আরামকো হামলা : সৌদিতে মার্কিন অস্ত্রগুলো কোথায়?

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯ | ২ কার্তিক ১৪২৬

আরামকো হামলা : সৌদিতে মার্কিন অস্ত্রগুলো কোথায়?

পরিবর্তন ডেস্ক ২:৩৪ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৯

আরামকো হামলা : সৌদিতে মার্কিন অস্ত্রগুলো কোথায়?

সৌদি আরবের জাতীয় তেল কোম্পানি আরামকোর দুটি তেল স্থাপনায় ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ড্রোন হামলা ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পর সম্প্রতি সৌদি সশস্ত্র বাহিনীর সামরিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

আমেরিকার সামরিক কারখানাগুলোর উৎপাদিত সর্বশেষ নতুন অস্ত্রগুলো সংগ্রহ করেও সৌদির সামরিক সক্ষমতার এমন দুর্বলতা দেখে অবাক হয়েছেন ওয়াশিংটনের অনেক বিশেষজ্ঞ। বিশেষ করে, যখন ড্রোন ও ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি প্রতিরক্ষা ভেদ করে একের পর এক লক্ষ্যস্থলে আঘাত হেনে চলেছে।

রাশিয়ার নমনীয়তা

অন্যদিকে, হামলার এই সকল ঘটনায় উৎসাহিত হয়ে সৌদিকে রুশ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয়ের পরামর্শ দেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। গত সোমবার তুরস্ক ও ইরানের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ পরামর্শ দেন। 

পুতিন বলেন, ‘সৌদি যদি নিজেদের প্রতিরক্ষা করতে চায়, তাহলে সৌদি আরবের নেতারা একটি দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিলেই পারেন, যেমন সিদ্ধান্ত ইরান নিয়েছিল। সে রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৩০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংগ্রহ করেছে। অথবা তুরস্কের মত সিদ্ধান্ত; তুরস্ক আমাদের কাছ থেকে এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয় করেছে।’

আগামী মাসে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সৌদি আরবে এক ঐতিহাসিক সফর করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, ‘আরামকো হামলা আগামী অক্টোবর মাসে নির্ধারিত সৌদি আরবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের সফরের প্রস্তুতির উপর কোন প্রভাব ফেলবে না। এবং দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার জন্য রিয়াদ ও মস্কো উভয়ের পক্ষ থেকে “দৃঢ় রাজনৈতিক ইচ্ছা” রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। 

আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং ওয়াশিংটনে মিডলইস্ট ইনস্টিটিউটের সহকারী ডেভিড ম্যাক বলেছেন, ‘আমেরিকার শুন্যস্থান পূরণ করতে হস্তক্ষেপের সামান্য সুযোগও হাতছাড়া করবে না রাশিয়া, যেমনটা সিরিয়া ও তুরস্কে ঘটেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘মস্কো সোভিয়েত আমল থেকেই ধনী আরব রাষ্ট্রগুলোর কাছে অস্ত্র বিক্রি করতে চায়। রাশিয়া ইতোমধ্যে সিরিয়া, ইয়েমেন, মিসর, লিবিয়া ও আলজেরিয়ার কাছে অস্ত্র বিক্রি করেছে। তবে সে দ্রুত ও সহজেই বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে ধনী রাষ্ট্রগুলোর কাছে অস্ত্র বিক্রি করতে সবসময় চেষ্টা করে আসছে, যা এখনও রাশিয়ার পক্ষে সম্ভব হয়নি।’

তার মতের পক্ষে ইরান বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং পেন্টাগনের জাতীয় প্রতিরক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জাওদাত বাহগাত মনে করেন, মার্কিন অংশীদারদের তুলনায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর প্রতি মস্কোর রাজনীতিতে যথেষ্ট নমনীয়তা রয়েছে।

তিনি আলজাজিরাকে বলেন, ওয়াশিংটন বিভিন্ন আঞ্চলিক কোন্দলে কোন এক পক্ষকে সমর্থন করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। অন্যদিকে, রাশিয়া অপর পক্ষের বিপরীতে কোন এক পক্ষকেও সমর্থন করে না। ফলে পুতিন তুরস্ক, ইরান, ইসরাইল, সৌদি, আরব আমিরাত, কাতার–সবার সাথেই ভালো সম্পর্ক উপভোগ করে এবং রাশিয়ার অস্ত্রের প্রচার ও বিক্রি করতে বিশ্বের যেকোনো অঞ্চলে যেকোনো সুযোগের সদ্ব্যবহার করে। 

সৌদির অস্ত্রের কার্যকারিতা

ইয়েমেনে যুদ্ধ শুরুর পাঁচ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সামরিকভাবে যুদ্ধ শেষ করতে অক্ষম হয়েছে।  

