মেয়ে দেখলেই প্রেমে পড়ে যেতাম: ফারুক আহমেদ

ঢাকা, সোমবার, ২৩ জুলাই ২০১৮ | ৮ শ্রাবণ ১৪২৫

মেয়ে দেখলেই প্রেমে পড়ে যেতাম: ফারুক আহমেদ

পরিবর্তন প্রতিবেদক ৪:০১ অপরাহ্ণ, জুন ২৩, ২০১৮

print
মেয়ে দেখলেই প্রেমে পড়ে যেতাম: ফারুক আহমেদ

বাংলাদেশের জনপ্রিয় নাট্য অভিনেতাদের মধ্যে অন্যতম একজন তিনি। হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত নাটক-চলচ্চিত্রের নিয়মিত মুখ তিনি। অভিনয়ের মাধ্যমে নির্মল বিনোদন ও হাসির খোরাক জোগানোর কাজটা দক্ষতার সাথে করে আসছেন এখনো। তিনি জনপ্রিয় কৌতুক অভিনেতা ফারুক আহমেদ।

অভিনয়ে আসা, প্রতিষ্ঠা পাওয়া। ব্যক্তিগত জীবনে তার প্রেম- ভালোবাসা, বিয়ে ইত্যাদি বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন। তার চুম্বক অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরেছেন পরিবর্তন ডটকমের প্রতিবেদক সীমান্ত বাঁধন চৌধুরী

অভিনয়ের শুরুটা কবে, কীভাবে?

ফারুক: অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ ছিল আমার স্কুল জীবন থেকেই। মোহাম্মদপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে যখন লেখাপড়া করি তখন হুমায়ূন আহমেদের ছোট ভাই আহসান হাবিব আমরা ব্যাচমেট ছিলাম। স্কুলে বাৎসরিক যে নাটক হতো ওখানে আমি অভিনয় করতাম। কলেজে তেমন নাটক করার সুযোগ ছিল না। ইউনিভার্সিটি গিয়ে আবার শুরু করি। এটা ছিল ’৮০ সালের কথা। তখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (জাকসু) নাট্য সম্পাদক ছিলেন হুমায়ুন ফরিদী ভাই। তিনি একটা ওয়ার্কশপের নোটিশ টানালেন। তাতে বলা ছিল, যারা অংশগ্রহণ করতে চাও তাদের আবেদন করতে হবে। পরীক্ষা দিতে হবে। আমি সেই পরীক্ষায় পাস করলাম। প্রথম নাটক করলাম সেলিম আল দীনের। আর আমাদের ওয়ার্কশপটা করালেন জামিল আহমেদ, যিনি বাংলাদেশের নাট্য বোদ্ধাদের অন্যতম একজন।

একমাস ওয়ার্কশপ হওয়ার পর নাটকের প্রতি আরও বেশি আগ্রহী হয়ে গেলাম। এরপর জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটার করলাম। নাটক করলাম ‘মুন্তাসির ফ্যান্টাসি’। জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটারের সব ঢাকা থিয়েটার কেন্দ্রীক ছিল। মুক্তমঞ্চে প্রথম নাটক করি ‘শকুন্তলা’। ’৮৩ তে মাস্টার্স করার পর আমি ঢাকা থিয়েটারে আসি। সেলিম আল দীনের নাটক শুরু করি। এরপর টেলিভিশনে অডিশন দিলাম সম্ভবত ’৯৬ এ। প্রথমবার হয়নি। পরে পাস করলাম। আমাদের দল থেকে অডিশন দিতে দিতো না, ভাল অভিনেতা না হওয়া পর্যন্ত- টিভিতে অভিনয় করা যাবে না।

টেলিভিশনে প্রথম নাটক ‘গ্রন্থিকগণ কহে’। এরপর প্রোডিউসার আলাউদ্দিন আহমেদ ডাকলেন ইমদাদুল হক মিলনের ‘বার রকমের মানুষ’ করার জন্য। বিখ্যাত এবং সাড়া জাগানো একটা নাটক। আমি নিজেও কিছুটা পপুলার হলাম। তারপর করলাম ‘মাটির ও পিঞ্জিরার মাঝে’ নাটকটা। এরপর হলো ‘আজ রবিবার’। আমার স্ত্রীও এতে অভিনয় করেছিল। 

হুমায়ুন আহমেদের নাটকে কিভাবে আসা?

