লেখকেরা পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃসঙ্গ মানুষ...

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৯ আশ্বিন ১৪২৫

লেখকেরা পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃসঙ্গ মানুষ...

পরিবর্তন প্রতিবেদক ১:১৫ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০১৮

লেখকেরা পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃসঙ্গ মানুষ...

রাজীব হাসান। যার দাবি 'এক পৃথিবী লিখবো ভেবে, একটি খাতাও শেষ করিনি'। অথচ পরপর দুই বছর বইমেলায় তাঁর দুটো বইই পাঠক সমাদৃত। শিশু-কিশোর বিষয়ক সাহিত্য গ্রন্থের জন্য তিনি ২০১৭ সালে পেয়েছেন কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার। সাংবাদিকতার পাশাপাশি লেখালেখি করেন নাকি লেখালেখির পাশাপাশি সাংবাদিকতা! কোথা থেকে পান তার লিখা গল্পগুলোর আইডিয়া! এমন কিছু প্রশ্নের উত্তর জানতে পরিবর্তন.কমের আড্ডায় আজ রাজীব হাসান। গুণী এই লেখকের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- আঁখি ভদ্র।

কেমন আছেন? 

-খুব ভালো আছি। 

রাজীব হাসান কখন বুঝতে পারলেন যে তিনি একজন লেখক হতে যাচ্ছেন? 

-দুটি ঘটনা আমাকে লেখক হয়ে ওঠার তাড়না এনে দিয়েছে। আমাদের শৈশবে রংপুরের যুগের আলো নামের একটি স্থানীয় দৈনিক চিন্তায়, ভাবনায়, সৃষ্টিশীলতা আর আধুনিকতায় চমকে দিয়েছিল। যুগের আলোতে ছোটদের একটা পাতা ছিল, অংকুর মেলা। যুগের আলোর ডাকবাক্সে চুপি চুপি একটা ছড়া জমা দিয়ে এসেছিলাম। অংকুর মেলা ছাপা হতো সম্ভবত বুধবার। প্রতি বুধবার সাতসকালে বাসা থেকে বেরিয়ে দুই কিলোমিটার হেঁটে যুগের আলোর বাইরের দেয়ালে টাঙানো পত্রিকা দেখতে যেতাম। যুগের আলোর দাম যখন ২ টাকা ছিল। আর ২ টাকা দিয়ে পত্রিকা রাখাও আমাদের পরিবারের জন্য ছিল বড় বিলাসিতা। আশপাশের বাসায় যারা পত্রিকা রাখত, তাদের ওখানে যেতেও লজ্জা করত। ফলে পত্রিকা অফিসের দেয়ালে টাঙানো ফ্রি পত্রিকাই ছিল ভরসা। আশপাশে আরও দু-চারজন মানুষের ভিড় ঠেলে পত্রিকা পড়ি। বড়রা বড় বড় চোখ করে আমার দিকে তাকায়, এই পিচ্চি এখানে কী করে! এর এই বয়সে পত্রিকা পড়ার এত নেশা! আসলে তো নিজের নামটা খুঁজি। এমনভাবে তাকাই যেন কেউ বুঝতে না পারে। কিন্তু ছাপা আর হয় না! খুব অভিমান হয়েছিল। আমি আসলে প্রত্যাখ্যান সহ্য করতে পারি না। নিজের ওপরই রাগ হয়েছিল কেন ছড়াটা দিলাম! হাল ছেড়ে দিয়েছি, আর যাবই না এমনই একদিন স্কুল থেকে হেঁটে বাসায় ফেরার পথে, কী যেন মনে হলো যাই তো একটু ওদিক দিয়ে। দুপুরের পর কখনো কখনো পত্রিকার কোনো দিকটা ছেঁড়া থাকত। এমনই একটা ছেঁড়া অংশে, খুলে পড়ে পড়ে এমন অবস্থায় আমি আমার ছড়াটা দেখলাম। কী যে রোমাঞ্চ হয়েছিল! বারবার শুধু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ছাপার অক্ষরে নিজের নামটা দেখি, আর ছড়াটা পড়ি। ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখার এই রোমাঞ্চ, এই আনন্দ আমি খুব কম জায়গায় পেয়েছি। এখনো নিজের লেখা প্রকাশিত হলে একই রোমাঞ্চ অনুভব করি। 

দুটি ঘটনার কথা বলছিলেন। আরেকটি কোনটি? 

