‘দুটো দল রাজনৈতিকভাবে জাপার সাথে ফাউল প্লে করেছে’

ঢাকা, বুধবার, ১৮ জুলাই ২০১৮ | ৩ শ্রাবণ ১৪২৫

‘দুটো দল রাজনৈতিকভাবে জাপার সাথে ফাউল প্লে করেছে’

সীমান্ত বাঁধন চৌধুরী ৯:১৬ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১১, ২০১৮

print
‘দুটো দল রাজনৈতিকভাবে জাপার সাথে ফাউল প্লে করেছে’

জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং সাবেক মন্ত্রী জিএম কাদের বলেছেন, দেশের রাজনীতি সঠিক কোনো গন্তব্যের দিকে যাচ্ছে কি না, তা কেউ বলতে পারছেন না। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নাম উল্লেখ করে জাপার এই কো-চেয়ারম্যান আরো বলেন, দু’টো দল রাজনৈতিকভাবে জাপার সাথে ফাউল প্লে করেছে।

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ রাজনৈতিক নানান বিষয়ে পরিবর্তন ডটকমের সঙ্গে আলাপকালে এসব মন্তব্য করেন সাবেক এই মন্ত্রী।

পরিবর্তন ডটকমের পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো। 

আপনাকে স্বাগত ও শুভেচ্ছা

আপনাকেও শুভেচ্ছা।

জাতীয় পার্টির একজন নীতিনির্ধারক হিসেবে আপনার কাছে প্রথমেই জানতে চাইবো দেশের কুশলাদি। রাজনীতি কোন দিকে মোড় নিচ্ছে?

দেশের রাজনীতি কোন দিকে যাচ্ছে এটাই এখন সবচেয়ে বড় অনিশ্চিত গন্তব্য। সঠিক কোনো গন্তব্যের দিকে যাচ্ছে কি না, আসলে কেউ বলতে পারছে না। শেষমেষ কী হবে এ ব্যাপারে অনিশ্চয়তা কাটছে না। বরং বাড়ছে এটাই হলো বাস্তবতা। সম্পূর্ণ পরিস্থিতি যথেষ্ট অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়েই পার হচ্ছে।

এই অনিশ্চয়তাটা আপনারা কবে থেকে অনুভব করা শুরু করলেন?

অনিশ্চয়তাটা শুরু হয়েছে ৫/৬ বছর আগে থেকেই। কিন্তু অনিশ্চয়তার মিটমাট করতে কোনো উদ্যোগ এখনো গ্রহণ করা হয় নাই। স্বাভাবিকভাবে যেটা বোঝা যাচ্ছে সেটা হলো, এখনো ভবিষ্যৎ নিয়ে একেকজন একেকভাবে হিসাব করছে। সত্যিকার অর্থে কী হবে বা কী হওয়া উচিৎ, নিয়ম অনুযায়ী তার সম্পর্কে কোনো ঐক্যমত হচ্ছে না।

৯০-এর পরবর্তী সরকারগুলোর শাসন ব্যবস্থার সাথে জাতীয় পার্টির ৯ বছরের শাসনামলের পার্থক্য কতখানি আপনি মনে করেন?

৯০-এর পর যারা ক্ষমতায় এসেছেন তারা জাতীয় পার্টির ক্ষমতা নিয়ে যে সমালোচনাগুলো করতেন বা যেগুলো উত্তরণের কথা বলে তারা ক্ষমতায় এসেছেন, বলা যায় এগুলোর বিষয়ে কোনটাতেই তারা সফলতা দেখাতে পারেননি। সত্যিকার অর্থে বলতে গেলে এরশাদ সাহেবকে যে কথা বলে সবসময়ই অভিযোগ করা হতো, উনি স্বৈরাচার বা স্বৈরাচারী কায়দায় দেশ চালিয়েছেন, দুর্ভাগ্যবশত এটা সত্য প্রমাণিত হয়েছে।

এবং এখন আর এটিতে সচেতন কেউ দ্বিমত করবে বলে আমার মনে হয় না যে, সেই স্বৈরাচারী কায়দায় দেশ চালানো থেকে দেশ উদ্ধার পায়নি বরং প্রতিদিনই এটা আরো বেশি সৈরাচারী কায়দায় চলে গেছে। এবং বলতে গেলে এখন বিশ্ব জনসম্মুখেও বিশ্ব জনমতের ভিত্তিতে স্বৈরাচার থেকে দেশ উত্তরণ পায়নি এটা প্রমাণিত হয়েছে এবং ঘোষণা দিয়েই প্রমাণিত হয়েছে।

তার মানে এরশাদের ৯ বছরের শাসনামল স্বৈরতন্ত্র থেকে দেশ বর্তমানেও মুক্তি লাভ করেনি বলে আপনি মনে করছেন?

