সবুজের কারিগর ড. তুহিন ওয়াদুদ

ঢাকা, শনিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সবুজের কারিগর ড. তুহিন ওয়াদুদ

মোবাশ্বের আহমেদ: ৪:৩৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ০১, ২০১৯

সবুজের কারিগর ড. তুহিন ওয়াদুদ

গাছ কাটার ব্যাপারে মানুষ যতটা আগ্রহী, রোপণের ব্যাপারে ঠিক ততটাই অনাগ্রহী। কিন্তু এই চিন্তাকে একেবারেই প্রশ্রয় দেননি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ।

তিনি শুধু বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভিতরেই প্রায় ৩৩ হাজার গাছ লাগিয়েছেন। প্রায় প্রতিটি গাছেই লেগে আছে তার হাতের ছোঁয়া। ৭৫ একরের ক্যাম্পাসে ঢুকলেই শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বাহারি গাছপালা যে কারও নজর কাড়তে সক্ষম। ফুলগাছ, ফলগাছ, ওষধিগাঠ, কাঠগাছসহ সব ধরণের গাছের একটি বৃক্ষ জাদুঘরে পরিণত হয়েছে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৫ একরের ক্যাম্পাস।

 ক্যাম্পাসের ভিতরে খেলার মাঠের পাশে, মসজিদের সামনে, ক্যাফেটেরিয়ার সামনে, লাইব্রেরীর সামনে, একাডেমিক ভবনগুলোর সামনে অথবা প্রশাসনিক ভবনসহ যে কোন জায়গায় দাঁড়ানো হোক না কেন মুহূর্তেই সেখানে একটা নির্মল অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যেক ভবনের সামনে নিয়মিত দূরত্বে লাগানো হয়েছে ফুলের গাছ। বছরের ১২ মাসই ফোটে কোন না কোন ফুল।

চারটি একাডেমিক ভবনের সামনে পুরোটা জুড়ে নানা রকম বৃক্ষের সমারোহ। চড়ুই, ঘুঘুসহ নাম না জানা অসংখ্য পাখি খেয়ালি ওড়াউড়ি করে এপাশ থেকে ওপাশ। রংপুর শহরের যেকোন স্থানের চাইতে ক্যাম্পাসের এই দৃশ্য অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। ক্যাম্পাসের এ বিরল দৃশ্য পরম যত্নে গড়ে তুলেছেন ড. তুহিন ওয়াদুদ। তিনি যেন সবুজের কারিগর।

শতাধিক প্রজাতির ৩৩ হাজার গাছ:

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শতাধিক প্রজাতির প্রায় ৩৩ হাজার গাছ লাগানো হয়েছে। পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে পরিচিত গাছের ফাঁকে ফাঁকে পরিচয় মিলবে বিভিন্ন অপরিচিত গাছেরও। কোনোটা পরিণত, আবার কোনোটা চারা অবস্থা থেকে মাত্রই ছোট ডাল মেলে বেড়ে উঠছে। শরীরভর্তি সবুজ-কোমল-কচি পাতা।

এর মধ্যে রয়েছে আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, কতবেল, জামরুল, হরতকি, বহেড়া, অর্জুন, শাল, সেগুন, সোনালু, তিন প্রজাতির চেরি, গগন শিরীষ, দেবদারু, উইপিং, কাঠগুয়া, আকাশমণি, ইপিল, রেইনট্রি, মেনজিম, মহুয়া, লম্বু, জলপাই, জাত নিম, ঘোড়া নিম, প্রায় ১০ প্রজাতির আম, পেয়ারা, কাঠগোলাপ, কাঠবাদাম, নারকেলি বাদাম, কাইজেলিয়া, পাঁউয়া, মেহগনি, গোলাপজাম, রিঠা, জয়তুন, আমলকি, কাঠলিচু, কাউফল, সফেদা, নারকেল, রাধাচূড়া, চন্দন, পাম, চালতা, গাব, পান্থপাদপ, কামরাঙা, আমড়া, কৃষ্ণচূড়া, পলাশ, বকফুল, তেঁতুল, গামারি, তাল, শিমুল আলু, রাবার, কাঁঠালচাপা, চম্পা, আলুবোখারা, পাকুর, বট, হিজল, অশোক, আগর, বরই, আতা, সাতকড়া, বেল, দারুচিনি, বিজলঘণ্টা, কদম, শিমুল, বটলব্রাশ, কমলা, আশফল প্রভৃতি।

গাছ এবং শিক্ষার্থী:

গাছ লাগানোর কাজে বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থীদেরও উদ্বুদ্ধ করেছেন তুহিন ওয়াদুদ। শিক্ষার্থীরাও সাড়া দিয়েছেন স্বতস্ফূর্তভাবে। শুরুর দিকে বাংলা বিভাগের ২০১৩-১৪ সেশনের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৃক্ষরোপণ নিয়ে কথা বলার পর শিক্ষার্থীরা গাছের পরিচর্যায় আগ্রহ দেখায়।

