উইঘুর মুসলিমদের সংস্কৃতি নিশ্চিহ্ন করতে মসজিদ গুঁড়িয়ে দিচ্ছে চীন

ঢাকা, ২১ মার্চ, ২০১৯ | 2 0 1

উইঘুর মুসলিমদের সংস্কৃতি নিশ্চিহ্ন করতে মসজিদ গুঁড়িয়ে দিচ্ছে চীন

পরিবর্তন ডেস্ক ৮:০৭ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ০৮, ২০১৯

উইঘুর মুসলিমদের সংস্কৃতি নিশ্চিহ্ন করতে মসজিদ গুঁড়িয়ে দিচ্ছে চীন

চীনের সংখ্যালঘু উইঘুর মুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অংশ হিসেবে চীন জিনজিয়াং প্রদেশের মসজিদ গুঁড়িয়ে দেয়াসহ বিভিন্ন দমন নিপীড়নের কৌশল গ্রহণ করেছে।

রোববার ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ানের সম্পাদকীয়তে একথা জানান সোয়াস ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডনের রিডার র‍্যাচেল হ্যারিস।

হ্যারিস জানান, গত সপ্তাহে টুইটারে শন ঝ্যাং নামে একজন সাংবাদিক স্যাটেলাইটের তোলা দু’টি ছবি প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায় দক্ষিণের হোতান অঞ্চলের কেরিয়া মসজিদটি যেখানে ছিল, ওই জায়গা এখন একদম ফাঁকা।

অসাধারণ এই স্থাপত্য নিদর্শনটি প্রায় ৮০০ বছর আগে ১২৩৭ সালে তৈরি হয়েছিল। ১৯৮০ ও ১৯৯০’র দশকে এটির ব্যাপক সংস্কার করা হয়। ২০১৬ সালে তোলা একটি ছবিতে দেখা যায় এক উৎসবের দিন মসজিদটির সামনের রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়েছে। ২০১৮ সালে দেখা মসজিদটি যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানে শুধুই সমান জমি।

পর্যবেক্ষকরা উইঘুরদের বিরুদ্ধে চীনের কর্মকাণ্ডকে ‘বুলডোজার স্টেট বা পিষে সমান করে দেয়া রাষ্ট্র’র কাজ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। ওই প্রদেশের ভূচিত্র এবং সেখানকার মানুষকে ধ্বংস ও পুনর্নির্মাণ করতে চীনের সরকারের চলমান কার্যক্রমের জন্য এটা একটা মানানসই অভিধা।

চীনে কথিত ‘ধর্মীয় চরমপন্থা’র বিরুদ্ধে অভিযানের প্রথম লক্ষ্যের একটি ছিল কেরিয়ার মসজিদ।

র‍্যাচেল বলেন, ২০১৭ সালে কুমুল এলাকায় গিয়ে একজন প্রতিবেদক স্থানীয় কর্মকর্তার কাছে জানতে পারেন, ওই অঞ্চলের ৮০০টি মসজিদের মধ্যে ২০০টি ইতিমধ্যেই ধ্বংস করে ফেলা হয়েছিল এবং ২০১৮ সালের মধ্যে আরও ৫০০ মসজিদ গুঁড়িয়ে দেয়ার কর্মসূচি নেয়া হয়েছিল।

এলাকাবাসী জানান, স্থানীয় মসজিদগুলো রাতারাতি উধাও হয়ে গিয়েছিল, কোনও আগাম ঘোষণা ছাড়াই গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছিল সেগুলো।

চীনের জিনজিয়াংয়ে শুধু মসজিদই ধ্বংস করা হচ্ছে না, সেখানকার শহরগুলোরও নকশা নতুন করে করা হচ্ছে, জানান উইঘুর সংস্কৃতি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ র‍্যাচেল। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারির ব্যবস্থা করতে পুনর্গঠন করা হচ্ছে শহরগুলো। কাশগারের মতো প্রাচীন শহরের স্থাপত্য নিদর্শনগুলো মাটিতে মিশিয়ে দিয়ে নতুন করে নির্মাণ করা হচ্ছে।

চীনা সরকারের দাবী, জিনজিয়াংয়ের ক্রমবর্ধমান পর্যটন খাতের সুবিধার্থে করা হচ্ছে এসব।

শুধু ঐতিহাসিক নিদর্শনই নয়, বুলডোজার চালানো হচ্ছে পুরো জনগোষ্ঠী, সংস্কৃতি মানুষের জীবনের ওপর। জিনিজিয়াংয়ে প্রাত্যহিক উপাসনা অর্থাৎ নামাজ কার্যত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। চেকপয়েন্ট, চেহারা শনাক্ত করার সফটওয়ার, মোবাইল ফোন স্ক্যানারসহ নজরদারির বিভিন্ন প্রযুক্তি ছেয়ে ফেলেছে মানুষের জীবন। যখন তখন হানা দেয়া হয় ‘চরমপন্থা প্রবণ’ ব্যক্তিদের বাড়িতে।

