‘কথাটা খোলাখুলি বললে আমাকে দেশ থেকে বের করে দেবে’

ঢাকা, সোমবার, ২৩ জুলাই ২০১৮ | ৮ শ্রাবণ ১৪২৫

‘কথাটা খোলাখুলি বললে আমাকে দেশ থেকে বের করে দেবে’

সীমান্ত বাধন চৌধুরী ৩:২৪ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২২, ২০১৮

print
‘কথাটা খোলাখুলি বললে আমাকে দেশ থেকে বের করে দেবে’

‘স্বপ্নজাল’ এর জাল বুনেছেন নিপুণ হাতে নির্মাতা গিয়াস উদ্দিন সেলিম। ‘মনপুরা’র পর আরেকটি সাড়া জাগানো ভিন্ন ধারার ছবি স্বপ্নজাল। স্বপ্নজালের স্বপ্ন নিয়ে পরিবর্তন ডটকমের সাথে গিয়াসউদ্দিন সেলিমের কথোপকথন।

বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা আপনাকে।

আপনাকেও শুভেচ্ছা।

ছবির জন্য যে গল্প লিখে থাকেন সে গল্প লেখার গল্পটা বলুন- 

আমি তো বেসিক্যালি ক্যারিয়ার শুরু করেছি লেখক হিসেবেই। টেলিভিশনের জন্য লিখতে লিখতেই শুরু। তারপর যখন ডিরেকশন করতে গেলাম তখন মনে হলো যে, সিনেমা বানিয়ে ফেলি। এটা বাংলাদেশের সমস্ত নাট্য নির্মাতাদেরই স্বপ্ন। নাটক ডিরেকশন করার পরই মনে হয় একটা সিনেমা বানানো যায় কি না। আর সিনেমার স্টোরি রাইটিং শুরুতে ভার্সিটিতে থিয়েটার লিখতে লিখতে, পরে টেলিভিশনের জন্য নাটক লেখা এবং পরবর্তীতে যখন সিনেমা করতে গেলাম তখন সিনেমার জন্য স্ক্রিপ্ট লেখা। এটাই শুরুটা।

প্রত্যেক নির্মাতাই চায় তার নির্মাণের একটা নিজস্বতা থাক। একটা স্বকীয়তা তৈরি করতে চায়। অন্যান্য নির্মাতাদের সাথে আপনার নির্মাণের পার্থক্য কতটা মনে করেন?

আমি মনে করলে হবে না। কতটা পার্থক্য তা দর্শক বলবে। আমার কথা হচ্ছে আমি যে খুব আলাদা কিছু করে ফেলি তা আমার কাছে মনে হয় না। আমার পূর্বসূরী যারা ছিলেন যেমন, জহির রায়হান সাহেব, খান আতা সাহেব উনারা যে ভঙ্গিতে সেসময় সিনেমাকে দাঁড় করিয়েছিলেন তা পূর্ব বাংলার নিজস্ব সিনেমা রীতিতে। মাঝখানে ওটার একটা ছেদ পড়েছে। আমি আসলে তাদের উত্তরসুরী, আলাদা করে কেউ না।

ছবি নির্মানের পূর্ব প্রস্ততিকালে তো একটা বিষয়বস্তু নির্ধার করেন। ঐ বিষয়বস্তুটা কিভাবে নির্ধার করে থাকেন?

লিখার সময় বিষয়বস্তুটা নির্ধারণ হয়। স্ক্রিপ্টটা কী হবে বিষয়বস্তু তখনই ঠিক হয়। এরপর যখন স্ক্রিপ্ট তৈরি হয়ে যায় তখন নির্মাণ প্রক্রিয়ায় যেতে থাকে।

বিষয়বস্তুর সাথে তো দর্শনের একটা যোগাযোগ থাকে। সে দর্শনের প্রভাব কি আপনার ছবিতে দেখাতে চেষ্টা করেন?