আরেকটি ঘটনার কথা বেশ কবার বলেছি। যারা আগে জেনেছেন, বিরক্ত হতে পারেন। তবে আপনাদের পাঠকদের সঙ্গে সেই অনুভূতি তো ভাগাভাগি করে নেওয়াই যায়। আমি রংপুরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সদস্য ছিলাম, ওখানে নিখরচায় বই পড়া যেত বলে। বই পড়ে খুব ভালো লাগত। তো বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র রংপুরের ম্যাগাজিন ‘নিজেদের কথা’য় একটা অংশ ছিল বই আলোচনা। সেরা আলোচনা পাবে ২০০ টাকার প্রাইজবন্ড। সেবারের বইটা ছিল আংকেল টম’স কেবিন। আমি আমার মতো করে বইটা নিয়ে লিখেছিলাম। সেবার রংপুরে প্রাইজবন্ডের সংকট ছিল সম্ভবত, তাই খামে ভরে আমাকে দুটো ১০০ টাকার নোট দেওয়া হয়েছিল। প্রতি শুক্রবার কেন্দ্রের আসর হতো, ৫০-৬০ জন আসতেন। তাদের করতালির মধ্যে খামটা নিয়েছিলাম। এও তো অন্য রকম এক রোমাঞ্চ। এটা আমার জীবনেরই প্রথম আয়, তখনো টিউশনি শুরু করিনি। মনে আছে, নিজের ছেঁড়া স্যান্ডেলটা কিছুতেই চলছিল না বলে সেই পুরস্কারের টাকায় নতুন এক জোড়া স্যান্ডেল কিনতে গিয়েছিলাম। কিন্তু হুট করে স্যান্ডেল না কিনে সেই টাকায় এক কেজি মাংস কিনেছিলাম। আমাদের পরিবারের তখন মাংস রান্নাই হতো দুই ঈদে। সে রাতে বাসার সবাই মিলে গরম ভাতের সঙ্গে ভুনা মাংস এত মজা করে খেয়েছিলাম, দৃশ্যটা ভুলতে পারি না। এখনো লিখতে বসলে, কোনো লেখা তৃপ্তি এনে দিলে নাকে ভাপ ওঠা ভাত আর মাংস ভুনার মিলেমিশে একাকার হওয়া অপার্থিব একটা ঘ্রাণ পাই। 

কিশোর দীর্ঘ গল্প, কিশোর উপন্যাস এবার উপন্যাস। যদি জানতে চাওয়া হয় আপনার কাছে উপন্যাসের সংজ্ঞা আসলে কী? তাহলে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন? 