ফারুক:   প্রথমে রিয়াজউদ্দিন বাদশা জানালেন, হুমায়ূন আহমেদের একটা নাটকে কাজ করতে হবে। ‘অচীনবৃক্ষ’ নামের অসাধারণ একটা নাটক বিটিভিতে। রিয়াজউদ্দিন বাদশা ছিলেন ওটার প্রোডিউসার। তখন থেকেই শুরু তার সাথে কাজ করা। হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে বেশি নাটক করেছি আমি সংখ্যায়।

হুমায়ূন আহমেদের সাথে কাজের অভিজ্ঞতা একটু বলবেন?

ফারুক: জগতের সব সিরিয়াস বিষয়কেই উনি হাল্কা এবং সহজভাবে নিতেন, কাজের ক্ষেত্রেও তাই করতেন। খেলা সুলভ মনোভাবে করতেন সবকিছু। আমি এটা বলতে চাচ্ছি যে, উনি কাজটা করতেন সিরিয়াসলি কিন্তু হেসে-খেলে করতেন। উনি স্ক্রিপ্ট করছেন মজা করতে করতেই। কাজের খাতিরে উনার সাথে সুইজারল্যান্ড পর্যন্ত যাওয়া হলো। স্বাধীনতার পর পর উনারা যখন মোহাম্মদপুর বাবর রোডে এলেন, তখন আমরা থাকতাম হুমায়ূন রোডে। তখন থেকেই তাকে চিনতাম। তার ছোট ভাই আহসান হাবিব যেহেতু আমার বন্ধু ছিল, যে কারণে আমার তাদের বাসায়ও যাওয়া হতো প্রচুর।

নাট্যজগতে হুমায়ূন আহমেদের শূন্যতা কতখানি দেখেন?

ফারুক: হুমায়ূন আহমেদ যেভাবে নাটক করতেন সেভাবে লেখা আর ডিরেকশন দেয়া এখন আর এই পর্যায়ে কাছাকাছিও কেউ নেই। বিশেষ করে হাসির নাটক তো না-ই। হাসির নাটক মানে এখন হয়ে গেছে চিৎকার চেঁচামেচি, হাসির নাটক মানে হয়ে গেছে ভাঁড়ামি, হাসির নাটক মানে লোক ঠকানো, মিথ্যা শেখানো, জোর করে হাসানোর চেষ্টা, হাসির নাটক মানে ঝগড়া, চেহারা বিকৃত করা, আমি নিজেও চেহারা বিকৃত করি। তবে হুমায়ূন আহমেদের নাটকের সাথে পার্থক্য করলে তখন বোঝা যায়। দর্শকও এখন চেঞ্জ হয়ে গেছে। দর্শকও এখন এমন চায় চিৎকার, চেঁচামেচি, হাউকাউ...। রুচি চেঞ্জ হয়ে গেছে। এখন মিডল ক্লাস পর্যন্ত টিভি দর্শক নাই। এখন আর ঐ ধরনের নাটকও নাই, ঐ শ্রেণির দর্শকও নাই। এখন একটা নাটকের নাম শুনলেই বুঝবেন...

এই বিপর্যয় কেন?

ফারুক: বিপর্যয়ের জন্য আমি মনে করি এখন দর্শকদের অনেক কিছু দেখার সুযোগ হয়েছে। তাছাড়া হাসির নাটকের জন্য হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যু একটা কারণ। হুমায়ূন আহমেদ যেভাবে নাটক করতেন ঐ ধারাটা নষ্ট হয়ে গেছে। আগে থেকেই শুরু হয়েছে, কেউ কেউ ধারাটা চেঞ্জ করতে চেষ্টা করছে যে, আমি হুমায়ূন আহমেদের চেয়েও একটু বড় হই! সেটা করতে গিয়ে নষ্ট করে ফেলছে যেমন- নন অ্যাক্টর দিয়ে অ্যাকটিং করাতে গেছে।

আপনি তো হাসির নাটকেই বেশি অভিনয় করে থাকেন, দর্শকও হাসতে বাধ্য হয় এই কঠিন মন্ত্রটা কিভাবে রপ্ত করলেন?  

