনার শৈশব কোথায় কেটেছে?

বাবা চাকরিজীবী ছিলেন, তাই আমার শৈশব কাটে জয়পুরহাটে। ওখান থেকেই আমার গ্রাজুয়েশন। এরপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে মাস্টার্স করি।

শ্রোতা দর্শকের কাছে একসময়ের ক্রেজ ছিলেন জীবনের একটা রোম্যান্টিক মোমেন্ট শেয়ার করুন আমাদের সঙ্গে

(হাসি) এসব বলা যাবে না। পছন্দ করতো তো অনেকেই। তবে ‘তুমি আমার’ লেখা একটা এক ইঞ্চি চিরকুট প্রথম জীবনে দিয়েছিল একজন। আমি তখন স্কুলে পড়ি। তার সাথে আর দেখা হয়নি। এরপর বড় চিঠি অনেক এসেছে। ওসব চিঠিতে আপনাদেরও যা লিখেছে, আমাদেরও তা-ই লিখেছে। অনুভূতির বিষয়তো একই রকম।

কি আর বলব! ( হাসি ) আমি যেহেতু গান করতাম, তাই একপাক্ষিক ব্যাপারটাই বেশি ছিল। আর দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে আমার বাড়িতে প্রচুর শাসন ছিল। জানলে মেরে শেষ করে ফেলবে। কাজেই সেই সাহস দেখাই নি।

আপনার বিয়েটা কি প্রেমের পরিণতি?

তার সাথে আমার পরিচয় ছিল এবং ভালো লাগার কথাও প্রকাশ করেছে। তবে প্রেম পর্যায়ে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। এর আগেই তিনি বিয়ের প্রস্তাব দেন আমার পরিবারে।

আপনার পরিবারের আর কেউ সঙ্গীতে যুক্ত আছেন?

আমার দুই মেয়ে এক ছেলে। তারাও গান করে। আমার স্বামী এবং তার ভাই-বোনেরাও সঙ্গীতপ্রেমী। তারা ছায়ানটের সাথে যুক্ত ছিলেন। বড় মেয়ের ঘরের নাতনি আছে আমার। নাতনির নাম আমেনা। আমারই রাখা নাম।

আপনাদের সময় এবং বর্তমান সময়ের সঙ্গে নজরুল সঙ্গীতের চর্চার কোনো ফারাক দেখেন কি?

অবশ্যই, অনেক পার্থক্য আছে। পার্থক্যটা পজেটিভ। যেমন- আমারা আগে অনেক গান জানতাম এটা নজরুলের গান না, এটা এই সুরের না। এখন কিন্তু সেই ভুল শুদ্ধের ঝামেলা যেটা ছিল, সব কিন্তু শুধরে এখন সঠিক সুরে গান করছে, নতুন প্রজন্ম গাচ্ছে। অর্থাৎ আদি রেকর্ড থেকে যে নোটেশনটা উদ্ধার করা হয়েছে সেগুলোই সমস্ত বই এবং সিডি আকারে পাওয়া যাচ্ছে। নজরুল ইন্সটিটিউট করেছে এটা। এটা কিন্তু যারা নজরুলচর্চা করে তাদের জন্য খুবই হেল্পফুল হচ্ছে। এবং আমাদের জন্যও হেল্পফুল। আমরা এমন গান করেছি, যা আমাদের অগ্রজরাও করেছেন, কিন্তু একসময় এসে শুনি এটা নজরুলের গান না। আমরা তো সাধারণত অগ্রজদেরই অনুসরণ করি। এমন অনেক গান করেছি, পরে শুনি এটা নজরুলের গান না বা তার সুর না। এটা কেন তার উত্তর আমি দিতে পারব না। এখনকার শিল্পীদের সেই ভুলটা হবে না। কারণ তারা অনেক ধরনের সাপোর্ট পাচ্ছে। নজরুলের গান এবং অথেনটিক সুরটা তারা পাচ্ছে, যার কারণে মনের জোরটাও পাচ্ছে তারা। আমাদের সময় এসব সুযোগ ছিল না।

নতুন শিল্পীদের সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কি?

তারা কষ্ট করছে। একটা গান গলায় তুলতে অনেক কষ্ট করতে হয়। যে গাচ্ছে, তার গায়কীটা কেমন হওয়া উচিত এটা তার জেনেই এগুতে হয়। যে গাচ্ছে সেতো ক্লাসিক্যাল বেজটা নিয়েই গাচ্ছে। ক্লাসিক্যাল বেজ না থাকলে  নজরুলের গান করা সম্ভব না। নতুন শিল্পীরাও বেশ ভালো করছে। তবে আমাদের সময় যেমন বহুদিন সাধনার পর মিডিয়ায় জায়গা পেয়েছি, এখন আর মিডিয়ায় জায়গা পেতে সেই সাধনা করতে হয় না। এখন মিডিয়ায় স্পেস অনেক বেশি, সবই হাতের কাছে। অনেক ক্ষেত্রে সহজে প্রচার পাওয়াটাও কিন্তু মাথা খারাপ করার জন্য যথেষ্ট।

উঠতি নজরুল সঙ্গীত শিল্পীদের প্রতি আপনার পরামর্শ কি থাকবে?

তাদের প্রতি পরামর্শ হলো ক্লাসিক্যাল চর্চাটা করতেই হবে। ক্লাসিক্যাল চর্চা মানে কিন্তু ক্লাসিক্যাল গাওয়া না। আর গাইতে পারলে তো আরও ভালো। ক্লাসিক্যাল চর্চাটা করলে হয়কি, নজরুলের গানে যে বিভিন্ন গহনার কারুকাজ আছে, তা ফুটিয়ে তুলতে ক্লাসিক্যাল দরকার। নজরুলের গানে কি কি গহনা আছে, তার কারুকাজ কেমন তা একজন নজরুল সঙ্গীত শিক্ষার্থীই বুঝবে।

সঙ্গীত জগতে সুদীর্ঘ হোক আপনার পথচলা শুভ কামনা

পরিবর্তন ডটকম এবং আপনার প্রতিও আমার শুভ কামনা।

এইচআর

 

সাক্ষাৎকার: আরও পড়ুন

আরও