বাবার থেকেই বঙ্গবন্ধুর আদর্শ পেয়েছি: রোকেয়া প্রাচী

ঢাকা, সোমবার, ২৩ জুলাই ২০১৮ | ৮ শ্রাবণ ১৪২৫

বাবার থেকেই বঙ্গবন্ধুর আদর্শ পেয়েছি: রোকেয়া প্রাচী

সীমান্ত বাধন চৌধুরী ১:৩৯ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২৩, ২০১৮

print
বাবার থেকেই বঙ্গবন্ধুর আদর্শ পেয়েছি: রোকেয়া প্রাচী

অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচী। অভিনয়ের পাশাপাশি দীর্ঘ দিন থেকেই দেশের প্রায় সবরকম সামাজিক আন্দোলনে তার উপস্থিতি। অভিনয় ছিল যার নেশা এবার অভিনয়ের মঞ্চ ছেড়ে পা রেখেছেন রাজনীতির মঞ্চে। রাজনীতি ছাড়াও তিনি নিজেকে জড়িয়েছেন নানা সমাজসেবার কাজে। এসব বিষয়ে পরিবর্তন ডটকমের সাথে তার সাক্ষাৎকার পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

আন্তরিক শুভেচ্ছা আপনাকে

আপনাকে এবং পরিবর্তন ডটকমকেও শুভেচ্ছা। পরিবর্তন ডটকমের সাথে আমার অনেক দিনের সম্পর্ক।

মঞ্চ, টেলিভিশিন, চলচ্চিত্র তিনটি ক্ষেত্রে দক্ষতার সাথে কাজ করে এসেছেন। প্রথমেই জানতে চাইবো কোন জায়গাটা আপনার কাছে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যের?

মঞ্চ এবং চলচ্চিত্র। মঞ্চে অভিনয়, উপস্থাপনা এ দুটোই আমার কাছে খুব চ্যালেঞ্জিং  এবং আনন্দের।  আর চলচ্চিত্র হচ্ছে আমার আবেগের ভালোবাসার জায়গা।

মঞ্চে কবে এসেছেন?

মঞ্চে কাজ শুরু আরণ্যক দিয়ে। লোকনাট্যদল নাট্যকেন্দ্রে আমি ওয়ার্কসপ করেছিলাম কিন্তু লম্বা জার্নিটা হচ্ছে আরণ্যক নাট্য দলে। সেদিক থেকে মঞ্চ নাটকে মামুনুর রশীদকে আমার শিক্ষাগুরু বলতে পারি। তিনি আমার শিক্ষক। এরপরে আমি প্রাচ্যনাটে করলাম এবং শেষ কাজ করেছি খালেদ খানের ডিরেকশনে নাগরিকের হয়ে।

মঞ্চের প্রতি কি এখন আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন? মঞ্চ টানে না?

হ্যাঁ এখনও কাজ করতে ইচ্ছে করে। এখন মঞ্চে উপস্থাপনা করি, মঞ্চে বক্তৃতা করি। মঞ্চ ঠিক আছে কিন্তু আঙ্গিকগুলো পাল্টেছে। তবে ভবিষ্যতে মঞ্চ নাটক সুযোগ হলে অবশ্যই করবো।

চলচ্চিত্রে আপনার শুরুটা কিভাবে?

দুখাই দিয়ে চলচ্চিত্রে আমার হাতেখড়ি।

মাটির ময়না, দুখাই, স্বপ্নডানার মতো আলোচিত ছবিগুলো করে আপনি বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন ভবিষ্যতে আর কোনো ছবিতে আপনাকে দেখা যাবে কি?

ভালো ছবি পাওয়া, ভালো পরিচালকের সাথে কাজ করা এবং দর্শকের মনে জায়গা করে নেওয়া এই তিনটি জিনিসই সৌভাগ্যের ব্যাপার। আমি আমার ক্যারিয়ারের শুরুতেই পেয়েছি ভালো পরিচালক, ভালো চলচ্চিত্র, ভালো চরিত্র মানে দুখাই যা সেই সময়ের সাথে যায় এবং দর্শক গ্রহণ করেছে।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছি এবং প্রশংসিত হয়েছি। এরপর ধারাবাহিকভাবে মাটির ময়না, অন্তর্যাত্রা, স্বপ্নডানায় কাজ করেছি। একজন শিল্পী ঠিক করবে সংখ্যায় কম হোক কিন্তু সে ভালো কাজ করবে নাকি অনেক কাজ করবে কিন্তু সময়ের সাথে ঝরে যাবে।

এটা নির্ধারণ করতে হবে। আমি চেষ্টা করেছি মঞ্চে চলচ্চিত্রে ভালো কাজ করতে। বরাবরই কোয়ান্টিটির কথা না ভেবে কোয়ালিটির কথা ভেবেছি। এই ছবিগুলোর গ্যাপে অন্য কোনো ছবির অফার আমার আসেনি তা নয়  অনেক কাজ এসেছিল। আমি নিজেকেই থ্যাংক্স দেই যে ঐ কাজগুলো আমি বেছে নিই নি। সেই মোহ থেকে বের হতে পেরেছিলাম। আর ওসব কখনো আমাকে আকর্ষণও করেনি।

সামনে কোনো ছবিতে কাজ করছেন কি?

