ট্রাম্পের ‘কূটচালে’ কোণঠাসা ইরান, এরপর কী?

ঢাকা, রবিবার, ৮ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

ট্রাম্পের ‘কূটচালে’ কোণঠাসা ইরান, এরপর কী?

পরিবর্তন ডেস্ক ৯:০৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ২২, ২০১৯

ট্রাম্পের ‘কূটচালে’ কোণঠাসা ইরান, এরপর কী?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান— দু’দেশই বলছে তারা যুদ্ধ চায় না। কিন্তু, মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলে বিরাজমান উত্তেজনা দেখে মনে হচ্ছে তারা শেষ পর্যন্ত একটা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে।

সাম্প্রতিক সব উত্তেজক ঘটনায় গোলাগুলির যুদ্ধ শুরু যদি নাও হয়; গত দুই মাস ধরে নিম্নমাত্রায় যে সংঘর্ষ চলছে, তা আন্তর্জাতিক জ্বালানি শিল্পের জন্য একটা হুমকি এবং তেলের বাজার এই ঝুঁকিটার সঠিক মাত্রা একদমই ঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারছে না। এরা শুধু আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ধীরগতির হয়ে যাওয়ার কারণে চাহিদা কমে যাওয়া নিয়ে চিন্তিত।

অপরিশোধিত তেলের দাম এখন ব্যারেল প্রতি ৬৩ ডলার, যা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংকট শুরুর আগের দাম থেকে কম। গত দুই মাসে হরমুজ প্রণালীতে কমপক্ষে সাতটি তেলের ট্যাংকারের ওপর হামলার ঘটনায় প্রধান সন্দেহভাজন ইরান।

পারস্য উপসাগরের কয়েকটি বন্দর এমনকি সৌদি আরবের ভেতরে একটি পাইপলাইন লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে এবং ইরান মার্কিন একটি ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করেছে তাদের আকাশসীমা লঙ্ঘনের অভিযোগে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার বলেছেন, হরমুজ প্রণালীতে যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস বক্সার ইরানের একটি ড্রোন খুব কাছে চলে আসায় সেটি ভূপাতিত করেছে।

এরপর সর্বশেষ উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয় শুক্রবার, যখন ইরানের রেভ্যুলুশনারি গার্ড বাহিনী ব্রিটিশ পতাকাবাহী একটি তেলের ট্যাংকার আটকে দেয়।

বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যে সবচেয়ে বড় চেকপয়েন্ট হরমুজ প্রণালী। আনুমানিক প্রায় দুই কোটি ব্যারেল বা আন্তর্জাতিক সরবরাহের ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল সেখান দিয়ে বহন করা হয়।

ইরানের নেতারা বলেছেন, তারা জাহাজ চলাচলের এই গুরুত্বপূর্ণ পথটি বন্ধ করে দিতে সক্ষম। কিন্তু, এমন কাজ তাদের অর্থনীতির জন্য উপকারী নয়। হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিলে সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও ইরানের তেল রফতানি ব্যাহত হবে।

গত বছর বিশ্বের এলএনজি বা জ্বালানি গ্যাসের ২৬ শতাংশ বা ১১০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার এই পথ দিয়ে বহন করা হয়েছে, যার বেশিরভাগই গেছে কাতার ও আমিরাত থেকে। ওই এলাকায় একাধিক শোধনাগার পেট্রোকেমিক্যাল রফতানির স্থাপনা রয়েছে।

মিডিয়াগুলো অর্থনৈতিক কৌশলগত গুরুত্বের কারণে প্রণালীটি নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও এটা বন্ধ হয়ে যাবে বা সেটা হলেও তা বেশিদিন ধরে চলবে এমনটা মনে করেন না বেশিরভাগ বিনিয়োগকারী। ট্রাম্প প্রশাসন ওই প্রণালী দিয়ে নিরাপদ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক জোট গঠনসহ বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে। কিন্তু, প্রণালীটি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার চেয়েও আশঙ্কাজনক বিষয় রয়েছে।

এর মধ্যে প্রথমেই বলতে হচ্ছে, ট্রাম্প ও ইরানের নেতারা চাইলেও এটা আলোচনার মাধ্যমে কিভাবে শেষ হবে তা পরিষ্কার নয়।

যুক্তরাষ্ট্র ‘সর্বোচ্চ চাপ’ সৃষ্টির লক্ষ্যে ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর অবরোধ আরোপ করেছে ইরানের ওপর। এসব পদক্ষেপকে তেহরান ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ হিসেবে অভিহিত করেছে। ট্রাম্প ইরানের অপরিশোধিত তেল রফতানি দিনে আড়াই লাখ ব্যারেলের নিচে নামিয়ে দিয়েছেন। অথচ এটাই দেশটির জীবনীশক্তি বলা যায়।

