সিনেমায় সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন শাহরিয়ারের

ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮ | ৩০ কার্তিক ১৪২৫

সিনেমায় সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন শাহরিয়ারের

জাহিদুল ইসলাম, জবি ১০:৩৯ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ০৯, ২০১৮

সিনেমায় সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন শাহরিয়ারের

সিনেমা কি একটি সমাজ বিনির্মাণ করতে পারে? উত্তরে যখন নবীন নির্মাতা বলেন, হ্যাঁ, সিনেমায় পারে একটি সমাজের পুনর্বিন্যাস করতে। তখন শুধু বোদ্ধাই নন, দর্শক-শ্রোতাদেরও একটু নড়েচড়ে বসতে হয়।

কথা হচ্ছিল ‘অনির্বাণ ফিল্মস’র কর্ণধার আবদুল মজিদ চৌধুরী শাহরিয়ারের সঙ্গে। পরিবর্তন ডটকমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি তার স্বপ্ন, কর্মতৎপরতা, সিনেমা জগতের বর্তমান সংকট, উত্তরণের উপায়সহ নানা প্রসঙ্গ জানিয়েছেন।

এতকিছু থাকতে সিনেমা নির্মাণকে কেন বেছে নিলেন— এমন প্রশ্নের জবাবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের এই ছাত্র বলেন, একটা সময় আমি লেখালেখি করতাম। এক পর্যায়ে উপলব্ধি হলো, এই মাধ্যম দিয়ে আমি শুধুমাত্র শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর কাছে যেতে পারব। সমাজকে আমি কোনো বার্তা দিতে চাইলে, সেটি যারা পড়বে কেবল তারাই জানবেন। বিষয়টি তারা চিন্তা-ভাবনা করে ছড়ালে সেটি অন্যরা পাবে অথবা কেউ পাবেনই না। এটি খুবই দীর্ঘ প্রক্রিয়াও বটে।

এই ভাবনার পর মঞ্চনাটকে কাজ শুরু করলাম। সেখানেও ভিন্ন চিত্র, হাতেগোনা কিছু মানুষের কাছে বার্তা পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। তখন মাথায় আসলো, সমাজকে নতুন কিছু দেয়া কিংবা নতুন করে সমাজ বিনির্মাণ করতে গেলে সিনেমার কোনো বিকল্প নেই। এই মাধ্যমে খুব কম সময়ের মধ্যে আমি বিশ্বব্যাপী আমার বার্তাকে ছড়িয়ে দিতে পারব। এইতো এরপরই সিনেমা জগতে কাজ শুরু করলাম।

কথা প্রসঙ্গে শাহরিয়ার তার ওপর সিনেমা কিভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে, সে গল্পও শোনান। এ বছর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় ফিলিস্তিনের নারী পরিচালক ইমতিয়াজ আলমগিরিবির ‘ডিটেনশন’ সিনেমা। এটি তাকে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। ‘ডিটেনশনে’ তিনি বাস্তবতার নিরিখে দেখালেন, আল আকসা মসজিদের সামনে ইসরাইলি সেনাদের হাতে ফিলিস্তিনি মুসলিম নারীদের হয়রানি ও গ্রেফতার।

শাহরিয়ারের ভাষ্যে, এটি দেখার পর আমার কাছে মনে হয়েছে, একজন সিনেমা পরিচালক অস্ত্র ছাড়াই সত্যিকারের যোদ্ধা। যিনি নতুন নতুন যোদ্ধা যেমন তৈরি করতে পারেন, সঙ্গে অস্ত্রধারী অনেক যোদ্ধাকেও অনায়াসে পরাজিত করতে সক্ষম।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রাঙ্গনের সংকট নিয়ে যেমন অভিযোগ, অনুযোগ রয়েছে তার। পাশাপাশি এও মনে করেন, আমাদের দেশের নির্মাতাদের দেশপ্রেম, আদর্শ ও নৈতিকতা বিষয়ে বেশি বেশি সিনেমা বানানো উচিত। এটি সম্ভব হলে আমরা সহজেই সমাজকে পরিবর্তন করতে পারব। কিন্তু, যারা নিজের ভেতরে এমন চিন্তা লালন করছেন, তাদের যথাযথ প্লাটফর্ম কিংবা স্পেস দেয়া হচ্ছে না। ফলে সিনেমার মাধ্যমে সমাজ বিনির্মাণের যে ধারা, সেটিতে বাংলাদেশ সফল হতে পারছে না।

