বঙ্গবন্ধুই আমার সঠিক মূল্যায়ন করেছেন

ঢাকা, ১ জুলাই, ২০১৯ | 2 0 1

বঙ্গবন্ধুই আমার সঠিক মূল্যায়ন করেছেন

সীমান্ত বাঁধন চৌধুরী ১০:১৫ পূর্বাহ্ণ, জুন ৩০, ২০১৮

বঙ্গবন্ধুই আমার সঠিক মূল্যায়ন করেছেন

ড. কামাল হোসেন। বিশিষ্ট আইনজীবী, রাজনীতিবিদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান রচনা কমিটির প্রধান ছিলেন। এখন গণফোরামের সভাপতি ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার আহ্বায়ক।

বঙ্গবন্ধুর প্রিয়ভাজন এই রাজনীতিক ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হয়েছিলেন। বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতি, আইনের শাসন, নির্বাচন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে পরিবর্তন ডটকমের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সীমান্ত বাঁধন চৌধুরী। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্ব আজ—

সদ্য স্বাধীন দেশের বড় চ্যালেঞ্জ সংবিধান প্রণয়ন। এমন একটি কঠিন কাজের দায়িত্ব বঙ্গবন্ধু আপনাকে দিয়েছিলেন। সংবিধান প্রণয়নে তখন কোন পরিস্থিতিকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন?

পশ্চিম পাকিস্তান আর আমাদের মধ্যে (পূর্ব পাকিস্তান) অর্থনৈতিক বৈষম্যের মূল কারণ হলো শাসনব্যবস্থা। আমাদের সিংহভাগ বৈদেশিক মুদ্রা আসতো পাট দ্রব্য রফতানি করে। কিন্তু, বরাদ্দের সময় দেখতাম, শিক্ষাব্যবস্থা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা অন্যান্য খাতে এসব ব্যয় হতো পশ্চিম পাকিস্তানে। এই জিনিসটাকে ধরে আমরা পাকিস্তান সংবিধানের সংশোধনীগুলো করলাম। আওয়ামী লীগ থেকে দায়িত্ব পেয়ে আমি আমাদের সহকর্মীদের নিয়ে এটা করেছিলাম, যে কীভাবে এই অর্থের ওপর নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীয় সরকার থেকে সরিয়ে আঞ্চলিক সরকারের অধীনে করা যায়। তারপর যখন স্বাধীন হয়ে গেলাম, তখন স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে তো আরও সহজ হয়ে গেল সংবিধান প্রণয়ন করা।

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সংবিধানের কোনো পরিমার্জন-পরিবর্ধনের দরকার আছে বলে মনে করেন কী?

৪০/৪৫ বছর পরে অভিজ্ঞতার আলোকে যেকোনো কিছুরই উন্নতি করার সুযোগ রয়েছে। একটা জিনিস যেটা সত্তরের অনুচ্ছেদে আছে, দলীয় নিয়ন্ত্রণ। তখনও আমরা অনেকে বলেছিলাম, এই দলীয় নিয়ন্ত্রণ হলে সংসদ সদস্যদের দায়িত্ববোধ কমে যাবে। অনেকেই মনে করেন, সংসদ সদস্যদের ভূমিকা রাখতে ৭০ অনুচ্ছেদ একটি বাধা। মোটা দাগে এটাকে সংশোধন করা জরুরি।তারপরে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা এখন যেমন আছে। সবাই মনে করেন, অন্যান্য সংসদীয় গণতন্ত্র যেসব দেশে আছে যেমন: ইংল্যান্ড, ভারত। এসব রাষ্ট্রে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার একটা ভারসাম্য আছে, যা আমাদেরও থাকা উচিত। আমরা বলেছি, জনগণের একটা মতামত নিয়ে সংলাপের মধ্যদিয়ে সংশোধনীর ভাষাটা বের হয়ে আসবে। তখন এটা সংসদে দুই তৃতীয়াংশ মেজরিটি রেজ্যুলেশন নিয়ে ভোট নিয়ে পাস করাতে হবে।

জনগণ সংসদে প্রতিনিধি নির্বাচন করছেন। এই প্রতিনিধির মাধ্যমে তার আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন কতটুকু ঘটছে বলে আপনি মনে করেন?

‘জনগণ ক্ষমতার মালিক’ এটা লেখা আছে সংবিধানের সপ্তম অনুচ্ছেদে। ১৬ কোটি মানুষ তো সরাসরি এক জায়গায় হয়ে দেশ শাসন করতে পারে না। তারপর প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র, দ্যাট মিন্স অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সংসদ সদস্যদের নির্বাচিত করা। এখন নির্বাচন নিয়ে কেন এত উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়? মনে করা হয়, নির্বাচন পদ্ধতিতে হাত দেয়া হচ্ছে বা নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষভাবে তার দায়িত্ব পালন করছে না। তো এখানে নির্বাচন কমিশন, পুলিশ প্রশাসন সকলেরই দায়িত্ব আছে। আর সর্বোপরি টাকা যেভাবে নির্বাচনের মধ্যে ঢুকেছে, এখন আর কোটি টাকা বললে লোকে আমাকে আউট ডেটেড মনে করে। এখন পাঁচ কোটি দশ কোটি বলতে হয়। একজন সংসদ সদস্যের নির্বাচন করতে মিনিমাম পাঁচ কোটি টাকা লাগে। এই যে এখন চার হাজার কোটি, পাঁচ হাজার কোটি এগুলো আমরা জীবনেও শুনি নাই। হাজার কোটি লিখতে বললে কয়টা শূন্য দিতে হয় তা গুণতে গেলে কষ্ট হয়।

আপনিই বললেন জনগণকেই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক করেছেন। কিন্তু, বাস্তবে এই মালিকানা আমরা কতটা ভোগ করতে পারছি?