সৌদি বাহিনীকে আমেরিকার রসদ ও গোয়েন্দা সহযোগিতা সত্ত্বেও সৌদি আরব অসংখ্য সামরিক ভুল করেছে, যার ফলে শতশত বেসামরিক লোক হতাহত হয়েছে।

অন্যদিকে, স্কাড ক্ষেপণাস্ত্রের মত ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র অথবা ড্রোন ব্যবহার করে সৌদির অভ্যন্তরে নানা লক্ষ্যস্থলে হুথিদের আক্রমণও থেমে নেই।

কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিসের একটি সমীক্ষা ইঙ্গিত দেয় যে, ২০০৭ সালের মে মাসে ট্রাম্প রিয়াদে সফর করার পর সৌদি আরবের সঙ্গে বেশ অনেকগুলো অস্ত্র বিক্রির চুক্তিতে সাক্ষর করে। এরপর হোয়াইট হাউস কংগ্রেসকে এর বেশিরভাগের অনুমোদনের জন্য বলে। তন্মধ্যে সবচে গুরুত্বপূর্ণগুলো হচ্ছে :

-থাড (THAAD) জাতীয় সাতটি এয়ার ডিফেন্স ব্যাটারি। মূল্য : ১৩.৫ বিলিয়ন ডলার
-জিবিউ-১০ (GBU-10) মডেলের ১০৪টি আকাশ থেকে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র। সামষ্টিক মূল্য : ৪.৪৬ বিলিয়ন ডলার
-প্যাট্রিয়ট জাতীয় এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের ব্যাটারির পুনঃচার্জ এবং শক্তিশালীকরণ সিস্টেম। মূল্য : ৬.৬৫ বিলিয়ন ডলার
-রক্ষণাবেক্ষণ এবং সহায়তা প্রোগ্রামসহ সি-১৩০জে (C-130J) মডেলের ২৩টি সামরিক পরিবহন বিমান।
-আটটি এফ-১৫ (F-15) মডেলের বিমান। মূল্য : ৬.৩৬ বিলিয়ন ডলার
-সৌদি নৌবাহিনীর জন্য লকহিড মার্টিনের তৈরি একটি ফ্রিগেট। মূল্য : ৬ বিলিয়ন ডলার
-বেশ কিছু সংখ্যক স্মার্ট বোমা। মূল্য : ৭ বিলিয়ন ডলার

অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা

সাধারণ নাগরিক হত্যাসহ লেখক ও সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডের ফলে কংগ্রেস রিয়াদের কাছে অস্ত্র বিক্রিতে বেশ কয়েকবার নিষেধাজ্ঞা আরোপের উদ্যোগ নেয়।

উভয় চেম্বারে কংগ্রেস অস্ত্র রপ্তানি ঠেকাতে ভোটও দেয়। কিছু সদস্য এই আশঙ্কা ব্যক্ত করেন যে, এই অস্ত্র হয়তো ইয়েমেনের যুদ্ধ কবলিত এলাকায় বেসামরিক নাগরিকদের উপরও ব্যবহার করা হবে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ করে কংগ্রেসের সিদ্ধান্তকে ভেটো দেন। তার যুক্তি ছিল, এই সিদ্ধান্ত আমেরিকার বৈশ্বিক প্রতিযোগিতাকে দুর্বল করে দেবে এবং মিত্রদের সাথে তার সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।  

কিন্তু ওয়াশিংটনের অনেক সামরিক বিশেষজ্ঞ বলেন, এটা অসম্ভব যে সৌদি আরব ওয়াশিংটন থেকে সরে গিয়ে রাশিয়া অথবা চীনের সঙ্গে মিলিত হবে। কেননা সৌদি সেনাবাহিনী অস্ত্রশস্ত্র ও সামরিক প্রশিক্ষণগত দিক থেকে বিশেষভাবে পাশ্চাত্যের ধাঁচে গঠিত।

ফলে পূর্বদিকে যাওয়াটা সৌদি আরবের জন্য অবাস্তব আকাঙ্ক্ষা ধরে নেওয়া যেতে পারে। এটা কোনোভাবেই এক দুই বছরের মধ্যে সম্ভব হবে না। কেননা পুরো সশস্ত্র ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং এর সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রশিক্ষণের প্রক্রিয়াগুলো অনেক বছর এবং সম্ভবত কয়েক দশকও সময় নেয়।

ওয়াশিংটনে আলজাজিরার প্রতিনিধি মুহাম্মাদ আল-মিনশাউয়ীর আর্টিকেল আলজাজিরা আরবী থেকে ভাষান্তর করেছেন মুহাম্মাদ ফয়জুল্লাহ।

এমএফ/

 

ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ: আরও পড়ুন

আরও