আমার এখন ‘মাটির প্রজার দেশে’ চলছে। আর এবছর আমি কোনো ছবিতে কাজ করছি না। তবে একটা স্ক্রিপ্ট রেডি সেটা আগামী বছর হতে পারে। এখনই তা বলতে পারছিনা।

আমি যেহেতু এখন আসলে পুরোপুরি ভাবে রাজনীতিবিদ, রাজনীতিটাই এখন আমার কাছে মূখ্য। এই গ্যাপে আসলে কতটা কমিটেড ভাবে কাজটা করতে পারবো ওটাই সন্দেহ। যদি নিবেদিতভাবে কাজ করতে পারি তাহলে করবো নয়তো সে কাজ আমি করবো না।

প্রথম কবে অভিনয়ে এলেন?

একদম প্রথম স্কুলে আর সিরিয়াসলি আমি গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের মাধ্যমে ৮৯ থেকে আমার ধারাবাহিক যাত্রা। তখন লোকনাট্য দলের একটা বিদেশি অনুবাদ নাটকে পারফর্ম করেছিলাম। এরপর আরণ্যকের হয়ে সম্ভবত ‘নামকার পালা’ নামে নাটকে কাজ করেছি। টিভিতে ৯৪-৯৫ তে এসেছি।

অভিনয়ে আসার অনুপ্রেরণাটা কোথা থেকে পেয়েছিলেন?

রক্ষণশীল পরিবারে জন্মেছি। পরিবার অভিনয়ের ব্যাপারে ঘোর-বিরোধী ছিল। যখন থিয়েটার করা শুরু করলাম তখন সমাজ,পরিবেশ কোনটাই অনুকূলে ছিলনা। বাবা রাজনীতিবিদ ছিলেন, সে সময়ে যে ধরনের রাজনৈতিক আবহ ছিল, বাড়ির মেয়ে থিয়েটার করবে মিরপুর থেকে এসে এতো সময়, এতো ডেডিকেশন দিয়ে, অতোটা পারমিশন ছিল না অনেক প্রতিবন্ধকতা ছিল। এ প্রতিবন্ধকতা সলভ করার জন্য খুবই আরলি বিয়ে হয়ে গেলো আমার।

হাজবেন্ড থিয়েটার করতেন, বাবা বিয়ের কথা বলার পর ভেবে দেখলাম এর সাথে বিয়ে হলে থিয়েটারটা করতে পারবো। এরপর আমার ক্যারিয়ার শুরু হলো। এই ছিল আমার অভিনয়ে সিরিয়াস হবার গল্প। মূলত আমাকে স্রোতে টেনে নিয়ে গিয়েছে সংস্কৃতিতে।

রাজনীতিতে কবে, কিভাবে এলেন?

বলতে গেলে রাজনীতি অনেক আগে থেকেই করি। এরশাদ-বিরোধী মুভমেন্টে সক্রিয় ছিলাম। সারা বাংলাদেশ ঘুরেছি গণতন্ত্র অভিযাত্রায়। জাহানারা ইমামের আন্দোলনের সাথে গণসঙ্গীত করেছি। এটা কি আমার রাজনীতি নয়?

বাবা আওয়ামী লীগ করতেন, বঙ্গবন্ধুর সৈনিক ছিলেন। আমরাও সেই রাজনৈতিক আদর্শের আবহের মধ্যেই বড় হয়েছি। আরও আগে হয়তো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সদস্য হইনি। আমার কখনো মনে হয়নি আলাদা করে একটা ফরম পূরণ করে রাজনৈতিক কর্মী হতে হবে। এভাবে পরবর্তীতে হেফাজত বলুন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বলেন সমস্ত আন্দোলনেই তো কাজ করেছি। এবং একটা সময় মনে হয়েছে যে যেহেতু আন্দোলন করে আসছি এবার আমি পরিণত প্রস্তত, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সদস্য হবার জন্য।

এসব কারনেই রাজনীতিতে দেরি করে আসা?

রাজনীতি হচ্ছে ফুলটাইমের বিষয়, পার্ট টাইম বলে কোন কথা নাই। তখন বাচ্চারা ছোটো ছিল, আমি সিঙ্গেল মাদার, তখন আমার আমার মনে হয়েছে আমি একটা দলের পোষ্ট হোল্ড করে ফুল টাইমার পলিটিশিয়ান হবার জন্য পারিবারিকভাবে প্রস্তত না।

সিঙ্গেল মাদার বললেন এটা কেন?

