‘ভিডিও ছাড়া গান কীভাবে পৌঁছে দেওয়া যায়, সেই চিন্তাও দরকারি’

ঢাকা, সোমবার, ২১ জানুয়ারি ২০১৯ | ৮ মাঘ ১৪২৫

‘ভিডিও ছাড়া গান কীভাবে পৌঁছে দেওয়া যায়, সেই চিন্তাও দরকারি’

পরিবর্তন প্রতিবেদক ৯:৩৩ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৩১, ২০১৮

‘ভিডিও ছাড়া গান কীভাবে পৌঁছে দেওয়া যায়, সেই চিন্তাও দরকারি’

সংখ্যা নয়, মানের বিচারে এই সময়ের অন্যতম গীতিকার সোমেশ্বর অলি। সাম্প্রতিক সময় একাধিক গানে পাওয়া গেছে তাকে। সমঝদারদের মনোযোগের পাশাপাশি অলির লেখা গান নানা প্লাটফর্মে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এছাড়া আসছে তার নতুন কিছু গান। সম্প্রতি পরিবর্তন ডটকমের মুখোমুখি হন তিনি।

 

বুকের বাঁ পাশে, খরচাপাতির গান, বর্ষা বন্দনা, দুঃখ নেই ও ভালো থাকবো’-পরপর বেশ কয়েকটি গান প্রকাশ হলো। সব মিলিয়ে কেমন সাড়া পাচ্ছেন?

‘সাড়া পাওয়া’র বিষয়টি আপেক্ষিক। এটি সন্দেহাতীত নয়। আমি আপনাকে বললাম যে, ‘খুব ভালো সাড়া পাচ্ছি’। এর ভিত্তি বা প্রমাণ কি? মুখের কথাটাই প্রমাণ? যে কোনো কাজেরই একটু আধটু ‘সাড়া’ সংশ্লিষ্টরা পান। তাতে কী আসে যায়? কাজটি সফল বা মহৎ হয়ে যায়! এসব মাথায় রেখেই বলি, মাহতিম শাকিবের গাওয়া ‘বুকের বাঁ পাশে’র জন্য যতো ইতিবাচক প্রশংসা পেয়েছি, তেমনই প্রশংসা এসেছে লুৎফর হাসানের গাওয়া ‘খরচাপাতির গান’-এর জন্য। কিন্তু ‘সাড়া’ পরিমাপের জন্য যদি ইউটিউব ‘ভিউ’ বিবেচ্য হয়, তাহলে দুটি গানের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। এ অবস্থায় ‘সাড়া’ বুঝবো কী করে?

অন্যদিকে শানের কণ্ঠে ‘বর্ষাবন্দনা’ ও বেলাল খানের কণ্ঠে ‘দুঃখ নেই’ ইউটিউবে ‘সাড়া’ ফেলতে পারেনি। কিন্তু এ দুটি কাজও গড়পরতা কাজের চেয়ে ‘ভালো হয়নি’ বলা যাচ্ছে না। এগুলোও তো আমার প্রিয় কাজ! আর সদ্য প্রকাশিত রেহান রসূলের গাওয়া ‘ভালো থাকবো’ নিয়ে এখনই কিছু বলা সম্ভব হচ্ছে না। তবে দর্শকনন্দিত নাটক ‘শোক হোক শক্তি’র গান হিসেবে এর রিসেপশন ভালোই মনে হচ্ছে।

ইউটিউব হিসেবে নিশ্চয় খেয়াল করেছেন নাটকের গানগুলো বেশি ভিউ হচ্ছে। এর কারণ কী মনে করেন?

যদি সিনেমার গানের সঙ্গে তুলনা করে নাটকের গানের ভিউ বেশি হচ্ছে বিবেচনা করা হয়, তাহলে বলবো, অনেকখানি ঠিক। অধিকাংশ সিনেমার গান মধ্যবিত্ত তথা শিক্ষিত তরুণ দর্শকশ্রেণিকে আকৃষ্ট করতে পারছে না, উপস্থাপনার কারণে। অন্যদিকে নাটক বা নাটকের গান তাদেরই নিত্যদিনের বিনোদনে পরিণত হয়েছে, এটিও উপস্থাপনার কারণেই।

হ্যাঁ, সিনেমার গানের ভিউ কম নয়। কিন্তু আলোচনা হয় না তেমন একটা...
সিনেমার গান লোকজন হয়তো দেখছেন, কিন্তু সেটি নিয়ে আলোচনা করছেন না বা নাক সিঁটকাচ্ছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে হাতেগোনা সিনেমার গান করেছি। একরকম ব্যর্থ হয়েছি। অন্যদিকে হাতেগোনা নাটকের গান লিখে বাহবা পাচ্ছি। সত্যি বলতে, আমি এই মুহূর্তে নাটকের গান লিখতেই সাচ্ছন্দ্যবোধ করছি, পাশাপাশি অডিও গান তো আছেই। আমার প্রায়ই মনে হয়, একজন প্রিন্স মাহমুদ সিনেমার গানে হতে পারতেন কিংবদন্তি। কিন্তু তেমনটি ঘটলো কই? তিনিই সিনেমায় সমাদার পেলেন না, তার অনুগামীরা কী করে পাবে?

বেশ আওয়াজ দিয়েই লুৎফর হাসানের সঙ্গে ‘খরচাপাতির গান’ প্রকাশ হলো। আপনাদের কাজের অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিনের। পাইপলাইনে আরো কিছু গান আছে। গায়ক-গীতিকারের এই মেলবন্ধনকে কীভাবে দেখছেন?

