উপাচার্যকেই দুষছেন নিবন্ধিত গ্রাজুয়েটরা

ঢাকা, রবিবার, ১৯ আগস্ট ২০১৮ | ৩ ভাদ্র ১৪২৫

উপাচার্যকেই দুষছেন নিবন্ধিত গ্রাজুয়েটরা

জাকির হোসেন তমাল ২:৪১ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৮

print
উপাচার্যকেই দুষছেন নিবন্ধিত গ্রাজুয়েটরা

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) দশম সমাবর্তন অনুষ্ঠান হতে যাচ্ছে আগামী ২৪ মার্চ। রাষ্ট্রপতি ও আচার্য মো. আবদুল হামিদ সমাবর্তনে থাকছেন না। তার জায়গায় সমাবর্তনে সভাপতিত্ব করবেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। তবে সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতিকেই সভাপতি হিসেবে দেখতে চান গ্রাজুয়েটরা। সেটা না হলে সমাবর্তন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন অনেকেই। 

গ্রাজুয়েটরা বলছেন, চলমান এসএসসি পরীক্ষার সবকটি প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রী ব্যাপক সমালোচিত হচ্ছেন। প্রশ্নফাঁসকাণ্ডের পর শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি উঠেছে জাতীয় সংসদে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে তাই শিক্ষামন্ত্রীকে চান না তারা। রাবির সমাবর্তনে শিক্ষামন্ত্রীর আগমন নিয়ে ফেসবুকেও ব্যাপক সমালোচনা চলছে। রাষ্ট্রপতির সভাপতিত্বে সমাবর্তন কিছুদিন পেছালেও কোনো আপত্তি নেই নিবন্ধিত গ্রাজুয়েটদের। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে খোলা কাগজকে বলেন, ‘প্রতিবছর সমাবর্তন হওয়ার কথা থাকলেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তা হচ্ছে না। প্রতিষ্ঠার পর মাত্র নয়বার সমাবর্তন হয়েছে। কয়েক বছর পর পর অনুষ্ঠিত সমাবর্তনেও যদি রাষ্ট্রপতি ও আচার্য উপস্থিত না থাকেন, তাহলে সেটা আমাদের জন্য দুঃখজনক।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ১৯৭৩-এর ১০(১) ধারায় উল্লেখ আছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসেবে রাষ্ট্রপতি সমাবর্তনে সভাপতিত্ব করবেন। তবে তিনি উপস্থিত থাকতে না পারলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সমাবর্তনে সভাপতিত্ব করবেন।

গত বছরের ২৪ জানুয়ারি রাবির দশম সমাবর্তন অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। এ জন্য গ্রাজুয়েটরাও নিবন্ধন করেছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতির সময় না দেওয়া এবং নানা জটিলতায় তা করতে পারেনি গত প্রশাসন। বর্তমান প্রশাসন রাষ্ট্রপতির পরিবর্তে শিক্ষামন্ত্রীকে নিয়েই সমাবর্তন আয়োজন করতে যাচ্ছে। 

সমাবর্তনের নিবন্ধিত গ্রাজুয়েট নাসির উদ্দিন ও নাজিম মৃধা খোলা কাগজকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি ছাড়া শিক্ষামন্ত্রীর সভাপতিত্বে সমাবর্তন হতে পারে না। এমনিতেই সমাবর্তন অনুষ্ঠান দেরি হয়ে গেছে, রাষ্ট্র্রপতি আসার জন্য আরও দেরি হলে সমস্যা নেই। আমরা সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতিকেই চাই।’  

শিক্ষামন্ত্রী থাকলে সমাবর্তনে যাবেন না গ্রাজুয়েটরা  

গত ১ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় এখন পর্যন্ত প্রতিটির প্রশ্নফাঁস হয়েছে। পরীক্ষা শুরুর আগেই সামাজিক মাধ্যমে উত্তরসহ প্রশ্নফাঁস হয়েছে। এর আগেও একাধিক পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। প্রশ্নফাঁসের পর দেশে ব্যাপক সমালোচিত হচ্ছেন শিক্ষামন্ত্রী।