তুহিন ওয়াদুদ নিজের বেতন থেকে দুই হাজার টাকা খরচ করে ২০০ গাছের চারা কিনে ক্যাম্পাসে গাছ লাগানো শুরু করেন। এভাবেই শুরু হয় খাঁ খাঁ ক্যাম্পাসে গাছ লাগানোর কর্মকাণ্ড। এই উদ্যোগ দেখে মিঠাপুকুর উপজেলার আবদুস সালাম বেশ কিছু আমগাছের চারা দেন।

এছাড়া বাংলা বিভাগের এই শিক্ষক নিজ বিভাগের প্রতিটি ব্যচের শিক্ষার্থীকেই উদ্বুদ্ধ করেন গাছ লাগানোর জন্য। এমনকি মাঝে মাঝে ক্লাসও নেন যে কোন গাছের নিচে অথবা কোন বাগানে। এতে করে শিক্ষার্থীদের মাঝে গাছ লাগানোর জন্য বাড়তি উৎসাহ কাজ করে। মাঝে মাঝে শিক্ষার্থীরাই চাঁদা তুলে গাছ লাগিয়েছেন।

যাদের সহযোগিতা ভুলবার নয়:

কোন গাছের চারা কোথায় পেয়েছেন, কার কার সহযোগীতা বেশি পেয়েছেন জানতে চাইলে তুহিন ওয়াদুদ বলে যান আগ্রহভরে। গাছ লাগানোর শুরু থেকেই ‘সবুজের পথে’ নামের একটি সংগঠনের কয়েকজন সদস্য এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়। ওই সময় ক্যাম্পাসে বেশ কিছু গাছ লাগানো হয়েছে। গাছ লাগানোর ক্ষেত্রে ব্যক্তি হিসেবে আরও সহযোগীতা করেছেন মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষক শেখ মাজেদুল হক, সিদ্দিক মেমোরিয়াল স্কুল এন্ড কলেজের চেয়ারম্যান ফেরদৌস আলম মুকুল, প্রাইম মেডিকেল কলেজের পরিচালক আক্কাছ আলী, এডভোকেট রঞ্জিত, মহাদেব ভুতুরি ও সেকশন অফিসার গ্রেড-২  মাহবুবা।

সংগঠন হিসেবে সহযোগিতা করেছেন, সবুজের পথে, রণণ, প্রথম আলো বন্ধুসভা, রিভারাইন পিপল, সমকাল সুহৃদ সমাবেশ, প্রাঙ্গণ। আরও সহযোগিতা করেছেন মাপা (মানবাধিকার ও পরিবেশ আন্দোলন), ফার্টিলাইজার এসোসিয়েশন, রংপুর ইউনিট, ডক্টরস কমিউনিটি ক্লিনিক, রানা নার্সারী, কেয়া কসমেটিকস, বনায়ন।

সেই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক আয়শা সিদ্দিকার বাবা দেন ইট। গাছের মধ্যে কখন কোন সার ও ওষুধ দিতে হবে এসব পরামর্শ নিয়েছেন লালমনিরহাটের কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা নুরুজ্জামান। প্রতিটি গাছের পিছনেই রয়েছে একটি করে সুখময় স্মৃতি এবং কারও না কারও অবদান। এছাড়া বৃক্ষরোপণের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সবাই সার্বিকভাবে সহযোগিতা করেছেন।

খাঁ খাঁ মাঠ থেকে বৃক্ষ জাদুঘর:

মাত্র কয়েকবছর আগেও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ছিল ধু ধু মরুভূমি। কোথাও গাছপালার তেমন কোন অস্তিত্ব ছিল না। ২০১৩ সাল থেকে শুরু করে মাত্র কয়েক বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো চিত্র যেন একবারেই পাল্টে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় ২০০৮ এবং ২০০৯ সালের দিকে একটি জায়গায় দাঁড়ালে ৭৫ একরের পুরো ক্যাম্পাস দেখা যেত। ২০১৩ সালের পর মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে ক্যাম্পাসের এই চিত্র একবারে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ক্যাম্পাসে একসাথে বেড়ে উঠছে ৩৩ হাজার গাছ। যা অনেকের কাছেই একটি বিস্ময়কর ব্যাপার।

ড. তুহিন ওয়াদুদের লাগানো গাছের স্বীকৃতিস্বরুপ ২০১৬ সালে বৃক্ষরোপণে প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় পুরুস্কারের জন্য ২য় স্থান অধিকার করে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।

তুহিন ওয়াদুদ বলেন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের দাঁড়ানোর মতো ছায়া ছিল না। সেই ক্যাম্পাস এখন সবুজে পরিপূর্ণ। ক্যাম্পাসে ঢুকলেই বিভিন্ন ফুল চোখে পড়ে। পাখিদের কলকাকলিতে মনটাই ভরে যায়। এই গাছগুলো ক্যাম্পাসকে দিয়েছে এক অনন্য সৌন্দর্য। অনেক শিক্ষক-শিক্ষার্থী-কর্মকর্তা-কর্মচারী, রংপুরের অনেক প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তির সহযোগিতায় মূলত এত বড় কাজটি আমি সহজে করতে পেরেছি।

পিএসএস

 

পরিবর্তন বিশেষ: আরও পড়ুন

আরও