সম্পর্কের ক্ষেত্রে সততাকে প্রাধান্য দেই: মিথিলা

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ জুলাই ২০১৮ | ৫ শ্রাবণ ১৪২৫

সম্পর্কের ক্ষেত্রে সততাকে প্রাধান্য দেই: মিথিলা

সীমান্ত বাঁধন চৌধুরী ২:০৪ অপরাহ্ণ, মে ১৪, ২০১৮

print
সম্পর্কের ক্ষেত্রে সততাকে প্রাধান্য দেই: মিথিলা

এ সময়ের জনপ্রিয় মুখ রাফিয়াত রশিদ মিথিলা। তাহসান খানের সাথে সম্পর্কের সেতুতে ফাটলের কারণ, একাকীত্ব, ভবিষ্যৎ ভাবনা, অভিনয় ও কর্মজীবনসহ অনেক অজানা কথা জানা যায় এ উন্নয়নকর্মী ও অভিনেত্রীর ভাষ্যে। লৈঙ্গিক বৈষম্য, নারীর প্রতি সহিংসতা ও বঞ্চনা নিয়েও অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন পরিবর্তন ডটকমের সাথে সাম্প্রতিক আড্ডায়।

ঈদকে সামনে রেখে কী কী কাজ করছেন?

এখন একটা শুটিংস্পটে আছি। একটা ঈদের নাটকে অভিনয় করছি। এটা দিয়ে ঈদের কাজ শুরু করলাম। আরো কয়েকটা নাটক হাতে আছে। যেহেতু ফুলটাইম জব করি, তাই সময় করে উঠতে পারি না। এজন্যই শুধু বিশেষ দিবসগুলোতে কাজ করি।

তবে তো খুব ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।
ব্যস্ততা প্রধানত ফুলটাইম জবের জন্য, প্লাস বাচ্চা আছে। সো ঐ দুটোর মাঝখানেই আমার বেশিরভাগ সময় চলে যায়। আর এটা ছাড়া মাঝে মাঝে কোন বিশেষ উপলক্ষ সামনে রেখে কাজ করি। সেটা উইকেন্ডে করার চেষ্টা করি। একটা রেডিও শো শুরু করেছি শিশুবিকাশকে কেন্দ্র করে প্যারেন্টসদের জন্য।

আমি নিজেও আরলি চাইল্ডহুড ডেভেলপমেন্টে পড়াশুনা করেছি ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি থেকে। দশ বছর ধরে আমি ডেভেলপমেন্ট সেক্টরে কাজ করি। ব্র্যাকে আছি নয় বছর। সবসময়ই শিশুদের শিক্ষা আর বিকাশ নিয়ে কাজ করেছি। ঐ প্যাশনের জায়গা থেকে আমার এই রেডিও শো। এটা ব্র্যাকের সহায়তায়ই করছি।

এতকিছুর পর মেয়েকে সময় দেন কখন?
প্রায়োরিটি অনুযায়ী সময়কে একটু ভাগ করে নিতে হয়। অফিস করে যতটুকু সময় থাকে মেয়েকে দিই। আর শুটিংটা শুধু উইকেন্ডে অথবা অন্য ছুটিরদিনগুলোতে ফেলার চেষ্টা করি।

শুধু অভিনেত্রী নন, কণ্ঠশিল্পী-গীতিকার-উন্নয়নকর্মী অনেক পরিচয়ে  পরিচিত আপনি। কোন জায়গাটা বেশি ভালোলাগার?
আমি নিজেকে একজন উন্নয়নকর্মী বলতে পছন্দ করি। অভিনয়টা শখের বশে করতে করতে অভিনেত্রী হয়ে গেছি। গান, ছড়া, ছবি আঁকা, লেখালেখিটা ছোটবেলা থেকেই করি কিন্তু কখনো প্রফেশনালি নিইনি এসব। সবকিছু প্রফেশনালি নেওয়া সম্ভবও না। থিয়েটারও করতাম ছোটবেলায়।