মনে করছি না, এটা প্রমাণিতও হয়েছে। ৯০-এর পর যারা এসেছে তারা ওনার চেয়ে কম স্বৈরাচারী বলে কেউ দাবি করতে পারবে না। দাবি করলেও কেউ প্রমাণ করতে পারছেন না এবং প্রতিদিনই মনে হচ্ছে যেন এই স্বৈরাচারীভাবে দেশ চালানোর যেই অবস্থান সেটা বেড়েই চলেছে। এটা শুধু আমাদের দেশেই না বিদেশেও স্টাবলিশড হয়ে গেছে যে, স্বৈরাচার থেকে আমরা মুক্তি লাভ করতে পারিনি, সেটা হলো প্রথম কথা। দ্বিতীয়ত, স্বৈরাচারী কথাটার আরেকটি কানেক্টেড জিনিস ছিল সেটা হলো গণতন্ত্রের অভাব, যেখানে জনগণের শাসন টোট্যালি হচ্ছে না। সে ক্ষেত্রেও আমরা বর্তমানে সফলতা দেখাতে পারছি না। কেননা দেখা যায় যে, তখনকার সময় প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক যা-ই হোক আমি যা দেখেছি আমাদের ধারণা মতে, সাধারণ মানুষের ধারণা মতে তখনকার সরকার তবুও জনমতের কিছু তোয়াক্কা করতো, মানুষের প্রত্যাশা পূরণে একটা উদ্যোগ থাকতো। জনগণকে কথা বলার এবং কথা শোনার সুযোগ দেওয়া হতো, জনগণের কি চাহিদা সেটা জানার চেষ্টা করা হতো এবং সেই মোতাবেক কাজ করা হতো। পরে কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যা-ই থাক আমাদের জনগণের মতামত শোনা এবং বলার যেই কোরাম যেমন পার্লামেন্ট, সরকার শিক্ষা নেওয়ার কোরাম পার্লামেন্ট- এগুলো কিন্তু কার্যকর হয়নি। এগুলো দেখা গেছে হয়তো চালুই ছিল না বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অথবা যেটুকু চালু ছিল সেটুকু শুধুই লোক দেখানো।

পরবর্তী শাসনামলে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী দেশ পরিচালনা বা সরকার চলবে, সরকার গঠিত হবে এসব বিষয় ইম্প্রুভমেন্ট হয়নি। ফলে যেটা হয়েছে ‘জবাবদিহিতামূলক সরকার’ যেটা গণতন্ত্রের প্রধান বার্তা। যেখানে সরকার জনগণের ইচ্ছামতো হবে এবং দেশ চালাবে এবং জনগণের কাছে জবাবদিহিতার জায়গা থাকবে সবসময়। ইলেকশনের মাধ্যমে একটা জবাব, পার্লামেন্টের মাধ্যমে একটা জবাব, অন্যান্য সংগঠনের মাধ্যমে জবাব- এসব জবাবদিহিতায় ব্যর্থ হলে দায়বদ্ধতা নিতে হবে। সেই দায়বদ্ধতা নিয়ে তার শাস্তির ব্যবস্থা, তার জন্য কোর্ট, তার জন্য অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থা নেবে। বরং দেখা গেছে এগুলো এরশাদ সাহেবের সময় যতটুকু ছিল পরে সেটার অবনতিই হয়েছে। পরবর্তী শাসন ব্যবস্থায় দায়বদ্ধতা এবং জবাবদিহিতার বিষয়টা জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়নি। জবাবদিহিতাবিহীনভাবে সরকার চললে দুর্নীতি বিস্তার থেকে শুরু করে নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়। দুর্নীতির ব্যাপারে ৯০-এর পরে বাংলাদেশ উপর্যুপরি ৪/৫ বার বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিবাজ দেশ হিসেবে ব্র্যান্ডেড হয়েছে। এখনো আমরা সর্বোচ্চ দুর্নীতিবাজ না হলেও মোটামুটি বিশ্বের দুর্নীতিবাজ দেশগুলোর কাছাকাছি। আইনের শাসনের প্রশ্নে এরশাদ সাহেবের আমলে গুম, খুন বা অন্য যে ধরনের এক্সট্রা জুডিশিয়ারি কিলিংস এগুলো অভিযোগ করা হতো, তা সেরকম বিরাটভাবে কোনো কিছু হয়নি। তবে দু-একটা হতো। আবার সরকার সবগুলোর সাথে জড়িত ছিল এমনও প্রমাণ নেই। কিন্তু নব্বই পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে এগুলো বেড়েছে মোটামুটি এমন একটা পর্যায়ে চলে গেছে যে, বিশ্বের মানুষও এখন এটা নিয়ে কথাবার্তা বলছে এবং বিশ্ব বিবেক উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। কাজেই আইনের শাসন বা মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি কিন্তু এরশাদ সাহেবের সময় যতটুকু ছিল পরবর্তীতে এটার উন্নতি হয়নি, বরং বলা যায় অবনতি হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে জাতীয় পার্টির ভূমিকা কী?

মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে দাঁড়ানোর চেষ্টা জাতীয় পার্টি করে যাচ্ছে। তবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দাঁড়ানোর জন্য যেই সুযোগ সুবিধা থাকা উচিত সেই স্পেসটা নেই। ডেভেলপড কান্ট্রিগুলোতে যেভাবে সুযোগ দেওয়া হয়, যেমন- রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য দেওয়ার, বক্তব্য শোনার এবং তার জন্য তাদেরকে ডেমোনেস্ট্রেশন করার, সরকারকে বোঝানোর চেষ্টা করার এবং সরকার সেগুলোকে যেভাবে গ্রহণ করেন আমাদের দেশে এসব সুযোগ কম দেওয়া হচ্ছে। তেমনি সব সরকারেরই গ্রহণ করার মানসিকতা নেই বলতে গেলে চলে। ফলে এসব মোকাবেলা করতে নিয়মতান্ত্রিকভাবেই রাজনৈতিক দলগুলোর যা করা উচিত সেটা নিয়মের ভিতরেই রয়ে গেছে, বাস্তবে সেইভাবে করা যাচ্ছে না।

হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদকে সেই সময়টায় স্বৈরাচার কেন বলা হতো। এর মূল কারণটা কি?

দুটি জিনিস এখানে হয়েছে। গ্রহণযোগ্য কারণ হলো- উনি যেই প্রসেসে ক্ষমতায় এসেছেন সেটা রাজনৈতিকভাবে কোনো নিয়মতান্ত্রিক পন্থা নয়। কাজেই উনাকে একটা গালাগাল দেওয়ার সুযোগ আছে। আর দ্বিতীয়টা হলো- উনি গালাগালি করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। মানুষকে প্রেশারাইজ করে বা নিপীড়ন করে বাধ্য করা যে তার বিরুদ্ধে কিছু বলা যাবে না, এ ধরনের বিষয়গুলো পারতপক্ষে উনি করতেন না। একেবারে হয়নি আমি তা বলবো না। তবে তুলনামূলকভাবে অনেক কম ছিল। ফলে ওনাকে গালাগাল করা, সমালোচনা করা তখন যতটা ফ্রিলি হতো পরবর্তীকালে কিন্তু এগুলো সংকুচিত হয়ে গেছে। এখন নেতাকে কেউ গালাগাল করতে গেলে অনেক কিছু চিন্তা করতে হয়। তাদের নিরাপত্তার কথা, রুজি রোজগারের কথা চিন্তা করতে হয়। এরশাদ সাহেবের সময় কিছুটা হলেও মানুষের কথা বলার স্বাধীনতা ছিল। তবে উনি যেহেতু নিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতায় আসেননি তখন বলাই যায় যে, এটা ঠিক হয়নি। তবে মানুষের কিন্তু স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন ছিল। নব্বইয়ের পর তাকে যখন একবারেই কোণঠাঁসা করার ব্যবস্থা করা হলো তখনও জেলখানা থেকে তিনি ৫টি আসনে পরপর দুবার নির্বাচিত হয়েছেন। তার মানে উনার কর্মকাণ্ডগুলো জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল তা প্রমাণিত।

যারা তখন স্বৈরাচার হটানোর আয়োজন করেছিল, সেই তাদের সাথেই তো আপনাদের ঘর বাঁধতে হয়েছে....