মৌলিক অধিকারের যে বিধানগুলো আছে, সেগুলো কার্যকরভাবে আমাদের দেখতে হবে। যেমন: বাকস্বাধীনতা, সভা-সমিতি করার স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা। এগুলো কার্যকর গণতন্ত্রের নমুনা। কিন্তু, জনগণ ক্ষমতার মালিক হিসেবে ভূমিকা রাখতে হলে সব ধরনের ভয়ভীতি, হুমকি থেকে মুক্ত হওয়া দরকার। মুক্ত হওয়ার পথই হলো সংবিধান মেনে যদি সবাই তাদের দায়িত্ব পালন করে, তখন মানুষ অনেকটা সেই পরিবেশ পাবে, যেখানে তারা ক্ষমতার মালিক হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারবে।

কী ধরনের শাসনব্যবস্থায় মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হতে পারে?

প্রথমত হলো সাংবিধানিক শাসন। দেশের শাসনব্যবস্থা সংবিধান মেনে করতে হবে। তার মধ্যে আছে আইনের শাসন। আইনের শাসনকে যদি শক্তভাবে করা হয়, যারা অন্যায় অপরাধ দুর্নীতি করে পার পাচ্ছে, তারা মনে করে শাস্তি তো হচ্ছে না বরং তারা পুরস্কৃত। এখানে কার্যকর আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আইনের শাসন থাকলে এসব পাচার অনেক কমে যাবে। দেশের শাসনব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যদি মানুষের মৌলিক অধিকারকে নিশ্চিত করা যায়, মানুষ তখন নিজেকে নিরাপদ মনে করবে। তাছাড়া দেশের রাজনীতিতে এটা আসা দরকার, মানুষের ন্যায্য প্রাপ্য কী কী? এটা থেকে মানুষ কেন বঞ্চিত হচ্ছে, এটা বুঝতে হবে। মোট কথা আমরা যেন সাংবিধানিক শাসনকে নিশ্চিত করতে পারি, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারি, এগুলো সংবিধানের মৌলিক কথা। শুধু যদি আমরা সুশাসনটাকে নিশ্চিত করতে পারি, তবেই মানুষের স্বপ্নপূরণ সম্ভব হবে।

আমরা সবাই জানি, বঙ্গবন্ধু আপনাকে অনেক বেশি স্নেহ করতেন। খুব কাছ থেকে আপনি তাকে দেখেছেন, প্রশাসন সামলেছেন। মহান এই ব্যক্তির সঙ্গে আপনার কাজের অভিজ্ঞতা যদি বলতেন...

বঙ্গবন্ধুর সময়ে আমার সবচেয়ে বেশি মূল্যায়ন হয়েছে, সঠিক মূল্যায়ন যেটাকে বলে। ওই বয়সে আমি যেই সুযোগগুলো পেয়েছি, এমনকি দুই হাত কেটে দিলেও তার বিনিময়টা হয় না। তখন আমার বয়স ৩৩/৩৪। ওই বয়সে যা পেয়েছি আমি মনে করি, এগুলো আল্লাহর রহমত। পাকিস্তানিদের হাত থেকে বঙ্গবন্ধুর বেঁচে আসা আর আমার বেরিয়ে আসা, শুধু বেরিয়ে আসা না, উনি আমাকে সঙ্গে করে প্লেনে নিয়ে আসলেন। একাত্তরের কথা, এরপর একদিন বঙ্গভবনে সবার সঙ্গে বসে চা খাচ্ছি। বঙ্গবন্ধু আমাকে দেখে বললেন, ‘তুমি আজকে দু’টার সময়ে একটু বঙ্গভবনে আইসো, আর একটু পরিষ্কার জামা-কাপড় পড়ে এসো (হাসি)’। আর কিছু বললেন না। আমার তো জামা-কাপড় কম ছিল। এক বন্ধুর নাম ‘টুলু’, ওর একটা পাজামা-পাঞ্জাবি পরে ঘুরতাম আর কি (হাসি)।

যথারীতি বঙ্গবন্ধুর কাছে গেলাম। তিনি বললেন, ‘তোমাকে তো এখন শপথ নিতে হবে। কেবিনেটে একজনকে অ্যাড করা হচ্ছে, সেখানে তোমাকে নিচ্ছি’। তাজউদ্দীন ভাইয়ের যে কেবিনেট ছিল, তার মধ্যে একজনকে যোগ করা হলো সেদিন, সেটা হলাম আমি। এটা বিরাট ভাগ্য, স্বাধীন বাংলাদেশে এটা আমার বিরাট প্রাপ্তি। বঙ্গবন্ধু এবং তাজউদ্দীন আহমেদ ওনাদের যে আমি কাছে থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি, তাদের যে সাহস আর নীতি এই বড় মাপের মানুষ তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমি বলার কারণ হলো, এগুলো মানুষের কাছে বেশি বেশি তুলে ধরা দরকার।’

আগামীকাল রোববার পড়ুন সাক্ষাৎকারের দ্বিতীয় পর্ব...

এসবিসি/এসবি/আইএম

 

পরিবর্তন বিশেষ: আরও পড়ুন

আরও