কার লাভ কার ক্ষতি

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ জুলাই ২০১৮ | ৪ শ্রাবণ ১৪২৫

এলএনজি যুগে বাংলাদেশ

কার লাভ কার ক্ষতি

নিজস্ব প্রতিবেদক ৬:৩৭ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২৬, ২০১৮

print
কার লাভ কার ক্ষতি

 

কাতার থেকে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রথম চালান গত মঙ্গলবার দেশে এসেছে। মহেশখালীর মাতারবাড়ি উপকূল থেকে তিন কিলোমিটার দূরে মঙ্গলবার দুপুরে নোঙর করেছে এলএনজি বোঝাই জাহাজ ‘এক্সিলেন্স’। ২৭৭ মিটার লম্বা, ৪৪ মিটার প্রস্থ এবং ১২ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের (জাহাজের পানির নিচের অংশ) এ জাহাজে রয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ঘনমিটার তরল গ্যাস। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ প্রবেশ করল এলএনজি যুগে।

 

দেশের ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদা মেটাতে সরকার এলএনজি আমদানি করছে। তারই অংশ হিসেবে প্রথম দফা চালান এসেছে কাতার থেকে। আমদানিকৃত এলএনজি রূপান্তরের মাধ্যমে আগামী ১৫ মে থেকে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও গ্যাস সঞ্চালনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের কাজ এখনো শেষ করা যায়নি। যে জাহাজে এলএনজি এসেছে সে জাহাজই ভাসমান টার্মিনাল হিসেবে কাজ করবে। এটি দেশে সবচেয়ে বড় বিশেষায়িত জাহাজ বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। আমেরিকান প্রতিষ্ঠানের এ জাহাজটি বাংলাদেশ থেকে ভাড়া গুনবে ১৫ বছর । এরপর বাংলাদেশ সরকারের মালিকানায় চলে আসবে এটি।

এদিকে এলএনজি সঞ্চালনের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ছাড়াও দেশের অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব পড়বে, কাদের লাভ হবে, কাদেরই বা ক্ষতি হবে- এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে রয়েছে বিভিন্ন মত। এলএনজি আমদানিতে দেশের শিল্পমালিকরা নতুন করে স্বপ্ন দেখলেও সাধারণ গ্রাহক বা ভোক্তাদের জন্য এটা মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবেও আবির্ভূত হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। বিশেষ করে এলএনজি আমদানির সঙ্গে সঙ্গে শিল্প কারখানা পর্যায়ে যেমন কয়েকগুণ গ্যাসের দাম বাড়বে তেমনি গ্রাহক পর্যায়েও বাড়বে। বেড়ে যাবে সব ধরনের পণ্যের উৎপাদন খরচ। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাসের দাম জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সমন্বয় করে সহনীয় মাত্রায় বাড়ানো হবে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের অনেকেই বলছেন, আমাদের নিজস্ব প্রাকৃতিক গ্যাসের সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলোতে অনুসন্ধানে গুরুত্ব দিচ্ছে না সরকার। উপরন্তু বিইআরসি বিধি লঙ্ঘন করে জ্বালানি বিভাগ এলপিজির মূল্যহার নির্ধারণ করতে দিচ্ছে না। দেশের বিভিন্ন খাতে গ্যাস বণ্টনেও চরম বৈষম্য বিদ্যমান। ক্রমাগত বাড়ছে বাড়ছে গ্যাস চুরি ও দুর্নীতি। জ্বালানি বিভাগ দেশে এলপিজি ও এলএনজির বাজার সম্প্রসারণ এবং বিপুল মুনাফার লক্ষ্যে এ ধরনের কৌশল হাতে নিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ব্যাপক রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও অর্থ লুটপাটের সুযোগ তৈরি হবে।

গ্যাস খাতের চুরি, দুর্নীতি ও বৈষম্যের কোনো সুরাহা না করে নানা অজুহাতে গ্যাসের মূল্যহার গড়ে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে। এটা সাধারণ মানুষের ওপর নিপীড়নের শামিল।

এলএনজি কেন গুরুত্ব পাচ্ছে?
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাসের অভাবে দেশে বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ বিভিন্ন শিল্প কারখানা অচল হয়ে রয়েছে। এলএনজি দেশের গ্যাস ঘাটতি পূরণ করবে। বন্ধ হয়ে যাওয়া ও খুঁড়িয়ে চলা শিল্প কারখানাগুলো নতুন করে প্রাণ পাবে। একইসঙ্গে নতুন নতুন শিল্প কারখানা সৃষ্টির সুযোগও বাড়বে।

