আমার নাম ছিল হারানো দিনের পার্বতী: দিলারা জামান

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

আমার নাম ছিল হারানো দিনের পার্বতী: দিলারা জামান

সীমান্ত বাঁধন চৌধুরী ৪:৩৭ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২৯, ২০১৮

আমার নাম ছিল হারানো দিনের পার্বতী: দিলারা জামান

নাটক ও চলচ্চিত্র অভিনেত্রী দিলারা জামান। ১৯৫৭ সালে স্কুলে পড়ার সময়ে যার অভিনয়ে হাতেখড়ি। চকের গুড়ো আর সিঁদুরের সংমিশ্রণে মেকআপ নিয়ে যখন অভিনয়ের মঞ্চে পা রেখেছিলেন তিনি, সেই থেকে আজ অবধি অভিনয়ের প্রতিটা শাখায় তার দাপুটে পদচারণা। আশির দশকে ‘সকাল-সন্ধ্যা’, ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘অয়োময়’ এর মতো দর্শক প্রিয় ধারাবাহিক টিভি নাটকগুলোয় তার অসামান্য অভিনয় মূলত তাকে দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে দেয়। এরপর আর তাকে পেছনে তাকাতে হয়নি। একের পর এক ছোট পর্দা, বড় পর্দায় কাজ করে গেছেন অবিরত।

‘আগুনের পরশমণি’, ‘প্রিয়তমেসু’, ‘ব্যাচেলর’, ‘চন্দ্রগ্রহণ’, ‘মনপুরা’, ‘ব্রিহন্নলা’, ‘হালদা’ এমন সব সিনেমায় দক্ষতার স্বাক্ষর রাখার পাশাপাশি টিভি নাটক এবং বেশকিছু স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রেও কাজ করেন দিলারা জামান এবং জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।

দিলারা জামানের হাতে এখন বেশ কিছু নাটক, সিনেমার কাজ রয়েছে। কাজকে ভালবেসে তাকে প্রায় দিন এখনো শ্যুটিংয়ে দৌড়াতে হয়। প্রকৃতি তাকে ৭৬ বছর বয়সে টেনে নিয়ে এলেও তিনি কাজের ক্ষেত্রে থেমে নেই, তবে মাঝে মাঝে স্ক্রিপ্ট ভুলে যান, আর কিছুটা ক্লান্তি পেয়ে বসে। তার সোনালী অতীত আর বর্তমান এই প্রতিবেদকের কাছে তুলে ধরেছেন তিনি।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- সীমান্ত বাঁধন চৌধুরী 

অভিনয় জগতে কবে পা রেখেছিলেন?

ছোটবেলা থেকে সিনেমা দেখতে দেখতে মনে হতো যে একটা মানুষ কিভাবে পর্দার ভেতরে হাসছে-কাঁদছে, ওটা দেখে দেখে একটা মুগ্ধতা এসেছে। এরপর সরাসরি মঞ্চে ডাকসুর একটা নাটক হচ্ছিল, সে অনেক বছর আগে। আমি তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি। আমার বাবাকে কার্ড দেয়া হয়েছিল, বাবার সাথে গিয়েছিলাম। সেখানে মমতাজ লিলি খান, জহরত আরা এরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। জহরত আরা, আব্দুল জব্বার খানের প্রথম বাংলা ছবি ‘মুখ ও মুখোশে’ কাজ করেছেন। তো এরা তখন মঞ্চে অভিনয় করছেন, আর আমি অবাক হয়ে দেখছি যে জীবন্ত মানুষ মঞ্চে হাসছে, কাঁদছে কথা বলছে, দেখে আমি বিমোহিত, মানুষ কেমন করে পারে! সেটা যে অভিনয় তা আমি ততদিনে বুঝে গেছি। তখন থেকেই মনের মধ্যে একটা সুপ্ত আশা, স্বপ্ন কাজ করছিল।