গত সোমবার জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সদস্য জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু। একই সঙ্গে তিনি শিক্ষামন্ত্রীকে বরখাস্ত করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বানও জানান।   

প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় যখন গোটা দেশে চলছে শিক্ষামন্ত্রীর সমালোচনা, তখন তাকে রাবির সমাবর্তনে সভাপতিত্ব নিয়ে অনেক গ্রাজুয়েট প্রশ্ন তুলেছেন। শিক্ষামন্ত্রীর কারণে অনেকে সমাবর্তনে না আসারও ঘোষণা দিয়েছেন। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট এসকে জাহিদ লিখেছেন, ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতি ছাড়া কিসের সমাবর্তন? এ ব্যর্থতা প্রাচ্যের ক্যামব্রিজ (রাবি) কর্তৃপক্ষের নয় কি? আসবই না সমাবর্তনে।’

সমাবর্তনে নিবন্ধন করা গ্রাজুয়েট এমরান হোসেন মিলন ফেসবুকে লিখেছেন, ‘অনেক প্রত্যাশা নিয়ে সমাবর্তনের নিবন্ধন করেছিলাম। কিন্তু ‘তার’ (শিক্ষামন্ত্রী) উপস্থিতিতে সনদ নিতে হবে জানলে ও টাকা দিয়ে ভ‚রিভোজ করতাম।’

মারুফ বিল্লাহ মাসুম লিখেছেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রী উভয়ই প্রশ্নের মুখোমুখি। যে হারে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ উত্থাপিত হচ্ছে, যেকোনো সময় তিনি তার দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে পারেন! এমন একজন ব্যক্তি কীভাবে সমাবর্তনে সভাপতিত্ব করবেন?’ 

রাষ্ট্রপতিকেই চান গ্রাজুয়েটরা

১৯৫৩ সালে রাবি প্রতিষ্ঠার পর এখন পর্যন্ত সমাবর্তন হয়েছে নয়টি। স্বাধীনতার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে সপ্তম, অষ্টম ও নবম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য মো. আবদুুল হামিদ উপস্থিত থেকে গ্রাজুয়েটদের ডিগ্রি প্রদান করেন। কিন্তু এবারের সমাবর্তনে তার অনুপস্থিতি মানতে পারছেন না গ্রাজুয়েটরা। তারা যেকোনোভাবে রাষ্ট্রপতিকেই সমাবর্তনে চান। 

রোকসানা আক্তার নামের এক গ্রাজুয়েট লিখেছেন, ‘রাষ্ট্রপতি আসবেন শুনে আমার বাবা-মা কী আনন্দিত হয়েছিলেন, আর গর্বিত হয়েছিলেন। সত্যি এটা যেমন একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি বাড়ায়, সম্মানের বিষয়, সাথে সাথে হাজার হাজার গ্রাজুয়েট এবং তাদের অভিভাবকদের জন্যও গর্বের বিষয়। যেহেতু অনেক সময় অতিবাহিত হলো, আরও সময় নিন প্রয়োজনে, তবু রাষ্ট্রপতি এবং অনুপ্রেরণা জোগায় এমন কোনো সমাবর্তন বক্তাকে নিয়ে আসুন।’ 

সুমন মোড়ল লিখেছেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ অভিভাবক আচার্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সমাবর্তনে আচার্যের কাছ থেকে সনদ গ্রহণ করবেন এটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। অস্বাভাবিকতা সেটাই, যখন আচার্য উপস্থিত থাকবেন না। ফলত তার অনুপস্থিতি প্রতিষ্ঠান তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য হেয়কর।’

সেতু নামের এক গ্রাজুয়েট লিখেছেন, ‘অনেক প্রতীক্ষার পর রাবির দশম সমাবর্তনের তারিখ ঘোষিত হলেও মহামান্য চ্যান্সেলর উপস্থিত থাকবেন না জানার পর থেকে আমরা সমাবর্তনে অংশগ্রহণকারী প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা খুবই হতাশ। তাই উপাচার্য অধ্যাপক এম আবদুস সোবহানের প্রতি আমাদের আবেদন, এই বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য তিনি যেন মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ জানান।’

দানিয়েল দ্বীপ লিখেছেন, ‘সময় লাগুক তারপরও রাষ্ট্রপতিকে চাই সমাবর্তনে। যেখানে বেসরকারি মঘা ভার্সিটি রাষ্ট্রপতিকে আনতে পারে, আপনাদের দমের এত অভাব কেন?’

