জবির অনিরাপদ পানিতে আক্রান্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা!

ঢাকা, শুক্রবার, ২৪ মে ২০১৯ | ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

জবির অনিরাপদ পানিতে আক্রান্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা!

জারিন তাসনিম অর্নি, জবি প্রতিনিধি ১২:০০ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২৬, ২০১৯

জবির অনিরাপদ পানিতে আক্রান্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা!

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) খাবার পানি আসছে শ্যাওলা জমা পানির ট্যাংক থেকে। যদিও পানি তোলা হয় ডিপকল থেকে। এতে নানা ধরনের পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।

বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারের তথ্য মতে, যারা বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে মেডিকেল সেন্টারে আসেন তাদের শতকরা ৫০ ভাগেই হচ্ছে পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত। 

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সরেজমিনে দেখা যায়, বিভিন্ন বিভাগ আর অনুষদ ভবনের উপরে অবস্থিত মোট ২৯টি ট্যাংকের অধিকাংশই ময়লা আর ঢাকনা খোলা অবস্থায় আছে। যেখানে পড়ছে ধূলো-বালি, পাখির বিষ্ঠাসহ অন্যান্য অপদ্রব্য।

অবকাশ ভবনের পানির তিনটি ট্যাংকের ভিতরের দিকে তাকালে দেখা যায়, দীর্ঘদিন পরিস্কার না করায় সবুজ শ্যাওলা জমে পঁচে কালো হয়ে গেছে। সেটি হয়ে উঠছে প্রাণঘাতী নানা ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়ার আবাসস্থল। আর এই পানি অনেকটা অন্ধভাবেই পান করছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা। ক্যাম্পাসের বিভিন্নস্থানে বসানো পানির ট্যাপগুলোর বেহাল অবস্থা। নেই নিয়মিত পরিচর্যা।

এসব ট্যাংক নিয়মিত পরিষ্কার-পরিছন্ন রাখা ও রক্ষণাবেক্ষণের কথা থাকলেও সর্বশেষ কবে এসব পরিস্কার করা হয়েছে তার কোনো হদিস নেই প্রশাসনের কাছে।

এমনকি গত কয়েক বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি পরীক্ষা করা হয়েছে কি না তারও কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি প্রশাসনের দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছ থেকে।

ক্যাম্পাসে পানি সরবরাহের কাজে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কোথাও কোনো তথ্য নেই ক্যাম্পাসের পানি কতটুকু নিরাপদ। এমনকি আদৌ ক্যাম্পাসের সরবরাহকৃত পানির কোনো পরীক্ষা করা হয়েছে কি না। এতে দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের পানিবাহিত রোগের প্রকোপ।

জবির মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড.শামীমা আক্তার বলেন, মূলত শ্যাওলা পঁচা ট্যাংকগুলোতে বাসা বাধে সায়ানোব্যাক্টেরিয়া। সেখান থেকে উৎপন্ন হয় ক্ষতিকর সায়ানোটক্সিন, যা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করে লিভার, ফুসফুস এমনকি নিউরোনের ক্ষতি করে থাকে। এসব ব্যাকটেরিয়া, আর এই পানি পান করলে কখনো কখনো জ্বর, বমি বমি ভাব, মাথা ব্যাথা, কিডনি অকেজো, নিউমোনিয়া, জন্ডিসসহ নানান পানিবাহিত রোগ হতে পারে।

জবির মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের দশম ব্যাচের ছাত্র জনি হোসেন বলেন, ‘আমাদের হল নেই, দূর থেকে আসি, সারাদিন ক্যাম্পাসে থাকতে হয় আমাদের, আমি ক্যান্টিন থেকে প্রায়ই বোতলে পানি নিয়ে যায়, এই পানি কতোটা বিশুদ্ধ তা জানা নেই, অন্ধবিশ্বাসেই পান করি এই পানি।’

সম্প্রতি টাইফয়েডে আক্রান্ত জবির সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র জাকির হোসেন বলেন, আমাদের জীবনের নিরাপত্তার ব্যাপারে জবি প্রশাসনের অনিহা দেখে আমি সত্যি বাকরুদ্ধ! ক্যান্টিনের রান্নার পরিবেশ তো একবারেই জঘন্য! আবার সরবরাহকৃত দুষিত পানি হাজার হাজার শিক্ষার্থী এই পানি পান করে, সবার শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এক না হওয়ায় অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছে, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, জন্ডিসসহ নানান রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এর দায়ভার কার? আমি নিজেও টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়েছি।

জবির মেডিকেল সেন্টারের সিনিয়র মেডিকেল অফিসার ডা. মিতা শবনম বলেন, আমাদের কাছে আসা প্রায় ৫০% রোগী পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত এবং ৪% টাইফয়েডের রোগী।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জবির প্রধান প্রকৌশলী সুকুমার চন্দ্র সাহা বলেন, ‘আমি এটার দ্বায়িত্বে নেই। 

তিনি তার নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম হোসেনকে বিষটি দেখতে বলেন।

এ ব্যাপারে শামীম হোসেন বলেন, প্রায় দেড় বছর আগে পানির ট্যাংকি পরিস্কার করা হয়। এরপর আর কারো নজরে আসেনি বিষয়টি, তবে খুব শীঘ্রই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান বলেন, পানি দূষনের জন্য আমাদের খেযাল করতে হবে যে, নিজস্ব লাইনের সাথে কোনো সুয়ারেজ লাইনের সংমিশ্রণ ঘটছে কি না।  আমাদের পানিকে পরীক্ষা করার জন্য ক্যাম্পাসের বিভিন্ন বিভাগেরই সক্ষমতা আছে। ক্যাম্পাসের পানির বিওডি, সিওডি, পিএইচ, জীবানুসহ নানা গুনাগুন পরিক্ষা করা হয়নি। এটা চাইলেই প্রকৌশল দপ্তর করতে পারে। তাছাড়া বিভিন্ন বিভাগে ২০০৬ সালের দিকে যে ফিল্টার লাগানো হয়েছে তা পরে সঠিক ব্যবস্থাপনা করা হয়নি। নিরাপদ পানির জন্য অবশ্যই পানি পরিক্ষা ও ট্যাংকগুলোকে সিজনালি পরিস্কার করতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জবি ট্রেজারার অধ্যাপক সেলিম ভূঁইয়া বলেন, খাবার পানির বিষয়টা তিনি অবগত নন। বিষয়টি তিনি দেখবেন এবং যথাসম্ভব ব্যবস্থা নিবেন।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড.মীজানুর রহমানকে একাধিক বার ফোন করেও পাওয়া যায়নি।

জেটিএ/এআরই