এই ‘চরমপন্থা প্রবণ’ ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত মানুষগুলোকে গত কয়েক বছর ধরে পাঠানো হচ্ছে বিশাল আকারের গণ বন্দীশালায়। অত্যন্ত গোপনে ওই বন্দীশালাগুলো পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু গবেষকরা বিপুল পরিমাণ তথ্য প্রমাণাদি সংগ্রহ করে নিশ্চিত হয়েছেন, বন্দিশালাগুলোতে দশ লাখেরও বেশি উইঘুর ও কাজাখ মুসলিমকে বন্দি রাখা হয়েছে। বন্দীদেরকে নির্মম অত্যাচারের মাধ্যমে তাদের আত্মসমালোচনায় বাধ্য করার চেষ্টা করে সরকার।

বহির্বিশ্ব এই বন্দীশালাগুলোর কথা জানতে পেরেছে ওই এলাকার উইঘুর ও কাজাখ গোত্রের অনেকে এবিষয়ে মুখ খোলার পর। এর ফলে তাদের কাছের মানুষদের চীনা কর্তৃপক্ষ নির্যাতন করতে পারে জেনেও তারা সোচ্চার হন অন্যায়ের প্রতিবাদে।

চীনা সরকার আন্তর্জাতিক মহলের কাছে এই বন্দীশালাগুলোকে ‘কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’ হিসেবে তুলে ধরার জন্য ব্যাপক প্রচারণা শুরু করেছে। তাদের দাবী, ওই অঞ্চল থেকে চরমপন্থা নির্মূল করতে এবং স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো জরুরী।

র‍্যাচেলের বহু সহকর্মী ও বন্ধু হারিয়ে গেছে এই বন্দীশালাগুলোর ভিতরে। তার মতে এগুলোর সম্পর্কে চীনা সরকারের বক্তব্য অপমানজনক।

এখানে বন্দীদের মধ্যে রয়েছে শিক্ষাবিদ, জনপ্রিয় তারকা, কমেডিয়ান এবং কবি। গুঁড়িয়ে দেয়া মসজিদের মতোই এরাও উইঘুরদের পরিচয় ও গৌরবের নিদর্শন। সাংস্কৃতিক অভিজাত শ্রেণীকে এভাবে ছেঁকে বিচ্ছিন্ন ফেলাটা ১৯৩০’র দশকে সোভিয়েত নেতা স্টালিনের শাসনামলের আতঙ্কের কথা মনে করিয়ে দেয় র‍্যাচেলের ইউরোপীয় সহকর্মীদের।

উইঘুরদের নিজস্ব ভাষা ব্যবহারেও বিধিনিষেধ আরোপ করে তাদের জন্য চীনা ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ভিন্ন গোত্রের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে তাদের। সাধারণ উইঘুরদেরকে সর্বক্ষণ তাগাদা দেয়া হচ্ছে চীনা উৎসব উদযাপন ও বিপ্লবী গান গাওয়ার জন্য।

এটা সহিংস চরমপন্থার পাল্টা জবাব নয়, বরং একটি সংস্কৃতিকে সম্পূর্ণ শূন্যগর্ভ করে ফেলা ও একটা পুরো জনগোষ্ঠীকে আতঙ্কিত করে রাখার জন্য সর্বাত্মক পদক্ষেপ। পশ্চিমা দেশগুলো বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাচ্ছে, এই অজুহাতে এসব কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে চীনের সরকার।

এটা দুঃখজনক যে চীনের কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে কঠোর সমালোচনা করছে যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থী মহল, যাদের নিজেদের স্বার্থ রয়েছে চীনে। কিন্তু বিশ্বজুড়ে যে ইসলামভীতি দেখা দিয়েছে তার পরিপ্রেক্ষিতে জিনজিয়ানের মুসলিমদের দমন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে বামপন্থি দলগুলোরও সোচ্চার হওয়া দরকার বলে মনে করেন র‍্যাচেল।

চীনের বিশাল সড়কের নেটওয়ার্ক তৈরির প্রকল্প ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর অংশ হয়ে চীনের কাছে দারুণ ঋণী হয়ে আছে অনেকগুলো মুসলিম দেশ। একারনে মুসলিম দেশগুলোও জিনজিয়াং-এ চীনের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করতে ব্যর্থ হয়েছে।

অন্যদিকে পশ্চিমা দেশগুলোও আরও ভালো কোনও ভূমিকা পালন করতে পারেনি। সম্প্রতি ইতালি যোগ দিয়েছে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে। যেসব কোম্পানি, প্রতিষ্ঠান, এবং রাষ্ট্রের সরকার মুখে মানবাধিকারের কথা বলে তারা যদি পণ্য, প্রযুক্তি বা কৌশল দিয়ে জিনজিয়াংয়ে নির্যাতনে সাহায্য করে তাদেরকে জবাবদিহির ব্যবস্থা করা জরুরী বলে মন্তব্য করেন র‍্যাচেল।

চীনের নিরাপত্তা বাহিনীর অত্যাচার সত্ত্বেও যেসব সাহসী মানুষ মুখ খুলেছেন তাদের জন্য এই নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মহলকে সচেতন করাটা জরুরী মনে করেন তিনি।

এমআর/এএসটি

 

ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ: আরও পড়ুন

আরও