সিঙ্গেল মাদার এই সেন্সে, আমি বিয়ে করেছিলাম কিন্তু আমার হাজবেন্ডের সাথে ডিভোর্স হয়ে গেছে।

এই ভাঙ্গনটা কেন একটু বলবেন?

আমাদের দুজনের মধ্যে ফিলসফিক্যাল কোনো ধরনের মিল হচ্ছিল না। একারনেই মূলত ডিভোর্স।

বিয়েটা কি আপনার পছন্দের ছিল? মানে প্রেমের বিয়ে কি-না?

না। আ্যারেঞ্জ ম্যারেজ।

আপনার অভিনয়, রাজনীতি, জীবন দর্শন সব মিলিয়ে রোকেয়া প্রাচী কেমন আছে?

সব মিলিয়ে রোকেয়া প্রাচী একটা সুখী মানুষ। আমি আমার নিজেকে খুব ভালোবাসি। আমি নিজে যদি সুখী না হই তাহলে অন্যের জন্য স্বপ্ন দেখতে পারবো না। আমি প্রতি সেকেন্ডে স্বপ্ন দেখি এবং সেটা বাস্তবায়িত করার জন্য দৌড়াই। এ স্বপ্ন আমার নিজের জন্য না। আমি স্যাটিসফাইড বলেই আমার মধ্যে অন্যের জন্য স্বপ্ন তৈরি হতে থাকে, অন্যের জন্য ভাবতে পারি।

রোকেয়া প্রাচীকে মাঝে মাঝে একাকীত্ব ছুঁয়ে যায় না?

একদমই না। কাজ, স্বপ্ন, সৃষ্টি আমাকে এতটাই ব্যস্ত রাখে যে, ওসব ভাববার অবকাশ থাকে না।

অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচী অনেকের পছন্দের মানুষ। আপনার জীবনের প্রেম, রোমাঞ্চ নিয়ে কিছু বলুন-

ওরকম মূহুর্ত এখনো আসেনি। ছোটো বেলা অল্প সময়েই আমার বাবা আমাকে জোর করে বিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। ওটা মেনে নিতে হয়েছিল। ঐ রকম রোমান্টিকতা, প্রেম, ভালোবাসা আমার হয়নি।

সার্জেন্ট আহাদ মানে প্রথম বিয়েটা?

ওটা অলমোষ্ট আ্যারেঞ্জ ম্যারেজ।

আর পরেরটা মানে আসিফ নজরুল?

পরেরটা সুপার অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ। আমরা বিয়ের একমাস আগেও কেউ কাউকে চিনতাম না।

এখন যদি কোনো প্রস্তাব পান কী করবেন?

(হাসি) এখন কোনই সুযোগ নেই। মানুষের ফিলিংস পরিবর্তন হয়। এখন মেয়েরা বড় হয়েছে, আমি সোসাইটিকে রিপ্রেজেন্ট করি। এখন আমার ফিলিংস আমার সন্তান, আমার এলাকা, আমার কাজ। প্রতিটা মানুষেরই প্রেম ভালোবাসা একটা শক্তি। একেকটা থেকে একেকটা রূপে যায়। আমারও এখন লাইফের ড্রিমের জায়গাটা এমন।

তাহলে ভবিষ্যতে আপনার পাশে আর কাউকে এক্সেপ্ট করছেন না এই তো?

আমার রাজনীতি, আমার কাজ, আমার স্বপ্ন, রাজনৈতিক কর্মীরা আছে। এতো মানুষ, এতো স্বপ্নের পর একটা ব্যক্তিকেন্দ্রিক জায়গা যাওয়ার জন্য আমাকে আবার নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে আসতে হবে, নিজেকে আবার ছোট করতে হবে, কোনো একজন পুরুষের জন্য আবার নারীতে পরিবর্তন হয়ে যেতে হবে। আবার মহিলা হয়ে যাওয়া, আবার নারী হয়ে যাওয়া, আবার প্রেমিকা হয়ে যাওয়া বা একজন ব্যক্তি হয়ে যাওয়া সম্ভব না।

আমি এখন অনেক কিছুর ভেতর দিয়ে নিজেকে দেখতে পাই। সেখান থেকে নিজেকে নিয়ে আসার মানে কি? রাজনীতির জন্য মানুষের জন্য কাজ করতে আমিতো প্রায় অভিনয়ই ছেড়ে দিলাম। একজন রোকেয়া প্রাচী আরো অনেক রোকেয়া প্রাচী তৈরি করতে চায়।

এসবিসি/

 
.



আলোচিত সংবাদ