লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলির লড়াই ইউরোপের জন্যে সমস্যা

ঢাকা, রবিবার, ৮ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলির লড়াই ইউরোপের জন্যে সমস্যা

আহমেদ শরীফ ৬:০২ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১১, ২০১৯

লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলির লড়াই ইউরোপের জন্যে সমস্যা

লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলির আশেপাশে চলছে যুদ্ধ। ৮ই এপ্রিল ত্রিপোলিতে অবস্থিত ‘গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল একর্ড’ বা জিএনএ বলে যে, রাজধানীর আশেপাশে সংঘর্ষে ২১ জনের প্রাণহানি ঘটেছে, আর ২৭ জন আহত হয়েছে। হতাহতের মাঝে রেড ক্রিসেন্টের একজন ডাক্তারও রয়েছে। ‘জিএনএ’-এর বিরোধী ‘লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি’ বা ‘এলএনএ’ বলছে যে, লড়াইয়ে তাদের ১৪ জন সৈন্য মারা গেছে। সাম্প্রতিককালে ত্রিপোলিতে এই লড়াই শুরু হবার কারণ হলো লিবিয়ার দুই গ্রুপেরমাঝে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। ‘জিএনএ’-এর কর্মকান্ডের কেন্দ্র হলো ত্রিপোলি। অপরিকে পূর্বের আল-বাইদা শহরে ঘাঁটি গেড়েছেন জেনারেল খলিফা হাফতার। হাফতারের অধীন ‘এলএনএ’ সেনাবাহিনী পুরো লিবিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছে, যা কিনা লড়াইকে ত্রিপোলির দোড়গোড়ায় এনে দিয়েছে। ত্রিপোলি হলো লিবিয়ার অর্থনৈতিক রাজধানী। এই অঞ্চলের সকল তেল বিক্রির অর্থ ত্রিপোলিতে আসে। ২০১১ সালে পশ্চিমা সহায়তায় লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট মুয়াম্মার গাদ্দাফীকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকে ত্রিপোলির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই শুরু হয়। তবে এবারের ত্রিপোলির যুদ্ধের একটা গভীর ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। 

গাদ্দাফীর পতনের পর থেকেই হাফতার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন পুরো লিবিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিতে। ১৯৮০-এর দশকে হাফতার গাদ্দাফীর সেনাবাহিনীর একজন অফিসার হিসেবে দক্ষিণেরদেশ শাদ-এ যুদ্ধ করতে যান। শাদ-এর সেনাবাহিনীর হাতে পরাজিত হবার পর হাফতার যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। সেখানে তিনি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-এর তত্ত্বাবধানে থাকেন গাদ্দাফীর পতন পর্যন্ত। গাদ্দাফীর পতনের পর তিনি লিবিয়াতে ফেরত আসেন এবং লিবিয়ার পূর্বের শহর বেনগাজী থেকে সামরিক অপারেশন শুরু করেন। ৭৫ বছর বয়সী জেনারেলহাফতারকে যুক্তরাষ্ট্র, মিশরএবংআরবআমিরাত সমর্থন দিয়ে আসছে। যদিও মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব মাইক পম্পেও লিবিয়ার রাজধানীর উপর হাফতারের হামলার বিরোধিতা করেছেন। ফ্রান্সও হাফতারকে সহায়তা দিয়েছে, যাতে হাফতার লিবিয়ার মাঝ দিয়েচলাচলকারী আফ্রিকার অভিবাসী-প্রত্যাশী এবং সন্ত্রাসীদের ইউরোপে প্রবেশ প্রতিরোধ করতে পারেন। ইউরোপিয়রা ‘জিএনএ’-কেও একই কারণে সমর্থন দিচ্ছে। একইসাথে রাশিয়াও হাফতারকে কাছে টেনেছে উত্তর আফ্রিকাতে তার প্রভাব বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে।

লিবিয়াতে কর্মরত জাতিসংঘের কর্মকর্তারা বলছেন যে, তার খুব সম্ভবতঃ লিবিয়া ছেড়ে যাবেন না। তবে ৭ই এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যরা জাহাজের মাধ্যমে লিবিয়ার উপকূল ছেড়ে যায়। মার্কিন আফ্রিকা কমান্ডের প্রধান জেনারেল থমাস ওয়াল্ডহাউজার এক বিবৃতিতে বলেন যে, মার্কিন সেনারা সেখানে ছিল কূটনৈতিক কাজে সমর্থন দেয়া এবং সন্ত্রাস দমনের কাজে। যেহেতু বর্তমান পরিস্থিতিতে এরপর কি হবে বলা যাচ্ছে না, তাই তারা সেখান থেকে সেনা প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, মার্কিন সেনারা সরে যাওয়ায় হাফতারের বাহিনীকে কোন অনাকাংক্ষিত সমস্যায় পড়তে হবে না, এবং এর ফলে সামরিক অপারেশন চালাতে হাফতারের সুবিধাই হবে। আর হাফতারের সৈন্যদের সামনে পড়লে মার্কিন সেনারা কি করবে – এধরনের জটিল পরিস্থিতিও মার্কিন কর্মকর্তাদের মোকাবিলা করতে হবে না। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে লিবিয়ার বিভিন্ন সামরিক-রাজনৈতিক গ্রুপগুলিকে একত্রিত করে একটা সরকার তৈরি করতে। তবে ইউরোপিয় দেশগুলি মার্কিন নেতৃত্ব মেনে নিতে চাইছে না বলেই এই সমস্যার সুরাহা হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র বলছে যে, তারা ‘জিএনএ’-কে সমর্থন করে। একইসাথেতারাবলছেযে, যেহেতুহাফতারকে বাদ দিয়ে কোন সমাধান করা যাবে না, তাই হাফতারকেও হিসেবে রাখতে হবে।

‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, হাফতার চাইছেন পুরো লিবিয়াকে একত্রিত করতে; তবে তা হতে হবে হাফতারের অধীনে। সামরিক বিশ্লেষকেরা কেউ কেউ বলছেন যে, হাফতারের সেনাবাহিনী তার সাপ্লাই লাইন থেকে বহুদূরে চলে এসেছে। এখন সেই সাপ্লাই লাইন সঠিকভাবে কাজ করানোই কঠিন হবে। এটা না করতে পারলে হাফতারের বাহিনীর সন্মান নিয়ে পিছু হটা কঠিন হয়ে যাবে। ৭ তারিখ থেকে উভয় দলই একে অপরের উপর বিমান হামলা শুরু করেছে। স্থানীয় লোকেরা বলছেন যে, হাফতারের সেনারা ত্রিপোলির ২০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমের শহর আজিজিয়াতে ‘জিএনএ’-এর সেনাদের সাথে যুদ্ধ করছে।

হাফতারকে ঠেকাবার জন্যে লিবিয়ার বহু পক্ষের মাঝে একত্রিত হবার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। উপকূলের মিসরাতা এবং পশ্চিমের পাহাড়ী এলাকার জিনতান-এর বাহিনীগুলি এখন হাফতারের বিপক্ষে এক হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এখন দেখার বিষয় হবে যে, হাফতারের বিপক্ষে দাঁড়ানো এই গ্রুপগুলি কতদিন একত্রে কাজ করতে পারে; অথবা এদের কেউ আলাদা হয়ে গিয়ে হাফতারের পক্ষে ভিড়ে যায় কিনা।

লিবিয়াতে হাফতারের আক্রমণ এমন সময় শুরু হলো, যখন প্রতিবেশী আলজেরিয়াতেও রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে। লিবিয়া এবং আলজেরিয়া আফ্রিকা থেকে ইউরোপে অভিবাসী প্রত্যাশীদের প্রতিরোধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ইউরোপের দেশগুলি অভিবাসী প্রত্যাশীদের ঠেকাতে উত্তর আফ্রিকার দেশগুলিকে ইউরোপিয় প্রভাব বলয়ে রাখা ছাড়াও সেখানে স্থিতিশীলতা চায়। লিবিয়ার গৃহযুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইউরোপের জন্যে অভিবাসী সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। একইসাথে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধও একই সমস্যা সৃষ্টি করেছে ইউরোপের জন্যে। হাফতারের অধীন ‘এলএনএ’ ইউরোপের প্রভাব বলয়ে নেই। সেক্ষেত্রে হাফতারের আক্রমণে ইউরোপই সবচাইতে চিন্তিত। ‘বিবিসি’র এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, এপ্রিলের ১৪ থেকে ১৬ তারিখের মাঝে লিবিয়ার ব্যাপারে আলোচনায় বসার কথা রয়েছে; এর মাঝেই এই হামলা এলো। যেভাবে এবং যে সময়ে হাফতার হামলা শুরু করেছেন, তাতে এটা বোঝা যাচ্ছে যে, যুদ্ধে হেরে না গেলে হাফতার পিছু হটবেনা না। গত মার্চের প্রথম সপ্তাহে হাফতার ‘জিএনএ’এর সাথে আলোচনায় বসেছিলেন। সেসময় তিনি মনে করছিলেন যে, ত্রিপোলির উপর হামলা করা অসম্ভব; কারণ কয়েকটা পশ্চিমা রাষ্ট্র হাফতারকে ত্রিপোলি আক্রমণ থেকে দূরে থাকতে বলেছে। তবে সেই আলোচনার কিছুদিন আগেইফেব্রুয়ারিতে হাফতারের সেনারা লিবিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমে আলজেরিয়ার সীমান্তের কাছাকাছি এল-শারারা তেলখনি দখল করে নেয়। পশ্চিমের প্রতিবেশী তিউনিসিয়াও ত্রিপোলির লড়াইয়ে চিন্তিত। বর্তমানে লিবিয়ার বেশিরভাগ অঞ্চলই হাফতারের বাহিনীর দখলে। এমনকি দক্ষিণে শাদ-এর সীমানাতেও হাফতারের বাহিনী নিজেদের অবস্থান সুসংহত করছে, যেখানে ফরাসী সামরিক বাহিনী তীক্ষ্ণদৃষ্টি রেখেছে।

লেখক: ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক

এএসটি/

 

ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ: আরও পড়ুন

আরও