পরে স্কুলে ম্যাট্রিকের ফেয়ারওয়েল হবে, তখন ছোট একাঙ্কিকা এবং অন্যান্য একটা অনুষ্ঠান হবে, সেখানে শরৎচন্দ্রের ‘মামলার ফল’ ওটা আমাদের পাঠ্যও ছিল। ওটাকে নাট্যরূপ দিয়ে আমরা মঞ্চে করলাম। সেটা ১৯৫৭ সালে বাংলাবাজারের স্কুলের কথা। আমি তখন কিশোরী ক্লাস টেনে পড়ি। অভিনয় করার সময় তখন মেকআপ দেয়া হতো মুখের মধ্যে চকের গুড়ো আর সিঁদুর মিশিয়ে। মুখটাকে একটু লাল সাদা করা আর কি। ঠাঁটারি বাজার একজনের বাসা, উনি কিনে নিয়ে আসতেন। ওটা মেখে আমরা অভিনয় করতাম। ওটা মাখার পর সাদা ভুতের মতো মুখখানা, আমি নিজেকে এতই গর্বিত মনে করতাম যে বাংলাবাজার স্কুল থেকে লালাবাগের বাসায় আসার সময় বাসের জানালা দিয়ে সারাক্ষণ মুখটা বের করে রাখতাম। মনে করছিলাম, লোকে দেখুক যে কিছু একটা করেছে। ওটা নিজেকে জাহির করার একটা প্রয়াস, এখন হাসি পায় ওই পাগলামির কথা মনে করে। রোকেয়া রহমান নামে আমাদের একজন শিক্ষক ছিলেন যিনি অভিনয়ের ব্যাপারে আমাদের গাইড দিতেন স্কুলে। ওই একটু একটু অভিনয় করে নাম হয়ে গেল। এভাবেই অভিনয়ে হাতেখড়ি।

চকের গুড়ো আর সিঁদুরের মেকআপ নেয়া মেয়েটি একজন দক্ষ অভিনেত্রী হয়ে উঠলেন কীভাবে?

বাংলাবাজার স্কুল পেরুনোর পর ইডেনে ভর্তি হলাম, তখনও বার্ষিক অনুষ্ঠানগুলোতে অভিনয় করতাম এবং প্রশংসা কুড়িয়েছি। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হই। সেখানেও ডাকসুর প্রোগ্রাম এবং অন্যান্য মঞ্চ নাটকগুলো করার সুযোগ পাই। তবে শিক্ষা যেটা, সেটা আমি পেয়েছি অধ্যাপক নুরুল মোমেনের কাছ থেকে। উনি আইন বিভাগে অধ্যাপনা করেন এবং অনেক নামকরা নাটক লিখেছেন তখন। এরপর টিচার্স ট্রেনিং কলেজে মঞ্চ করলাম, ডাকসুতে করলাম আলাউদ্দিন আল আজাদের লেখা ‘মায়াবী প্রহর’। আমার বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন, ইতিহাস বিভাগের ছাত্র আবদুল্লাহ আল মামুন, এবং সায়েন্স ফ্যাকাল্টির ড. ইনামুল হক তিনিও অভিনয় করেছেন। ‘মায়াবী প্রহর’-এ খুব ভাল করেছিলাম এবং খুব প্রশংসিত হয়েছিলাম। তখন ‘পূর্বাণী’, ‘চিত্রালি’-তে এসব পত্রিকায় নাম ছবি ছাপা হওয়া মানে বিরাট ব্যাপার। সবখানে ছেপেছিল। স্বাধীনতার পরবর্তী সময় চিটাগাং-এ অরিন্দম নাট্যগোষ্ঠীর সাথে সরাসরি যুক্ত হলাম এবং আট/দশ বছর আমি গ্রুপে কাজ করি। এর আগে ১৯৬৪ সালের ডিসেম্বরে রেডিও টেলিভিশনে কাজ করেছি। তখন ডাইরেক্ট টেলিকাস্ট হতো। ১৯৮০ সাল থেকে টেলিভিশনে একটানা কাজ শুরু করেছিলাম। তখন থেকেই দর্শক দিলারা জামান হিসেবে আমাকে চিনতে শুরু করল।

তখনকার সমাজ ব্যবস্থায় তো মেয়েদের অভিনয়ে আসাটা অনেক কঠিন ছিল পরিবার আপনাকে সাপোর্ট করেছিল?