এগুলো বারাক ওবামার আমলের অবরোধের মতো নয়। তখন ইরান দিনে প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল তেল রফতানি করতে পারতো। ট্রাম্প ইরানের তেল রফতানি শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং তিনি এতে যতটা সফল হয়েছেন তা অনেকেই চিন্তা করতে পারেনি।

এমনকি ইরানের প্রধান দুই ক্রেতা ভারত ও চীনও মে মাস থেকে ইরানের তেল আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে। এতে পরিষ্কার যে ইউরোপের দেশগুলোর মতোই চীন এবং ভারতও চায় না যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের সুযোগ হারাতে।

ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপের প্রতিক্রিয়ায় ইরান পরমাণু চুক্তি ভঙ্গ করতে শুরু করেছে। শুধু ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে হলেও এই চুক্তি বহাল আছে। চুক্তিতে যে পরিমাণ পারমাণবিক বস্তু মজুদ করার অনুমোদন রয়েছে, তার চেয়ে বেশি মজুদ করেছে এবং ইউরেনিয়াম অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বেশি পরিশুদ্ধ করছে।

অবরোধ থেকে মুক্তি না পাওয়া পর্যন্ত ইরান পরমাণু চুক্তি ভঙ্গ করতে থাকবে। ট্রাম্প শিগগিরই ক্ষ্যান্ত দেবেন বলে মনে হয় না। নিকট ভবিষ্যতে বর্তমান অবস্থায় চলতে থাকবে বলেই মনে হয়।

ইরান উপসাগরের জ্বালানি পরিকাঠামোকে হেনস্তা করে যাবে। কারণ অবরোধের বিরুদ্ধে এটাই ইরানের একমাত্র অস্ত্র। এসব ঘটনা তেলের বর্তমান মন্দা বাজারকে কিছু চাঙ্গা করে এবং ইরান যে যৎসামান্য তেল বিক্রি করতে পারে সেটার ভালো দাম পায়।

উপসাগরে ইরানের ঝামেলা তৈরির ক্ষমতাকে খাটো করে দেখা উচিৎ নয়। ওই এলাকায় ইরানের বিভিন্ন ‘প্রক্সি গ্রুপ’ বা ইরানের হয়ে লড়াই করার মতো বিভিন্ন দল রয়েছে।

লেবাননে রয়েছে হিজবুল্লাহ। ইয়েমেনে হুথি, যারা সৌদির সঙ্গে লড়াই করছে এবং ইতোমধ্যে সৌদির জ্বালানি পরিকাঠামো ও তেলের ট্যাংকারের ওপর হামলা করেছে।

ইরাকের ভেতরেও ইরানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী রয়েছে। ওপেক সদস্যদের মধ্যে সৌদির পরেই সবচেয়ে বেশি উৎপাদনকারী ইরাক। ইরানের প্রক্সি যোদ্ধাদের কারণে এক্সন দু’বার ইরাকের তেলে খনি ছেড়ে আসতে বাধ্য হয়েছে।

তাহলে সামনে কী ঘটবে? কোনো পরিস্থিতিই এতটা খারাপ না যে সেটাকে আরও খারাপ অবস্থার দিকে নিয়ে যাওয়া যায়। তীর থেকে দূরে স্থাপিত তেলের স্থাপনায় সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। এটা হলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এই সংকট আরও ঘণীভূত হওয়ার ঝুঁকিটা জটিল হয়েছে দূর থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে খোঁচাতে ইরান মনুষ্যবিহীন ড্রোন, মাইন ও সাইবার হামলার ওপর নির্ভর করায়।

দু’পক্ষই খুব বিপদজনক একটা খেলা খেলছে যেটা কোনো পক্ষই শান্তিপূর্ণভাবে শেষ করার উপায় জানে বলে মনে হয় না।

তেলের বাজার বর্তমান সময়ের জন্য আশাবাদী হতে পারে। কিন্তু, পরে এই আত্মবিশ্বাস ভুল প্রমাণিত হতে পারে পরে।

[Trump Has Put Iran In A Corner, Now What’ শিরোনামে ড্যান এবারহার্টের বিশ্লেষণী কলামটি ২২ জুলাই ফোর্বসের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে। ড্যান এবারহার্ট যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ব্যক্তি মালিকানাধীন তেলের খনির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। তিনি উত্তর আমেরিকা, এশিয়া এবং আফ্রিকার জ্বালানি খাতে কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন। তার বিভিন্ন বিশ্লেষণী লেখা সিএনএন, দ্য হিল ও দ্য ইকনোমিস্টসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া তিনি ফক্স বিজনেস, সিএনএন, এমএসএনবিসি, ব্লুমবার্গ ও সিএনবিস্যার মতো সংবাদ মাধ্যমের অনুষ্ঠানে নিয়মিত উপস্থিত হন]

এমআর/আইএম

 

ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ: আরও পড়ুন

আরও