রবীন্দ্রনাথ আমার নাম রেখেছিলেন: মীনাক্ষী দত্ত

ঢাকা, সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯ | ২৯ আশ্বিন ১৪২৬

রবীন্দ্রনাথ আমার নাম রেখেছিলেন: মীনাক্ষী দত্ত

সীমান্ত বাধন চৌধুরী ৮:৫৩ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ০৯, ২০১৯

রবীন্দ্রনাথ আমার নাম রেখেছিলেন: মীনাক্ষী দত্ত

স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তাঁর নাম রেখেছিলেন মীনাক্ষী। খ্যাতিমান লেখিকা প্রতিভা বসু আর খ্যাতনামা বাঙালি সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসু দম্পতির প্রথম কন্যা মীনাক্ষী দত্ত।  লেখক, কবি, সাংবাদিক এবং প্রবন্ধকার জ্যোতির্ময় দত্ত তাঁর স্বামী। এতবড় পরিচয়ের পাশেও রয়েছে তার নিজের আপন আলো।

একজন মীনাক্ষী দত্ত লেখক, কবি, সম্পাদক, সাহিত্যিক, সমালোচক, অনুবাদক, সংস্কৃতিকর্মী হিসেবে রয়েছে তাঁর পরিচিতি। মাও এর শেষ নর্তক - লি কুন শিন এর অনুবাদক,

রবীন্দ্রনাথের মীনাক্ষীর সাথে তার-বাবা মা ও রবীন্দ্রনাথের সাথে মীনাক্ষীর স্মৃতি এবং অন্যান্য প্রসঙ্গে কথা হয় সীমান্ত বাধন চৌধুরীর।

মীনাক্ষী দত্ত কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘মা-বাবা (বুদ্ধদেব বসু দম্পতি) প্রায়ই ওর (রবীন্দ্রনাথ) কাছে যেতেন এবং ওর সাথে প্রাতরাশ করতেন। একদিন সন্ধ্যেবেলা মা-বাবা আমাকেসহ তার কাছে যান। তার সেক্রেটারি এসে বলেন, গুরুদেব বিষম আছেন, সারা সন্ধ্যা পায়চারী করেছেন। কাল সকালে এসে প্রথমেই মেয়ের জন্য নাম চাইবেন। তার কাছে মেয়ের নাম চাননি বলে তিনি  দুঃখিত হয়েছেন। পরদিন মা গেলেন এবং খুব লজ্জা পাচ্ছেন। ইতস্তত করে বললেন যে, আপনাকে একটা কথা বলতে সাহস পাচ্ছি না। আমার মেয়ের একটা নাম দিন। এদিকে রবীঠাকুর মনে করেছেন, আমার বাবা-মা তাকে ছাড়া এদ্দিনে  নামধামের পর্ব সেরে ফেলেছেন।’

রবীঠাকুর খুব অভিমানসহ ব্যঙ্গ করেই বললেন, ‘কেন! যাও না, তুমি তোমার কবি স্বামীর কাছে! তোমার কবি স্বামীকে বল না! সে-ই রাখুক মেয়ের নাম।’

মাও ব্যঙ্গ করে বললেন, না না ও কি করবে। আপনি নামটা দিন।

তখন তিনি বললেন, নাম তো লেখাই আছে। তিনি একটা নোটবুক বের করে দেখালেন, নাম মীনাক্ষী।

এই নাম নিয়ে মা বাড়ি এলেন। কিন্তু মার নামটি পছন্দ হয়নি। মা আবার তাকে চিঠি লিখলেন, এসে খুব খারাপ লাগছে, আপনার কথা খুব মনে হচ্ছে ইত্যাদি বলে মা লিখলেন, পুনশ্চ- আমার মেয়ের একটা নাম দেবেন। মা ভেবেছিলেন, উনি কত ব্যস্ত লোক, একবার নাম দিয়েছেন তা তার মনে কি আছে! নিশ্চয়ই মনে নেই।

কিন্তু রবীন্দ্রনাথ মাকে চিঠির জবাব দিলেন বললেন, ‘মীনাক্ষী মাতাকে আশীর্বাদ’। অর্থাৎ তুমি মনে করেছ আমি ভুলে গেছি? আমি ভুলিনি। মানে আমি মীনাক্ষী নাম দিয়েছি, আমাকে ঠকাবার চেষ্টা করো না । (এসব বিশ্বভারতীতে রাখা আছে)। অবশেষে কবিগুরু অভিমান ভুলে আমার নাম রেখেছিলেন মীনাক্ষী।’

 রবীন্দ্রনাথের সাথে মীনাক্ষীর একটা ভাসা ভাসা স্মৃতি মনে পড়ে, যা তার কাছে অনেকটা স্বপ্নের মতই মনে হয়।