তখন অভিনয়ের জন্য মেয়ে না পেলে অনেক সময় দেখেছি, ছেলেদের মেয়ে সাজিয়ে অভিনয় করাতো। ধীরে ধীরে এটা বদলাতে শুরু করে। আর আমার ফ্যামিলিতে ছোটবেলা বাবার সহযোগিতা পেয়েছি বলেই অভিনয়ে আসাটা সহজ হয়েছে। এরপর আমার স্বামী ফখরুজ্জামান চৌধুরী, বিশিষ্ট অনুবাদক, তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক। তার সহযোগিতা না পেলে আমার মনে হয় না আমি এতদূর আসতে পারতাম।

অভিনয়ের বাইরে আপনিতো শিক্ষকতা করতেন?

দীর্ঘ ২৬ বছর চাকরি করেছি। স্কুলে শিক্ষকতা করেছি। প্রথম চাকরি নারী শিক্ষা মন্দির, ঢাকার টিকাটুলিতে। ওটা এখন হয়েছে শেরেবাংলা স্কুল এন্ড কলেজ। এরপর বিএড করলাম। ময়মনসিংহ যখন ছিলাম তখন এমএড করলাম। দুটোতেই ভাল রেজাল্ট করলাম। তখন অভিনয়কে মানুষ পেশা হিসেবে নেয়নি। যারাই অভিনয়ে ছিল, তারা পাশাপাশি অন্য একটা পেশার সাথে যুক্ত ছিল। চিটাগাং পাবলিক স্কুলে প্রায় আট বছর চাকরি করেছি, ঢাকায় মেহেরুন্নেসা স্কুল, শাহিন স্কুল এবং সর্বশেষ ভিকারুন্নেসা দিয়ে শেষ করলাম। ২০০০ সাল থেকে অভিনয়কেই পেশা হিসেবে নিয়েছি। অভিনয়টা আমার পেশা এবং ভাল লাগা দুইই।

দীর্ঘ সময় টিভি, সিনেমায় কাজ করে যাচ্ছেন, এত এনার্জি  কোথায় পান?

ভাল লাগা রক্তের সাথে মিশে যাওয়া একটা ব্যাপার আছে। তাছাড়া আমার মনে হয় টিচিং এন্ড অ্যাকটিং ওয়ান ক্যান নট গিভআপ আরকি (হাসি)। কাজকে ভালবাসলে মানুষ যতক্ষণ শরীরে শক্তি থাকে, মনে জোর থাকে করে যেতে পারে।

ক্লান্তি অনুভব করেন না কখনো?

হ্যাঁ, এখনতো বয়স হয়ে গিয়েছে। এখন একটানা কাজও করতে পারি না। দুদিন কাজ করলেই ক্লান্ত লাগে। যখন দেখি সবাই এত ভালবাসে, আমাকে মা বলে ডাকে, শ্যুটিং থাকলে লাঞ্চ করতে সবার বিকেল সন্ধ্যা হয়ে যায় কিন্তু আমাকে সবাই দুটো বাজলেই খেয়ে নেয়ার জন্য বলে। সবাই খুব কেয়ারিং আমার প্রতি। এই যে একটা মায়া এটাই আমাকে টেনে নিয়ে যায়।

আশির দশকে যখন অয়োময়, এইসব দিনরাত্রি করেছেন, তখন মানুষের নাটক দেখার প্রতি একটা আগ্রহ ছিল এখন নেই কেন?