ভোটের রাজনীতি হলো আরেক জিনিস। বাংলাদেশে এখন যেই পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে, নব্বইয়ের পরে জাতীয় পার্টি ছাড়া আর দুটি দল সরকার চালিয়েছে। তারা দেশময় তাদের একটা প্রতিযোগিতা করার মতো, তাদের প্রার্থী দেওয়া, সাংগঠনিক শক্তি ও সমর্থক গোষ্ঠি রয়েছে। ভোটের রাজনীতিতে সমীকরণ যখন আসে তখন দেখা যায় যে দেশ তিন ভাগ হয়ে  যায়। কেউ সরকারের পক্ষে থেকে সরকারকে রাখতে চায়, কেউ সরকার পরিবর্তন করতে চায়। এই পরিস্থিতিতে জাতীয় পার্টিকে যে কোনো জায়গায় একটা অবস্থান নিতে হয়। সে অবস্থান নিতে গিয়ে জাতীয় পার্টি যে একটা লিডিং ভূমিকা রাখবে এটা এই ২৭ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকাতে আরো কিছু সময়ের প্রয়োজন। রাজনৈতিকভাবে কন্টিনিউয়াসলি দুটো দল জাতীয় পার্টির সাথে ফাউল প্লে করেছে। তারা স্বাভাবিক এবং নিয়মতান্ত্রিকভাবে জাতীয় পার্টিকে রাজনীতি করতে দেয়নি। এজন্য জাতীয় পার্টি দ্রুত লিডারশিপে আসতে পারছে না। কিন্তু এখনো জাতীয় পার্টি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিয়ামক শক্তি হিসেবে প্রবলভাবে আছে। ৩টার মধ্যে যখন দুটো হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয় তখন জাতীয় পার্টি যেদিকে ভর দেয় দেখা যায় সেদিকেই পাল্লা ভারি। জাতীয় পার্টি যদি বাইরে থাকে অর্থাৎ আওয়ামী লীগের সাথে না থাকে তাহলে আওয়ামী লীগ কোনো দিনও ক্ষমতায় আসতে পারবে না। বিএনপির ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার যদি জাতীয় পার্টি বিএনপির সাথে বিরোধিতা না করে তাহলে তাদের নির্বাচনে জয়লাভের সম্ভাবনা। এটাই এখন বর্তমান পরিস্থিতিতে ইলেকশন সমীকরণে এসে দাঁড়িয়েছে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ না করলে জাপা ৩০০ আসনে ভোট  করবে। জাপাকে বিএনপির বিকল্প শক্তি হিসেবে দেখছেন?

জাপা সবসময় বিএনপির বিকল্প ছিল এবং বিএনপি জাপার বিকল্প। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটা সবসময়ই থাকবে। এর কারণ হলো দেশের প্রধান তিনটি রাজনৈতিক দলের একই চরিত্র।

আওয়ামীলীগ, বিএনপি ও জাপার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তিনটি দলই মধ্যপন্থী দল।

তারা একই সঙ্গে সাম্প্রদায়িক, একই সঙ্গে তারা ধর্মনিরপেক্ষ এবং বাংলাদেশের বেশিরভাগ জনগণ একই সঙ্গে সাম্প্রদায়িক, একই সঙ্গে তারা ধর্মনিরপেক্ষ। তারা একই সঙ্গে ওয়াজ মাহফিল শুনে  চোখের পানি ফেলে, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে আবার পরের দিনই তারা যাত্রাপালায় গিয়ে নর্তকীদের সাথে নাচে। এই হলো চরিত্র। তারা ধর্মপ্রাণ আর নিরপেক্ষ একসাথে। এই স্বভাবটিকে ধারণ না করলে কোনো দলই জাতীয় দল হতে পারে না। কেউ যদি পুরোপুরি ইসলামিক দল হয় সে যেমন পুরোপুরি সমর্থন পাবে না আবার কেউ যদি কমিউনিস্ট হয় তারাও বেশিরভাগ জনগণের সমর্থন পাবে না। আওয়ামী লীগের সাথে জাতীয় পার্টির এবং বিএনপির একটি বেসিক পার্থক্য হলো বন্ধুত্ব চয়েস করা। আওয়া মীলীগ সবসময় উদারপন্থীদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে আর বিএনপি হলো যারা আওয়ামী লীগকে পছন্দ করে না আর যারা সাম্প্রদায়িক দল অর্থাৎ কনজারভেটিভ তারা বিএনপিতে গিয়ে জড়ো হয়েছে। স্বাধীনতার পরে এদেরকে রাজনীতি করতে দেওয়া হয়নি, বিএনপি হওয়ার পর তারা ওখানে গিয়েছে। তারপর বিএনপির যখন কোনো কারণে পতন হলো এবং জাতীয় পার্টি তৈরি করা হলো তখন ওই লোকগুলোই রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে জাতীয় পার্টিতে আসে, ফলে জাপা এবং বিএনপির মধ্যে কোনো রকম পার্থক্য নেই। কোনো সময় যখন জাতীয় পার্টি উঠবে তখন বিএনপি ডাউন হবে, আবার বিএনপি উঠলে জাতীয় পার্টি ডাউন হবে।