লুৎফর হাসানের সঙ্গে ঠিক গায়ক-গীতিকারের সম্পর্ক নয় আমার। আমরা ভাই-ভাই। আমার গান লেখার পেছনে তার অবদানই বেশি। তার মতে, আমি এই শহরের ‘সৌখিন ও নাক উঁচু’ গীতিকার! অবশ্য এর জন্য তিনিই দায়ী। আমাদের বোঝাপড়াটা দীর্ঘদিনের। তিনি নিজেই ভালো লেখেন, তবু তার মনে হয় তার জন্য ভালোটা আমিই লিখতে পারি। যা হোক, ‘ঘুড়ি তুমি কার আকাশে ওড়ো’ আমাদের বোঝাপড়া আরও শক্তপোক্ত করেছে। ২০০৪ সালে লিখেছিলাম এটি, রিলিজ হয়েছিলো ২০১১ সালে। তখন মিউজিক ভিডিওর দাপট ছিলো না। কষ্ট করে তাই ভিউ গুণতে হয়নি!

‘ঘুড়ি’র ধারাবাহিকতায় এসেছিলো ‘আমার আকাশ পুরোটাই’। এবার এলো ‘খরচাপাতির গান’। শেষের গানটির বেলায় মিউজিক ভিডিও অবধারিত হয়ে উঠলো। ভালো মানের ভিডিওসহ সেটি প্রকাশও হলো। প্রকাশের পর থেকেই আমার মনে হচ্ছিলো, এই গানটি ভিডিওর জন্য নয়, বরং ভিডিও কিছু গানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, গানের বক্তব্য উপলব্ধি করতে সুযোগ দেয় না কিংবা গানটিকে ভিন্ন চিন্তার দিকে নিয়ে যায়। ‘খরচাপাতি গান’ সেটিই প্রমাণ করে। হতে পারে গানটির কনটেন্ট খুব বেশি ভালো হয়নি। কিন্তু চলতি কোটি কোটি ভিউ পাওয়া অনেক গানের চেয়ে এটি বাজে? বা ভিডিওটি মানোত্তীর্ণ নয়?

তাহলে মিউজিক ভিডিও নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে?

আমার মনে হয়, মিউজিক ভিডিও ছাড়া গানকে কীভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, সেই চিন্তাটি করাও এখন দরকারি হয়ে পড়েছে। এসব দরকারি কথা ভাবার জন্য নিশ্চয়ই দরকারি মানুষ আছেন। তাই এসব ভুলে আমরা আরও কিছু কাজের পরিকল্পনা এগিয়েছি। এর মধ্যে পাইপলানে আছে ‘আয়না দিয়ে ঘর বেঁধেছি’ গানটি। দৃশ্যত রোমান্টিক মনে হলেও এটি হবে আধ্যাত্মিক চিন্তার গান। অচিরেই ধ্রুব মিউজিক স্টেশন থেকে প্রকাশ হবে গানটি।    

একইভাবে নাট্যকার মিজানুর রহমান আরিয়ান ও সুরকার সাজিদ সরকার সঙ্গে পরপর জুটি বাঁধছেন নাটকের গানের জন্য। গানগুলো বেশ জনপ্রিয়ও। আপনাদের তিনজনের বোঝাপড়ার ধরনটা কেমন? পরস্পরকে কীভাবে প্রভাবিত করেন?

এই দু’জন আগে থেকেই জুটি হিসেবে সফল। হঠাৎ করেই তাদের সঙ্গে আমার যুক্ত হওয়া। এটি খুব পরিকল্পিত নয়। প্রথমে একটি কাজ হয়েছে, তারপর থেকে হয়েই চলেছে। আমাদের বোঝাপড়ার ধরনটা একটু অদ্ভূত বলা চলে। আরিয়ান ভাই অনেক সময় আমাকে স্ক্রিপ্ট মেইল করে মেসেজ পাঠান। আমি সিকোয়েন্স বুঝে ‘একটা কিছু’ লিখে পাঠিয়ে দেই। তারপর কোনো খবর থাকে না। দেখা-সাক্ষাৎ তো দূরের কথা, ফোনেও কথা হয় না। এর মধ্যে সুর কাঠামো তৈরি হওয়ার পর আসে সাজিদ সরকারের মেইল। সবাই মিলে ‘ওকে’ করি। এরপর গানটি প্রকাশ পায়। আবার এমনও হয়, একটা লিরিক নিয়ে আমরা যুক্তি-তর্ক করি, রি-রাইট করি, রি-এডিট করি, বাদ দিই, আবার লিখি, অনেকটা সময় চলে যায়। তারপর গানটা প্রকাশ পায়। আমি যেমন লিখি তেমনই ডেলিভারি দেই এই দু’জনের ক্ষেত্রে। আমার জায়গা থেকে সরে গিয়ে কিছু লিখতে হয় না। তাদের বেলায়ও তাই, এভাবেই আমরা পরস্পরে প্রভাবিত। 

সামনে নতুন কী গান আসছে?

কাঙালিনী সুফিয়া গেয়েছেন ‘প্রেমিক বাঙাল’ নামের একটি গান। তার সঙ্গে থাকবেন আরও দু’জন শিল্পী। মিউজিক ভিডিওর পরিকল্পনা চলছে। মমতাজ-বেলাল খান জুটি গেয়েছেন ‘বাপের বড় পোলা’ নামের গান। এটিরও ভিডিও হবে। ফরমায়েশি ছাড়াও নিজের জন্য কিছু (অবাণিজ্যিক) লিরিক লিখে রাখছি। আর কবিতা লেখার চেষ্টা করছি। যে কবিতা লেখার জন্য ঘর পালিয়ে ঢাকায় এসেছিলাম, যে কবিতার জন্য দীর্ঘদিনের পেশা বদল করে অন্য চাকরিতে থিতু হলাম।

সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।

এসবি