মীনাক্ষী বলেন, ‘ছোট্ট একখানা টেবিল সমান উঁচু বাচ্চা মেয়েটি দাঁড়িয়েছিলাম, আর রবীন্দ্রনাথ সে বাচ্চাটিকে  একটি লজেন্স দিচ্ছেন। আরেকটা স্মৃতি মনে আছে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর আগের। তিনি বসে আছেন ঘর অন্ধকার, চুলটুল কেটে দেয়া হয়েছে, রুমাল আছে। আর বাবাকে কাউকে কোনদিন প্রণাম করতে দেখিনি, কিন্তু বাবা (বুদ্ধদেব বসু) রবীন্দ্রনাথকে প্রণাম করলেন এবং আমি অবাক হয়ে দেখছিলাম যে, বাবা প্রণাম করলেন। এসব স্মৃতি আমার এখনো মনে আছে। আর রবীঠাকুরের সামনে পায়ের কাছে একটি মোড়ায় বসা আছি। আমার এই একটা ছবি আছে । (এসবও বিশ্বভারতীতে রাখা আছে) ভাগ্যিস ছবিটা আছে তাই প্রমাণ আছে। ছবিটা রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর তিন বছর আগে তাঁর বাড়িতে।’

খ্যাতনামা বাঙালি সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসু কন্যার কাছে তার দেশের বাংলা ভাষা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘এটাই তো আমার দেশ। মায়ের বাড়ি ঢাকার ১৫নং বক্সিবাজারে এখনো আছে।’ ঢাকায় এলেই তিনি ছুটে যান শেকড়ের সন্ধানে।

তিনি জানান, ‘বাড়িতে বাবার দিদিমা ছিলেন আর বাড়িতে বাংলা ভাষায়ই কথা বলা হতো। মানে বিক্রমপুরের, ঢাকার ভাষা। মায়ের ভাষায় চিরকাল একটু বাঙালি টান ছিল, কিন্তু বাবার ছিল না। আসলে মানুষ যেখানে বসবাস করে সেখানকার ভাষায়ই ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। বাবা খুবই ভালো বাংলা বলতেন। মায়ের গ্রামের বাড়ি ছিল বিক্রমপুরের হাসারা, আর বাবার বাবার বাড়ি মালখানগর। শহরে দাদু চাকরি করতেন বিধায় বকশীবাজার বাড়িতে থাকতাম। বকশীবাজারে পুরো বাড়ির স্মৃতি এখনো বেশ মনে পড়ে। বারান্দায় দাঁড়াতাম যখন, সেই চিনাবাদামওয়ালার ডাকটা কানে বাজে। কাঁচের চুরি ... এই কাঁচের চুরি ... এসব স্মৃতি কানে বাজে, চোখে ভাসে।’

মীনাক্ষীর চোখে বুদ্ধদেব বসুর শ্রেষ্ঠ লেখা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তার সব লেখাই শ্রেষ্ঠ। কোনটা রেখে কোনটা বলা যায়! বুদ্ধদেব বসুর মেয়ে হিসেবে আমি খুব গর্বিত। মাকে নিয়েও। বাবা লিখতেন কিন্তু বাবাকে লিখতে তো মা সাহায্য করতেন। সংসারের দিকে পিঠ ফিরিয়ে বাবা যে এতো লিখতে পেরেছেন, এসব মায়ের ত্যাগের জন্য।

সবকিছু সামলেই মা লিখতেন, মা ছবি আঁকতেন, শেলাই করতেন, অপূর্ব রান্না করতেন। মাকে নিয়েও আমি গর্ববোধ করি। ব্যক্তিগত জীবনে আমার স্বামী জ্যোতির্ময় দত্ত এবং আমাদের এক ছেলে, এক মেয়ে। মেয়েও লেখে। মেয়ের নাম কঙ্কাবতী দত্ত। আনন্দবাজারে কাজ করতো। আমার দুই নাতি, ছেলের একটি, মেয়ের একটি।’

বর্তমান ব্যস্ততা সম্পর্কে মীনাক্ষী বলেন, ‘Hamdi Bey-এর একটা বই অনুবাদ করছি। জাস্ট শেষ করলাম কলকাতা কবিতা পত্রিকার সংকলন। আরেকটা বই বের হয়েছে গতবছর বুদ্ধদেব বসুর ১০৪টি চিঠি আমায় লেখা, সেইসঙ্গে বাবার ওপর আমার চারটে লেখা। সেই বইটার নাম হচ্ছে ‘স্মৃতিতে চিঠিতে বুদ্ধদেব বসু’।

এইচ আর/

 

সাক্ষাৎকার: আরও পড়ুন

আরও