আপনি বলছিলেন জাপা যেদিকে ভর দেবে সেদিকে পাল্লা ভারি হবে। তাহলে তো জাপার দর বেশ তুঙ্গে

আগামী নির্বাচনে আমরা যদি ঠিকমতো দর কষাকষি করতে পারি এবং স্বকীয়তা রাখতে পারি তাহলে আমাদের বড় একটা সম্ভাবনা আছে। বিএনপি আর জাপা আদর্শের দিক থেকে খুবই কাছাকাছি। আমাদের নেতৃত্বে যদি কোন রকম গাফিলতি হয় তাহলে হয়তো দেখা যাবে আমাদের ভোটাররা আর আমাদের সাথে থাকছে না। সে জন্য নিজেদের স্বকীয়তা রাখতে হবে। উই আর ডিফারেন্ট দ্যান বিএনপি, এটা মানুষকে আমাদের বোঝাতে হবে। নয়তো আমাদের ভোটাররা কি দেখে থাকবে!

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কতটুকু অংশগ্রহণমূলক হবে বলে আপনি মনে করেন?

এটা কেউই বলতে পারবে না। এই বিষয়টা সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। এই অনিশ্চয়তা থেকে দেশে একটা অস্থিরতা আছে। এই অস্থিরতাটা কিন্তু দেশের মানুষকে হিট করছে। যখন দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকে তখন দেশে সবচেয়ে বড় যে ক্ষতি হয় সেটা হলো, দেশে অর্থনৈতিক মন্দা হয়। অর্থনৈতিক মন্দার সাথে দেশের ভালো মন্দ সব কিছু জড়িত। দেশের কি হবে, না হবে কোন ভবিষ্যৎ থাকে না। বেকারত্ব বাড়বে, সামাজিক নিরাপত্তা হীনতা, আইন শৃঙ্খলার অবনতি ইত্যাদি হতে থাকবে। কাজেই অনিশ্চয়তা না কাটলে কিছু বলা যায় না। তবে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হলো জনগণের অংশগ্রহণ, পলিটিক্যাল পার্টির অংশগ্রহণ না। জনগণ অংশগ্রহণ করেছে কি না সেটাই আসল। মেজরিটি লোক যদি ভোট দিতে পারে সেটাই অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন । বিএনপি এলো না, জাতীয় পার্টি এলো না, আওয়ামী লীগ এলো না, দ্যাট্স নট এ পয়েন্ট।

আপনি কি অবাধ, সুষ্ঠু ও  গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আশা করছেন?

ভোট অবাধ সুষ্ঠু হলো কি না, ভোট কাউন্ট হলো কি না, ভোট সঠিকভাবে দিতে দেওয়া হলো কি না, এটা যদি না হয় তাহলে তো নির্বাচন সুষ্ঠু হলো না। যদি আমরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করি আর ভোট যদি সুষ্ঠু না হয় সেটা দেশবাসী জানলো, বিদেশিরা জানলো কিন্তু কথা তো থেকেই গেলো যে, নির্বাচন তো হলো কিন্তু সুষ্ঠু হলো না। গ্রহণযোগ্যতা হওয়া না হওয়া তো আমাদের হাতে না। তা জনগণ দেখবে বিশ্ব দেখবে।

সংসদে জাতীয় পার্টি এই যে একটা দোটানার মধ্যে যেমন- আপনাদের কথা আমরা এখনও বিরোধী দল হয়ে উঠতে পারিনি এই উপলব্ধিটা আপনাদের এতো পরে হলো না কেনো?

