সিরিয়ায় তুরস্কের নতুন সামরিক মানচিত্র

ঢাকা, রবিবার, ৮ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সিরিয়ায় তুরস্কের নতুন সামরিক মানচিত্র

পরিবর্তন ডেস্ক ৮:২১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০৯, ২০১৯

সিরিয়ায় তুরস্কের নতুন সামরিক মানচিত্র

সোমবার রাতে সিরিয়া সীমান্তের দিকে যাচ্ছে তুরস্কের সাঁজোয়া যান। ছবি: আনাদোলু এজেন্সি

সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে তুরস্কের আসন্ন অভিযান আবারও দেশটিতে সংঘাতের নতুন মানচিত্র আঁকবে। সীমান্ত থেকে কুর্দিদের উৎখাত করে এই অভিযানে তুরস্ক তার নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চল সম্প্রসারণ করবে।  

২০১৬ সালে উত্তর সিরিয়ায় তুরস্ক সৈন্য মোতায়েনের পর থেকে এ পর্যন্ত দেশটির তৃতীয় অভিযান এটি। মূলত কুর্দিদের প্রভাব ঠেকাতেই এই অভিযান।   

তুরস্ক আসলে কী চায়?
উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় তুরস্কের দুটি প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে:
১. ওয়াইপিজিকে (কুর্দিশ পিপল’স প্রোটেকশন ইউনিট) তুরস্কের সীমান্ত থেকে সরানো, কেননা একে তুরস্কের নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করা হয়।
২. সিরিয়ার অভ্যন্তরে এমন একটি অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে দুই মিলিয়ন সিরিয়ান শরণার্থীকে পুনর্বাসন করা সম্ভব হবে।

আঙ্কারা সিরিয়া ভূখণ্ডে ৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় অংশগ্রহণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দিয়েছে, তবে গড়িমসির অভিযোগ এনে একাই সামরিক হস্তক্ষেপ করবে জানিয়ে ওয়াশিংটনকে একাধিকবার সতর্কতা দিয়েছে। 

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগান সম্প্রতি আরও বেশি শরণার্থীকে সিরিয়ায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে সিরিয়ার আরও গভীরে হামলার কথা বলেছেন। যা প্রস্তাবিত ‘নিরাপদ অঞ্চল’ ছাড়িয়ে সিরিয়ার রাক্কা এবং দাইর আয-যুর শহর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।  

কুর্দিদের উপর অভিযানের প্রভাব
আইএসের বিরুদ্ধে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের সহায়তায় কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ) পূর্ব ও দক্ষিণ সিরিয়াজুড়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারণের জন্য কয়েক বছর সময় ব্যয় করেছে।

সিরিয়া যুদ্ধে অর্জনের দিক থেকে চিন্তা করলে কুর্দিদেরকে উৎকৃষ্ট উদাহরণ মনে করা হয়। কারণ তারা তাদের মিত্রদের সাথে প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় এই বিষয়টির উপর সবসময় গুরুত্বারোপ করে এসেছে যে তাদের লক্ষ্য স্বায়ত্তশাসন, স্বাধীনতা নয়।  

কিন্তু তুরস্কের যেকোনো বড় ধরণের অভিযানে এই অর্জন পুরোপুরি ধসে যেতে পারে। এই অঞ্চল তখন পুরোপুরি যুদ্ধে তলিয়ে যাবে। সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক কাউন্সিলের মতে, এই অভিযান নতুনভাবে ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির জোয়ার সৃষ্টি করবে।    

ওয়াইপিজি (কুর্দিশ পিপল’স প্রোটেকশন ইউনিট) হচ্ছে এসডিএফ জোটের বৃহত্তম দল এবং তারা নির্ভর করবে আমেরিকা সিরিয়ার পূর্ব ও উত্তর-পূর্বের অন্যান্য অঞ্চলে সেনা রাখছে কিনা তার উপর।

যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্পূর্ণরূপে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয় তাহলে তুরস্ক আরও কঠিন আক্রমণ চালাবে। তখন হয়তো তারা এরচেয়ে বরং আইএসের ফিরে আসাকে প্রাধান্য দেবে, অথবা ইরান ও রাশিয়া সমর্থিত সিরিয়া সরকার কর্তৃক এই অঞ্চল ফিরিয়ে নেওয়াকে অগ্রাধিকার দেবে।  

গতবছর যখন কুর্দিরা আমেরিকার সৈন্য প্রত্যাহারের সম্ভাবনার সম্মুখীন হয় তখন তারা আলোচনার জন্য দামেশকের দরোজাতেও গিয়েছে, যা সিরিয়ার সরকার ও তার মিত্র রাশিয়াকে সীমান্তে মোতায়েনের অনুমতি দেয়।   

সেই আলোচনার যদিও কোনো অগ্রগতি হয়নি, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এবারের বৃহত্তর পরিসরে সৈন্য প্রত্যাহারের ঘটনায় এ জাতীয় আলোচনা গোষ্ঠীটির জন্য আবারও বিকল্প হতে পারে।

তুরস্ক কতদুর পর্যন্ত যেতে পারে?
কুর্দি বাহিনী পশ্চিমে ফোরাত নদী থেকে পূর্বে ইরাকের সীমান্ত পর্যন্ত ৪৮০ কিলোমিটার বিস্তৃত উত্তর-পূর্ব সীমান্ত অঞ্চলটি নিয়ন্ত্রণ করে।

কিন্তু তুরস্কের সামরিক পরিকল্পনা এখন ‘রা’স আল আইন’ এবং ‘তেল আবইয়াদ’ নামক দুটি শহরের মধ্যবর্তী সীমানা ঘিরে বলে মনে করা হচ্ছে, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ১০০ কিলোমিটার। 

এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তার দেশের সৈন্যরা সেখানকার পর্যবেক্ষণ পোস্টগুলো থেকে সরে এসেছে।

যদিও এই অংশ কুর্দি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল, তবু ঐতিহাসিকভাবে এখানে শক্তিশালী আরব উপস্থিতির কথা স্বীকৃত।

জার্মান মার্শাল ফান্ডের ওজগুর উনলুহিসারসিক্লি বলেন, “এটি এমন অঞ্চল যেখানে আরবরা বসবাস করে এবং তুরস্কের বিশিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর সাথে তাদের ভালো সম্পর্ক রয়েছে।”  

তিনি বলেন, ওয়াইপিজি যদি সেখানে ভূমি রক্ষার চেষ্টা করে তাহলে তাদের অনেক রক্ত ঝরাতে হবে।

তুরস্ক এখনও অভিযানের সম্ভাব্য পরিধি বা প্রাথমিক কেন্দ্র নির্ধারণ করেনি। তুরস্কের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, স্থান, সময় এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবেলায় অভিযান পরিচালনার পরিধি–সবকিছুই তুরস্ক নতুনভাবে নির্ধারণ করবে।  

রাশিয়া ও ইরান
এটা প্রসিদ্ধ যে, রাশিয়া এবং ইরান সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে জোরালো সমর্থন করে। কিন্তু এর বিপরীতে তুরস্ক এবং যুক্তরাষ্ট্র আসাদকে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়েছে এবং তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার লড়াইয়ে তার বিরোধী পক্ষকে সমর্থন দিয়েছে।

রাশিয়া বলছে, নিজের প্রতিরক্ষার অধিকার তুরস্কের আছে। কিন্তু সোমবার ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেস্কভ বলেছেন, সিরিয়ার উচিত আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষা করা এবং এই অঞ্চলে ‘অবৈধ উপস্থিতি’ রয়েছে এমন সকল বিদেশি সামরিক শক্তিগুলোর উচিত সিরিয়া ত্যাগ করা।

আমেরিকা যদি উত্তর-পূর্ব সিরিয়া থেকে তার সমস্ত সেনা প্রত্যাহার করে নেয়, তাহলে রাশিয়া-সমর্থিত দামেস্ক সরকার তুরস্কের নিয়ন্ত্রণাধীন নয় এমন বেশিরভাগ অঞ্চলে ফের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে পারে।

পশ্চিমাদের অবস্থান
দুই মিলিয়ন সিরীয় শরণার্থীকে স্বভূমিতে ফিরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনায় তুরস্ক তার পশ্চিমা মিত্রদের দিক থেকে কোনো সমর্থন পায়নি। পাশ্চাত্যের প্রধান উদ্বেগ হলো, কুর্দি নিয়ন্ত্রণাধীন উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় সুন্নি আরব সিরিয়ানদের আগমন এই অঞ্চলের জনসংখ্যার পরিবর্তন ঘটাবে।    

সিরিয়া সংকটে নিয়োজিত জাতিসংঘের আঞ্চলিক সমন্বয়ক বলেন, তুরস্ক আক্রমণ চালালে তার জন্য উচিত যেকোনো পক্ষের বেসামরিক নাগরিকদের বাস্তুচ্যুতি যেন না ঘটে সেদিকে লক্ষ্য রাখা।

আসাদ ও তার বিরোধীরা?

যদিও এই অঞ্চলটি কার্যত সিরিয়া সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়েছে, তথাপি তুর্কি অভিযানের অর্থ এই দাঁড়াবে যে, এই অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রক সত্ত্বা একটি বেসরকারি বাহিনী (কুর্দি) থেকে তুরস্ক ও আসাদের পতনকামী যোদ্ধাদের দিকে স্থানান্তর হবে।

দামেস্ক বহু আগ থেকেই তুরস্ককে একটি দখলদার শক্তি হিসেবে দেখে আসছে, সিরিয়ার উত্তরাঞ্চল নিয়ে যার বিশেষ পরিকল্পনা আছে। তাই দামেশক কখনো কখনো কুর্দিদের সঙ্গে চুক্তিতে ইচ্ছুক এমন ইঙ্গিতও দিয়েছে, যদিও তাদের সাম্প্রতিক আলোচনা একটি পরিণতিতে পৌঁছে গেছে।    

বিশৃঙ্খলা এবং আইএস
এই বছরের গোড়ার দিকে আইএসের সর্বশেষ ঘাঁটি দখলে নেয়ার পর থেকে এসডিএফ আইএসের স্লিপার সেলগুলোর বিরুদ্ধে আক্রমণ পরিচালনা করে আসছে।  

কুর্দি নেতারা দীর্ঘদিন থেকে সতর্কতা দিয়ে আসছিলেন যে, তুরস্কের আক্রমণের ফলে যদি পরিস্থিতির অবনতি ঘটে, তাহলে হয়তো এসডিএফের পক্ষে আইএস বন্দিদের ধরে রাখা সম্ভব হবে না। 

উত্তর সিরিয়ার কুর্দি-নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের বৈদেশিক সম্পর্ক বিভাগের মতে, এসডিএফের কাছে ইরাক ও সিরিয়া থেকে ৫,০০০ যোদ্ধা এবং ৫৫ টিরও বেশি দেশের এক হাজার বিদেশি যুদ্ধবন্দি রয়েছে। এই অঞ্চলে বিশৃঙ্খলা হলে আইএস এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে আবার নতুনভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে।

আলজাজিরা আরবির প্রতিবেদন ভাষান্তর করেছেন মুহাম্মাদ ফয়জুল্লাহ।

এমএফ/

 

ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ: আরও পড়ুন

আরও