লেখক হয়ে উঠতে চাওয়ার পেছনে আরও দুটো ব্যাপার কাজ করেছে। যুগের আলো তাদের এক প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ঠিক করল সেরা লেখককে পুরস্কৃত করবে। আমার খুব কাছের বড় ভাই ছিলেন আমির খসরু সেলিম, উনি রংপুরে থেকেই ঢাকার পত্রিকা, ম্যাগাজিনে নিয়মিত লিখতেন। একবার যুগের আলোর সেরা লেখক হলেন তিনি। সেদিনের অনুষ্ঠানে তাঁকে ঘিরে ধরা এত আলো আমাকে মুগ্ধ করেছিল। লেখকদের সবাই কী ভালোবাসার চোখে গ্রহণ করে! আর তখনো দেখিনি তবে অক্ষরের মানুষ হয়ে ছিলেন আনিসুল হক। তিনিও রংপুরের, রংপুর জিলা স্কুলের। তিনিও আমার মতো টাউন হলে ঘোরাফেরা করতেন, অভিযাত্রিকের সদস্য ছিলেন। সেখান থেকে ঢাকায় গিয়ে এত নাম করেছেন! তাঁর নিধুয়া পাথার, আয়েশামঙ্গল তখন সবখানে এত আলোচিত! প্রশংসিত। তো তাঁর পদরেখা ধরে ধরে আমি ঢাকায় এলাম। প্রথম আলোতেও জায়গা হয়ে গেল কী করে কী করে। যদিও ছোটবেলার সেই বিশাল শ্রদ্ধার কারণে আমি সব সময় তাঁকে দূর থেকেই দেখেছি। দূর হতে আমি তারে সাধিব আরকি! গতবার বইমেলার কারণে তাঁর খুব কাছে আসার সুযোগ হয়েছিল। হরিপদ ও গেলিয়েন বের হচ্ছে জানার পর তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, উপন্যাস যে লিখছ, উপন্যাস কাকে বলে জানো? আমি তো ভয়েই মরি! না তো, জানি না! কী করে উত্তর দেই! এই বুঝি বকা দেবেন! শেষে ভয়ে ভয়ে মাথা নেড়ে বলি, মিটুন ভাই, আমি জানি না উপন্যাস কাকে বলে! মিটুন ভাই গম্ভীর করে রাখা মুখটায় তার শিশুসুলভ হাসি হেসে বললেন, তাহলে তোমাকে দিয়েই হবে। আমিও আসলে জানি না উপন্যাস কাকে বলে! এত সাহস পেয়েছিলাম এই কথায়! 

লেখালেখির জগতে আপনার প্রবেশের পর আপনার সবচেয়ে ভালো অভিজ্ঞতা কী? 

আম্মার খুব ন্যাওটা ছিলাম। সব সময় মায়ের আঁচল ধরে ঘুরতাম। এর অসুবিধাজনক দিক হলো আমি নিজে নিজে করতে হয় এমন অনেক কিছু করতে শিখিনি। আমার চুল এলোমেলো থাকে এ কারণে, আম্মার আঁচড়িয়ে দেওয়া বাদ দেওয়ার পর আমি কোনো দিন চুলে চিরুনি দেইনি। এ কথা এ জন্য বললাম, আমার চরিত্রটা বোঝাতে। আমি বেশির ভাগ জিনিসই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে করতে পারি না। একটা জিনিসই পারি, সেটা হলো লিখতে। পেশা হিসেবে আমি লেখালেখিকে বেছে নিতে পেরেছি, সাংবাদিকতা করছি, এটা আমার জন্য সৌভাগ্যের। লেখালেখি জগতে প্রবেশের পুরো অভিজ্ঞতাটাই আনন্দের। আর সবচেয়ে সেরা অভিজ্ঞতা বললে, গতবারের বইটা যেভাবে পাঠক গ্রহণ করেছে সেটা। এটা আমার প্রথম উপন্যাস ছিল, খুব ভয় ছিল যদি কেউ গ্রহণ না করে। লোকে হাসাহাসি করে। সেই বইটা পাঠক-সমালোচক দুই পক্ষই সাদরে গ্রহণ করেছেন। সবাই সাহস দিয়েছেন। 

আপনার নিখুঁত পাঠক কে? 