জানা গেছে, দেশে বর্তমানে গ্যাসের চাহিদা রয়েছে দৈনিক ৩৫০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে সরবরাহ হয় ২৭০ কোটি ঘনফুট। ঘাটতি রয়েছে ৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। গ্যাস প্রক্রিয়াকরণের যে জাহাজটি মহেশখালীতে অস্থায়ী টার্মিনাল হিসেবে নোঙর করেছে সেখান থেকে চলতি বছরের মে মাস থেকেই ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাবে। সেখানেও ঘাটতি থাকবে ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। সরকারের তরফ থেকে আরও ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস আমদানির কথা বলা হয়েছে।

গ্যাসের চাহিদা মেটাতে সরকার ২০১০ সালে এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নেয়। এ লক্ষ্যে ২০১৬ সালে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির সঙ্গে দেশের প্রথম সমুদ্রে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের চুক্তি হয়। চুক্তির আট বছরের মাথায় সে উদ্যোগ বাস্তবায়ন হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, দৈনিক ৫০ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহের জন্য চুক্তি হলেও অবকাঠামো ঘাটতির কারণে জাতীয় গ্রিডে প্রথমদিকে ২৫ থেকে ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হবে। সেক্ষেত্রে চট্টগ্রামে গ্যাসের চাহিদার ৩০ কোটি ঘনফুটের পুরোটাই দেওয়ার চিন্তা করছে সরকার। এ নিয়ে এরই মধ্যে চট্টগ্রামে শিল্প মালিকদের মধ্যে দারুণ উৎসাহ ও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলের গ্যাস বিতরণ কোম্পানি কর্ণফুলী এরই মধ্যে ২৬৫টি নতুন কারখানার ডিমান্ড নোট ইস্যু করেছে। এদের মধ্যে ৭১টি কারখানা প্রয়োজনীয় অর্থও পরিশোধ করেছে। এর বাইরে আরও ৩৫৬টি শিল্প কারখানার আবেদন অনুমোদনের জন্য সরকারের উচ্চ পর্যায়ে পাঠানো হয়েছে।

এরই মধ্যে মহেশখালী থেকে চট্টগ্রামের আনোয়ারা পর্যন্ত ৩০ ইঞ্চি ব্যাসের ৯১ কিলোমিটার পাইপলাইনের পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। এখন আনোয়ারা থেকে সীতাকুণ্ড পর্যন্ত ৪২ ইঞ্চি ব্যাসের আরও ৩০ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণের কাজ চলছে। নির্দিষ্ট সময়ে সীতাকুণ্ড পর্যন্ত পাইপলাইন তৈরির কাজ শেষ না হলে চট্টগ্রামে এলএনজি থেকে প্রাপ্ত গ্যাস সরবরাহ করা হবে।

সঞ্চালন অবকাঠামো নির্মাণ পুরোপুরি সম্পন্ন না হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে এলএনজি সরবরাহ সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারের মহেশখালীতে ৫০০ মিলিয়ন ঘটফুট ধারণক্ষমতার দুটি ভাসমান টার্মিনাল বা ফ্লোটিং স্টোরেজ রি-গ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) স্থাপন করা হবে। এর একটি স্থাপন করবে এক্সিলারেট এনার্জি বাংলাদেশ লিমিটেড (ইইবিএল) ও অন্যটি সামিট এলএনজি টার্মিনাল কোম্পানি (প্রা.) লিমিটেড। এরই মধ্যে টার্মিনাল স্থাপন ও ব্যবহার নিয়ে প্রতিষ্ঠান দুটির সঙ্গে আলাদা চুক্তি করেছে পেট্রোবাংলা।

সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে বাস্তবায়ন এবং পরিকল্পনাধীন পাইপলাইন প্রকল্পের ওপর একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টার্মিনাল থেকে এলএনজি দেশের অভ্যন্তরে আনতে এবং গ্রাহক পর্যন্ত পৌঁছে দিতে ছয়টি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন। এর মধ্যে দুটি হচ্ছে এক্সিলারেট ও সামিটের টার্মিনাল পয়েন্ট থেকে উপক‚লে জিটিসিএলের পাইপলাইন পর্যন্ত সাব-সি পাইপলাইন প্রকল্প। এ দুটি প্রকল্পের আওতায় সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে ২৪ ইঞ্চি ব্যাসের দুটি পাইপলাইন স্থাপন করা হচ্ছে। এর মধ্যে এক্সিলারেটের পাইপলাইনের দৈর্ঘ্য ৭ দশমিক ৩৭ কিলোমিটার এবং সামিটের পাইপলাইনের দৈর্ঘ্য ৫ দশমিক ৪২ কিলোমিটার। পাইপলাইন দুটো বসানো হলেও এখনো গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের (জিটিসিএল) পাইপলাইনের সঙ্গে সংযুক্তি (টাই-ইন) হয়নি।