হ্যাঁ, সবারইতো একটা নিজস্ব ফিলোসফি থাকে, আমার নিজস্ব যে ফিলোসফি সে অনুযায়ী স্বপ্নজাল সিনেমাটা আসলে কনটেম্পোরারি টাইমে একটা ফিল্ম মেকারের দায়িত্বের জায়গা থেকে বুঝি, অভিবাসন বিষয়টা খুব বেদনাদায়ক একটা ব্যাপার তাই না? আমাদের দেশেও দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসি আছে। প্রায় সাতচল্লিশের পর থেকেই আছে। কনটেম্পোরারি ফিল্ম মেকার হিসেবে ঐটা একটু বলবার চেষ্টা করেছি স্বপ্নজাল সিনেমায়। ওটা প্রেমের গল্পই আসলে। কিন্তু প্রেমের গল্পের একটা বাতাবরণ আছে কিন্তু এর অন্তর্নিহিত যে সুর, এই অভিবাসনটা আসলে কাম্য না।

বাংলাদেশে এই অভিবাসী বলতে কাদেরকে বুঝাচ্ছেন আপনি?

এইটা খোলাখুলি বললে আমাকে দেশ থেকে বের করে দেবে। অন্য একটা ব্যাপার আছে, খুবই অন্তর্নিহিত ভঙ্গি আছে এতে।

আপনার নির্মিত ছবিতে কোনো বিশেষ বিষয়কে উপস্থাপন বা মেসেজ দিতে চেয়েছেন কিনা?

আমাদের দেশের সিনেমার সামগ্রিক যে অবস্থা এ ক্ষেত্রে শুধুমাত্র রুচির ক্ষেত্রে আমি একটু কাজ করেছি। আমি এখানে খুব সাধারণ বাংলাদেশেরই গল্প বলতে চাই। কিন্তু ওটা রুচিকর ভঙ্গিতে উপস্থাপন করতে চাই। এখানে কোনরকম কুরুচির সমাবেশ আমি করতে চাই না। এটাই আমার একমাত্র লক্ষ্য।

‘ভালো নির্মাতার অভাবে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির দুর্দিন যাচ্ছে’ কথাটার সাথে কি আপনি একমত?

শুধু ভালো নির্মাতাই দায়ী না, এখানে আরো অনেক কিছু দায়ী।

আর কী কী কারণ থাকতে পারে?

আমার কাছে মনে হয় প্রফেশনাল প্রডিউসার নাই এই ইন্ড্রাষ্ট্রিতে। একটা সিনেমার স্বপ্ন কিন্তু ডিরেক্টর দেখে না, নির্মাতা দেখে না। দেখে প্রডিউসার। স্বপ্ন দেখার পর সে একজন রাইটার হায়ার করে নরমালি। এরপর তার পছন্দ অনুযায়ী নির্মাতা হায়ার করে। এখানে এই প্রক্রিয়ার মধ্যে আমরা নাই। আমাদের এখানে দেখা যায় একজন ডিরেক্টর সেও স্বপ্ন দেখে সিনেমার, নিজেই গল্প লেখে আবার প্রডিউসার ও খোঁজ করে। এসব আসলে প্রোপার প্রক্রিয়া না। এটাই মুল ল্যাকিং আমি মনে করি।

এই সকল কারনেই আমরা যৌথ প্রযোজনায় ঝুঁকে থাকি?

যৌথ প্রযোজনা খারাপ কিছু না। যৌথ প্রযোজনার সুবিধা হলো যে, এপার ওপার মিলে বড় বাজার। আমাদের এখানে যদি ১৬ কোটি বাঙালি থাকে পশ্চিম বাংলায় আরো ১০ কোটি মোট ২৬ কোটি বাঙালি। সবাই তো আসলে নিজের ভাষায় এন্টারটেইন হতে চায় সে ক্ষেত্রে যৌথ প্রযোজনা ভালো আমি বলবো।

ভালো ছবি বলতে কোন ধরনের ছবিকে বোঝেন? আপনার সমসাময়িক নির্মাতা কারা?

অনেকেই আছেন, অনেকেই ভালো ছবি বানাতে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন।

দর্শক কি হলমুখী হচ্ছে? আপনার কী মনে হয়?