আমি ছেঁড়া ছেঁড়া কিছু দৃশ্য নির্মাণ করে বাকিটা পাঠকের কাছে ছেড়ে দিই। যেমন আমার এবারের উপন্যাসে দ্বিতীয় অধ্যায়ের কথা বলি। সেই অধ্যায়টা ফুলবানুর। ফুলবানুর স্বপ্ন সে রাশেদকে বিয়ে করে ট্রেনে সংসার পাতবে। রাশেদ যেহেতু স্বপ্ন দেখে ট্রেনের চালক হওয়ার। রান্না ঘরের মেঝেতে চিটচিটে কাঁথায় শুয়ে ফুলবানু যখন এই স্বপ্ন দেখে, তখন তার পাশ দিয়ে হেঁটে যায় একটা কেন্নো পোকা। কেন্নো পোকাটাও ট্রেনের মতো, টোকা দিলে এই পোকাটা গুটিয়ে যায়। যখন শের খান সেই রাতে ফুলবানুর ঘরে আসে, ফুলবানুর দিকে বাঘের থাবা মেলে দেয়, কেন্নো পোকাটা নিজে থেকে গুটিয়ে যায়। যেন ফুলবানুর স্বপ্ন বয়ে নিয়ে যাওয়া একটা ট্রেন দুমড়ে মুচড়ে গেল। আমি শুধু এই দৃশ্যগুলো নির্মাণ করেছি, এখানে যতটা ব্যাখ্যা দিয়ে বললাম, সেভাবে বলিনি। যে পাঠক এই ছোট ছোট বিষয়গুলোকে নিজের মতো করে আবিষ্কার করবে, সে-ই আমার নিখুঁত পাঠক। যেমন রাশেদের গলায় আমি মাফলার দিয়েছিলাম এই মাফলার পরে শের খান কুকুরে চেনের মতো ব্যবহার করবে, একই মাফলার ফুলবানু ব্যবহার করবে তার জীবনের কঠিনতম সিদ্ধান্ত নিতে। আশাদের বাসায় পড়া ভোকাট্টা ঘুড়ি আনতে গেছে এই অপরাধে আশার নানা যখন রনির গালে চড় মেরে বসেন, রনির গালে তিনটা আঙুলের ছাপ থাকে। তখন শহরে গুজব ছিল বাঘ যাকে ধরে, তার শরীরে তিনটা আঁচড়ের দাগ থেকে যায়। কেন এটা লিখলাম? এগুলো পাঠকের আবিষ্কার করার জন্য তুলে রাখা। আমার কাছে উপন্যাস হচ্ছে লেখক ও পাঠকের পার্টনারশিপ। ক্রিকেটের অন্যপ্রান্তের ব্যাটসম্যানের মতো। দুই রানের জন্য সেও সমান দৌড়ায়, যদিও রানটা লেখা হয় একজনের নামে। 

রাজীব হাসান কি বিখ্যাত হতে চান? 

একদমই না। আমি আড়াই বছর এফএমে খুবই জনপ্রিয় একটা শো করেছি। সেই শো করতে গিয়ে দেখলাম আরজেদের জনপ্রিয়তা এই দেশে লেখকদের চেয়ে কমপক্ষে ১০ গুণ। সহজ মাধ্যম, খুব দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়। আবার আরজেদের নিয়ে স্টারস্ট্রাক ব্যাপারটা কাজ করে। কিন্তু আমি তো লেখকই হতে চেয়েছি। রেডিওতেও ভুলভাল উচ্চারণে যতটুকু বলতাম, সে আমার নিজের গল্পই। আরজে থাকার সময়ও আমি তারকা ব্যাপারটা নিজের মধ্যে অনুভব করিনি। আসলে তারকা হওয়ার অনেক সমস্যা। আমার যেমন হাড্ডি চাবাতে খুব ভালো লাগে। তারকা হলে আপনি কোনো রেস্তোরাঁয় হাড্ডি চাবাতে পারবেন না। আমি এখনো পাবলিক বাসে বা লেগুনায় উঠি। সকালের গাদাগাদি ভিড়ের বাসে ভক্তের সঙ্গে সেলফি তোলার অভিজ্ঞতা হয়েছে। আমার পাবলিক বাস তো খুবই ভালো লাগে। কত গল্প খুঁজে পাই! জানি না আমার কখনো গাড়ি থাকবে কি না। গাড়ি হলেও আমি অবশ্যই পাবলিক বাসে উঠব। 

তুমি কেমন করে প্লট ভাবো হে লেখক? 