অন্যদিকে এলএনজি সঞ্চালনের জন্য অনশোরে চারটি বড় সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করছে জিটিসিএল। কিন্তু এর একটিও এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। ১ হাজার ৩৬৯ কোটি টাকা ব্যয়ে কক্সবাজারের মহেশখালী থেকে চট্টগ্রামের আনোয়ারা পর্যন্ত ৩০ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপলাইন স্থাপনের কাজ ২০১৪ সালে শুরু হয়। সংসদীয় কমিটিকে দেওয়া জ্বালানি বিভাগের প্রতিবেদন মতে, গত জানুয়ারি পর্যন্ত প্রকল্পটির ক্রমপুঞ্জীভ‚ত বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে ৭৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। সে হিসাবে প্রকল্পের ২২ শতাংশের মতো কাজ বাকি থেকে গেছে।

এসব ব্যাপারে চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, দেশের গ্যাস সংকট নিরসন করে শিল্প কারখানাগুলোতে উৎপাদন অব্যাহত রাখার জন্য আমরা দীর্ঘদিন ধরে সরকারকে দাবি জানিয়ে আসছিলাম। সরকার বিষয়টিতে গুরুত্ব দিয়েছে। অবশেষে এলএনজি এসেছে। এটা আমাদের জন্য শিল্পের খুবই আশাব্যঞ্জক ঘটনা। ন্যাশনাল গ্রিডে এ গ্যাস যুক্ত হবে, দেশের শিল্পায়ন বৃদ্ধি ঘটবে। শুধু চট্টগ্রাম নয়, এটা সারা দেশের শিল্প সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখবে। গ্যাস সংকট নিরসন হবে। দেশে বিনিয়োগ বাড়বে, নতুন বাজার সৃষ্টি হবে, কর্মসংস্থানও বাড়বে।

তিনি বলেন, এখন তো অস্থায়ী টার্মিনাল থেকে আমরা গ্যাস নামাব। কিন্তু দ্রুততম সময়ে একটা স্থায়ী টার্মিনালও আমাদের করতে হবে। এখন যে বিষয়টি নিয়ে কথা হচ্ছে, তা হচ্ছে গ্যাসের দাম। আমরা সরকারকে বলেছি, দাম বৃদ্ধি করলে একটা সহনশীল মাত্রায় বাড়িয়ে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। সাধারণ ভোক্তা পর্যায়ে এর বেশি চাপ যেন অনুভূত না হয় সেদিকটা লক্ষ রাখতে হবে।
কার লাভ কার ক্ষতি

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল আলম বলেন, আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা বলে, বিদ্যুতের উৎপাদন ৮/৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। তার পরও তো সংকট নিরসন হচ্ছে না। সেই ২০০৯ সালেও বলা হয়েছিল জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে। সে কারণে উৎপাদন ব্যয় বেশি পড়বে। বিদ্যুতের দাম দ্রুত গতিতে বাড়বে-বেড়েছে। এবারও ২০১৮ সালে জরুরি ভিত্তিতে সংকট মোকাবেলা করার জন্য ১৮০০ থেকে ৩২০০ মেগাওয়াট তরল জ্বালানি অতি উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এখন আপনি কী করে বলবেন যেখানে দৈনিক ন্যূনতম ঘাটতি ১৫০০ বিলিয়ন ঘনফুট বিদ্যুতের চাহিদা আছে। এখন সংকট এক্সিসটিং ডিমান্ড। সরকারের কর্তৃপক্ষীয় ব্যক্তিরা ঘোষণা দিয়েছেন নতুন গ্যাস সংযোগ দেওয়া হবে। এতে চাহিদা বেড়ে যাবে। চাহিদা বেড়ে গেলে যে গ্যাস আমদানি করা হচ্ছে তাতে সংকট নিরসন সম্ভব হবে না। এ অবস্থায় গ্যাসের দাম তো বাড়বেই। সার উৎপাদনে ৩৭২ শতাংশ, বিদ্যুৎ উৎপাদনে ২০০ শতাংশ দাম তো সরকার খুশিমতো নির্ধারণ করে দিয়েছে। এর ভেতর দিয়ে একটা আতঙ্ক ওেতা তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, আমাদের নিজস্ব সম্ভাব্য গ্যাস ক্ষেত্রগুলোতে অনুসন্ধান চলছে না। মূলত মজুদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে এবং সংকট মোকাবেলায় গ্যাস অনুসন্ধানকে সরকার গুরুত্বই দিচ্ছে না। শিল্প ও আবাসিক গ্রাহককে চরম গ্যাস সংকটে রাখা হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসবণ্টনে চলছে চরম বৈষম্য। এলপিজি ও এলএনজির বাজার সম্প্রসারণ এবং মুনাফার লক্ষ্যেই জ্বালানি বিভাগ এ কৌশল গ্রহণ করেছে। একটা লুটপাটকারী শ্রেণি এর পূর্ণ সুবিধা নেবে।

কেকে/এএস

 
.



আলোচিত সংবাদ