আসলে তখন তো টিভিই ছিল একটা। বিনোদন বলতে ওই বিটিভি। তবে তখন পারিবারিক সুখ, দুঃখ, হাসি-কান্নার যে নাটকের গল্পগুলো সবাই দেখার মতই ছিল। বাবা-মা ভাই-বোন, ছেলে-মেয়ে, গৃহকর্মী সবাই একসাথে বসে টেলিভিশন দেখত। আর এখনতো সময় আর প্রযুক্তি বিশ্বকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে। প্রযুক্তি যেমন আমাদের ভাল কিছু দিয়েছে, আবার অনেক ভাল লাগাকে ম্লানও করে দিয়েছে। এখন এতগুলো টেলিভিশন চ্যানেল হয়েছে, সেখানে যেমন মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে সেটা যেমন ভাল দিক, আবার বসে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে একটা কিছু উপভোগ করা তা হচ্ছে না। একেবারে অবসরপ্রাপ্ত, পুরোপুরি গৃহিণী, আমার মত বুড়ো, হাতে প্রচুর সময়, তারা সে সময়টায় টিভি দেখছে। তবে সময়ের সাথে সাথে এখন মানুষের ব্যস্ততা বেড়েছে, টিভি বা নাটক কম দেখার এটাও একটা কারণ।

কোন ধরনের চরিত্রে কাজ করে আপনার বেশি ভাল লেগেছে?

কাজ আমার কাছে কাজি। চরিত্র যেটাই হোক, তা মানুষের মনে রাখার মতো কাজ হতে হবে। হতে পারে তা মায়ের চরিত্র, তখন আমাকে একজন আদর্শ মায়ের ভূমিকায় যা যা করণীয়, তা প্রাণ ঢেলে করার চেষ্টা করি। আবার রুক্ষ, কঠোর মহিলার চরিত্রেও ওভাবেই কাজ করি। তখন পরিচিতজনদের সাথে দেখা হলে কেউ কেউ বলে, তুমি এমন রুক্ষ! কিভাবে এসব করলা! তখন মনে হয়, তাহলে আমি অভিনয়টা ঠিকভাবেই করতে পেরেছি। মানুষ ওই চরিত্রকেই বাস্তব ব্যক্তির সাথে মিলিয়ে ফেলে। এইখানেই কাজের সার্থকতা আমি মনে করি।

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটা স্বল্পদৈর্ঘ্য করছিলেন শুনেছিলাম ...ওটার কাজ শেষ?

ওটা হচ্ছে “ওমর ফারুকের মা”। এটা একটা অনুদানের ছবি। জমা হবে শিগগিরই। ছবিটা একটা সত্য ঘটনা অবলম্বনে। ছবির কাজ শেষ করে আমি ওমর ফারুকের মায়ের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম বরিশালের পিরোজপুরে। এই মা এখনও দরজা বন্ধ করেন না। সে তার মেয়েকে বলে, “দরজা খোলা রাখো আমার ওমর ফারুক আসবে। ও দরজা বন্ধ পেলে চলে যাবে। ভাতের চাল একটু বেশি দিও, ওমর ফারুক তো একা আসবে না, তার সাথে আরও দুই একজন থাকবে”।

এ কাজটি করতে গিয়ে আমি কেঁদেছি, ক্যামেরার পেছনে যারা ছিল তারা সবাই কেঁদেছে। সত্যিকারের ওমর ফারুকের মায়ের বয়স এখন ৯৩ বছর। ঠিকমত কথাও বলতে পারেন না। ছেলের জন্য এখনো অপেক্ষা করছেন (কান্না। টিস্যুতে চোখ মুছলেন দিলারা জামান)।

আপনার সোনালী অতীত নিয়ে কিছু বলুন 

এখন আর সোনালি কোনো অতীত নেই। একটা কথা খুব মনে আছে, ১৯৬৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় পহেলা বৈশাখে আমার নাম দিয়েছিল ‘হারানো দিনের পার্বতী’। বন্ধুরা এ নামেই ডাকতো (হাসি)।

সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আরও দীর্ঘ হোক আপনার এ পথচলা, শুভকামনা এবং অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে।

পরিবর্তন ডটকমকেও ধন্যবাদ। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন।

এসবিসি/এসবি