কোন থিয়েটারে?
লোকনাট্যদল। ওখানে ছোটদের একটা গ্রুপ ছিল সেই গ্রুপে কাজ করতাম। অনেকগুলো শোও করেছি। গান শিখেছি হিন্দোল একাডেমিতে নজরুল সংগীত। নাচ শিখেছি বেনুকা একাডেমিতে। ছোটবেলা থেকেই সব শেখা।

যেহেতু ডেভেলপমেন্ট সেক্টরে কাজ করেন, নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে আপনার ভাবনা কী?
আমি এটা নিয়ে ইনফ্যাক্ট কাজও করি। আমি যেহেতু শিক্ষা নিয়ে কাজ করি, সেখানে নারী উন্নয়ন, নারী শিক্ষাটা চলেই আসে। কারণ শিক্ষা হচ্ছে নারীর ক্ষমতায়নের খুবই মৌলিক বিষয়। শিক্ষা ছাড়া ক্ষমতায়ন চিন্তা করা যায় না। এখনো আমি বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ বা সেখানে পুরুষের ভূমিকা কী— এসব নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। ব্র্যাকের একটা ক্যাম্পেইন আছে ‘রিডিফাইনিং ম্যাসক্যুলিনিটি’ বা পৌরষত্বের নতুন সংজ্ঞা…

ওটা কী? মানে পৌরুষত্বের নতুন সংজ্ঞাটা কেমন?
ম্যাসক্যুলিনিটি বা পৌরুষত্ব যেটাকে বলে সেটা সম্পর্কে খুবই  গতানুগতিক কিছু ধারণা আমাদের সমাজে আছে, যেগুলো সবসময় পজেটিভ না। যেমন; পুরুষ মানেই শক্ত-সামর্থ্য, ডমিন্যান্ট হবে, কাঁদতে পারবে না, পুরুষ কর্তৃত্ব করবে এই ধারণাগুলো আছে। আসলে পুরুষদের মধ্যেও কিন্তু মানুষ হিসেবেই কোমল-কঠিন মনের মানুষ আছে। আমরা আসলে মানুষ হিসেবে সংজ্ঞায়িত না করে পুরুষকে পুরুষ হিসেবে, নারীকে নারী হিসেবে সংজ্ঞায়িত করছি। পুরুষরাও কাঁদে, ইমোশনাল হয় এবং এটা মানুষ হিসেবে সবার হয়। কিন্তু আমরা এমনভাবে আলাদা করে ফেলছি জেন্ডার রোলটাকে, যেটা আসলে সমাজে একটা বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করছে। সো সেই টিপিক্যাল জেন্ডার রোলটা ভেঙ্গে দেওয়ার জন্যই এই ক্যাম্পেইনটা।

নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ— আপনার পারিপার্শ্বিক/পারিবারিক জীবনে এমন কোন বৈষম্য চোখে পড়েছে?
আমার মনে হয়, আমরা যে সমাজে বাস করি সেখানে ছোটবেলা থেকেই আমাদের ওপর এর ছাপ পড়ে। এটা নিজের বাড়ি থেকেই শুরু হয়। সেখানে পিতাই থাকে পরিবারের কর্তা। আমার পরিবারে হয়তো কম হয়েছে কিন্তু আশপাশে অনেকসময় দেখেছি পরিবারে ভাইয়েরাই হয়তো প্রাধান্য পায়। মায়ের খুব একটা ভয়েস থাকে না পরিবারে। তারপর যখন স্কুলে যাই তখনো এক ধরনের শিক্ষা দেওয়া হয় যেখানে পুরুষের কর্তৃত্বকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। এরপর কর্মক্ষেত্রে গেলে সেখানে আসল স্ট্র্যা্গলটা অনুভব করতে পারি।

আর সংসার জীবনে?
সংসার জীবনেও তাই। এখন যেমন নারীর ক্ষমতায়নের ফলে নারীরা ঘরের বাইরে কাজ করে, চাকুরী করে, আমিও করি আমার মতো অনেকেই করছে। তারপরও ঘরের কাজ পুরোটাই মেয়েদের সামলাতে হয়। তো সেখানে একটা দ্বন্দ্বের সুযোগ থাকে এবং আমার ধারণা এটা সব মেয়েরাই ফেস করে।