আমরা অনেক আগে থেকেই বলেছি যখন জাতীয় পার্টি থেকে মন্ত্রী নেওয়া হলো তখন আমি বলেছি এবং লিখেছি। আমাদের প্রেসিডিয়ামে সিদ্ধান্ত নিয়ে এরশাদ সাহেবকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। উনি অনেকবার বলেছেন যে, তাদেরকে ফিরিয়ে নেওয়া হোক। এরপর রওশন এরশাদও বলেছেন, এটা হঠাৎ করে বলা হচ্ছে এটা ঠিক নয়।

আমাদের দেশে সংবিধানে পরিষ্কার বলা আছে যে, সংসদীয় দলগুলো দুভাগ হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। সংসদীয় দলগুলো সবসময় একসাথে থাকতে হবে। মানে সংসদে জাপা যারা আছি তারা সবাই একসুরে কথা বলতে হবে। আমরা কিছু লোক সরকারের পক্ষে কিছু লোক সরকারের বিপক্ষে এটা হবে না। কাজেই আমরা যদি বিরোধী দল হই তাহলে মন্ত্রী থাকলে মন্ত্রীদের তো সরকারের পক্ষেই থাকতে হবে। মন্ত্রীর ডেফিনেশন পার্ট অব দ্য গভর্নমেন্ট। সংসদের যে কোনো ডিসিশন যে কোনো প্রস্তাব আসুক, সেখানে মন্ত্রী থাকুক আর না থাকুক, যেহেতু তার মন্ত্রীর নাম আছে, তাকে ধরে নিতে হবে যে, সে সরকারকে সমর্থন দিয়েছে এবং হ্যাঁ ভোট দিয়েছে। সেখানে বিরোধী দল হিসাবে সংসদে জাপা যদি না ভোট দেয় তাহলে এই মন্ত্রীদের মন্ত্রী পরিষদে থাকা সংবিধান অনুযায়ীই শুধু না সংসদ সদস্য পদই থাকবে না। সংবিধান অনুযায়ী যদি সত্যিকার বিরোধী দলের রোল প্লে করতে হয় তাহলে সরকারের কাজে শুধু প্রতিবাদ নয়, ভোট দিয়ে প্রমাণ করতে হবে যে আমি এর বিপক্ষে আছি। আমরা যদি ‘না’ ভোট না দিতে পারি তাহলে বিরোধী দল হলাম কি করে? তাহলে আমাদের দেশের আইনেই আমরা বিরোধী দল নই।

ডাবল রোল প্লে করাটা যন্ত্রণাদায়ক জেনেও এই রোলটা আসলে কেন নিয়েছিলেন?

এটা আমি বলতে পারব না।

আপনি তো জাপার একজন নীতিনির্ধারক আপনি তো জানেন...

নীতিনির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। নীতিনির্ধারণী ফোরাম থেকে বলা হয়েছে তাদের রেজিগনেশন দিতে হবে এবং সে ব্যাপারে পার্টির চেয়ারম্যানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

একটা প্রকৃত এবং আদর্শ বিরোধী দল হতে আপনাদের প্রতিবন্ধকতা কোথায় ছিল?

আমাদের দেশের রাজনীতিতে যেটা বলা হয় তার উল্টোটাই হয় সবসময়। বলা হয়- ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়, হয় এর  উল্টোটা। এটা নতুন করে বলার কিছু নেই।

জাপা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কী ধরনের পরিবর্তন আশা করে?

প্রত্যাশা আমাদের অনেক কিছু- দেশের মানুষ শান্তিতে থাকবে, দেশ সমৃদ্ধশালী হবে, বিশেষ করে যেটা বড় সমস্যা এখন দাঁড়িয়ে গেছে, তা হলো আমরা অনেকে অনেক বড় বড় অর্জনের কথা বলি, কিন্তু প্রকৃত অর্থে মানুষ অর্থনৈতিকভাবে মুক্তি লাভ করেছে বলে মনে হয় না। সাধারণ জনগণের কাছে, দেশের বেকার সমস্যার কাছে, মাদকাসক্ত পরিবারগুলোর কাছে বাস্তবতা সুকান্তের ভাষায় এই রকম- ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।

এসবিসি/এএল/

 
.



আলোচিত সংবাদ