নিয়মিত সাংবাদিক হওয়ার অসুবিধাজনক দিক হলো, আমাকে প্রচুর লিখতে হয় বা লেখা সম্পাদনা করতে হয়। রোজকার লেখার এই ক্লান্তি আছে। কোনো গল্প লেখা আমাকে এই ক্লান্তি যেমন মুছে দেয়, আবার কেউ ঘাড়ে বন্দুক না রাখলে বাসায় গিয়ে গল্প লিখতে বসা হয় না। সাংবাদিকেরা বাড়তি লেখা ডেডলাইনের চাপে না পড়লে লিখতে পারেন না। আমার বেশির ভাগ গল্প আমার শেষ মুহূর্তে লেখা, গতবারের উপন্যাসটা যেমন লিখেছিলাম মাত্র ৫ দিনে। তবে গল্পটার প্লট মোটামুটি মাথার ভেতরে ছিল। বড় লেখকেরা নাকি প্রথম লাইনটা কেবল শুরু করে দেন, তারপর লিখতে থাকেন। কিন্তু আমাকে গল্পটা কিছু দূর অন্তত ভাবতে হয়। যখন বুঝতে পারি, এখন লেখা দরকার, তখনই শুরু করি। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যা হয়, যেভাবে ভেবে রাখা থাকে, গল্পটা ওই পথে এগোয় না। শেষটা অন্য দিকে চলে যায়। 

হরিপদ ও গেলিয়েন এবং আমাদের শহরে বাঘ এসেছিল এ দুটোর প্লট কী করে পেয়েছেন? 

আর সব লেখকের মতোই আমি আমার চারপাশ থেকে গল্প নেই। হরিপদ চরিত্রটা আমাদের অফিসের অফিস সহকারী অনিল দাকে মাথায় রেখে ভাবতে শুরু করেছিলাম। সেই উপন্যাসটা অঞ্জন দত্তের একটি গান থেকে সরাসরি অনুপ্রাণিত। আমাকে যেকোনো লেখকের চেয়ে অঞ্জন দত্ত সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছেন। হরিপদ নামের এক কেরানিকে ভিনগ্রহের আগন্তুকেরা তুলে নিয়ে যায়। আমি ভাবলাম, আচ্ছা এত এত সুপারম্যানকে আমরা দেখি। খুব সাধারণ, কেরানি একটা মানুষও কি সুপারহিরো হতে পারে না? এই ভাবনা থেকে অঞ্জনের গানটা মাথায় রেখে উপন্যাসটা লেখা। অঞ্জনের গান নিয়ে আরেকটি উপন্যাস লিখব। আর আমাদের শহরে বাঘ এসেছিল এটা আমার শৈশবের অভিজ্ঞতা থেকে লেখা। রংপুরে নব্বইয়ের দশকে বহুরূপী বাঘ নামার গুঞ্জনে পুরো শহর এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। 

কোন সাহিত্যর সাথে নিজের অনেক মিল পান? 

অঞ্জন দত্তের অসংখ্য গানে আমি নিজের জীবনকে খুঁজে পাই। আসলে আমি মনে হয় অঞ্জনের ঘোর থেকে কখনো বের হতে পারব না। অঞ্জনকে আমি আমার প্রিয় লেখক বলি। অঞ্জনের প্রতিটা গান আমার কাছে একেকটা ছোট গল্প। 

কোন বইটা আপনার জীবনে পরিবর্তন এনেছে? 

ব্যাংকের চেক বই! আসলে সেভাবে কোনো বই নিজের জীবনকে বদলে দেয়নি। তবে প্রতিটা বইই আমার কাছে একেকটা জানালার মতো। একটা বইয়ের মলাট খুলে বসা মানে জানালার কপাট খুলে দেওয়ার মতো। 

লেখার জন্য নির্জনতার প্রয়োজন হয় কি? 