ফারুক: আসলে হাসির নাটক বলতে কিছু নাই, সিরিয়াস নাটক বলতে কিছু নাই, কাঁদার নাটক বলে কিছু নাই। নাটক নাটকই। অভিনয় যদি হাসির হয় হাসবেন, কান্নার হলে কাঁদবেন, গল্পে যদি হাসির বিষয় থাকে হাসবেন। জোর করে কাউকে হাসানোরও দরকার নাই, জোর করে ভালবাসারও কিছু নাই। ফিলিংস অনুযায়ী যা করবেন ওটাই নাটক। আমি ফারুক আহমেদ হাসির নাটক জীবনেও করি না। এটা আমার মাথায়ও আসে না।

তাহলে মানুষ হাসে কেন

ফারুক:   হাসে ডায়ালগ হাসির সে জন্য! আমি অভিনয় করি, নাটক করি, নাটকের চর্চা করি সেটা হাসি, কান্না, দুঃখ, বেদনা, প্রেম এ সব কটার চর্চা করা আছে আমার। অভিনয়ের ভেতর আমি সিরিয়াস চরিত্র সবচেয়ে ভাল করি। ঢাকা থিয়েটারের ১৬টা নাটক করেছি সেলিম আল দীনের। এর মধ্যে ১২টাই আমার সিরিয়াস ক্যারেক্টার। আমাদের কখনো এটা শেখানো হয় নাই যে এটা হাসির নাটক। হুমায়ূন আহমেদও কখনো বলেন নাই। কিন্তু এখন জোর করে আমাদের বলা হয় এটা হাসির নাটক, দম ফাঁটানো হাসির নাটক। কেমনে যেন দম ফাঁটবে! খুব স্থূল বিষয়। আমরা পঁচিশ বছর থিয়েটার করে যেখান থেকে আসছি, এগুলো সব তার বাইরে। মানুষ এখন সহজেই কিছু পেতে চায় কিন্তু শিল্পে শর্টকাট কোনো রাস্তা নাই। শিল্পে নির্দিষ্ট একটা পথ পরিক্রমার পরে শিল্পী হয়।

একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি- আপনার জীবনের প্রথম প্রেম ভালবাসা?

ফারুক: তখন ক্লাস সিক্স-সেভেনে। ওই রকম কিছু বুঝি না কিন্তু ভাল লাগে। যেহেতু এখনো মনে আছে তার মানে ওটা একটা প্রেম।

তবে আমার স্ত্রীর সাথেই সিরিয়াস প্রেমটা করি। সাত বছর অপেক্ষা করে ওকে বিয়ে করতে হয়েছে। এর মধ্যে আমার আব্বা অনেক মেয়ে দেখাইছে, আমি রাজি হয়নি। বন্ধুরা সবাই বিয়ে করে ফেলছে। সবাই মনে করতো আমি আর বিয়ে করব না। একদিন বন্ধুরা জিজ্ঞেস করল, নাসরিন যদি রাজি হয় তুই বিয়ে করবি? নাসরিনের নাম শুনেই আমি রাজি হয়ে গেলাম। তার আগে আমি অনেক প্রেম করছি। মেয়ে দেখলেই আমি প্রেমে পড়ে যেতাম। একতরফা প্রেমই বেশি ছিল, ওই মেয়ে হয়তো জানতোই না। কলেজে যখন পড়ি তখন ক্লাস সিক্সের এক মেয়ের প্রেমে পড়ি। ওই মেয়ের কারণে আমার পড়ায় এক বছর গ্যাপও হইছে। আবার ইউনিভার্সিটিতে একটা ছিল ম্যাচিউর প্রেম। ও এখন আমেরিকায় থাকে। তারপর নাটোরে এক বন্ধুর বাড়ি বেড়াতে গিয়ে তার বোনের সাথে গভীর প্রেম। আসার সময় কান্নাকাটি সেই মেয়ের। ঢাকায় এসে চিঠি লিখি বেশ কয়টা, এই চিঠি আদান-প্রদান করতে গিয়ে বন্ধুর হাতে ধরা খাই। ওখানেই প্রেমের সমাধি। এই জীবনে এগারোটা প্রেম এসেছিল নীরবে!

ছবি: সুমন্ত চক্রবর্তী

এসবি

 
.



আলোচিত সংবাদ