সেক্ষেত্রে আপনি যখন সংসার জীবনে ছিলেন তখন কি এমন কিছুর সম্মুখীন হয়েছেন?
হ্যাঁ। আমি যখন সংসার করেছি তখন পাশাপাশি চাকুরী করেছি, বাচ্চা পেলেছি, রান্না করেছি, পড়ালেখা করেছি। আমিই সব করেছি। সিংহভাগ কাজই আমাকে করতে হতো।

স্বামী বা শ্বশুরবাড়ি থেকে এমন কিছু চাপিয়ে দেওয়া হতো কখনো ? যেমন; এটা করা যাবে না, ওখানে যাওয়া যাবে না— এরকম কিছু?
আমি সেটা বলব না। আমার মনে হয় আমরা মেয়েরা বাবার বাড়ি থেকেই নানা প্রতিবন্ধকতার শিকার হতে শুরু করি। সে রকম অনেক ধরনের অনেক ইস্যুই চলে আসে শ্বশুর বাড়িতে। একটা বাড়িতে ছেলে আর ছেলের বউ যখন থাকে তখন ছেলেকে এক ধরনের প্রাধান্য দেওয়া হয় আর ছেলের বউয়ের কাছে এক ধরনের প্রত্যাশা থাকে। এগুলোতো আমাদের সোসাইটিতে খুব কমন। 

কর্মক্ষেত্রে, বিশেষ করে অভিনয় করতে গিয়ে এমন কোন বিষয়ে খটকা লেগেছে? 
আসলে আমাদের মিডিয়াতে মেয়েদের রোলগুলো খুব দুর্বল, নাকি কান্না এসব দেখানো হয়। এখনো শক্ত ফিমেল রোল দেখানো হয় না। ওই ক্যারেক্টারগুলো প্লে করতে গিয়ে আমার মনে হয়, আমি কি ক্যারেক্টার প্লে করছি! আমি এখানে নারীর প্রতি অন্যরকম দৃষ্টিভঙ্গি আনার কথা বলছি। যেটা নারী-পুরুষের সমতায়নের ক্ষেত্রে কাজ করবে। নারী মানেই দুর্বল, অবলা চরিত্রে রোল প্লে করতে গিয়ে আমি দ্বন্দ্ব ফিল করি অবশ্যই। এক্ষেত্রে আমাদের মিডিয়ার চিন্তা-চেতনা ধীরে ধীরে বদলাতে হবে। আর ওরকম কোন বাধা ফিল করলে আমি সেটা আমলে নিইনি। আমি সবসময়ই বাধা ফেস করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি।

একটু অন্য প্রসঙ্গ। আপনি আর তাহসান তরুণ প্রজন্মের আইডল জুটি ছিলেন। সম্পর্কের এই নান্দনিক সেতুটি ফাটল ধরেছিল কেন?
মিডিয়ার স্ক্রিনে যে কোন দুটো ক্যারেক্টার একসাথে কাজ করতে দেখলে মানুষ মনের ভেতর একটা জুটি কল্পনা করে নেয়। ওটা আমাদের ক্ষেত্রে একটু বেশি প্রবল হয় যখন আমরা রিয়েল লাইফে কাপল।

আমার ধারণা মানুষ ইমাজিনেশন লেভেলে অনেক কিছু চিন্তা করে ফেলেছে কিন্তু বাস্তবতা আসলে অন্যরকম। বাস্তবে আমাদের ব্যক্তি জীবন আছে, বোঝাপড়ার ব্যাপার আছে। ব্যক্তি জীবনে তো আর মানুষের এক্সপেকটেশন ফুলফিল করা যায় না সবক্ষেত্রে।

ভাঙনটা কেন হয়েছিল?
এই কেন’র উত্তর দিতে গেলে ১১ বছর আগে থেকে শুরু করতে হবে। আমরা দুজন তো জীবনের একটা লম্বা সময় একত্রে কাটিয়েছি। একটা সময় এসে মনে হয়েছে আমাদের দুজনের আসলে দুইটা পথ।