ভালো ছবি হলে দর্শকতো দেখছে। হল-এ যায়না এটাতো বলা যাবে না। মনপুরার সময় দর্শক হলে গিয়েছে। স্বপ্নজাল খুব সীমিত আকারে রিলিজ করেছি। কিন্তু সিনেপ্লেক্সে টিকেট পাওয়া যাচ্ছে না। আয়নাবাজি, ঢাকা এট্যাক মানুষ দেখেছে। ভালো ছবি হলে লোকেরা দেখতে পছন্দ করে।

দর্শককে হলমুখী করতে ভালো ভিন্নধারার ছবি বেশী বেশী নির্মা করা হচ্ছে না কেনো?

হলমুখী করতে ফ্রিকোয়েন্টলি ভালো ছবি হতে হবে। এখন হয়তো বছরে একটা দুইটা ভালো ছবি হচ্ছে, এটলিস্ট বছরে চার পাঁচটা যদি ভালো ছবি হয় তাহলে আমার ধারণা দর্শক হলমুখী হবে।

মনপুরা করার পর দীর্ঘ নয় বছর পর আবার ছবি করলেন। এতো দীর্ঘ বিরতি কেনো?

প্রডিউসার পাওয়া যায়নি।

স্বপ্নজালে দর্শকের সাড়া কেমন?

যারা যারা দেখেছে যে প্রতিক্রিয়া পেয়েছি, খুবই পজিটিভ প্রতিক্রিয়া আমি বলবো। এবং লোকেরা পছন্দ করেছে।

ছোট পর্দার কাজ অর্থা নাটক এখনো করছেন কিনা?

নাটক নিয়ে আমার কোনো অনীহা নাই। কিন্তু বিজ্ঞাপনের ফাঁকে ফাঁকে নাটক করতে চাই না। সাম্প্রতিক সময়ে মা ও শিশু স্বাস্থ্য সম্পর্কে একটা মোটিভেশনাল কাজ করছি।

টেলিভিশনের বর্তমানের নাটকগুলো এতোই সস্তা যে দর্শক চ্যানেল ঘুরাতে বাধ্য হয়।

এটার বেসিক কারণ হলো- নির্মাণ এখন টিভি মালিকদের হাতে নাই, বিজ্ঞাপন দাতাদের হাতে । একারনেই টিভির কোনো কিছু বলারই থাকেনা আমার ধারণা। বিজ্ঞাপন দাতারা যেই ভঙ্গিতে করতে বলে, ওরা বোধহয় ওভাবেই দৌঁড়ায়।

টিভি মালিকদের কী কোনই দায় নেই?

টিভি মালিকদের কাছে বলটা নাই তো। বলটা মাল্টিন্যাশনালদের হাতে বা বিজ্ঞাপন দাতাদের হাতে। আরেক দিকে যেদেশে ৪/৫টা চ্যানেলই যথেষ্ট সেখানে যদি ২৮/৩০টা চ্যানেল হয় সেখানে অনুষ্ঠানের মান ধরে রাখতে না পারা এটাও একটা বিষয়।

স্বপ্নজালের পর আপনার পরবর্তী ভাবনা কী? এবং সেটা কবে নাগাদ?

স্ক্রিপ্ট হয়ে গেছে এবং এই বছরেই প্রোডাকশন শুরু হয়ে যাবে।

ছবির নামধাম ঠিক হয়ে গেছে?

সব হয়ে গেছে। এটা ফরমালি ঘোষণার ব্যাপার আছে।

আপনার জীবনসংসার, সঙ্গীনি সম্পর্কে কিছু বলুন।

বউ একটা, বাচ্চা দুইটা-সুমগ্ন, সুজয়।

এটা কি আপনার প্রেমের বিয়ে ছিল?

হ্যাঁ প্রেমের বিয়ে। কলেজ লাইফ থেকে প্রেম করেছি এরপর বিয়ে। এখন ২৬ বছরের সংসার জীবন।

এসবিসি/

 
.



আলোচিত সংবাদ