ভীষণ। লেখার জন্য নির্জনতা দরকার হয় বলে লেখকেরা ভীষণ একা হন। লেখকেরা তো আসলে পর্যবেক্ষক। আপনার-আমার সাধারণ চোখ একটা ঘটনা যেভাবে দেখবে, একজন লেখক সেই একই ঘটনা অন্যভাবে দেখবেন। এ কারণে বড় লেখকেরা সাধারণ ঘটনাকে অসাধারণ করে উপস্থাপন করতে পারেন। আর লেখকেরা সব ঘটনা পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন বলে ঘটনার মধ্যে থেকেও তারা বিচ্ছিন্ন থাকেন। হ‌ুমায়ূন আহমেদ তার মেয়ের বিয়ে নিয়ে একটা উপন্যাস লিখেছেন, আজ চিত্রার বিয়ে। সেই উপন্যাস পড়তে গেলে বোঝা যায়, বাবা হ‌ুমায়ূন তাঁর মেয়ের জীবনের এত বড় আয়োজন, আনন্দের উপলক্ষ কিংবা কন্যা বিদায়ের শোক একপাশে সরিয়ে রেখে পুরো ঘটনা একটু দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করছেন। কারণ তিনি তা লেখার উপাদান হিসেবে ব্যবহার করবেন। এই বিচ্ছিন্নতা লেখকের জন্য কতটা কষ্টের! লেখকের নির্জনতা তাঁর স্বরচিত নির্বাসন। পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃসঙ্গ মানুষটার নাম তাই লেখক। জনতার ভিড়েও তারা নির্জনতা খোঁজেন।

সোশ্যাল মিডিয়া, মানে মূলত ফেসবুককে কেন্দ্র করে অনেক তরুণ তরুণী লেখালিখিতে আসছে। এর সুফল ও কুফল দুটোই আছে। আপনার কি মনে হয়?

সুফলের দিকটা আগে বলি। একজন লেখক খুব সহজে নিজেকে তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছেন। একটা বড় অডিয়েন্সের কাছে পৌঁছাতে পারছেন। এঁরা পরে তাঁকে ফিকশন লেখক হিসেবে গ্রহণ করছেন। আমারও বই যারা নেন, এঁদের অনেকে ফেসবুকে আমার নিয়মিত লেখা থেকে তৈরি হওয়া পাঠক। আবার অসুবিধার কিছু দিক আছে। আগে লেখা প্রকাশ হওয়া কঠিন ছিল বলে নিজেকে বারবার ঘষে মেজে তৈরি করতে হতো। যেকোনো লেখা প্রকাশিত হওয়ার আগে সম্পাদনা হওয়া জরুরি। একজন লেখক তাঁর লেখার সঙ্গে এতটাই জড়িয়ে থাকেন, লেখাটার দুর্বলতা, ঘটনার পরম্পরা নির্মাণে কোনো অসংগতি থাকলে সেটা নিজে বুঝতে পারেন না। ফেসবুকে সরাসরি লেখা প্রকাশ করে দেওয়া যায় বলে লেখা সম্পাদনার চর্চাটা গড়ে উঠছে না। নিজের দুর্বলতাগুলো আমাকে কেউ বলেও দিচ্ছে না। এর চেয়েও বড় সমস্যা লাইকের মনস্তত্ত্ব। ফেসবুকের লাইকের মোহে পড়ে গেলে নিজের স্বাতন্ত্র্য নষ্ট হয়। আমি কী লিখতে চাই এর বদলে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কী লিখলে আমি বেশি লাইক পাব। আমি নিজে এই ঘোরের চক্করে পড়ে গিয়েছিলাম। ফেসবুকে আমি যে এখন লিখি না এর বড় কারণ এই মোহ থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা। ফেসবুক থেকে সরাসরি সাহিত্যে গেলেও এই ব্যাপারটা কাজ করতে পারে। আমি কী উপন্যাস লিখব, কীভাবে লিখব এটা ভাবার সময় হয়তো বেশি কাজ করে, কোন উপন্যাসটা আমাকে জনপ্রিয় করে তুলবে। তখন গল্পটা এর অকৃত্রিমতা হারাতে শুরু করে। 

আপনার কাছে আজকের আড্ডার শেষ প্রশ্ন। লেখকেরা কি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ? 

- ওইযে বললাম, লেখকেরা পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃসঙ্গ মানুষ... 

এভি/