সম্পর্কের শুরুটা তো এমন থাকে যে ‘আমি তোমায় ছাড়া বাঁচব না’। তো, পরে এটা কোথায় চলে যায়?
(হাসি) সব সম্পর্কই দেখা যায় ওখানেই শেষ হয়ে যায়।

আপনার বিয়ের পর আবেগের পরিণতি কী হলো?
বিয়ের আগে তাহসানের সাথে সম্পর্ক ছিল ৩ বছর আর বিয়ের পর ১১ বছর। আসলে রিয়েলিটিকে একসেপ্ট করতেই হয়। আর বিচ্ছেদ এমন না যে শুধু আমারই হয়েছে, হাজারও মানুষের হচ্ছে, হতেই পারে এবং সবার ক্ষেত্রেই একরকম। হয়তো শুরুর দিকটা একরকম থাকে, শেষের দিকটা মেলে না বলেই তো আলাদা হয়ে যাওয়া।

মানসিকভাবে অ্যাডজাস্ট হচ্ছিল না তাই তো?
আমরা তো বলতে গেলে ছোট বয়সে বিয়ে করেছি। একটা সময়ে এসে প্রায়োরিটি ডিফেরেন্ট হয়ে যায়। প্রায়োরিটি যখন মেলে না তখন একই ছাদের নিচে দুজনের বসবাস কঠিন হয়ে যায়। অনেকের কথা মতো সন্তানের দিকে তাকিয়ে এক সাথে দুইটা মানুষ ভালোবাসাহীন, জোর করে ঝগড়া করতে করতে বাস করার চেয়ে দুজন আলাদা থাকুক কিন্তু সুখে থাকুক। এবং এতে করে সন্তানের ওপরও মানসিক চাপ পড়বে না। এটাই হওয়া উচিৎ।

কবে মনে হলো ভালোবাসাটা উড়ে গেছে?
(হাসি) এটা বলতে পারব না। ১১ বছরের বিষয়।

তাহসানের সাথে যোগাযোগ আছে?
হ্যাঁ। যেহেতু আমাদের বাচ্চা আছে। বাচ্চা আমার কাছেই থাকে, মাঝে মাঝে ও এসে দেখা করে টাইম দেয়।

তাহসানের সাথে ভবিষ্যতে অভিনয়ে দেখা যাবে?
মনে হয় না। কারণ আমার মনে হয় একটা ফেইক এক্সপেকটেশন রেইজ করবে মানুষের মনে।

ডিভোর্সের পরপর শোনা গিয়েছিল তাহসানের সাথে অনেকের সম্পর্কের কথা। আসলে ঘটনাটা কী?
এই ঘটনাটা ওকে জিজ্ঞেস করবেন। আমাকে জিজ্ঞেস করে কোন লাভ নেই। আমি মানুষের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।

আপনার কথাও শোনা গিয়েছিল একজনের সাথে ...
একজন মাত্র! আমি তো শুনেছি অনেকজন (হাসি)। সম্পর্ক করে সময় দেওয়ার মতো সময় আমার নেই।

ইরেশ যাকের আপনার বন্ধু, সহকর্মী থেকে এখন বোনজামাই।  আগের মত অভিনয়ে ইরেশের সাথে দেখা যাবে আপনাকে?
এখনো বন্ধুত্ব আছে। অভিনয় তো অভিনয়ই। কাজ তো কাজই। কাজ একসাথে করতেই পারি।

মিথিলাকে পছন্দ করে এমন মানুষের শেষ নেই । ভবিষ্যতে প্রেমের অফার পেলে কোন দিকটা বিবেচনায় থাকবে সিলেকশনের ক্ষেত্রে?  
নতুন করে সম্পর্ক করে সময় দেওয়ার সময় আমার নেই। আর সম্পর্ক ঐভাবে তো হয় না। তবে যে কোন সম্পর্কের ক্ষেত্রে (বন্ধুত্বও হতে পারে) আমি প্রাধান্য দেই সততা। এ ছাড়া কোন ক্রাইটেরিয়া নেই।  

ছবি : ওসমান গনি

এসবিসি/ডব্লিউএস

 
.



আলোচিত সংবাদ