সিনেমার শক্তি বাংলাদেশ দেখেছে, ১৯৭১ সালে। কিছু গান, কিছু ভিডিওচিত্র কিভাবে আমাদের ওপর চলে আসা রাজনৈতিক নিপীড়ন, সাংস্কৃতিক গোলামী আর অর্থনৈতিক শৃঙ্খল ভাঙার ক্ষেত্রে তৈরি হওয়া মুক্তির আন্দোলনে জ্বালানি সরবরাহ করেছিল। এরও আগে ১৯২৫ সালে বিশ্বখ্যাত রাশিয়ান পরিচালক সের্গেই আইজেনস্টাইন তার ‘ব্যাটেলশিপ পটেমকিন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে গোটা বিশ্বে বিপ্লব ঘটিয়েছেন। যুদ্ধজাহাজ পটেমকিনের বিদ্রোহ থেকেইতো পরবর্তীতে জমাট বেঁধেছিল শ্রমিকদের অর্থনৈতিক মুক্তির আন্দোলন।

ঋত্ত্বিক ঘটকের সিনেমা সব সময় কথা বলে রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে তার মেঘে ঢাকা তারা, কোমল গান্ধার, সুবর্ণরেখা, যুক্তি-তক্কো-গপ্পো— প্রত্যেকটি ছবিতে প্রাধান্য পেয়েছে দেশভাগ থেকে উৎসারিত যন্ত্রণা, ছিন্নমূল-উদ্বাস্তু মানুষের বেদনার কথা আর নতুন জায়গাকে আপন করতে না পারার যন্ত্রণাগাঁথা।

চলচ্চিত্রের ওপর শাহরিয়ারের কোনো মৌলিক পাঠ নেই। কিন্তু, প্রবল আগ্রহ কিছু কিছু সময় মানুষকে করে তোলে বিপ্লবী। তেমনি দ্বাদশ শ্রেণি পড়ুয়া শাহরিয়ার নির্মাণ করে ফেললেন বাস্তব গল্প নির্ভর যৌন হয়রানির প্রতিবাদে ‘স্ট্রং আইডিওলজি’। ২০১৬ সালে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে এটির প্রিমিয়ার করেন ঘটা করে। মাত্র সাড়ে আট মিনিটের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটি ব্যাপক সাড়া ফেলে।

সে সময়েই চট্টগ্রামের বন্ধুদের নিয়ে শাহরিয়ার গড়ে তোলেন ‘অনির্বাণ ফিল্মস’, যেটি সংগঠন থেকে এখন প্রতিষ্ঠান হয়েছে। তিনি এটার নির্বাহী। চট্টগ্রামের গণ্ডি পেরিয়ে শাহরিয়ার এখন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এখানে এসে খুব কাছ থেকে দেখেছেন প্রকাশনার রাজ্য বাংলাবাজার, ইসলামপুর ও চকবাজারকে। এখানকার মানুষের কর্মব্যস্ততা তাকে ভীষণ নাড়া দেয়।

তাইতো ছাপাখানা প্রকাশনার ইতিহাস, বই তৈরিতে নিয়োজিত শ্রমিকগোষ্ঠীর জীবনাচরণ, কর্ম পরিবেশ নিয়ে শাহরিয়ার নির্মাণ করছেন গবেষণাধর্মী প্রামাণ্যচিত্র, ‘Banglabazar; A land of Book Production’.

তিনি বলেন, ‘আমরা কত মানুষকে পুরস্কৃত করছি। রাষ্ট্র ও সমাজের কতশত উন্নয়ন প্রকল্পের কথা বলছি। কিন্তু, পুরনো ঢাকার এই অঞ্চলের পুস্তক বাঁধাই শ্রমিকদের নিয়ে কেউই কিছু করছি না। পাঠক বই পড়ে লেখককে চিনেন। কিন্তু, বই প্রকাশনার নৈপথ্যের কারিগরদের চিনেন না। বই মেলায় লেখকের সঙ্গে মানুষজন দেখা করেন। কিন্তু, যার রক্তঘামে লেখকের কথামালা পেল, পাঠক তাকে ধন্যবাদটুকুও দেন না।’

শাহরিয়ারের স্বপ্ন, বই বাঁধাইয়ের নিরক্ষর শ্রমজীবী মানুষ, তাদের দুঃখগাঁথা, সুখ-স্বপ্ন এবং প্রকাশনার স্বর্গভূমি বাংলাবাজারকে আমি বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরব।

জেডআই/আইএম