আচার্যকে আনতে স্মারকলিপি দেবেন গ্রাজুয়েটরা

সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতি ও আচার্যকে নিয়ে আসার দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এম আবদুস সোবহানের কাছে আগামী রোববার স্মারকলিপি দেওয়ার কথা রয়েছে গ্রাজুয়েটদের। এ জন্য সব শিক্ষার্থীকে এক হতে ফেসবুকে প্রচারণায় নেমেছেন অনেক নিবন্ধিত গ্রাজুয়েট।

সমাবর্তনে নিবন্ধিত গ্রাজুয়েট নাজিম মৃধা বলেন, ‘আগামী রোববার রাজশাহীতে অবস্থিত গ্রাজুয়েটদের দিয়ে উপাচার্যের কাছে একটা স্মারকলিপি দেওয়া হবে। সমাবর্তনে সভাপতি হিসেবে রাষ্ট্রপতিকেই আমরা চাই। উপাচার্যকে আমরা সেটাই জানাব।’

নাজিম মৃধা আরও বলেন, ‘সমাবর্তনে অংশ নিতে নিবন্ধিত যারা রাজশাহীতে অবস্থান করছেন তাদের অনুরোধ করছি, আপনারা উপাচার্য বরাবর একটি স্মারকলিপি দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হোন। যেখানে অন্যতম দাবি হবে, রাষ্ট্রপতি আসতে পারেন (তা যে দিনই হোক) এমন দিনে সমাবর্তন রিসিডিউল করতে হবে।’

আল আমিন ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আমরা এই সমাবর্তন মহামান্য রাষ্ট্রপতি ব্যতীত অন্য কাউকে চাই না। আমাদের এই দাবি প্রশাসনকে জানাতে হবে এবং এই জানানোর জন্য অবশ্যই আমাদের এক হতে হবে। তাই সকলকে এখানে মতামত দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি।’

শিক্ষামন্ত্রী এলে সমাবর্তন অনুষ্ঠানস্থলেই বিক্ষোভের ঘোষণা

একাধিক গ্রাজুয়েট জানিয়েছেন, প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় সমালোচিত শিক্ষামন্ত্রীকে যদি সমাবর্তনে আনাই হয়, তাহলে অনুষ্ঠানস্থলেই গ্রাজুয়েটরা বিক্ষোভ করবেন। অনেক গ্রাজুয়েট সেটি ফেসবুকে ঘোষণাও দিয়েছেন। 

সাব্বির রাজু লিখেছেন, ‘দশম সমাবর্তন নিয়ে আমরা হতাশ। প্রেসিডেন্ট যেহেতু নাহিদ (শিক্ষামন্ত্রী) কাকুকে ক্ষমতা দিয়েছেন, আমরা এর বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে একজোট হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তার বক্তৃতা বর্জন করে বের হয়ে আসতে পারি। এখান থেকে ক্লিয়ার ম্যাসেজ দিতে হবে, চ্যান্সেলরকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতে হবে। কোনো অজুহাত চলবে না, দরকার হলে সময় আরও লাগুক। মতামত দিন।’

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এম আবদুস সোবহান সাংবাদিকদের বলেন, সমাবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য ও রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের প্রতিনিধিত্ব করবেন শিক্ষামন্ত্রী। কারণ এই সমাবর্তন ২০১৬ সালে হওয়ার কথা ছিল। তখন রাষ্ট্রপতি থাকবেন না জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রীকে সভাপতিত্ব করার নির্দেশনা দিয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল। তাই শিক্ষামন্ত্রীর সভাপতিত্বেই দশম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হবে।

সৌজন্যে : দৈনিক খোলা কাগজ

জিজাক/

 
.


আলোচিত সংবাদ